kalerkantho

বুধবার । ৫ কার্তিক ১৪২৭। ২১ অক্টোবর ২০২০। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪২

হাজার কোটি টাকা খরচ করেও রুগ্‌ণ চার নদী

বিশ্ব নদী দিবস আজ

আরিফুর রহমান    

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



হাজার কোটি টাকা খরচ করেও রুগ্‌ণ চার নদী

ঢাকার চারপাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদী দখলবাজদের হাত থেকে রক্ষা করতে কোটি কোটি টাকা খরচ করেও নদী রক্ষা করা যাচ্ছে না। নদীর দূষণও বন্ধ করা যাচ্ছে না। ঢাকার চারপাশে চারটি নদী রক্ষায় একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। কোটি কোটি টাকা খরচও করা হচ্ছে। কিন্তু কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে নদী রক্ষা ও দূষণ বন্ধ করতে গিয়ে হোঁচট খেতে হচ্ছে সরকারকে।

এমন বাস্তবতায় আজ বিশ্ব নদী দিবস পালিত হচ্ছে। ১৯৮০ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ রবিবার বিশ্ব নদী দিবস হিসেবে পালন করতে শুরু করে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়া (বিসি) ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি।

বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে প্রথম মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের পরের বছর বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধারে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ভুল পরিকল্পনার কারণে দশ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়নি। যেসব কাজ করা হয়েছিল, সেগুলোও দৃশ্যমান নয়। বুড়িগঙ্গা নদীর পানির প্রবাহ দৃশ্যমান করার জন্য যেভাবে নদী খননের কথা ছিল, সেই নকশায় ছিল গলদ। জমি অধিগ্রহণ করতে গিয়ে কী ধরনের সমস্যায় পড়তে হতে পারে, সে বিষয়ে কোনো সমীক্ষা করা হয়নি। বুড়িগঙ্গা নদী উদ্ধার করতে গিয়ে ২২টি সেতু ক্ষতির মুখে পড়তে পারে—সে বিষয়েও কোনো ধারণা ছিল না কর্মকর্তাদের। ফলে হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় প্রায় এক হাজার ২০০ কোটিতে গিয়ে ঠেকেছে।

বুড়িগঙ্গা নদীর কাজ চলমান অবস্থার মধ্যেই ঢাকার চারপাশের চারটি নদীর অবৈধ দখল বন্ধ করতে দুই বছর আগে আলাদা একটি প্রকল্পের মাধ্যমে আরো ৮৫০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছিল। ৮৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর তীরভূমিতে পিলার স্থাপন, তীর রক্ষা, ওয়াকওয়ে ও জেটিসহ আনুষঙ্গিক অবকাঠামো নির্মাণ’ প্রকল্পটি ২০১৮ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল, বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা ও বালু নদের তীরভূমি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা করা। কিন্তু এই প্রকল্পেও ভুল পরিকল্পনার কারণে পদে পদে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষকে (বিআইডাব্লিউটিএ)।

পরিকল্পনা কমিশন থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, দুই বছর পর এসে ভুল পরিকল্পনা সংশোধন করে এখন নতুন করে প্রকল্পটির ব্যয় বাড়ানো হয়েছে এক হাজার ৮৮৬ কোটি টাকায়। শতাংশের হিসাবে ব্যয় বাড়ছে ১২২ শতাংশ। একদিকে বুড়িগঙ্গা নদী পুনরুদ্ধার প্রকল্পটির কাজ শেষ না হয়েও খরচ বেড়েছে, নতুন করে ঢাকার চারটি নদী রক্ষার প্রকল্পটির ব্যয়ও অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন।

কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, যেসব পরিকল্পনা আগে নেওয়া উচিত ছিল, এখন এসে সেসব সংশোধন করা হচ্ছে। এটা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। সংশোধিত প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সঙ্গে ৮৫০ কোটি টাকার প্রকল্পটি কিভাবে বেড়ে এক হাজার ৮৮৬ কোটি টাকায় গেল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কমিশন।

প্রকল্প পরিচালক নূরুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পরিকল্পনা কমিশন বলেছে, এত টাকা ব্যয়ে করোনাকালীন সময়ে প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া যাবে না। খরচ কমাতে বলেছে কমিশন।’ তিনি আরো বলেন, ‘আগের প্রকল্পটি কিভাবে তৈরি করা হয়েছিল, তা জানি না। তবে নতুন করে প্রকল্পটিতে নতুন নতুন বিষয় যোগ করা হয়েছে।’

পরিকল্পনা কমিশনের তথ্য বলছে, ২০১৮ সালে যখন প্রকল্পটি অনুমোদন পায়, তখন বুড়িগঙ্গা নদীর অবৈধ দখল বন্ধ করতে সদরঘাট থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত এক কিলোমিটার এলাকা উন্নয়নের বিষয়টি পরিকল্পনায় ছিল না। এখন কর্মকর্তাদের উপলব্ধি হয়েছে, এই এক কিলোমিটার এলাকা উন্নয়ন কতটা জরুরি। নতুন করে ফুটপাত নির্মাণ, সবুজ এলাকা, নৌকাঘাট, খোলা চত্বর, নতুন করে পন্টুন, হাঁটার সেতু, রেলিং, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যেগুলো ২০১৮ সালের অনুমোদিত প্রকল্পে ছিল না। এ ছাড়া নতুন করে মিরপুর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার খননকাজ, কামরাঙ্গীর চর থেকে খোলামোড়া ঘাট পর্যন্ত এক কিলোমিটার উন্নয়নের প্রস্তাবটিও আগের পরিকল্পনায় ছিল না।

নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সদরঘাট ও তত্সংলগ্ন ঘাট এলাকায় বুড়িগঙ্গা নদী পারাপারে সদরঘাট, কেরানীগঞ্জ এলাকায় নদীতে প্রচুর পরিমাণে খেয়া নৌকা চলাচল করে। বড় লঞ্চের ধাক্কায় ওই খেয়া নৌকা ডুবে প্রায় সময় প্রাণহানি ঘটে। সমস্যা সমাধানে নৌকা পারাপারের জন্য লঞ্চঘাট থেকে নিরাপদ দূরত্বে পরিবর্তিত স্থান সদরঘাট প্রান্তে দুটি, কেরানীগঞ্জ প্রান্তে আরো দুটিসহ চারটি আধুনিক সুবিধাসংবলিত ঘাট নির্মাণ করা জরুরি। এই পরিকল্পনাও আগের অনুমোদিত প্রকল্পে ছিল না। নতুন করে এসব বিষয় সংযোজন করতে চায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়। কিন্তু তাতে বাদ সেধেছে পরিকল্পা কমিশন। এসব খরচ কাটছাঁট করতে বলেছে কমিশন।

জানতে চাইলে রিভার অ্যান্ড ডেল্টা রিসার্চ সেন্টারেরর চেয়ারম্যান মোহাম্মদ এজাজ কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকার চারপাশে নদী রক্ষার জন্য যে নকশার ওপর ভিত্তি করে সীমানা পিলার বসানো হয়েছে, সেটি ঠিক হয়নি। নদীকে রক্ষার জন্য সীমানা পিলার নির্ধারণ করতে গিয়ে ঢাকার পাশে গাবতলী বিল, কাউন্দিয়া বিল, বিরুলিয়া বিল, আশুলিয়া বিল ও টঙ্গী বিল—এই পাঁচটি বিল মেরে ফেলার আয়োজন করা হলো। এই পাঁচটি বিল বাঁচাতে হলে একটি পরিকল্পনা রাখতে হবে। তিনি বলেন, এই প্রকল্পের আগেও অন্য একটি প্রকল্পের আওতায় ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল, কিন্তু সেসব ওয়াকওয়ে পরিকল্পনা করে নির্মাণ করা হয়নি। ফলে সেসব ওয়াকওয়ে এখন অব্যবহৃত।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা