kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০২২ । ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৯ । ১৪ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

আয়ের পথ দেখাচ্ছে মরুর ফল সাম্মাম

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট ও প্রসূণ মণ্ডল, গোপালগঞ্জ   

৭ অক্টোবর, ২০২২ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আয়ের পথ দেখাচ্ছে মরুর ফল সাম্মাম

সাম্মাম : সাম্মাম ফল চাষ করে সাড়া ফেলেছেন বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার গারফা গ্রামের ইঞ্জিনিয়ার শেখ ফয়সাল আহম্মেদ। ছবি : কালের কণ্ঠ

মরু অঞ্চলের সাম্মাম। সুস্বাদু ও মিষ্টি জাতের ফল। বাংলাদেশে আগে থেকেই বিদেশি এই ফলের আবাদ হচ্ছে। তবে নতুন করে নদীর পার ও পতিত জমিতে সাম্মাম চাষ করে বাড়তি আয় করেছেন বাগেরহাটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার শেখ ফয়সাল আহম্মেদ এবং গোপালগঞ্জের কৃষক অবনি মণ্ডল।

বিজ্ঞাপন

এখন তাঁরা বাণিজ্যিকভাবে ফলটির আবাদের পরিকল্পনা করছেন।

ফয়সাল আহম্মেদের বাড়ি বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলার গারফা গ্রামে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মধুমতী নদীর দুই পারে ‘মধুমতি এগ্রো’ নামের ফলবাগান। বাগানে মাচায় ফুলে-ফলে ভরপুর সাম্মাম। বিভিন্ন আকারের কাঁচা-পাকা হাজার হাজার ফল ঝুলছে। সবুজ থেকে হলুদ বর্ণ ধারণ করছে ফলগুলো। গাছের গোড়ার অংশের মাটি মালচিং পেপার দিয়ে ঢাকা। ফয়সাল নিজেই গাছের পরিচর্যা করছেন।

তিনি জানান, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে পাস করে বের হওয়ার পর ঢাকায় দুটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ১০ বছর চাকরি করেছেন। তবে মা-বাবার পাশে থাকার জন্য দুই বছর আগে চাকরি ছেড়ে বাড়িতে ফিরে যান। এরপর কৃষিকাজে যোগ দেন। গত বছর প্রথমে তরমুজের চাষ করেন। তবে

১০ লাখ টাকা লোকসান হয়। এরপর চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে সাম্মামের বীজ সংগ্রহ করে চারা তৈরি করেন। এরপর ৪০ শতাংশ জমিতে তিন হাজার সাম্মাম গাছের চারা রোপণ করেন। আড়াই মাসের মধ্যে সাড়ে চার লাখ টাকার সাম্মাম বিক্রি হয়।

ফয়সাল আরো জানান, প্রথমবার চাষেই লাভবান হওয়ায় তিনি ছয় বিঘা জমিতে সাম্মামের আবাদ শুরু করেন। এ পর্যন্ত ১৫ লাখ টাকার সাম্মাম বিক্রি করেছেন। আর আবাদে খরচ হয়েছে প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা। ফলটির চাহিদা বেশি থাকায় এখন তিনি বাণিজ্যিক উৎপাদনের পরিকল্পনা করছেন।

ফয়সাল জানান, সাম্মাম সারা বছর চাষ হলেও এটি মূলত শীতের ফল। আর শীত ও বর্ষা মৌসুম-পরবর্তী সময়ে সাম্মামের চাষ ভালো হয়। বীজ থেকে সাম্মামের চারা রোপণ করার পর ৩০ থেকে ৪০ দিনের মধ্যে গাছে ফুল ও ফল আসে। সব মিলে ৭০ দিনের মধ্যে ফল সংগ্রহ করা যায়। এক থেকে আড়াই কেজি ওজনের একেকটি সাম্মাম ফলেছে তাঁর বাগানে। ৯০ থেকে ২৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। ক্রেতাদের কাছে সাম্মামের প্রচুর চাহিদা। ভবিষ্যতে তিনি বিদেশে এই ফল রপ্তানি করতে চান।

ফয়সালের দেখাদেখি গারফা গ্রামের আমিনুল ইসলাম সাম্মাম চাষে আগ্রহী। এরই মধ্যে নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জেনেছেন। সাম্মাম চাষের জন্য ২৭ শতাংশ জমি তিনি প্রস্তুত করছেন।

এদিকে অবনি মণ্ডলের বাড়ি গোপালগঞ্জের রঘুনাথপুর গ্রামে। তিনি জানান, নাতির জন্য বাজার থেকে একটি সাম্মান কিনতে গিয়ে ফলটির আবাদের কথা তাঁর মাথায় আসে।

অবনি মণ্ডল জানান, মৎস্য ঘেরের পারে পরীক্ষামূলকভাবে সাম্মাম চাষ করে সাফল্য পান তিনি। লাউ, কুমড়া ও শাক-সবজির সঙ্গে সৌদি আরবের ফল সাম্মাম ফলিয়েছেন। তিনি গত মে মাসের শেষ দিকে এক হাজার ৩০০ টাকার সাম্মামের বীজ কিনে বপন করেন। এরপর ৫৬টি চারা হয়। এগুলো পতিত জমিতে তিন ফুট দূরত্বের গর্তে রোপণ করেন। আগস্টের প্রথম দিকে ফল পরিপক্ব হতে শুরু করে। এসব গাছে ১৪০টি সাম্মাম হয়। প্রতিটির ওজন গড়ে দুই কেজি। ১২০ টাকা কেজি দরে ফলগুলো ৩৩ হাজার ৬০০ টাকায় বিক্রি করেন।

রাজধানীর বাড্ডার ভাই ভাই ফল ভাণ্ডারের ব্যবসায়ী ইলিয়াস আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজধানীতে সাম্মাম ফলের চাহিদা রয়েছে। প্রতিটি ফলের ওজন হয়ে থাকে দুই থেকে আড়াই কেজি। ২০০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়। সাম্মাম মূলত শীতকালীন ফল। এখন ফলটি তেমন দেখা যাচ্ছে না। অবশ্য কিছুদিন ধরে ফলটি রাজধানীর বাজারে অল্প অল্প করে আসতে শুরু করেছে। আগাম মৌসুম শুরু হওয়ায় কিছুদিনের মধ্যেই সাম্মাম সব দোকানে চলে আসবে।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আজিজুর রহমান জানান, সাম্মাম মূলত বেলে ুুদো-আঁশ মাটিতে চাষ হয়। বাগেরহাটের অনেক অঞ্চলের মাটি সাম্মাম চাষের উপযোগী। মাচা করে সাম্মাম চাষ করতে হয়। গাছের গোড়ার অংশের মাটি একধরনের পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। ফয়সাল আহম্মেদ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাম্মাম চাষে সফলতা পেয়েছেন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে নানাভাবে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সাম্মাম চাষ করে সাড়া জাগিয়েছেন ফয়সাল। তিনি আরো জানান, বিদেশি যেসব ফলের চাহিদা বেশি, সেসব ফল চাষের জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রযুক্তিগত সহায়তার পাশাপাশি তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।

গোপালগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খামারবাড়ির উপপরিচালক অরবিন্দ কুমার রায় বলেন, সাম্মাম বাঙ্গিজাতীয় বিদেশি ফল। খুব মিষ্টি। এই ফল রঘুনাথপুরে চাষ হওয়ায় এখানকার আবহাওয়ার সঙ্গে মানানসই প্রমাণিত হলো। উচ্চ ফলন ও লাভ হওয়ায় ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে এই ফলের চাষ বাড়াতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হবে।

 



সাতদিনের সেরা