চ্যালেঞ্জে পড়েছিল ব্রাজিল। জাপান এক রুদ্ধশ্বাস লড়াই উপহার দেয়; কিন্তু শেষটা হয়নি তাদের। পিছিয়ে পড়ে ব্রাজিল ম্যাচ বের করে নিয়েছে খেলার একেবারে শেষ মুহূর্তে। কাইশু সানো জাপানকে এগিয়ে দেওয়ার পর কাসেমিরোর হেডে সমতা ফেরায় পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা। এরপর যোগ করা সময়েরও শেষ মুহূর্তে বদলি নামা গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলির গোলে ব্রাজিলের জয় ২-১ এ। জাপানিদের হৃদয় ভেঙে সেলেসাওরা এখন শেষ ষোলোতে।
হলুদের উচ্ছ্বাসের মাঝে শুরু হয় ম্যাচ। ব্রাজিল স্বভাবসিদ্ধ গোলমুখে হানা দিচ্ছিল। কার্লো আনচেলোত্তি যে ধরনটা পছন্দ করেন, ‘ভার্টিক্যাল’। বল খুব বেশি পায়ে না রেখে গোলপানে ছোটা। আগের ম্যাচের একাদশটা ধরে রেখে এদিন সেভাবেই শুরু
করে সেলেসাওরা। জাপানিরা বলের পেছনে, আর হলুদ জার্সিধারীরা ডিফেন্সলাইন মাঝমাঠে তুলে নিয়ে ক্রমাগত আক্রমণে। বার কয়েক গোলের চেষ্টা হয়ে যায় খেলার মিনিট দশেকের মধ্যে। জাপানিরা এই চাপ কেটে কিভাবে বেরোয়, সেটি দেখার ছিল। ১৪ মিনিটে একবার আক্রমণ শাণিয়েও পাল্টা কাউন্টারে গোল হজমের উপক্রম হয় তাদের। কাসেমিরোর শট অল্পের জন্য পোস্ট ঘেঁষে বেরিয়ে যায়। তবে সেই কাসেমিরোও বক্সের ঠিক ওপরে ফাউল করে বিপদ ডেকে এনেছিলেন। ফ্রি কিকের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায় বল পেয়েও অবশ্য দাইচি কামাদা তা কাজে লাগাতে পারেননি, নিচু শট লাগান দেয়ালে।
নেইমার এদিনও শুরুতে বেঞ্চে। মাঠের বড় পর্দায় তাঁর ছবি ভেসে উঠতেই ব্রাজিলিয়ানরা গগনবিদারী আওয়াজে তাদের ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেন এই তারকাকে। মাঠে এদিনও মূল নজরটা ছিল ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দিকেই। তিনি অপেক্ষায় ছিলেন মুহূর্তের ঝলকে হলুদ নদীতে আবার উচ্ছ্বাস জাগাতে। অথচ উল্টোটাই হয় ম্যাচের ঠিক ৩০ মিনিটে। মাঝমাঠে ব্রাজিল বল হারালে জাপানি মিডফিল্ডার কাইশু সানো একাই বল নিয়ে হলুদ সব জার্সিধারীর মাঝ দিয়ে গিয়ে গোল করে বসেন। হ্যাঁ, গোলই, হিউস্টনের গ্যালারির নীল অংশের শুরুতে বুঝতে যেন বেগ পেতে হয়, কিন্তু সত্যি বল আলিসনকে পেরিয়ে ব্রাজিলের জাল কাঁপিয়ে দিয়েছে। খেলার ধারার বিপরীতে ম্যাচে তাই এগিয়ে যায় জাপান। সর্বশেষ গত বছর টোকিওতে ২-০-তে পিছিয়ে পড়ে এই জাপান ব্রাজিলকে হারিয়েছিল। এদিন ১-০-তে এগিয়ে যায় তারা সব হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে।
