kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

কুমিল্লার ঘটনার জের

নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ঢাকায় বিক্ষোভ, ভাঙচুর, আগুন

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



নোয়াখালী, চট্টগ্রাম, ঢাকায়  বিক্ষোভ, ভাঙচুর, আগুন

নোয়াখালীর চৌমুহনীর রামঠাকুর আশ্রমের সামনে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া গাড়ি। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুমিল্লায় পূজামণ্ডপের ঘটনার জের ধরে গতকাল শুক্রবার ঢাকা, নোয়াখালী, চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি স্থানে বিক্ষোভ হয়। সরকারের তরফ থেকে দাবি করা হয়েছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ব্যাপক নজরদারির কারণে নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ উপজেলার চৌমুহনী বাজার ছাড়া দেশের অন্য এলাকায় বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ঢাকা ও চট্টগ্রামে বিক্ষোভ এবং বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। চৌমুহনী পৌর এলাকায় আজ সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে ৩৫ জেলায়। গতকাল ভোর ৫টা থেকে প্রায় সন্ধ্যা পর্যন্ত সারা দেশে মোবাইল ইন্টারনেটও বন্ধ রাখা হয়।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের দাবি, বিজয়া দশমীর দিন সাম্প্রদায়িক অপশক্তি চট্টগ্রাম, সিরাজগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, করিমগঞ্জ ও নোয়াখালীর চৌমুহনী, সিলেটের মদিনা মার্কেটসহ বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপ, মন্দির, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট ঘটিয়েছে। নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে রাধামাধব জিউ মন্দির, কোটবাড়ী লোকনাথ মন্দির, কলেজ রোডে ইসকন মন্দির, পোড়াবাড়ী শ্যামা কালীমন্দির, রাম ঠাকুরের আশ্রম, মণ্ডলপাড়ার লোকনাথ মন্দিরে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। চৌমুহনীতে যতন কুমার সাহাকে হত্যা করা হয়েছে। নিমাই চন্দ্র দাস নামের একজন সন্ন্যাসী গুরুতর আহত হয়েছেন। পূজা উদযাপন পরিষদ আজ শনিবার ঢাকাসহ সারা দেশে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

নোয়াখালীতে গতকাল জুমার নামাজ শেষে জেলার চৌমুহনী বাজারে প্রায় ৮-১০টি পূজামণ্ডপ ও মন্দিরে হামলা চালানো হয়। কয়েকটি দোকানেও ভাঙচুর ও লুটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। চৌমুহনীতে রামঠাকুর আশ্রমের সামনে রাখা দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ কয়েকটি স্থাপনা পোড়ানো হয়েছে। হামলায় ২৫ জন আহত হয়েছে। এ ছাড়া চৌমুহনী বাজারের কলেজ রোডে অবস্থিত পূজামণ্ডপ, ব্যাংক রোডের আরো কয়েকটি মন্দিরেও হামলা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় একজনের নিহত হওয়ার খবর রটলেও পরে জানা যায় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। র‌্যাব, পুলিশ ও বিজিবি সদস্যরা প্রায় দুই ঘণ্টা পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেন।

নোয়াখালীর পুলিশ সুপার মো. শহিদুল ইসলাম জানান,  বিভিন্ন মন্দিরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যসংখ্যা কম থাকায় তাদের প্রতিহত করতে পারেনি। পরে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে। হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে, তবে কেউ মারা যায়নি।

চৌমুহনী বাজারের কলেজ রোডের পূজামণ্ডপ ‘বিজয়ার’ সম্পাদক জয় ভুইয়া বলেন, ‘দশমীতে আমরা প্রশাসনের নির্দেশ অনুযায়ী সকাল ১১টার মধ্যেই বিসর্জন সম্পন্ন করি। দুপুরের পর আমরা পূজা-পরবর্তী বৈঠক করছিলাম। জুমার নামাজ শেষে বাজারের বিভিন্ন মসজিদ থেকে দুই সহস্রাধিক লোকের মিছিল প্রথমে নবদুর্গা মণ্ডপে প্রবেশ করে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। এরপর বিজয়ার মণ্ডপে প্রবেশ করে প্রতিমা ভাঙচুর করে। আমাদের কমিটির সদস্য যতন সাহা (৩৬) এ ঘটনা দেখে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাদের হামলায় অনেকে আহত হয়। পরে ওই সড়কে অবস্থিত ইসকন মন্দিরও তারা ভাঙচুর করে।’

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে গতকাল জুমার নামাজের পর মহানগরীর বেশ কয়েকটি মসজিদ থেকে বের হয়ে মুসল্লিরা মিছিল করে। আন্দরকিল্লা এলাকায় জেএমসেন হলের পূজামণ্ডপের সামনে ভাঙচুর ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে কয়েকজন যুবক। বাধা দিতে গেলে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল ছোড়ে। পুলিশ রাবার বুলেট ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

ঘটনার পর পূজা উদযাপন পরিষদের নেতারা সড়কে অবস্থান নেন। সেখানে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা অ্যাডভোকেট রানা দাশগুপ্ত প্রতিমা বিসর্জন স্থগিত রেখে শনিবার দুপুর পর্যন্ত হরতালের ডাক দেন। এরপর সেখানে পৌঁছান চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। পরে পূজা কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ কমিশনার সালেহ মোহাম্মদ তানভীর। এরপর মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (জনসংযোগ) আরাফাতুল ইসলাম বলেন, কোনো ধরনের সমস্যা ছাড়াই বেশির ভাগ প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। প্রতিমা বিসর্জনের সময় পুলিশ পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। ঐক্য পরিষদ পরে হরতাল প্রত্যাহারের কথা জানায়।

