kalerkantho

শনিবার । ২৪ শ্রাবণ ১৪২৭। ৮ আগস্ট  ২০২০। ১৭ জিলহজ ১৪৪১

করোনাকালে মাঠ প্রশাসন

অনন্য ভূমিকায় তাঁরা

বাহরাম খান   

৪ জুলাই, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



অনন্য ভূমিকায় তাঁরা

করোনা উপসর্গ নিয়ে গত ১১ এপ্রিল বিকেলে ফরিদপুর মেডিক্যালে মারা যান ঝিনাইদহ পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড খাজুরার এক ব্যক্তি। সংক্রমণের ভয়ে স্বজনদের কেউ না আসায় আঞ্জুমান মুফিদুলের লোকজন গ্রামের বাড়ি পৌঁছে দেয় মরদেহ। করোনা আতঙ্কে স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী কেউই মরদেহের কাছে আসেনি। এমনকি জানাজা পড়াতেও রাজি হয়নি। তখন ওই ব্যক্তির জানাজা পড়ান ঝিনাইদহ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. বদরুদ্দোজা শুভ। সঙ্গে ছিলেন এক দল পুলিশ সদস্য। জানাজা শেষে তাঁরাই মরদেহের খাটিয়া বহন করে কবরস্থানে নিয়ে দাফনের কাজ সম্পন্ন করেন।

দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুর দিকে যখন পরিবার, আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশী আক্রান্ত ব্যক্তি কিংবা উপসর্গ নিয়ে মৃত ব্যক্তির কাছ থেকে ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল, তখন ইউএনও বদরুদ্দোজা শুভর ওই মানবিকতা নিয়ে এগিয়ে আসাটা ভয়ের চিত্র অনেকটাই বদলে দেয়। যেন নতুন দৃষ্টি পান মাঠ প্রশাসনের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। এমন দৃষ্টান্তে সাহস নিয়ে মানবিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করে সাধারণ মানুষও। ইউএনও বদরুদ্দোজা শুভ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কর্তব্যের খাতিরেই জানাজা পড়িয়েছিলাম। মানুষের এত ভালোবাসা পাব ভাবিনি।’

শুধু্ শুভই নন, মহামারি করোনার মধ্যে দেশ ও মানুষের কল্যাণে জীবন বাজি রেখে চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, র‌্যাব-পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী ও সাংবাদিকের পাশাপাশি মাঠ প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। তাঁদের মধ্যে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় বেশ কয়েকজন জেলা প্রশাসক, ইউএনও ও এসি ল্যান্ডের মানবিক কার্যক্রম ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

ঘরে দেড় বছরের সন্তান আর বাইরে হাজারটা চ্যালেঞ্জ। এ নিয়ে প্রতিদিনের কাজে নামতে হয় নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার ইউএনও মুক্তিযোদ্ধাকন্যা মমতাজ বেগমকে। করোনা মোকাবেলায় শুধু নিজের চাকরির দায়িত্বই পালন করছেন না, অবদান রাখছেন ব্যক্তিগত উদ্যোগেও। করোনা আক্রান্তদের জন্য নিজের এক মাসের বেতন তুলে দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের ডিসির তহবিলে। এলাকার নানা উদ্যোগেও তাঁর সুনাম আছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য ‘সুবর্ণ নাগরিক সেবাকেন্দ্র’ মমতাজ বেগমের বিশেষ উদ্যোগ। এই কেন্দ্রে প্রায় ৩৫০ প্রতিবন্ধী শিশুকে চিকিৎসা, খাবারসহ নানা সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়। মমতাজ বেগম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মন থেকে সেবা দিলে মানুষের দোয়া পাওয়া যায়। সেবাপ্রত্যাশীদের প্রত্যাশিত কাজ করে দিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করি।’

ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের বর্তমান ইউএনও জাকির হোসেন করোনাকালের শুরুতে নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলার ইউএনওর দায়িত্বে ছিলেন। করোনাকালে পৃথক টিম তৈরি করে মানুষকে সেবা দেওয়া, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ চালানোসহ দুর্যোগ মোকাবেলায় তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে সম্প্রতি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের ইউএনও পোস্টিং পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আন্তরিকতা নিয়ে দিন-রাত কাজ করি। কাজ করলে মানুষ ভালোবাসে, এটাই বড় পাওয়া।’

পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ায় করোনা উপসর্গে ৬০ বছরের এক বৃদ্ধার জানাজা পড়ান উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) তৌহিদুল ইসলাম। আত্মীয়-স্বজন এগিয়ে না থাকায় গত ৮ জুন মধ্যরাতে স্থানীয় চেয়ারম্যানকে নিয়ে লাশ দাফনের ব্যবস্থা করেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেউ না থাকলে আমাদেরই দায়িত্ব নিতে হয়।’

গত ৩০ মার্চ হোম কোয়ারেন্টিন ও সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে অভিযান চালানোর সময় সড়ক দুর্ঘটনায় হাত ও পায়ের হাড় ভেঙে গুরুতর আহত হন যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার এসি ল্যান্ড কাজী নাজিব হাসান। পরে তাঁকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় এনে উন্নত চিকিৎসা দেওয়া হয়। বর্তমানে নিজ বাড়ি ফরিদপুরে বিশ্রামে থাকা নাজিব হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০ দিনের মতো হাসপাতালে ছিলাম। ডাক্তার বলেছেন আরো প্রায় দেড় মাসের মতো লাগবে মোটামুটি সুস্থ হতে। সম্পূর্ণ সুস্থ হতে অনেক সময় লাগতে পারে।’

ঢাকা জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শেখ মো. মামুনুর রশীদও প্রশংসিত একটি নাম। দেশে করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর থেকেই ত্রাণ বিতরণে তাঁর তৎপরতা অনেকের নজর কাড়ে। নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। 

মাঠ প্রশাসনে সর্বশেষ ব্যাচ হিসেবে যোগ দেওয়া তরুণ কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার মাহমুদুল হাসান কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসনে গিয়ে প্রথমেই করোনা মোকাবেলার চ্যালেঞ্জে পড়েছেন। চাকরির প্রথম দিকে নতুনদের ওপর কম চাপ থাকে। কিন্তু করোনার কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে অন্যদের সঙ্গে সমানতালে মাঠে থাকতে হচ্ছে নতুনদেরও। মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘মানুষের সেবার যে স্বপ্ন নিয়ে প্রশাসনে যোগ দিয়েছি, তা পালন করার চেষ্টা করছি। কর্তব্য পালনে পিছপা হচ্ছি না।’

ঢাকার বর্তমান জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলাম টাঙ্গাইলে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালনের সময় তাঁর  উদ্যোগে প্রযুক্তির যথার্থ ব্যবহার করে একটি মাত্র স্মার্ট কার্ডের মাধ্যমে ত্রাণ সহায়তা দিতে টাঙ্গাইল, বরগুনা, নরসিংদী, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ জেলায় নিযুক্ত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের পাঁচজন দক্ষ ও পেশাদার প্রগ্রামারের সমন্বয়ে একটি টেকনিক্যাল টিম গঠন করা হয়। ওই টিমের মাধ্যমে তৈরি হয় সেন্ট্রাল এইড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম বা ক্যামস। এই সিস্টেমের মাধ্যমে উপকারভোগীদের জন্য একটি ইউনিক কিউআরকোডসংবলিত স্মার্ট কার্ড দেওয়া হবে, যার মাধ্যমে পরে সব মন্ত্রণালয়ের সব ধরনের মানবিক সহায়তা গ্রহণ করা যাবে। মানবিক সহায়তা প্রদানকারী ক্যামস মোবাইল অ্যাপসে লগইন করে কিউআরকোড স্ক্যানের মাধ্যমে তাত্ক্ষণিকভাবে সঠিক উপকারভোগীর পরিচয় নিশ্চিত করে মানবিক সহায়তা দিতে পারবে। সব মন্ত্রণালয় তাদের নিজস্ব ড্যাশবোর্ড থেকে সংশ্লিষ্ট মানবিক সহায়তার সব তথ্য দেখতে পাবে। গত ২৩ এপ্রিল ২০২০ তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের প্রতিমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জুম মিটিংয়ে এই টাঙ্গাইল মডেল বা সেন্ট্রাল এইড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম উপস্থাপন করা হয়। এরপর টাঙ্গাইল জেলার সব উপজেলাসহ বিভিন্ন জেলায় এর সফল পাইলটিং সম্পন্ন হয়। এরপর এ মডেল কেন্দ্রীয়ভাবে ব্যবহারের জন্য গৃহীত হয় এবং গত ২ মে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর থেকে সারা দেশে সেন্ট্রাল এইড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফটওয়্যারটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করে একটি চিঠি দেওয়া হয়। সফটওয়্যারটি সারা দেশে একযোগে ব্যবহারের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন টাঙ্গাইলের এডিসি (শিক্ষা ও আইসিটি) বজলুর রশীদও।

নরসিংদীর জেলা প্রশাসক সৈয়দা ফারহানা কাউনাইন দেশব্যাপী এলাকাভিত্তিক লকডাউনের এসওপির (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোসিডিউর) প্রণয়নে ভূমিকা রেখেছেন। এই এসওপি জেলা পর্যায়ে গাইডলাইন হিসেবে পাঠানো হয়েছে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসওপিটি সব জেলার জন্য সাধারণভাবে প্রণীত। কিন্তু সব জেলায় ঠিক একইভাবে এটা প্রযোজ্য হবে তা নয়। স্থানভেদে কিছু বিষয় যোগ-বিয়োগ করতে হবে।’ সৈয়দা ফারহানার মতে, মাঠে কাজ করলে শুধু কেন্দ্রের নির্দেশনার দিকে তাকিয়ে থাকলে হয় না। মাঠের অভিজ্ঞতাগুলোও কেন্দ্রে জানাতে হয়। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্যাররা খুবই ইতিবাচক, মাঠ থেকে যাওয়া অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন করেন, আমাদের উৎসাহিত করেন।’ তাঁর ব্যতিক্রমী কাজের স্বীকৃতি হিসেবে সৈয়দা ফারাহানা কাউনাইন এবার ঢাকা বিভাগীয় কমিশন অফিসের ‘শুদ্ধাচার পুরস্কার-২০২০’-এ ভূষিত হয়েছেন।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক কামাল হোসেনের কার্যক্রমের প্রশংসা সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগজুড়ে। করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে প্রথম দিকে যে কয়েকটি জেলা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল তার মধ্যে অন্যতম কক্সবাজার। সেই সঙ্গে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা অধ্যুষিত এই জেলাটি নিয়ে সরকারও চিন্তায় ছিল। সেখানে কামাল হোসেনের ইতিবাচক মনোভাব ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে সামগ্রিক কার্যক্রমে স্বস্তির কথা জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

কক্সবাজার জেলার দায়িত্বে রয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে করোনার মতো অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সামলানো খুব কঠিন। কামাল হোসেন এই দিকটা দারুণভাবে সামলাচ্ছেন। আমি নিয়মিত ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে জেলার খবর রাখছি।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা