kalerkantho

বুধবার । ১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ১ ডিসেম্বর ২০২১। ২৫ রবিউস সানি ১৪৪৩

রাজবাড়ীতে জিল্লুল-ইরাদতই রাজা!

হায়দার আলী ও জয়নাল আবেদীন   

১৫ অক্টোবর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



রাজবাড়ীতে জিল্লুল-ইরাদতই রাজা!

রাজবাড়ীতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা ঘুরেফিরে নিজ দলের প্রভাবশালী নেতাদের বিরোধিতার মুখে পড়ছেন। এতে কেউ কেউ নির্বাচনে পরাজিতও হচ্ছেন। যাঁরা জিতে আসতে পারছেন তাঁদের দলীয় প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে।

দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা এমন অবস্থার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রাজবাড়ী-২ আসনের সংসদ সদস্য জিল্লুল হাকিম এবং সাধারণ সম্পাদক কাজী ইরাদত আলীকে দায়ী করেছেন। কারণ তাঁরা গত কয়েকটি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।

স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জিল্লুল-ইরাদত জোটবদ্ধ হয়ে দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে দাঁড় করান নিজেদের পছন্দের প্রার্থী। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে দেওয়া অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জিতিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে তাঁদের বিরুদ্ধে। দলীয় মনোনয়ন পেয়েও স্বস্তিতে ভোট করা যায় না—বিগত কয়েকটি নির্বাচনের এই পরিস্থিতি মনে করে অস্বস্তিতে ভুগছেন আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

সদর, পাংশা, বালিয়াকান্দি ও কালুখালী উপজেলায় এই দুই নেতার অনুসারীদের হাতে দলের অনেকে নির্যাতিত হয়েছেন। নির্যাতনের শিকার অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলেছে কালের কণ্ঠ। তাঁরা অভিযোগ করেন, দলে এককভাবে প্রভাব বিস্তার করতে বেছে বেছে ত্যাগী নেতাদের সরিয়ে দেন জিল্লুল-ইরাদত।

নৌকা প্রতীক পেয়েও দলীয় নেতাদের বিরোধিতায় পরাজয়ের শিকার প্রার্থীরা বিষয়গুলো কেন্দ্রীয় কমিটিকে অবহিত করেছেন। দলীয় সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর চিঠি লিখেছেন কেউ কেউ। এ ছাড়া নির্যাতনের শিকার ও বিনা কারণে পদ থেকে বিতাড়িত নেতারাও কষ্টের কথা কেন্দ্রকে লিখে জানিয়েছেন। তবে কেউই প্রতিকার পাননি বলে জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট বলে দিয়েছেন, নৌকার বিরোধিতা করলে আগামী নির্বাচনে কাউকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হবে না। স্থানীয় সরকারসহ সব নির্বাচনে যাঁরাই নৌকার বিরোধিতা করছেন, তাঁরা নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে পারবেন না।

বাহাউদ্দিন দাবি করেছেন, যাঁরাই এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রাজবাড়ীতেও কোনো সংসদ সদস্য যদি দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজবাড়ী-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী কেরামত আলী নিজের ভাই কাজী ইরাদত আলীকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ লিখে দেওয়ার ঘটনাটি জানানো হলে বাহাউদ্দিন বলেন, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেউ কাউকে এভাবে পদ লিখে দিতে পারে না। দিলেও তা গ্রহণযোগ্য হয় না।

নৌকার প্রার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান : নির্যাতিত নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কালুখালী উপজেলা চেয়ারম্যান পদে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন তৎকালীন উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী সাইফুল ইসলাম। কিন্তু তাঁকে সমর্থন না করে জিল্লুল-ইরাদত বিরোধিতা করেন। ভোটে দাঁড় করান আলীউজ্জামান চৌধুরী ওরফে টিটুকে। শৃঙ্খলাবিরোধী এই কাজের জন্য ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত টানা ১০ বছর দল থেকে বহিষ্কৃত ছিলেন আলীউজ্জামান। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তাঁর বাবা নাজির হোসেন চৌধুরী ওরফে নিলু চৌধুরী এলাকায় রাজাকার হিসেবে পরিচিত।

