kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

শুধু শখে নয়, মার্কেটে যাওয়াটা প্রয়োজনেও

তৈমুর ফারুক তুষার   

১১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শুধু শখে নয়, মার্কেটে যাওয়াটা প্রয়োজনেও

প্রয়োজনের কেনাকাটা তো আছেই, শখ-আহ্লাদ মেটানোর আয়োজনেও কমতি নেই। ছবি : কালের কণ্ঠ

সময় তখন দুপুর সোয়া ১২টা। মাথায় ওপরের সূর্যটা যেন কিরণের সঙ্গে সঙ্গে আগুনও ঢালছে। তাপে দগ্ধ হয়ে হাঁসফাঁস অবস্থা। এরই মধ্যে রাজধানীর ঢাকা কলেজের বিপরীতে মেঘনা পেট্রল পাম্পের সামনের ফুটপাতে বিরাট জটলা। এগিয়ে গিয়ে দেখা গেল মাটিতে পলিথিন বিছিয়ে নারী ও শিশুদের জামা বিক্রি করা হচ্ছে। সেই দোকান ঘিরে এই ভিড়। ক্রেতারা অনেকটা ধাক্কাধাক্কি করে আড়াই শ টাকা দরে পছন্দের জামা বেছে নিচ্ছে।

শুধু ঢাকা কলেজের বিপরীতেই নয়, আশপাশের নিউ মার্কেট, গাউছিয়া, চন্দ্রিমা, ধানমণ্ডি হকার্স মার্কেট ঘুরে দেখা গেল মানুষের উপচে পড়া ভিড়। করোনা মহামারির মধ্যে এমন ভিড় করে, ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি নিয়ে মানুষ কেন কেনাকাটা করছে, তা জানতে কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে কথা হয় অনেকের সঙ্গে। 

জানা গেছে, শুধু শখের কারণেই যে মানুষ কেনাকাটা করছে—এমন নয়। অনেকেই বিশেষ প্রয়োজনে কেনাকাটা করতে বের হয়েছেন। মহামারির কারণে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি শিশু-বৃদ্ধদের মুখে খানিকটা হাসি ফোটাতে অনেকে কেনাকাটা করতে বের হয়েছেন। রমজানের ঈদ অনেক বড় একটি উৎসবের দিন, যার সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের অভ্যাস ও আবেগ জড়িয়ে আছে। ঈদকে সামনে রেখে মানুষ নানা সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, বছরের এ দিনটিতে পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে সময় কাটায়। এই উদযাপনের সঙ্গে নতুন জামাকাপড়সহ নানা জিনিস কেনাকাটা ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। চাইলেও যা অনেক সময় উপেক্ষা করা কঠিন।

গতকাল সোমবার দুপুরে রাজধানীর গাউছিয়ায় প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে স্ত্রীকে নিয়ে এ-দোকান ও-দোকান ঘোরাঘুরি করছিলেন আমজাদ হোসেন। করোনার মধ্যে ঝুঁকি নিয়ে কেন কেনাকাটা করতে এসেছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাসায় বৃদ্ধ মা-বাবা আছেন। বলা যায় না কখন কী হয়। উনাদের জন্যই শাড়ি, পাঞ্জাবি কিনতে এসেছি। সামনের ঈদে যদি উনারা দুনিয়াতে না থাকেন তাহলে তো কিছু দিতে পারব না। সে জন্যই কেনাকাটা করতে বের হয়েছি।’

গাউছিয়া মার্কেটের সামনের রাস্তায় কয়েকটি শপিং ব্যাগ হাতে দেখা গেল একজনকে। প্রথমে সাংবাদিক পরিচয় জেনে কথা বলতে চাইলেন না। এত কেনাকাটা কাদের জন্য—জানতে চাইলে তিনি মুখ খুললেন, তবে নিজের নাম বলতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, ‘বাসায় দুইটা বাচ্চা আছে। একজনের বয়স আট আরেকজনের ছয়। তারা তো বোঝে না করোনা কী বা মহামারি কী। তারা কয়েক দিন আগেই লিস্ট করেছে কী কী কিনবে। এখন ওদের এসব কিনে না দিলে তো কান্নাকাটি করবে। বাচ্চাদের ওপর মানসিক অবস্থার কথা বিবেচনা করেই শপিংয়ে এসেছি।’

নিউ মার্কেটের সামনে বেশ কয়েকটি ব্যাগ হাতে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক নারী। করোনার মধ্যেও মার্কেটে আসার প্রয়োজনীয়তার প্রসঙ্গে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিবছরই আমাদের বেশ কিছু গরিব আত্মীয়র জন্য শাড়ি, জামা কিনে দিই। বিশেষ করে বয়স্ক কয়েকজন নারীকে দুই ঈদে শাড়ি উপহার দিই। তাঁরা আশায় থাকেন, অপেক্ষায় থাকেন। হয়তো দেখা যাবে, সারা বছর তাঁরা আমার শাড়ি পরেই পার করেন। এখন করোনার কথা বলে যদি তাঁদের এই উপহার না দিই, তাহলে তাঁরা এটাকে স্বাভাবিকভাবে না-ও নিতে পারেন। তাঁরা হয়তো ভেবে বসবেন, করোনার ছুতায় আমি তাঁদের বঞ্চিত করলাম।’

বিকেল ৪টার দিকে লালমাটিয়ার সানরাইজ প্লাজার সামনে বিভিন্ন দোকানের ৯টি শপিং ব্যাগ হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন যোবায়ের হাসান নামে এক যুবক। করোনার ঝুঁকি নিয়ে এত কেনাকাটা কেন—এমন প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘আমি নতুন বিয়ে করেছি। এবারই প্রথম ঈদ। আল্লাহর রহমতে আমার টাকা-পয়সার সামর্থ্য আছে। এখন বিয়ের পর প্রথম ঈদে তো বউকে কিছু না দিয়ে পারি না। কিছু না দিলে বিষয়টি কি ভালো দেখাবে বলেন?’

কেনাকাটা তো অনলাইনেও করতে পারতেন, স্মরণ করিয়ে দিলে যোবায়ের হোসেন বলেন, ‘অনলাইনে কিনলে অনেক সময় সাইজ ঠিক হয় না। রংও অনেক সময় ছবিতে ঠিকমতো বোঝা যায় না। সামনাসামনি দেখে কিনলে ভালো জিনিস কেনা যায়।’

সানরাইজ প্লাজা থেকে কিছুদূর এগিয়ে গেলে একটি ভবনে লালমাটিয়া আড়ং আউটলেট। ভবনটির সামনে গাড়ি ও ক্রেতার ভিড় জমে আছে। লাইন ধরে আড়ংয়ে প্রবেশ করতে হচ্ছে। আটটি ব্যাগ হাতে আড়ংয়ের বাইরে দাঁড়ানো মধ্যবয়স্ক এক নারীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগামীকাল গ্রামে যাব। ঈদ আমাদের জন্য অনেক বড় একটি উৎসব। বিগত এক বছর ঢাকার বাইরে যাই না। হাঁপিয়ে উঠেছি। মরি বাঁচি গ্রামে যাব। আর গ্রামের দিকে তো করোনার তেমন সংক্রমণ নেই। ঢাকার মতো অবস্থা কিন্তু গ্রামে নেই। ফলে সেখানে তো খালি হাতে যাওয়া যায় না। আত্মীয়দের জন্য কিছু না নিয়ে গেলে তারা মন খারাপ করবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘সামাজিকতা এমন জিনিস, অনেক সময় টাকা না থাকলে ধার করেও মানুষের মন রক্ষা করতে হয়। আমরা তো সমাজ বিচ্ছিন্ন হয়ে চলতে পারব না।’

অনেকে যেমন প্রয়োজনের তাগিদে কেনাকাটা করতে বের হয়েছেন, তেমনি অভ্যাসবশতও কেনাকাটা করতে বের হয়েছেন অনেকেই। গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ধানমণ্ডি হকার্স মাকের্টের সামনের ফুটপাতের একটি দোকানে অনেক শপিং ব্যাগ হাতে এক যুবককে দেখা গেল ট্রাউজার দামাদামি করতে। সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে এতগুলো শপিং কাদের জন্য জানতে চাইলে ওই যুবক মুচকি হেসে কিছু না বলেই দ্রুত পায়ে হাঁটা দিলেন।

গাউছিয়া মার্কেটের সামনের রাস্তায় মাজুনি দরদাম করছিলেন এক নারী। তাঁর হাতের পলিথিন ব্যাগে দেখা গেল একটি কড়াই। জানালেন মোহাম্মদপুর থেকে এসেছেন বাসার কিছু জিনিসপত্র কিনতে। এগুলো তো মোহাম্মদপুরেই কেনা যেত—এমন প্রশ্নের উত্তরে ওই নারী বললেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে নিউ মার্কেট, গাউছিয়া থেকেই কিনি তো, সে জন্য এখানেই এসেছি।’