kalerkantho

শনিবার। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৭। ৫ ডিসেম্বর ২০২০। ১৯ রবিউস সানি ১৪৪২

লেখক মোতালেব হাওলাদার

রাজীব দেবনাথ

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



মেলায় একজন লেখক এসেছেন। সবার দৃষ্টি এখন সেদিকে। সবাই হাঁ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে আছেন।

ধীর কিন্তু ক্ষীপ্র পায়ে এগিয়ে চলেছেন লেখক। শত শত পাঠক ভিড় জমাচ্ছে তাঁর আশপাশে। পুলিশ রীতিমতো হিমসিম খাচ্ছে উত্সুক জনতাকে সামাল দিতে। একজন অফিসার বোধ হয় এরই মধ্যে কন্ট্রোল রুমে এক্সট্রা ফোর্স চেয়ে ফোনও করেছেন।

অন্যদিকে প্রকাশকরাও ভিড় জমাচ্ছেন। সবার আফসোস তাঁরা আগে কেন এই লেখকের সন্ধান পেলেন না। আগে কেন এই লেখককে খুঁজে বের করলেন না। কেন তাঁর সঙ্গে আগে যোগাযোগ করলেন না। তবে এবার আর কেউ সুযোগটা মিস করতে চাচ্ছেন না। সবাই চাচ্ছেন যেভাবেই হোক লেখককে বুঝিয়েসুঝিয়ে, ভুলিয়েভালিয়ে হলেও আগামী মেলার জন্য একটা বই করিয়ে নিতে।

চোখে সানগ্লাস, হাতে ব্রেসলেট, বাম কানে দুল, গলায় মোটা চেইন, তার ওপর দিয়ে হেডফোন ঝুলিয়ে এগিয়ে চলেছেন লেখক। লেখকের পেছনে জনতা আর প্রকাশক। তাদের সামাল দিচ্ছে পুলিশ।

উত্সুক জনতা অটোগ্রাফের ডায়েরি, ফটোগ্রাফের ক্যামেরা আর প্রকাশক নানা উপঢৌকন নিয়ে লেখকের পেছনে ছুটে চলেছেন। লেখকের নাম মোতালেব হাওলাদার ওরফে গালকাটা মোতালেব।

এই গালকাটা মোতালেব একসময় ছিলেন রেলস্টেশনের কুলি। মানুষজনের মালামাল টানাটানির পাশাপাশি ছোটখাটো চুরি-চামারিও করতেন। একদিন সেই চুরির টাকা ভাগাভাগি নিয়েই সঙ্গীদের সঙ্গে বিবাদে জড়ান মোতালেব ওরফে গালকাটা মোতালেব। ঝগড়ার একপর্যায়ে নিজের ওপর কন্ট্রোল হারিয়েই ইকবাল নামে এক সঙ্গীর গালে ক্ষুর চালিয়ে দেন। 

সেই থেকেই শুরু। তারপর কেটে গেছে বিশটা বছর। আর এই বিশ বছরে কত মানুষকে মেরেছেন, কত মানুষের ওপর ক্ষুর চালিয়েছেন তা হয়তো মোতালেব হাওলাদার নিজেও জানেন না। আর সেই দিনের ওই মোতালেব হাওলাদার ঢাকা শহরে আজ প্রভাবশালী আর বিত্তশালীদের একজন। দখলদারি আর জোর-জবরদস্তির মাধ্যমে আজ তাঁর মোট সম্পত্তির পরিমাণ কত সে সম্পর্কে মোতালেব হাওলাদারের নিজেরও ধারণা নেই। কিন্তু এত বিত্ত-বৈভব অর্জনের পরেও তাঁর ওই গালকাটা মোতালেব নাম চাপা পড়েনি, বরং তা আরো ফুলেফেঁপে চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে।

হঠাত্ তিনি ভাবলেন, তাঁর এই বিশ বছরের অভিজ্ঞতা সবাইকে জানানো প্রয়োজন। জানানো প্রয়োজন মোতালেব হাওলাদার থেকে গালকাটা মোতালেব হয়ে ওঠার গল্প। অবশেষে তাঁর জীবনের সব লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা নিয়ে এবারের বইমেলায় লিখেই ফেললেন একখানা বই।

থ্রিল আর ট্র্যাজেডিতে ভরপুর সেই বইটি কিনতেই ভিড় জমিয়েছে মোতালেব হাওলাদারের লোকজন। পাড়া-মহল্লা থেকে গাড়ি আর বাইকের শোডাউন দিতে দিতে আসছে তাঁর নেতাকর্মী আর চেলাপেলারা।

অবশেষে মোতালেব হাওলাদার তাঁর স্টলে পৌঁছলেন। উপস্থিত জনতার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণ রাখলেন। এবারে ভক্তদের হাতে বই তুলে দেওয়ার পালা। মোতালেব হাওলাদারও তাই করলেন। অটোগ্রাফসহ তাঁর ‘কমলাপুর থেকে মতিঝিল’ বইটির প্রথম কপি তুলে দিলেন ইকবালের হাতে—সেই ইকবালের হাতে, যার কারণে তিনি আজ গালকাটা মোতালেব।

মন্তব্য