তখন দলীয় সভানেত্রীকে তাত্ক্ষণিকভাবে চিঠি দিয়ে বিষয়টি অবগত করেন দলীয় প্রার্থী সাইফুল। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে ডেকে নিয়ে মামলা দেওয়া এবং এলাকাছাড়া করার হুমকিও দেন এমপি জিল্লুল হাকিম। এমপির ছেলে মিতুল হাকিমের অনুসারীরা আওয়ামী লীগের বহু নেতাকর্মীকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেয় এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকেও বাদ দেয় বলেও অভিযোগ করেন সাইফুল।

রাজবাড়ী সদর পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয় জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মোহাম্মদ আলী চৌধুরীকে। জিল্লুল হাকিম ২০১৯ সালে তাঁকে সমর্থন না দিয়ে আলমগীর শেখ তিতুকে জিতিয়ে আনেন। মোহাম্মদ আলী বিষয়টি লিখিতভাবে কেন্দ্রে জানিয়েছেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, এমপি জিল্লুল হাকিম তাঁকে পরাজিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। আলমগীর শেখ হলেন ইরাদত আলীর মদদপুষ্ট। জেলা আওয়ামী লীগের সভায় আলমগীর প্রকাশ্যে দলীয় মনোনয়নের বিরুদ্ধে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দেন।

মোহাম্মদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার যা বলার, নেত্রীর কাছে বলেছি। আমি তো হেরেই গেছি। কী কারণে, কেন হেরেছি সবই নেত্রীকে জানিয়েছি। ভবিষ্যতেও রাজনীতি চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা আছে। তাই এখন আর বেশি কিছু বলতে চাই না।’

আবার বালিয়াকান্দি উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের বিপক্ষে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন এমপি জিল্লুলের আপন চাচাতো ভাই এহসানুল হাকিম সাধনকে। কিন্তু সাধন নির্বাচনে হেরে যান। সর্বশেষ গত ৩০ জানুয়ারি পাংশা পৌরসভা নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন জিল্লুল হাকিম। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করিয়ে দেন উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ফজলুল হক ফরহাদকে। তবে দল মনোনীত প্রার্থী ওয়াজেদ আলী মাস্টারকে পরাজিত করতে পারেননি তাঁরা।

ওয়াজেদ আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হলেও তাঁরা (জিল্লুল সিন্ডিকেট) আমার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। ফজলুল হক কখনো যুবলীগের রাজনীতি করেছেন বলে জানি না। পকেট কমিটির মাধ্যমে তাঁকে নেতৃত্বে আনা হয়। তাঁকে আমার বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড় করিয়ে নেতাকর্মীদের মোবাইলে নির্দেশনা দিয়ে গেছেন এমপি জিল্লুল। কেন্দ্রীয় নেতাদের নির্দেশনাকেও তিনি উপেক্ষা করেছেন।’ তবে জনপ্রিয়তার কারণে নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন বলে জানান ওয়াজেদ।

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনেও একই পথ বেছে নেন এমপি জিল্লুল ও ইরাদত আলী। পাংশা উপজেলার কশবামাজাইল, শরিষা ও যশাই ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীর সরাসরি বিরোধিতা করেন তাঁরা। একই উপজেলার হাবাসপুর ইউনিয়নের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী আল মামুনের পক্ষে অবস্থান নেয় জিল্লুলের পরিবার।

মনোনয়ন দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়ার অভিযোগ : দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে পাংশা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ফরিদ হোসেন অদুদের কাছ থেকে আড়াই কোটি টাকা নিয়েছিলেন এমপি জিল্লুল হাকিম। তবে অদুদকে দলীয় মনোনয়ন পাইয়ে দিতে ব্যর্থ হন তিনি।

অদুদ বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে জিতে যান। অদুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপি জিল্লুল হাকিম আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে আমি ঠিকই নির্বাচনে জিতেছি।’ টাকা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘ঘটনার সত্যতা আছে বলেই তো এমন কথা শুনেছেন। সামনে যে ইউপি নির্বাচন আসছে, এই নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মাঝেও এ ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছে।’

