kalerkantho

সোমবার । ১০ কার্তিক ১৪২৭। ২৬ অক্টোবর ২০২০। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

দুই বছরে ১০ লাখ গ্রাহক হবে কমিউনিটি ব্যাংকের

মাসুদ রুমী   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



দুই বছরে ১০ লাখ গ্রাহক হবে কমিউনিটি ব্যাংকের

দুই লাখ পুলিশ সদস্যের জমানো টাকায় সৃষ্টি হয়েছে কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। তারাই এর মালিক এবং একই সঙ্গে গ্রাহকও। তবে এটি শুধু একটি বাহিনীকেন্দ্রিক নয়, জনমানুষের ব্যাংক হতে চায় বলে জানালেন কমিউনিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মসিউল হক চৌধুরী। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তৃণমূলে ক্ষুদ্র সঞ্চয় আকর্ষণের মাধ্যমে আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণে অবদান রাখতে চায় কমিউনিটি ব্যাংক। আগামী পাঁচ বছরে করপোরেট গভর্ন্যান্স, কর্মী সন্তুষ্টি, গ্রাহকসেবার দিক থেকে শীর্ষে যাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।

গত ২৯ অক্টোবর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় কমিউনিটি ব্যাংকের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। গুলশানে পুলিশ প্লাজা কনকর্ডে করা হয়েছে ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয়।

কমিউনিটি ব্যাংকের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১১ সেপ্টেম্বর আমাদের ব্যাংক উদ্বোধন করেন। আমাদের স্লোগান ট্রাস্ট, সিকিউরিটি ও প্রগ্রেস। কমিউনিটির সঙ্গেই পুলিশ বাহিনীর কাজ। তারা নিজেরাও একটি বড় কমিউনিটি। কোনো একটি ব্যাংকের শুরু থেকেই প্রায় দুই লাখের একটি বিশাল কমিউনিটি পাওয়া নজিরবিহীন ঘটনা। প্রথম ছয় মাসেই আমরা পুলিশ সদস্যদের বেতন নিয়ে কাজ করতে পারছি। আমরা খুব দ্রুত শাখা এবং বুথ নিয়ে তৃণমূলে হাজির হব।’

তিনি বলেন, বিশ্বের জনপ্রিয় কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার ফিনাকল দিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছি। এ বছরের মধ্যে আমরা ছয়টি শাখা খোলার অনুমতি পেয়েছি। আগামী বছর আমাদের পরিকল্পনা আরো ৩০টির মতো শাখা খোলার। শাখার আশপাশে আমরা বুথ ব্যাংকিংয়ে যাব। শুধু দুই লাখ পুলিশ সদস্য নন, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের ব্যাংকের সুবিধার আওতায় আনতে চাই। তাহলে আগামী দুই বছরের মধ্যে আমরা ১০ লাখ গ্রাহকের ব্যাংকে পরিণত হব।’

কমিউনিটি ব্যাংক কি শুধু পুলিশ বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে জানতে চাইলে এমডি বলেন, ‘একটি তফসিলি ব্যাংক। আমরা শুধু পুলিশের ব্যাংক হতে চাই না, গণমানুষের ব্যাংক হব। কারণ জনসম্পৃক্ত না হলে ব্যাংক বড় হবে না। ব্র্যাঞ্চ, বুথ, ডিজিটাল সার্ভিস—এ সবই আমরা সবার জন্য করছি। আমরা সবাইকে সমান অগ্রাধিকার দিতে চাই। এ বিষয়টি আমরা সম্পূর্ণভাবে খেয়াল রাখছি।’

মসিউল হক চৌধুরী বলেন, ‘যেহেতু কমিউনিটি ব্যাংক একটি তফসিলি বাণিজ্যিক ব্যাংক, তাই এখানে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী থেকে শুরু করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান সবাইকে আধুনিক ব্যাংকিং সেবা দেওয়া হবে। এখানে পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ব্যাংক হিসাব খুলতে পারবেন। গাড়ি কেনা, ব্যক্তিগত ঋণ, গৃহনির্মাণ, বিয়ে—সব ধরনের ঋণ দেওয়া হবে।’

ব্যাংক খাতের কঠিন প্রতিযোগিতায় নতুন ব্যাংক হিসেবে কমিউনিটি ব্যাংকের উদ্ভাবন কী হবে জানতে চাইলে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘আমরা দেশের গণমানুষের কাছে পৌঁছানো যায় এমন ঋণ ও আমানত প্রকল্প চালু করব। আমরা এতটাই তৃণমূলে যেতে চাই, যেখানে ব্যাংক এখনো যেতে পারেনি। আমরা গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য ক্ষুদ্র সঞ্চয় নিয়ে বিশেষভাবে কাজ করব। এ ছাড়া রিটেইল, এসএমই, করপোরেটসহ সব ধরনের সেবা দেব।’

কমিউনিটি ব্যাংক প্রথম থেকেই খেলাপি ঋণের ব্যাধি থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করবে বলে জানালেন ব্যাংকের এমডি। তিনি বলেন, ‘খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের সুদহার কমানো কঠিন হচ্ছে। আমরা এনপিএল (নন-পারফরমিং লোন) শূন্যের কোঠায় রেখে এগোব। এ ছাড়া ব্যাংকের প্রযুক্তিগত নিরাপত্তায় জোর দিচ্ছি। আমাদের যদি এনপিএল না হয় তাহলে আমরা কম রেটে গ্রাহকদের সেবা দিতে পারব। আমরা গবেষণায় দেখেছি, আমাদের বাজার যতটা না রেট সেনসেটিভ, তার চেয়ে বেশি সার্ভিস সেনসেটিভ। আমরা সেটাই দেওয়ার চেষ্টা করব। প্রথম থেকেই খেলাপির সংস্কৃতির বাইরে থাকার এবং করপোরেট গভর্ন্যান্স প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছি। আমরা যাকেই ঋণ দেব প্রথম থেকেই নিখুঁতভাবে দেখব, যাতে খেলাপি ঋণের ব্যাধি ব্যাংকে না আসে।’

খেলাপি ঋণ কমাতে আরো কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন উল্লেখ করে এই ব্যাংকার বলেন, ‘যাঁরা যৌক্তিক কারণেই খেলাপি হয়েছেন তাঁদের উদ্ধারের জন্য প্যাকেজ দেওয়া গেলে তাঁরা অর্থনীতিতে আরো অবদান রাখতে পারবেন। কিন্তু যাঁরা ইচ্ছাকৃত খেলাপি তাঁদের বিরুদ্ধে কঠিনতম আইনের প্রয়োগ করে একটি ইতিহাস সৃষ্টি করতে হবে।’

দেশে স্টার্টআপের বিকাশে কমিউনিটি ব্যাংকের ভূমিকা কী হবে তা জানতে চাইলে এমডি বলেন, ‘আমাদের দেশে কিছুটা সফল স্টার্টআপকেও ঋণ দিতে ব্যাংক পিছিয়ে যায়, কারণ সে কতটুকু সার্থক হবে তা আমি জানি না। তার পরও যাদের সলিড মার্কেট, বায়ার, ক্যাশফ্লো আছে তাদের অর্থায়ন করব। তবে এই খাতে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, ফিনটেক কম্পানির অনেক কাজ করার সুযোগ আছে। যেটা সিলিকন ভ্যালি, বেঙ্গালুরুতে হয়েছে। আমাদের তরুণ উদ্যোক্তাদের সুযোগ দিতে হবে, তাহলে সেখান থেকেই বড় কোনো উদ্যোগ বেরিয়ে আসবে।’

ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা বিশাল জনগোষ্ঠীর আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণেও কমিউনিটি ব্যাংক অগ্রণী ভূমিকা রাখবে বলে জানালেন এমডি। তিনি বলেন, ‘আমরাও ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব, স্কুল ব্যাংকিংসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের যেসব কার্যক্রম আছে তা করব। মোবাইল ফোনের গ্রাহকের তুলনায় আমরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছি। মোবাইল ফোনের যে টপআপ হচ্ছে—এটা ব্যাংকিং চ্যানেলের টাকা। এই ট্রাঞ্জেকশনটাও ব্যাংকের মাধ্যমে হতো পারত। তাহলে তাদেরও ব্যাংকিং সেবার আওতায় আনা যেত। মোবাইল ফোনের ডিস্ট্রিবিউশন, কেওয়াইসি সব কিছুই খুব সহজ, যা ব্যাংকের ক্ষেত্রে নয়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের সঙ্গে আমাদের জন্য সমান ক্ষেত্র নিশ্চিত করতে হবে।’

আগামী পাঁচ বছরে কমিউনিটি ব্যাংককে কোথায় দেখতে চান— জানতে চাইলে এমডি বলেন, ‘আমরা করপোরেট গভর্ন্যান্স, কর্মী সন্তুষ্টি, গ্রাহকসেবার দিক থেকে শীর্ষে থাকতে চাই। আমরা এমন পরিবেশ নিশ্চিত করতে চাই, যাতে মানুষ বলবে, বাংলাদেশে একটি স্টেট অব আর্ট ব্যাংক তৈরি করেছে পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্ট। আমরা যদি কাজটি ঠিকমতো করি তাহলে প্রফিটেবিলিটি আসবে। কিন্তু এটাই একমাত্র লক্ষ্য নয়। আসল লক্ষ্য এই ব্যাংকটির সুনাম।’

দেশের শীর্ষ ব্যাংকিং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হতে মানবসম্পদে সবচেয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে মসিউল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের প্রধান কার্যালয় ও ছয়টি ব্র্যাঞ্চ মিলিয়ে ১৬০ জন কর্মী নেওয়া হয়েছে। আগামী বছর তা ৮০০ হয়ে যাবে। আমরা ধাপে ধাপে এগোব। যিনি এখানে যোগ দিয়েছেন তিনি এখানে যাতে একটা ভালো ক্যারিয়ার ও কর্মের নিশ্চয়তা পান সেদিকে আমরা নজর দিচ্ছি। যাতে কর্মীরা মনে করেন এটা তাঁর পরিবারের অংশ, আমরা সেভাবেই ব্যাংকটিকে প্রতিষ্ঠা করব।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা