kalerkantho

রবিবার। ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৬ মে ২০২১। ০৩ শাওয়াল ১৪৪২

হুইপ সামশুল ও তাঁর ছেলের দুর্নীতি

মসজিদের জমি দখলের ধান্দাও চলছে

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম    

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



মসজিদের জমি দখলের ধান্দাও চলছে

মসজিদের এই জায়গাটি দখল করেই বহুতল মার্কেট করার পাঁয়তারা চলছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রামের পটিয়া আসনের সংসদ সদস্য হুইপ সামশুল হক চৌধুরী ও তাঁর ছেলে নাজমুল হক চৌধুরী শারুনের বিরুদ্ধে একের পর এক দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। এবার তাঁদের বিরুদ্ধে উঠেছে শত বছরের পটিয়া থানা মসজিদ দখল করে বহুতল বিপণিবিতান নির্মাণের অভিযোগ। শুধু তা-ই নয়, নিজেদের স্বার্থে তাঁরা পাল্টে দিয়েছেন মসজিদের নামও। প্রতিবাদ করায় হুইপ ও তাঁর ছেলের রোষানলে পড়েছেন পুলিশের কয়েক কর্মকর্তা। এ ছাড়া মসজিদ দখল করে বহুতল মার্কেট নির্মাণকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসনে দেখা দিয়েছে তীব্র অসন্তোষ।

পুলিশের কর্মকর্তারা হুইপ ও তাঁর ছেলের বিরুদ্ধে ভয়ে মুখ খোলেন না। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পটিয়া থানা জামে মসজিদের ২২ গণ্ডা জমি দখল করে তাতে ১০ তলা অভিজাত মার্কেট নির্মাণের পাঁয়তারা করছেন সামশুল হক চৌধুরী ও নাজমুল হক চৌধুরী শারুন। এরই মধ্যে তাঁদের অনুসারী এক নেতাকে দিয়ে কথিত মসজিদ পরিচালনা কমিটি গঠন করেছেন। পরিবর্তন করে দিয়েছেন মসজিদের নাম। তাঁদের নিয়ন্ত্রণাধীন তথাকথিত মসজিদ কমিটি বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে উন্নয়ন চুক্তিও করেছে। এরই মধ্যে মসজিদ ভেঙে ১০ তলা মার্কেট করে তাতে ৪০০টি দোকান তৈরির আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছে। একেকটি দোকান বরাদ্দ দেওয়ার জন্য ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। বহুতল এ মার্কেট থেকে দেড় শ কোটি টাকা লুটপাটের পরিকল্পনা রয়েছে হুইপ পরিবারের। তাঁদের এমন অপকর্মের প্রতিবাদ করায় হুইপ ও তাঁর ছেলের রোষানলে পড়েছেন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। এ নিয়ে পুলিশে চরম অসন্তোষ চলছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পটিয়া আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘ছোটকাল থেকে এটি থানা মসজিদ হিসেবে চিনে আসছি। কয়েক বছর আগে হুইপ ও তাঁর ছেলে নেপথ্যে থেকে দখল করে নেয় ওই মসজিদের জায়গা। গঠন করে নতুন কমিটি। পরিবর্তন করে ফেলে মসজিদের নাম। এরই মধ্যে মসজিদ ভেঙে মার্কেট নির্মাণের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেছে। তাদের এমন অপকর্মে আমরা বিব্রত।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৮৯০ সালে ২২ গণ্ডা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয় পটিয়া থানা জামে মসজিদ। প্রতিষ্ঠার পর থেকে পটিয়া সার্কেলের এএসপি কিংবা থানার ওসি সভাপতি এবং মুসল্লিদের পক্ষ থেকে একজন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনের মাধ্যমে মসজিদটি পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৯৯৪ সালে জনতা ব্যাংকের পটিয়া শাখায় থানা মসজিদের নামে একটি যৌথ হিসাবও খোলা হয়। সরকারি বিভিন্ন দলিলেও ‘পটিয়া থানা জামে মসজিদ’ হিসেবে উল্লেখ রয়েছে। গত এক দশকে পটিয়ার প্রাণকেন্দ্রে জমির দাম বেড়ে যায় কয়েক গুণ। ফলে মসজিদের জায়গার ওপর নজর পড়ে সামশুল হক ও তাঁর ছেলের। মসজিদের জায়গা দখল করতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে তিনি ২০১৩ সালে নিজের অনুসারী এবং তৎকালীন পৌর মেয়র হারুনুর রশিদকে সভাপতি করে সাত সদস্যের কথিত মসজিদ পরিচালনা কমিটি গঠন করেন। মসজিদের ওই জায়গায় ১০ তলা ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেন হুইপ ও তাঁর অনুসারীরা। মার্কেট নির্মাণের জন্য চুক্তি করা হয় বিএনপি ও জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকতাকারী প্রতিষ্ঠান নুসরাত ডেভেলপমেন্ট কম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে। এ ডেভেলপার কম্পানির মালিকদের একজন হলেন উপজেলা বিএনপি নেতা শফিকুল ইসলাম চেয়ারম্যান। কম্পানির বাকি মালিকরাও বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত।

২০১৮ সালে পটিয়া থানা জামে মসজিদের নাম পাল্টে ‘পটিয়া থানা ছদু তালুকদার জামে মসজিদ কমপ্লেক্স’ করে হুইপ পরিবার ও তাদের অনুসারীরা। অবৈধভাবে গঠিত কথিত মসজিদ কমিটি বাতিল এবং নুসরাত ডেভেলপমেন্ট কম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিলের জন্য আদালতে মামলা করা হয়। ২০১৯ সালে পটিয়ার সিনিয়র সহকারী জজ প্রথম আদালত এক রায়ে পটিয়া থানা ছদু তালুকদার জামে মসজিদ ও নুসরাত ডেভেলপমেন্ট কম্পানি লিমিটেডের চুক্তিকে অবৈধ ঘোষণা করেন। কিন্তু রায়ের তোয়াক্কা না করে হুইপ সামশুল হক চৌধুরী, তাঁর ছেলে শারুন এবং তাঁদের অনুসারীরা মসজিদের জায়গায় ১০ তলা মার্কেট করার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন। প্রতিটি দোকান বরাদ্দের নামে বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকা। পটিয়া থানা ছদু তালুকদার জামে মসজিদ কমপ্লেক্স থেকে দেড় শ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছেন হুইপ সামশুল হক, তাঁর ছেলে শারুন এবং তাঁদের অনুসারীরা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, হুইপ সামশুল হকের অনুসারী হারুনুর রশীদের বাড়ি পটিয়া থানা মসজিদ থেকে কমপক্ষে চার কিলোমিটার দূরে। তিনি কখনো পটিয়া থানা মসজিদ কমিটিতে ছিলেন না। মসজিদের জমি আত্মসাৎ করতেই হঠাৎ করে তাঁকে সভাপতি করে কথিত মসজিদ কমিটি গঠন করা হয়েছে। কথিত এ কমিটির নেপথ্যে রয়েছে হুইপ সামশুল হক ও তাঁর ছেলে নাজমুল হক চৌধুরী শারুনের দেড় শ কোটি টাকার বাণিজ্য। তাঁরা বিএনপি-জামায়াতের পৃষ্ঠপোষকদের সঙ্গে চুক্তি করে মসজিদ ভেঙে অভিজাত বিপণিবিতান করার পাঁয়তারা করছেন।