kalerkantho

শনিবার । ২৭ আষাঢ় ১৪২৭। ১১ জুলাই ২০২০। ১৯ জিলকদ ১৪৪১

আনন্দ-বিষাদে অন্য রকম ঈদ

আশরাফ-উল-আলম   

২৯ মে, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আনন্দ-বিষাদে অন্য রকম ঈদ

বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। ছবি : কালের কণ্ঠ

রমজান শেষে উদ্‌যাপিত হয়েছে ঈদুল ফিতর। গত সোমবার ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে বাংলাদেশে পালন করা হয় ঈদ উৎসব। এবারের করোনাকালে এই ঈদ যেন ছিল আনন্দ ও বিষাদে মোড়ানো অন্য রকম এক ঈদ।

ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। ঈদ মানে মনের সুখে ঘুরে বেড়ানো। ঈদ মানে ছেলে-বুড়ো একসঙ্গে ঈদগাহে হাজির হয়ে ঈদের নামাজ পড়া। কোলাকুলি করা, করমর্দন করা। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীর সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগী করে নেওয়া। একে অন্যের বাড়িতে একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করা। কিন্তু এবার এই অনাবিল আনন্দ কেড়ে নিয়েছে করোনার সংক্রমণ।

প্রায় সবাই পারিবারিকভাবে বাড়ি বা ঘরবন্দি হয়ে ঈদের আনন্দ সীমিত আকারে উদ্যাপন করলেও তাতে মনে ছিল না তৃপ্তি। কারণ এ রকম ঈদ কেউ চায়নি। এ যে আতঙ্কের নিঃশ্ব্বাসে মোড়ানো করোনাকালের ঈদ।

এবারের ঈদে ছিল স্বজন হারানোর বেদনা। ছিল স্বামী-স্ত্রী বা সন্তান হারানোর দুঃখ। এবার ছিল মা, বাবা, ভাই, বোন হারানোর কষ্টও। গত ছয় দিনে ঈদের আগে-পরে (শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার) করোনায় আক্রান্ত হয়ে মোট ১২৭ জন মৃত্যুবরণ করেন। এ ছাড়া একই সময়ে আক্রান্ত হন ১০ হাজার ১১৬ জন। মৃত ও আক্রান্তদের স্বজনদের কাছে এবারের ঈদ ছিল প্রিয়জনকে কাছে না পাওয়ার যন্ত্রণামথিত। উৎসবের সময়টা বিষাদময় হয়ে উঠেছিল তাদের জন্য।

শুধু আক্রান্তদের স্বজনদের নয়, ঈদের খুশির মধ্যে অজানা আতঙ্ক বিরাজ করে সবার মাঝে। যারা যেখানে যে অবস্থায় ছিল এই ঈদে—সবাই ছিল আতঙ্কিত যা এখনো বিদ্যমান রয়েছে। আতঙ্ক ও অস্বস্তি মানুষের ঘুম নষ্ট করে দেয়। এই অবস্থায় পালিত হয় ঈদ।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের মানুষকে পার করতে হয়েছে কঠিনতর সময়, স্বাভাবিক, আনন্দ-হাসি উৎসব হারিয়ে গিয়েছিল তাদের মাঝ থেকে। তখন একটা গান আলোচিত হয়ে ওঠে। ‘ও চাঁদ তুমি ফিরে যাও...’। ৪৮ বছর পর করোনা নামের এই ভাইরাস আবার কেড়ে নিয়েছে মানুষের হাসি-খুশি। এবার তাদের মনে ছিল না ঈদের চাঁদ দেখার আনন্দ।

বিশেষ করে ঈদের আগের দিন আক্রান্ত ও মৃত্যু যেকোনো দিনের সংখ্যাকে ছাড়িয়ে যায়। ঈদের দিনও একইভাবে আক্রান্তের সংখ্যা আরো বাড়ে। গত কয়েক দিন ধরে ক্রমশ বেড়েই চলেছে। করোনার ব্যাপক সামাজিক সংক্রমণের আভাসে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে দেশজুড়ে মানুষ। এরই মধ্যে কেউ কেউ গ্রামের বাড়িতে ছুটে যায়। তবে বেশির ভাগ মানুষ এবার ছুুটি কাটাতে যায়নি। গ্রামে মা-বাবা প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করতে না পারার কষ্ট আর করোনার ভয় দুটোই ছিল উদ্বেগজনক। উদ্বেগ আর উত্কণ্ঠায় বিষাদ ভরা মন নিয়ে যাদের দিন কেটেছে তারা কি ঈদের খুশিতে মগ্ন হতে পারে?