ত্যাগী নেতাদের বিতাড়ন ও নির্যাতন : জিল্লুল-ইরাদতের বিরুদ্ধে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেওয়ার বেশ কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। ২০১৪ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে অনেক নেতাকর্মীকে বিনা কারণে পদ থেকে অব্যাহতি দেন তাঁরা। রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খান মো. আব্দুল হাই, জেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরে আলম সিদ্দিক হক, পাংশা উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি চিত্তরঞ্জন কুণ্ডু, আহমেদ হোসেন, অধ্যক্ষ জয়নাল আবেদীন, সাংগঠনিক সম্পাদক ফরিদ হাসান অদুদ, জীবন কুণ্ডু, নজরুল খান ও শিক্ষাবিষয়ক সম্পাদক আতাউল্লাহ মাস্টারকে বিভিন্ন সময় কমিটি থেকে সরিয়ে দেয় জিল্লল-ইরাদত চক্র।

কালুখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী সাইফুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মো. সামছুল আলম ও ধর্মীয় সম্পাদক গোলাম সরওয়ার ঠাণ্ডুকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। একই আক্রোশের শিকার বালিয়াকান্দি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হারুন অর রশিদ মানিক, সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল খালেক ও মো. খলিলুর রহমান খান। এ ছাড়া বিভিন্ন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের অন্তত ১৫ জন নেতাকে বিভিন্ন সময় বিনা কারণে দল থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন তাঁরা।

জিল্লুল-ইরাদত জোটের বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন রাজবাড়ীর আরেক এমপি কাজী কেরামত আলীও। গত ২৩ অক্টোবর জেলার একটি রেস্তোরাঁয় এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, তাঁর ভাই কাজী ইরাদত আলী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদটি লিখে নেওয়ার পর থেকে জেলায় দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে পড়েছে। এমপি জিল্লুল হাকিমের দিকনির্দেশনায় যাকে-তাকে দলের পদ ও মনোনয়ন দেওয়া, বিরোধিতাকারীদের শারীরিক নির্যাতন এবং দল থেকে বহিষ্কার করে তাঁরা একক অবস্থান সৃষ্টি করেছেন।

ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা জানান, দলের সাধারণ সম্পাদকের পদটি বাগিয়ে নেওয়ার পর সভাপতি জিল্লুল হাকিমের সঙ্গে জোটবদ্ধ হন ইরাদত আলী। এরপর দলের নিবেদিতপ্রাণ নেতাকর্মীদের বিতাড়িত করতে থাকেন। জেলা আওয়ামী লীগের বিগত কমিটি গঠনের পর জেলার সর্বস্তরে ‘পকেট কমিটি’ করেছেন তাঁরা। দলীয় গঠনতন্ত্রবিরোধী কার্যকলাপ বৃদ্ধির বিপরীতে দাঁড়াতেই পারেননি আওয়ামী লীগের অন্তপ্রাণ নেতাকর্মীরা। গত ২১ সেপ্টেম্বর বর্ধিত সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির চারজন শীর্ষ নেতার উপস্থিতিতে সংক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা বিষয়গুলো তুলে ধরেন।

অভিযোগ অস্বীকার : জিল্লুল হাকিমের কাছে এ বিষয়ে জানতে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি। পরে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোনো বক্তব্য দেননি। তাঁর স্ত্রী সাঈদা হাকিমের কাছে স্বামীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি স্বামীর কোনো বিষয়ে বক্তব্য দিতে পারব না।’

রাজবাড়ী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক কাজী ইরাদত আলীর সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলতে ফোন করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি। মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠিয়ে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলেও সাড়া মেলেনি।

তাঁর ছোট ভাই কাজী টিটু এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের বিরুদ্ধে করা অভিযোগ মিথ্যা। আমার ভাইসহ সবাই আওয়ামী লীগের প্রার্থীর জন্য পৌর নির্বাচনে কাজ করেছি। কিন্তু প্রার্থীর জনপ্রিয়তা না থাকায় ভোটে হেরে গেছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘অনুপ্রবেশকারীদের দলে ঠাঁই না দিয়ে আমার ভাই সব সময় ত্যাগী নেতাদের পাশে আছেন।’



সাতদিনের সেরা