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে মরক্কোর বিপক্ষে পিছিয়ে পড়ে ড্র নিয়ে মাঠ ছাড়তে পেরেছিলেন ভিনিসিয়ুসরা। সেই ম্যাচে অবশ্য মরক্কানদের আধিপত্যও ছিল চোখে পড়ার মতো। এরপরের ম্যাচগুলোতে আনচেলোত্তির দল নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছে। নক আউটের শুরুতে আবার সমতা ফেরানোর লড়াইয়ে নামতে হয় তাদের। ওদিকে গোল পেয়ে জাপানের খেলায় আত্মবিশ্বাস ফেরে। জাপানের পোস্টের পেছনে একঝাঁক জাপানি সমর্থক। তাদের গলার আওয়াজও। স্টেডিয়ামের অন্য ব্রাজিলিয়ানদেরও হার মানিয়ে দিচ্ছিল তাদের টানা গান।
দৃশ্যপট বদলে দিতে দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই তরুণ এনদ্রিকে নামান আনচেলোত্তি। বলে প্রথম ছোঁয়ায়ই তিনি গ্যালারিতে আলোড়ন জাগিয়েছিলেন। এক গোলে পিছিয়ে থাকা ব্রাজিল দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই সাঁড়াশি আক্রমণে। সেই ধারায় গোল পেয়েই যাচ্ছিলেন প্রায় ব্রুনো গিমারেস। দানিলোর ক্রসে নিশানাভেদী হেড নিয়েছিলেন ব্রাজিলিয়ান মিডফিল্ডার। জাপানি গোলরক্ষক জিয়ন সুজুকি শেষ মুহূর্তে হাত বাড়িয়ে তা ফিরিয়ে দেন। স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় সেই অ্যাকশনের রিপ্লে আসার আগেই আবার কাসেমিরোর ডাইভিং হেড, এবার গোললাইন থেকে তা ফেরে ডিফেন্ডার তাকেহিরো তোমিয়াসুর গায়ে লেগে। কিন্তু ব্রাজিলকে তখন পেয়ে বসেছে গোলের নেশায়, ঠিক হাঙর যেভাবে রক্তের ঘ্রাণে পাগল হয়ে ওঠে। ভিনিসিয়ুস বাঁ দিক দিয়ে ঢুকে পোস্টে লাগান। পরের মুহূর্তেই গ্যাব্রিয়েলের ক্রসে আবার লাফিয়ে ওঠেন কাসেমিরো। আর সম্ভব হয় না জাপানি প্রতিরোধের। গোলরক্ষক সুজুকি হাত পুরোপুরি তোলার আগেই কাসেমিরোর সেই হেডার জালের ঠিকানা খুঁজে নেয়। হিউস্টনে সমতায় ফেরে ম্যাচ।
আনচেলোত্তি এরপর মাতিয়াস কুনিয়াকে তুলে নিয়ে গ্যাব্রিয়েল মার্তিনেলিকে নামান। জয়ের জন্য ব্রাজিল চাপ বাড়াচ্ছিল। সেটি সামলানোর নতুন চ্যালেঞ্জর মুখে পড়ে জাপান। তারা ম্যাচের গতি কমায়। ঝোড়ো আক্রমণের পর সেই বিরতি ব্রাজিলেরও কিছুটা প্রয়োজন ছিল। ম্যাচ গড়ায় শেষ ১৫ মিনিটে। নেইমার ছিলেন ওয়ার্ম আপে, আনচেলোত্তির ডাকের অপেক্ষায়। এদিকে দর্শকদের উৎকণ্ঠা বাড়ছিল, ম্যাচ যে গড়াচ্ছিল অতিরিক্ত সময়ের দিকে। কাসেমিরো চোট পেলে আনচেলোত্তি তখন ফাবিনিয়োকে নামান। ম্যাচে যোগ করা সময়ের খেলা চলে তখন। সেই ৬ মিনিটের পঞ্চম মিনিটেই আসে হলুদে ঢেউ তোলা, ব্রাজিলকে শেষ ষোলোতে তুলে দেওয়া মার্তিনেলির গোলটি। ডান দিকে বল পেয়ে এনদ্রিক বাড়িয়েছিলেন গিমারেসকে, গিমারেস বাঁ দিকে ঠেলেন মার্তিনেলিকে, আর্সেনাল উইঙ্গার বল ডান পায়ে নিয়ে দ্বিতীয় পোস্ট দিয়ে তা জালে ঠেলেছেন ঠাণ্ডা মাথায়। হৃদয় ভাঙে জাপানিদের। অতিরিক্ত সময়ে না গিয়ে ২-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা।




