আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগাতে তাঁদের জন্য কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও সৃজনশীল অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এ লক্ষ্য সামনে রেখে ১০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের প্রস্তাব রাখা হচ্ছে, যার মাধ্যমে তরুণরা আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং, তথ্য-প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ, স্টার্টআপ সহায়তা এবং কর ছাড়ের নানা উদ্যোগও থাকছে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে তরুণদের মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি কাজে লাগাতে সৃজনশীল অর্থনীতি বা ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ খাতে কর ছাড়, বিশেষ তহবিল ও রিফাইন্যান্স সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে যুব ও তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা গঠন এবং দক্ষতা উন্নয়নে একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আত্মকর্মসংস্থানের জন্য যুব ঋণের সর্বোচ্চ সীমা বৃদ্ধি, বিশেষ তহবিল গঠন এবং তথ্য-প্রযুক্তি ও ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্প্রসারণ।
প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৯ লাখ তরুণকে প্রশিক্ষণ ও ঋণ সুবিধার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত তরুণদের জন্য যুব ঋণের সর্বোচ্চ সীমা দুই লাখ টাকা এবং সফল উদ্যোক্তাদের জন্য পাঁচ লাখ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র আরো জানায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে আহত ব্যক্তি ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের জন্য আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বিশেষ প্রকল্প নেওয়া হবে। পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
আসন্ন প্রস্তাবিত বাজেট সম্পর্কে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘দেশের অর্থনীতিকে নতুন মাইলফলকে নিতে হলে উচ্চাভিলাষ দরকার। তাই আমাদের সরকারের প্রথম বাজেটটি হবে উচ্চাভিলাষী। আমরা মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনতে চাই এবং প্রবৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে নিতে চাই।’
বাজেটের আকার ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক লক্ষ্য : ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাত লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার তুলনায় এটি এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি, শতকরা হিসাবে বৃদ্ধি ১৮.৭৩ শতাংশ। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আদায় করবে ছয় লাখ চার হাজার কোটি টাকা। বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে দুই লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক ঋণ এক লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংক ঋণ এক লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং প্রবৃৃদ্ধি ৬.৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সৃজনশীল অর্থনীতি ও ‘কোদালের পাশে ল্যাপটপ’: প্রস্তাবিত বাজেটে সৃজনশীল অর্থনীতি বা ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’কে নতুন অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ধারণাকে অনেকে সহজভাবে ‘কোদালের পাশে ল্যাপটপ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন।
এই অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো মেধা, সৃজনশীলতা, মেধাস্বত্ব ও প্রযুক্তি। আগে যেখানে জমি ও কাঁচামাল ছিল প্রধান সম্পদ, এখন সেখানে ডিজিটাল দক্ষতা, উদ্ভাবন ও চিন্তাশক্তিকেও অর্থনৈতিক সম্পদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ফ্রিল্যান্সিং, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, ই-কমার্স ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর কাজ ভবিষ্যতের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে। সরকারও তরুণদের এ খাতে যুক্ত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে।
কর ছাড় ও নতুন সুযোগ : বাজেট প্রস্তাবে তথ্য-প্রযুক্তি ও সফটওয়্যার খাতে বিদ্যমান কর অব্যাহতি ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে। এটি ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে। পাশাপাশি ডিজিটাল কনটেন্ট ক্রিয়েশন, গেম ডেভেলপমেন্ট, অ্যানিমেশন, মিউজিক প্রোডাকশন, ডিজাইন সার্ভিস ও ফ্রিল্যান্সিংকে কর সুবিধার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
স্টার্টআপ ও ইনোভেশন খাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত ৫০ কোটি টাকার রিফাইন্যান্স স্কিমে সৃজনশীল উদ্যোক্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এই তহবিলে সুদের হার কম এবং জামানত শিথিল থাকবে। এ তহবিলের আকার বাড়ানোর প্রস্তাবও রয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী ও সিলেটে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিতে ‘ক্রিয়েটিভ হাব’ বা ইনোভেশন জোন গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব হাবে উচ্চগতির ইন্টারনেট, বিদ্যুৎ সুবিধা, আধুনিক কম্পিউটার ও ভিডিও এডিটিং সুবিধা থাকবে। তরুণ উদ্যোক্তারা স্বল্প ভাড়ায় কাজের সুযোগ পাবেন।
ভারতের ‘স্টার্টআপ ইন্ডিয়া হাব’ ও ইন্দোনেশিয়ার ‘বেকরাফ হাব’ মডেলে এসব কেন্দ্র গড়ে তোলা হবে বলে জানা গেছে।
দক্ষতা উন্নয়ন ও রপ্তানি সহায়তা : বাজেটে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে গ্রাফিক ডিজাইন, ভিডিও এডিটিং, থ্রিডি অ্যানিমেশন, ডিজিটাল মার্কেটিং ও মিউজিক প্রোডাকশনে তিন থেকে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ কোর্স চালুর প্রস্তাব রয়েছে। প্রশিক্ষণ ব্যয়ের একটি অংশ সরকার ভর্তুকি দেবে।
এ ছাড়া সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, গেম ও অ্যানিমেশন রপ্তানির ক্ষেত্রে ৫ থেকে ১০ শতাংশ নগদ সহায়তার প্রস্তাব রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম থেকে আয় করা উদ্যোক্তারা বাড়তি সুবিধা পাবেন।
সামাজিক সুরক্ষা ও অগ্রাধিকার খাত : অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, বাজেটে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতে এক লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব রয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি।
উপদেষ্টার মন্তব্য : প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, প্রচলিত চাকরির বাইরে গিয়ে তরুণদের নতুন সুযোগ তৈরি করতে হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগাতে হলে সৃজনশীল অর্থনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ‘তরুণরা এখন মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ ব্যবহার করে নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। সরকারের দায়িত্ব তাঁদের সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা।’
তিনি আরো জানান, বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৬৫ শতাংশের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এ বাস্তবতায় এনএসডিএর মাধ্যমে আন্তর্জাতিকমানের ‘ক্রিয়েটিভ
স্কিল সার্টিফিকেশন’ চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।