ঢাকা : দুপুরে রাজধানীর পল্টনে বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। বিক্ষোভকারীরা পুলিশের উদ্দেশে ইটপাটকেলও ছোড়ে। এতে পাঁচ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। পাঁচ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। ঘটনার সময় এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। 

প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ জানায়, জুমার নামাজের পরপরই বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। এ সময় বায়তুল মোকাররম ঘিরে রাখা শতাধিক পুলিশ তাদের বাধা না দিয়ে সরে দাঁড়ায়। পরে কয়েক শ মুসল্লি স্লোগান দিতে দিতে কাকরাইল মোড়ের দিকে যায়। কাকরাইল মোড়ে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। তখন মিছিল থেকে পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছোড়া শুরু হয়। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল  নিক্ষেপ  ও লাঠিপেটা করে।  মিছিলকারীরা পিছু হটে বিজয়নগর, ফকিরাপুল এলাকার বিভিন্ন গলিতে ঢুকে পড়ে এবং সেখান থেকেও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। পুলিশও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। দুপুর পৌনে ২টা থেকে প্রায় বিকেল ৩টা পর্যন্ত এ অবস্থা চলতে থাকে।

পুলিশ জানায়, কুমিল্লার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররম মসজিদ এলাকায় কেউ যাতে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সকাল ১১টা থেকেই মসজিদের চারদিকে তারা অবস্থান নেয়। দুপুর সাড়ে ১২টায় মসজিদের উত্তর দিকের গেটে মাথায় ফিতা বাঁধা একদল তরুণের অবস্থানের দিকে নজর রাখছিল পুলিশ। মসজিদের ভেতরেও এদের অবস্থান ছিল। ইমাম জুমার নামাজের সালাম ফেরানোর সঙ্গে সঙ্গে মসজিদের ভেতরে দৌড়াদৌড়ি ও স্লোগান শুরু হয়। ‘মালিবাগ মুসলিম যুব সমাজ’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে মুসল্লিরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করে।

পুলিশ তাদের বায়তুল মোকাররম থেকে কাকরাইলের নাইটিংগেল মোড় পর্যন্ত মিছিলের অনুমতি দিলেও মুসল্লিরা কাকরাইল মোড়ে গিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) আব্দুল আহাদ দুপুর ২টা ৪৫ মিনিটের দিকে সাংবাদিকদের বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে। মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়েছে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল সূত্র জানায়, বিক্ষোভকারীদের মধ্যে চারজন সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়।

সিলেট : সিলেট নগরের হাওলাদারপাড়া এলাকায় দুটি পূজামণ্ডপে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। দুপুর আড়াইটার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এতে মণ্ডপের একজন স্বেচ্ছাসেবক আহত হন। জালালাবাদ থানার ওসি নাজমুল হুদা খান বলেন, মিছিল থেকে মণ্ডপে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করা হয়। তবে পুলিশ ও মণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবকরা তা প্রতিহত করেন। পুলিশ তাত্ক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়ায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।

কুমিল্লা : কুমিল্লায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব। তাঁর নাম গোলাম মাওলা (২৬)। তিনি জেলার বুড়িচং উপজেলার কালিকাপুর মধ্য-দক্ষিণপাড়া গ্রামের মৃত তাজুল ইসলামের ছেলে। গতকাল সন্ধ্যায় র‌্যাব-১১-এর পক্ষে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়। 

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বুধবার নগরীর নানুয়ার দীঘির পারের পূজামণ্ডপের অপ্রীতিকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোলাম মাওলা তাঁর নিজের ফেসবুক ও ইউটিউব চ্যানেলে বিভিন্ন উগ্রবাদী কথা সংযুক্ত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব প্রচার করেন। গোলাম মাওলা নিজে একটি দোকানে ভিডিও এডিটর হিসেবে কাজ করেন। ঘটনার সময় তিনি নিজে ওই পূজামণ্ডপে গিয়ে বিভিন্ন ছবি সংগ্রহ করেন। বৃহস্পতিবার রাতে নগরীর নিউ মার্কেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

চাঁদপুর : চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে গতকাল নতুন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। গত বুধবার রাতের সংঘর্ষের ঘটনায় তিনটি মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় দুই হাজার লোককে আসামি করা হয়েছে। হাজীগঞ্জ থানায় হামলা ও পুলিশ আহত হওয়ার ঘটনায় দুটি মামলা করে পুলিশ। রাজারগাঁও ইউনিয়নের মুকন্দসার গ্রামে হামলার ঘটনায় অন্য মামলাটি করা হয়েছে। হাজীগঞ্জে মোট ১২টি পূজামণ্ডপ ভাঙচুর করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। হাজীগঞ্জ থানার ওসি হারুনুর রশিদ জানান, বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করা হচ্ছে। অন্যায়ভাবে কাউকে আটক করা হবে না।

হাজীগঞ্জের ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাসিরউদ্দিন সরোয়ারকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই সংঘর্ষে নিহত আল আমিন, শামীম ও হৃদয়ের দাফন হাজীগঞ্জের নিজ নিজ গ্রামে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং নির্মাণ শ্রমিক বাবলুর মৃতদেহ তাঁর গ্রামের বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সুন্দরগঞ্জ ভাগডাঙ্গায় নেওয়া হয়েছে।

কিশোরগঞ্জ : কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জের গুণধর ইউনিয়নের একটি কালীমন্দিরে হামলা চালানো হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যার দিকে ইউনিয়নের কদিমমাইজহাটি গ্রামে ২০-৩০ জনের একটি দল এ হামলা চালায়। করিমগঞ্জের ইউএনও তসলিমা নূর হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, জড়িতদের ধরতে পুলিশি অভিযান চলছে। মন্দিরে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। তিনি জানান, হামলার সময় মন্দিরে কেউ ছিল না।

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন কালের কণ্ঠের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা)

 



সাতদিনের সেরা