kalerkantho

বুধবার । ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ৮ ডিসেম্বর ২০২১। ৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৩

পিছু ছাড়ছে না শারুন আতঙ্ক

ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন মোরশেদের স্ত্রী-কন্যা

► থানায় জিডি করে অজ্ঞাত স্থানে
► ‘প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারলে স্বস্তি পেতাম’

শাহাদাত স্বপন   

১০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন মোরশেদের স্ত্রী-কন্যা

নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন

‘আমার স্বামীর মতো আমি নিজেও বেঁচে নেই। আমার ও আমার মেয়ের জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। এমনকি আমি যাতে মোরশেদের মামলা নিয়ে না লড়ি এ জন্য অনবরত আমাকে মানসিকভাবে হেনস্তা করা হচ্ছে।’ কালের কণ্ঠকে কাঁদতে কাঁদতে বলছিলেন ইশরাত জাহান। চট্টগ্রামের ব্যাংক কর্মকর্তা আব্দুল মোরশেদ চৌধুরীর স্ত্রী ইশরাত নিরাপত্তাহীনতায় এরই মধ্যে বাড়ি ছেড়েছেন। একেক দিন অবস্থান করছেন একেক স্থানে। এমনকি গণমাধ্যমকেও তিনি নিজের অবস্থানের কথা জানাতে সাহস পাচ্ছেন না।

স্বামীর মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যার প্ররোচনার মামলা করেছিলেন ইশরাত জাহান। আর এই মামলা এখন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর। হুইপের ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন ও তাঁর মদদপুষ্ট দুই আসামি চিটাগাং চেম্বারের সাবেক দুই পরিচালক পারভেজ ইকবাল ও জাবেদ ইকবাল প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে হুমকি দিচ্ছেন ইশরাতকে। ফলে একমাত্র মেয়ে মোবাশ্বিরা জাহান চৌধুরী জুমকে নিয়ে ঘড়ছাড়া হয়েছেন তিনি। অজ্ঞাত স্থান থেকে ফোনে কালের কণ্ঠকে নিজের বর্তমান পরিস্থিতি বলতে গিয়ে ইশরাত এক পর্যায়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কোথায় আছি আপনাকেও বলব না

ইশরাত বলেন, ‘মোরশেদ আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে যাঁদের আসামি করা হয়েছে তাঁদের ভয়ে প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে থাকি। হুইপের ছেলে শারুন চৌধুরী মামলার দুই আসামি পারভেজ ইকবাল ও জাবেদ ইকবালকে সঙ্গে নিয়ে মোরশেদকে বারবার হুমকি দিয়েছিলেন। আর এই হুমকির মুখেই আমার স্বামী আত্মহত্যা করেন। সেই তাঁরাই এখন আমাকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। আমি তাঁদের ভয়ে বাসা ছেড়েছি। কোথায় আছি, তা আপনাকেও (প্রতিবেদক) বলব না। জানলে তাঁরা আমাকেও হত্যার চেষ্টা করবেন।’ ইশরাত জানান, আত্মগোপনে থেকেও তিনি ভয়ে ঘুমাতে পারেন না। তিনি বলেন, ‘মাঝে মাঝে আতঙ্কিত হয়ে যাই এই ভেবে যে তাঁরা চাইলে আমি যেখানেই থাকি, সেখান থেকে খুঁজে বের করতে পারেন। আমি আমার ভাশুর ও আমার ফ্যামিলি মেম্বারদের যাঁরা আছেন, তাঁরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। এর আগে থানায় আমি জিডিও করেছি। কী হবে, আল্লাহর ওপরে ছেড়ে দিয়েছি।’

পরিবার ছেড়ে অজ্ঞাত স্থানে যাওয়া প্রসঙ্গে ইশরাত বলেন, ‘মামলার আসামিরা প্রকাশ্যে ঘুড়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁরা অনেক ক্ষমতাবান, যেকোনো সময় আমার বা আমার মেয়ের ক্ষতি করতে পারেন। যেহেতু মোরশেদ আর্থিক লেনদেন ঘটনার জেরে হুমকি পেয়ে আত্মহত্যা করেছেন। ফলে মামলা তদন্তের কাজে নিয়োজিত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা আর্থিক বিষয়গুলো খুঁজে দেখলেই যথেষ্ট প্রমাণ পেয়ে যাবেন। যথাযথ বিচার না হলে আমার মেয়েটাকে নিয়ে কিভাবে সার্ভাইভ করব, ভেবে কূল-কিনারা পাচ্ছি না।’

দুই আসামিই শারুনের খুব কাছের

মামলার সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ইশরাত বলেন, ‘পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা কামরুল সাহেব তদন্ত করছেন। আমাকে একবার ডেকেছিলেন, তাঁকে আমি সব ধরনের তথ্য দিয়েছি। আমি বলেছি, মামলার আসামি ও চিটাগাং চেম্বারের সাবেক দুই পরিচালক পারভেজ ইকবাল ও জাবেদ ইকবাল দুজনই শারুন চৌধুরীর খুব কাছের। শারুন তাঁদের লালন-পালন করেন। শারুনের বোনের এক বিয়ের অনুষ্ঠানে দেখেছি, কোথায় কত টাকা লাগবে খরচের জন্য, এই দুজনকে শারুন নির্দেশনা দিচ্ছেন। শারুনের টাকার ব্যাগও ক্যারি করতেন তাঁরা। তাঁদের আইনের আওতায় নিলেই সব তথ্য বেরিয়ে আসবে।’

মোরশেদ আত্মহত্যার ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে ইশরাত বলেন, ‘হঠাৎ একদিন শারুন চৌধুরী মোরশেদকে ফোন করে বললেন, আপনি কি মোরশেদ সাহেব বলছেন? সেটি ছিল রমজান মাস। মোরশেদ তখন বলেছিলেন, হ্যাঁ। শারুন বললেন, আপনার সঙ্গে কি পারভেজের কোনো লেনদেন আছে? তখন মোরশেদ বলেছিলেন, হ্যাঁ। শারুন বলেছিলেন, এটা নিয়ে আপনার সঙ্গে আমার কথা আছে। তখন মোরশেদ বলেছিলেন, এটা তো আমার সঙ্গে পারভেজের লেনদেন। আপনার সঙ্গে কেন কথা বলব? তখন শারুন বলেছিলেন, আমি পারভেজকে দিয়ে টাকা খাটিয়েছি, এটা আমার টাকা। সো, ওই টাকাটা আপনার কাছ থেকে আমি এখন বের করব।’ ইশরাত জানান, মোরশেদ সেদিন শারুনের ডাকে না যেতে চাইলে শারুন বলেন, ‘আপনি আসবেন না, আপনার চৌদ্দগুষ্টি আসবে।’

শারুন আমাদের বাসায় আসেন

ইশরাত আরো বলেন, ‘এর কিছু পরেই শারুন আমাদের বাসায় আসেন। তবে এসে বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে গাড়ি থেকে নামেননি। তবে শারুনের সঙ্গে আসা ব্যক্তিরা আমার বাসায় ভাঙচুর করে। এরপর ওই দিন রাতেই মোরশেদ চলে যান আজম ভাইয়ের (মোরশেদের বোন জামাই) বাসায়। সেখানেও যান শারুন ও তাঁর সহযোগীরা। ওই বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। তাই শারুন সেখানে নেমেছিলেন। সেখানে আরসাদুল আলম বাচ্চু, পারভেজ হারুনসহ তাঁদের কয়েকজন সহযোগী ছিলেন। মোরশেদের সঙ্গে সেখানে তর্ক হয় শারুনের। এ সময় মোরশেদের মানিব্যাগ ছিনিয়ে নেন, চশমা খুলে ছুড়ে ফেলেন। শারুন মোরশেদের চেয়ে বয়সে ছোট, কিন্তু বাবার ক্ষমতার জোরে শারুন এতটা উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেছেন, গালাগাল করেছেন যে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। তাঁদের আচরণে মোরশেদ ভয় পেতেন। এ কারণেই তিনি আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।’ এক পুলিশ কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করে ইশরাত বলেন, ‘চট্টগ্রাম পুলিশের তৎকালীন এই ডিসি মোরশেদকে ফোনে বলেছিলেন ‘আপনি আসবেন, নাকি আমি আসব? আমি এসে আপনাকে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে আসব। এই ডিসির অফিসে যতগুলো মিটিং হয়েছে প্রতিটি মিটিংয়ে আরসাদুল আলম বাচ্চু ও পারভেজ হারুন উপস্থিত ছিলেন।’

প্রধানমন্ত্রীকে বলতে পারলে স্বস্তি পেতাম

স্বামী মৃত্যুর ঘটনায় অভিযুক্তদের ধরা হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে আশাবাদী ইশরাত জাহান। তিনি বলেন, ‘অভিযুক্তরা বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আর যুবলীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদুল হক চৌধুরী রাসেল, যিনি মোরশেদকে হুমকি দিয়েছিলেন, তিনি তো ঢাকাতেই বসে আছেন।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘একজন লোককেও কি ধরা যাচ্ছে না? যদিও তাঁরা অনেক টাকার মালিক এবং প্রভাবশালী।’ এর পরও ন্যায়বিচারের আশা করে ইশরাত বলেন, তিনি শেষ দেখে ছাড়বেন। ইশরাত বলেন, ‘আমার মেয়ে প্রতিদিন আমাকে বলে—মা, তুমি সেভ থাকবে তো? আল্লাহ যদি আমার মৃত্যু কারো হাতে রেখে থাকে সেটা হতে পারে। তবে আমি মোরশেদের মতো সুইসাইড করব না। আল্লাহ যত দিন হায়াত রেখেছেন, যতদূর সম্ভব আমি ফাইট করে যাব। আমি এখনো সরকারের ওপর ভরসা করছি, আমি প্রকৃত বিচার পাব। প্রকৃত ঘটনা তুলে ধরে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি লিখতে চাই। অন্তত একটি চিঠি পাঠিয়ে যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি অবহিত করতে পারি, স্বস্তি পেতাম।’

ইশরাত জাহান অশ্রুসিক্ত গলায় বলেন, ‘উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটিকে হারিয়ে অন্ধকারে হাবুডুবু খাচ্ছি। কী করব, কোথায় যাব, কিভাবে সংসার চালাব। এত দিন পর কি মা-বাবার বাসায় ফিরে বোঝা হবো?’

ইশরাতের ঘরে এখন তালা

প্রতিবেদকের কথা হয় মোরশেদের বড় ভাইয়ের স্ত্রী সামিরা চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, মোরশেদের বড় ভাই আরশাদ চৌধুরী পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা কামরুলের সঙ্গে দুই দিন আগে দেখা করেছেন। কামরুল জানিয়েছেন, আসামিদের মোবাইল ফোন বন্ধ। তাঁদের রিচ করা যাচ্ছে না। তবে তদন্তকাজ চলমান আছে। ঘটনা উদঘাটনে তদন্ত করতে সময় লাগবে।

সামিরা চৌধুরী বলেন, ‘মোরশেদের ঘরে এখন তালা। প্রাণভয়ে ইশরাত মেয়েকে নিয়ে একেক দিন একেক জায়গায় পালিয়ে অবস্থান করছেন। আমাদেরও বলেন না কোথায় থাকেন।’ তিনি জানান, মোরশেদের বৃদ্ধা মা সন্তান হারানোর শোকের পাশাপাশি বিচার কার্যক্রমে অগ্রগতি না দেখে বিমর্ষ অবস্থায় শয্যাশায়ী।

শারুন চৌধুরী ও তাঁর ক্যাডারদের নির্যাতন ও অব্যাহত চাপের মুখে গত ৭ এপ্রিল আত্মহত্যা করেন ব্যাংকার মোরশেদ চৌধুরী। তার আগে সুসাইড নোটে লিখে যান, ‘আর পারছি না। সত্যি আর নিতে পারছি না। প্রতিদিন একবার করে মরছি। কিছু লোকের অমানুষিক প্রেসার আমি আর নিতে পারছি না। প্লিজ, সবাই আমাকে ক্ষমা করে দিয়ো। আমার জুমকে (মেয়ে) সবাই দেখে রেখো। আল্লাহ হাফেজ।’ এপর ১১ এপ্রিল চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনে ইশরাত জাহান বলেছিলেন, ‘এটা আমার দৃষ্টিতে একটি হত্যাকাণ্ড, ফোর্স ডেথ। আমি আমার স্বামীর আত্মহননের নেপথ্যে জড়িতদের বিচার চাই।’

মোরশেদ আত্মহত্যা প্ররোচনা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে কালের কণ্ঠকে বলেন, তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে। আসামিদের ধরার প্রচেষ্টা চলছে। তদন্তাধীন বিষয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলা ঠিক হবে না বলে জানান তিনি।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চট্টগ্রাম ১২ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে শারুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি।

 

 



সাতদিনের সেরা