kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

ক্রিকেটের বিজ্ঞান না আমাদের বিশ্বাস

মোস্তফা মামুন

১০ আগস্ট, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ক্রিকেটের বিজ্ঞান না আমাদের বিশ্বাস

সেবার অস্ট্রেলিয়া যেতে ঝামেলা হয়েছিল বিস্তর। তখন আমাদের পত্রিকাগুলোর খুব বেশি টাকা-পয়সাও নেই, টিকিটের দাম বাঁচাতে একটা ব্যতিক্রমী পথ আবিষ্কার করলাম। ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর, সিঙ্গাপুর থেকে বালি, সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়ার ডারউইন। বিমান সংস্থা হলো গারুদা, ইন্দোনেশিয়ান এই এয়ালাইনসের নাম আগে কোনো দিন শুনিনি, পরেও বিশেষ শুনিনি। তিন ফ্লাইটে চড়ে, নানা এয়ারপোর্টে অপেক্ষা করে আর ঘুরে এক কাকডাকা ভোরে ডারউইনে নেমে ভাবলাম, যাক বাবা রক্ষা। রক্ষা বিশেষ হলো না। কারণ অস্ট্রেলিয়ার প্র্যাকটিসে গিয়ে সে দেশের সাংবাদিকরা সব অদ্ভুত অদ্ভুত প্রশ্ন করতে লাগলেন, ‘আমাদের দেশে কোন কোন শহরের রাস্তা পানিতে ডুবে থাকে’, ‘মোহাম্মদ রফিক পানির মধ্যে নৌকা ভাসিয়ে সেখানেই নাকি ক্রিকেট অনুশীলন করেন।’ এসব ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করি আর বিস্মিত হই।

ভুল ভাঙানোর চেষ্টা করে গেলাম আর হতাশ হলাম। তখন হয়তো ইন্টারনেটের দিন নয়, তাই বলে অত বড় সব সাংবাদিক মাথা, তুচ্ছ গাঁজাখুরি গল্প বিশ্বাস করে বসে থাকবে! তার কিছু কিছু লিখেও দেবে।

জবাব দেওয়া যায় মাঠে। তারও বিশেষ উপায় নেই। ডারউইনের মাঠে আলাদা করে কোনো প্রেস বক্স ছিল না। শামিয়ানা টানিয়ে ঠিক বাইরে একটা সাময়িক স্থাপনা। সেখান থেকেই মাঠের আঁচটা সরাসরি পাওয়া গেল। সত্যিকার অর্থেই আগুনের আঁচ। ব্রেট লির বলগুলো এমন গোলার রূপ নিয়ে ব্যাটসম্যানদের দিকে ছুটে যাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল, বল ব্যাটে লাগার পর সত্যিকার অর্থেই অগ্নিকাণ্ড হয়ে যাবে। আর কোনোটা যদি আবার ভুলটুল করে আমাদের দিকে চলে আসে তাহলে শরীর ভেদ করে বেরিয়ে যাবে নির্ঘাত। সত্যি বললে, একটু নিরাপত্তার অভাবও বোধ করলাম। সতর্কও থাকলাম। একেকবার মনে হলো, সামনে থাকা ল্যাপটপটাকে দরকারে ঢাল বানিয়ে নেব।

সেই তুলনায় সামান্য আমরা। অতি সীমিত সামর্থ্য। ম্যাচের প্রতিটি দিনশেষে সংবাদ সম্মেলনে একটা প্রশ্ন থাকে অবধারিত। বাংলাদেশের কোনো খেলোয়াড়কে কি আলাদা করে চোখে পড়েছিল। একদিন ড্যারেন লেম্যান বললেন, ‘হ্যাঁ, একজনকে আমার খুব পছন্দ হয়েছে।’

‘কে?’

‘মাহফুজা।’

‘মাহফুজা!’ ধাক্কা কাটিয়ে বুঝে নিলাম, তিনি তরুণ পেসার মাশরাফি বিন মর্তুজার কথা বলছেন। নাম যে ঠিক বলেননি, আজকের দিনে সেটা নিয়ে ট্রল হতো, তখনকার দিনে সেটাই সন্তুষ্টি।

কিন্তু সময় যত গেল তিক্ততাও তত দূর হতে থাকল। সেই উন্নাসিক, উদাসীন সাংবাদিকরাই অগ্রণী। খুব সম্ভব দি অস্ট্রেলিয়ানের ম্যালকম কন একদিন বললেন, ‘শোনো, তোমাদের দল কিন্তু এগিয়ে যাবে।’

‘বলছ?’ অবাক এবং আনন্দিত।

‘তোমাদের দেখে। এই যে তোমাদের দল ভালো করছে না, তবু কী উৎসাহ তোমাদের। ছুটে বেড়াচ্ছ। সামান্যতেই কত খুশি। এ থেকে ধারণা করতে পারি তোমাদের মানুষদের কত আগ্রহ। ভালোবাসায় এমন তীব্রতা আর শুদ্ধতা থাকলে ফল আসতে বাধ্য।’

কন বা তাঁর সঙ্গীদের তখন ঈর্ষা হয়। বলি, ‘তোমাদের কী আনন্দ! সব সময় দল জেতে।’

কন দার্শনিকের মতো বলে, ‘নট অলওয়েজ। উইনিং ইজ সামটাইম বোরিং।’

ওই সময় কী যেন একটা ঘটল, আলোচনাটা শেষ হয়ে গেল বলে পেছনের কথাটা আর শোনা হলো না, তবু কথাটা এত বছর পর প্রায়ই কানে বাজে। উইনিং ইজ সামটাইম বোরিং।

আসলে কি উইনিং ইজ সামটাইম বোরিং? মনে হয় না। কিন্তু ‘উইনিং ইজ সামটাইম মিসলিডিং।’

বন্ধু সাংবাদিক আজাদ মজুমদার ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ডকে হারানোর কাহিনি টেনে এনে লিখেছে, সেবার এ রকম স্লো উইকেটের ফাঁদে নিউজিল্যান্ডকে ফেলে ওদের হোয়াইটওয়াশ করার কুফলটা ফলেছিল পরের বছরের বিশ্বকাপে। সেরকম উইকেটের ফাঁদে বিপক্ষকে ফেলতে গিয়ে নিজেরাই আক্রান্ত। ৫৮ আর ৭৮-এর ঘটনা ঘটেছিল। আরেকটু হলে হার হয়ে যেত এমনকি আয়ারল্যান্ডের সঙ্গেও। এবারও কি সেরকম বুমেরাংকে টেনে নিচ্ছি নিজেদের দিকে। ভুল ভাবনা আর মিথ্যা আত্মবিশ্বাসের ছুরিতে বিশ্বকাপে গিয়ে কাটা পড়তে হবে না তো? আমরা জানব, অস্ট্রেলিয়া আর নিউজিল্যান্ডকে (এ রকম উইকেটে ওরাও বিধ্বস্ত হবে নির্ঘাত) হারিয়েছি, কাজেই বিশ্বকাপে তো ফাটিয়ে দেব। কার্যক্ষেত্রে নিজেরাই ফেটে চৌচির।

কিন্তু সমস্যা হলো, এটা সাফল্যের একটা ডিসকোর্স, একমাত্র নয়। আরেকটা পাঠও আছে। ২০১০-র নিউজিল্যান্ডকে ধরেই করি। যদিও বিশ্বকাপে বুমেরাং হয়েছিল, কিন্তু আবার অন্যভাবে দেখলে, সেই সাফল্যজনিত বিশ্বাস ঠিকই কাজে লেগেছে। এর আগে বাংলাদেশ মূলত জিতত জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে, এবার অত বড় একটা দলকে বিধ্বস্ত করার বিশ্বাস ঠিকই জ্বালানি হয়ে গেল। বাংলাদেশ যে ওয়ানডেতে দেশে-বিদেশে একটা শক্তি হয়ে উঠল, পরের দশকে তাতে এই বিভ্রান্তিমাখা নিউজিল্যান্ড সাফল্যের ভূমিকা আছে নিশ্চিত। অস্ট্রেলিয়াও আপাতত বিভ্রান্তি। কিন্তু কে জানে, ভবিষ্যতে হয়তো বিশ্বাসের টনিক।

ব্যাট করা আর রান জোগাড়কে মনে হচ্ছে পৃথিবীর কঠিনতম কাজ। বোলারদের প্রতি নেমে আসা ঐশী সাহায্য দেখে পাড়ার লালু-ভুলুদেরও যদি এই অস্ট্রেলিয়ানদের বিপক্ষে দু-এক ওভার বল করার স্বপ্ন জাগে তাহলে ওদের দোষ দেওয়া যায় না। কাজেই ফল নিখাদ ক্রিকেটীয় বিচারে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়তো নয়, কিন্তু ক্রিকেটে ক্রিকেটের বিচারই শেষ কথা কে বলে! অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর বিশ্বাস ক্রিকেটীয় বিজ্ঞানকে ছাপিয়েও যেতে পারে। আরেকটা কারণও দেখছি। এবং আমার কাছে সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। টি-টোয়েন্টি মূলত তরুণদের খেলা। ফিল্ডিংয়ের গুরুত্ব, নতুন ভাষার ক্রিকেট এবং রানের সংখ্যার চেয়ে গতি বা ধরন গুরুত্বপূর্ণ হওয়াতে সে-ই আসলে সফল হয়, যার কাছে নামের চেয়ে কাজ বড়। কে যেন বলছিল, সে-ই এখানে বড় ব্যাটসম্যান যে নিজের উইকেটের মায়াটা ত্যাগ করতে পারে। তারকাদের বেলায় নামের ভারটাই তাদের ভারাক্রান্ত করে রাখে। আর আমাদের তরুণমুখী টি-টোয়েন্টি দল তৈরিতে সেটাই সমস্যা; চিরন্তন তারকামুখিতা। এই সিরিজে তরুণদের এগিয়ে আসা সেই ভুল বোধ ঝেড়ে ফেলার একটা সুযোগ করে দিল। আফিফ-নুরুল-শরীফুলদের কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে আরো তারুণ্যের রং লাগিয়ে একটা রঙিন পথ তৈরি তো করা যায়। কয়েকজন অভিজ্ঞ লাগবে। তা সে জন্য তো সাকিবরা আছেনই। মোদ্দা কথাটা হলো, টি-টোয়েন্টির বেলায় সাহসী হতে হবে। ক্রিকেটারদেরও। আমাদেরও।

আমাদের মতো সাফল্য-বুভুক্ষু সমাজে সাফল্য নিয়ে একরকম উভয়সংকট আছে। মোটা টেস্ট পেপার পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করা না বাজারি সিলেবাসে চটজলদি বেশি নম্বরের বন্দোবস্ত করা—সেই নিয়ে তর্ক থাকবেই। অবশ্যই প্রথমটা বেশি কাজের, কিন্তু দ্বিতীয়টাতে যে ফল পাওয়া যায় ভালো। ধরা যাক, এই সিরিজে বাংলাদেশ সঠিক এবং শাস্ত্রসম্মত উইকেটে খেলে বড় হার হেরে গেল, তখনকার ক্ষতিকর দিকটা দেখুন। ক্ষোভ-হতাশা-সমালোচনা। এখনকার ক্ষতি তো দূরের আশঙ্কা, তখনকার ক্ষতি হতো আমাদের তাত্ক্ষণিক তীব্রতায়। এখনকার দুশ্চিন্তা হয়তো সাফল্যজনিত অতিবিশ্বাস। তখন হতো, হতাশাজনিত অবিশ্বাস। এবং তা থেকে সব ওলটপালটের ঝড়ে কী যে হতো...। মানুষ চায় সাফল্য। কর্তারা শর্টকাট একটা বন্দোবস্ত করে দেন। ক্রিকেটজনতা খুশি। তার আড়ালে তাঁদেরও সাফল্যের হাসি।

এটা তাই শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের একরকম দ্বন্দ্ব। ক্রিকেটবিজ্ঞান বলে, এই সাফল্য বুদবুদ বা বিভ্রান্তি। আবার, আমাদের হাইব্রিড ব্যাকরণ বলে, এই সাফল্য দেয় সেই বিশ্বাস, যা দীর্ঘ মেয়াদে খুব জরুরি জ্বালানি। জয় তাই বাতাসভর্তি বেলুন না সম্ভাবনাবর্তী  সোনালি ভবিষ্যতের বাক্স, সেই প্রশ্ন রয়েই যায়।

এখন, বিজ্ঞান আর বিশ্বাসের মধ্যে কোনটাকে আগে রাখব? ক্রিকেটের বিচার বলে, অবশ্যই আগে বিজ্ঞান। কিন্তু সুবিধার কথা এটাই যে বিজ্ঞানের বিচারই ক্রিকেটের বেলায় সব সময় শেষ বিচার নয়।



সাতদিনের সেরা