সামাজিক সংক্রমণ ঠেকাতে এবার ঈদের নামাজ ছিল সীমিত পরিসরে অর্থাৎ ঈদগাহে গিয়ে ধর্মীয় রীতি ও ঐতিহ্য অনুসরণ করে নামাজ আদায়ে বিধি-নিষেধ ছিল। তাই মসজিদে ও নিজ নিজ ঘর-বাড়িতে নামাজ আদায় করতে হয়েছে। নামাজ আদায়ের পর ছিল না কুশল বিনিময়ের উষ্ণ করমর্দন ও কোলাকুলি। করোনার ভয়ে কেউ কারো বাড়িতে বেড়াতে যায়নি। ঘুরতে যায়নি বন্ধুর বাড়ি, পাড়া-মহল্লায় বা কোনো বিনোদনকেন্দ্রে। পর্যটনকেন্দ্রে প্রকৃতির সান্নিধ্যে যায়নি ভ্রমণপিপাসুরা। করোনার প্রাদুর্ভাবে দূরপাল্লার গণপরিবহন বন্ধ থাকায় স্বাভাবিকভাবে কেউ গ্রামে যেতে পারেনি। গ্রামে বা গঞ্জে বসেনি কোনো ঈদ মেলা। ঈদের দিন বিকেলের সেই চিরাচরিত দৃশ্য ছিল না চিড়িয়াখানা, শিশু পার্ক বা অন্য কোনো পার্কে।

এবার করোনায় আক্রান্ত হাজার হাজার মানুষকে ঈদের দিনে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে, একাকি, কোয়ারেন্টিনে। প্রিয়জনের সঙ্গে দেখাও করতে পারেনি তারা। আবার দায়িত্বশীল চিকিৎসক ও স্বাস্থকর্মীরাও হাসপাতাল ছেড়ে যেতে পারেননি নিজের পরিবারের কাছে। তাঁদেরও প্রিয়জন ছাড়া ঈদ উদ্যাপন করতে হয়েছে।

সম্পূর্ণ অন্যরকম এই ঈদে শিশু-কিশোরদের আনন্দের বর্ণচ্ছটায় এসেছে অমোঘ নিয়তির বাধা। ঘরবন্দি হয়ে কাটাতে হয়েছে তাদের। টেলিভিশনে কার্টুন ছবি দেখে, ঘরের মধ্যে ছোটাছুটি করা, বড়জোর বাসার ছাদে গিয়ে আকাশ দেখাই ছিল ঈদের দিনের বিনোদন। জীবনের অপ্রাপ্তিবোধ ভুলিয়ে দিতে অভিভাবকরাও বাচ্চাদের বড়জোর ওই ছাদে ওঠার অনুমতিটুকুই দিতে পেরেছেন। ঈদের দিনের চিরাচরিত নিয়মে মুরব্বিদের কাছ থেকে সেলামি বা ঈদি আদায়েও বঞ্চিত হয়েছে ছোটরা ব্যাপক হারে।

নিম্ন্ন আয়ের মানুষরা ঈদের সময় ছুটে যায় গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু এবার গণপরিবহনের ব্যবস্থা না থাকায় এই শ্রেণির বিশাল সংখ্যক মানুষ এবার যেতে পারেনি প্রিয় সেই গ্রামে, স্বজনের মাঝে। আবার টানা ছুটি ও লকডাউন থাকায় তাদের আয়ও বন্ধ ছিল। বন্ধ ছিল ভালোমন্দ খাওয়া-দাওয়া। কারণ বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জই এবার ঈদে ছিল মুখ্য। কারাগারেও ঈদের জামাত হয়নি। স্বজনদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বন্দিদের। করোনা সতর্কতার কারণে বাইরে থেকে স্বজনরা খাবার পাঠাতে পারেনি তাদের জন্য।

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা