kalerkantho

সোমবার । ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ৪ ফাল্গুন ১৪২৬। ২২ জমাদিউস সানি ১৪৪১

অনন্য অর্জন নিয়ে বীরদের ফেরা

মাসুদ পারভেজ   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



অনন্য অর্জন নিয়ে বীরদের ফেরা

বিমানবন্দর থেকে সোজা মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটে বিশ্বকাপজয়ী যুবদলের সংবর্ধনায় ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছেন অধিনায়ক আকবর আলী ও বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান। ছবি : মীর ফরিদ

মানিব্যাগে এক বাচ্চা ছেলের ছবি নিয়ে ঘোরেন মোহাম্মদ মুরাদ হোসেন। সেটিই বের করে বললেন, ‘দেখুন তো চিনতে পারেন কি না?’ খুব ছোটবেলার ছবি বলে চেনা একটু দায়। অগত্যা ছবির বাহকই বলে দিলেন, ‘এটি আকবর আলীর ক্লাস সিক্সে পড়ার সময়কার ছবি।’

মেজ ভাইয়ের মানিব্যাগে ধরে রাখা ছোট আকবর অচেনা হলেও এই তরুণ বয়সের আকবর কিছুতেই তা নন। বরং বিশ্বজয়ী এক বীরের মর্যাদা নিয়ে বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলের অধিনায়ক এখন টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সীমানা পেরিয়েও ছড়িয়ে পড়েছেন আরো দূরে। ৯ ফেব্রুয়ারির পচেফস্ট্রুমে ভারতের বিপক্ষে অপরাজিত ৪৩ রানের এক বিশ্ব জেতানো ইনিংসে তিনি ক্রিকেট দুনিয়ারই এক চেনা চরিত্র হয়ে উঠেছেন। গত ২২ জানুয়ারি একমাত্র বোনকে হারানোর শোককে শক্তিতে পরিণত করে বিশ্ব মঞ্চে দাঁড়ানো এক দুর্বিনীত ক্রিকেট চরিত্রও।

শুধু আকবর একা নন, আগামীর সম্ভাবনার খাতায় টোকা হয়ে গেছে তাঁর প্রায় সব সতীর্থের নামই। সে জন্যই গত রাতে আকবরকে পাশে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার সময় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) সভাপতি নাজমুল হাসানকে বলতে শোনা গেল, ‘আগেও বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ভালো ভালো অনেক খেলোয়াড় খেলেছে। কিন্তু ওই দলগুলোর সবাইকে কিন্তু সবাই চেনে না। কিন্তু এদের এখন সবাই চেনে।’

চেনে কারণ নাজমুলের ভাষাতেই এঁরা একেকজন হয়ে উঠেছেন ‘আইকন’। সেটি তাঁরা অনন্য এক কীর্তির সৌধে চড়ে বসাতেই, ‘ওরা এখনো এত বড় খেলোয়াড় হয়ে যায়নি। তবে ওরা যেটি এনে দিয়েছে, সেটি তো আর কেউ পারেনি। ওরা যা করেছে, এর তুলনা হয় না। বিশ্বকাপ বিশ্বকাপই।’ সাফল্য বুভুক্ষু জাতিকে প্রথম কোনো বিশ্ব আসরের শিরোপা এনে দেওয়া আকবর আলীদের তাই জমকালো প্রত্যাবর্তনই প্রত্যাশিত ছিল।

তবে এমিরেটসের ফ্লাইটে জোহানেসবার্গ থেকে দুবাই হয়ে গতকাল বিকেলে ঢাকায় নামা আকবরের কাছে যা কিছু হয়েছে, তার সবই অপ্রত্যাশিত লেগেছে। কেন? সেই ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘জানতাম যে কিছু একটা হবে। তাই বলে এত কিছু, সেটি ভাবতেও পারিনি।’ বিমানবন্দর থেকে ফেরার সময় রাস্তার অনেক জায়গায়ই দেখলেন যে দুই ধারে দাঁড়িয়ে মানুষ তাদের উদ্দেশে হাত নাড়ছে।

যদিও ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিজয়ী দলের সদস্য এবং ১৯৯৯-এর বিশ্বকাপে পাকিস্তানকে হারানোর নায়ক খালেদ মাহমুদের মতে, ওই দুইবারের মতো উন্মাদনা এবারও তুঙ্গ ছুঁয়ে ফেলত, যদি বিকেলে না হয়ে সকালেই ঢাকায় নামতেন আকবররা। বিসিবির গেম ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান হিসেবে আকবরদের বিশ্বজয়ের নেপথ্যে থাকা এই সাবেক অধিনায়ক সামনেও তাকাচ্ছেন, ‘পরের প্রজন্মের জন্য এই ট্রফিটা অনেক উপকার করে দিল। এরা পথ দেখাল। পরের প্রজন্ম তাই বিশ্বজয়ের বিশ্বাস নিয়েই বড় হবে।’

সেই বিশ্বাস ছড়িয়ে ফেরা আকবরদের নিয়ে উন্মাদনা ১৯৯৭ কিংবা ১৯৯৯-এর মতো হলো না বটে। তবে যা হলো, সেটিও তো কম নয়। আগের দিন থেকেই সাজসাজ রব মিরপুরের ‘হোম অব ক্রিকেট’-এ। গতকাল দুপুর থেকে শেরেবাংলা স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণে আকবরদের বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকা মানুষের উপচেপড়া ভিড়। সেই ভিড় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও গেল। অন্তত তিন শতাধিক মোটরসাইকেলের একটি শোভাযাত্রাও বিমানবন্দর অভিমুখী স্রোতের সামনেই থাকল। 

সেটি আবার আকবরদের বহন করা বাস অনুসরণ করে সন্ধ্যা নাগাদ মিরপুরেও ফিরল। চেনা আঙিনায় বীরদের প্রত্যাবর্তনে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিতও হয়ে উঠল গোটা স্টেডিয়াম এলাকা। ফেরার পর বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্যদের নিয়ে বিসিবির বোর্ড রুমে বসলেন নাজমুল। সেখান থেকে মাঠে এসে কেক কাটার অপেক্ষা। সেই অপেক্ষা ফুরানোর আগেই শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড গ্যালারিও ভরে গিয়েছিল কানায় কানায়। উৎসবে শামিল হতে আসা মানুষ কখন যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়েছে!

মাঠের ভেতরে যে জায়গাটায় কেক কাটার ব্যবস্থা, সেখানেও এমন উটকো ভিড় লেগে গেল যে বোর্ড সভাপতি ক্রিকেটারদের নিয়ে নেমে আসতে আসতেই ওই জায়গাটি হয়ে উঠেছে বিশৃঙ্খলার মহামঞ্চ। এটুকুই যা একটু দৃষ্টিকটু লাগল। না হলে এই আয়োজন আরো জমকালো দেখাত নিশ্চিতভাবেই। কেক কাটা হতেই ফোটানো হলো আতশবাজিও, সংখ্যায় যা ১৯টি। কেন? সেই ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই দিতে হবে না। ওড়ানো হলো কনফেত্তিও।

পরে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হলো অনন্য এক অর্জনের চূড়ায় পৌঁছানো ক্রিকেটারদের পুরস্কৃত করার অন্য রকম ব্যবস্থার কথাও। এমনিতে সামান্য অর্জনেও বাংলাদেশে ক্রিকেটারদের কখনো কখনো অর্থ পুরস্কারে ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছে। সেই রকম কোনো ঘোষণা এবার নেই, কিন্তু যা আছে সেটিও এই পর্যায় থেকে আকবরদের পরের পর্যায়ে উন্নীত করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে সহায়ক হওয়ার কথা। যা এত দিন ছিল না, আকবরদের পরিচর্যার জন্য গঠন করা হচ্ছে অনূর্ধ্ব-২১ ক্রিকেট দল। এর আওতায় আগামী দুই বছর তাঁদের দক্ষতার উন্নয়নে কাজ করবেন কোচরা। দেশে এবং দেশের বাইরেও ম্যাচ খেলানোর ব্যবস্থা হবে। আর এই সময়ে রোজগারের চিন্তাও করতে হবে না তাঁদের। বিশ্বজয়ী দলের প্রত্যেক ক্রিকেটার মাসে বেতন পাবেন এক লাখ টাকা করে।

চুক্তির সুখবর পাওয়া আকবরও ক্রিকেটার হিসেবে আরো বড় হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন, ‘সব কিছুর শুরু দরকার। আমরা শুরু করলাম। তবে অনূর্ধ্ব-১৯ ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের মধ্যে অনেক পার্থক্য থাকে। আমরা চেষ্টা করব বোর্ডের সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে এই পার্থক্য ঘুচিয়ে দেওয়ার।’ মেজ ভাইয়ের মানিব্যাগে থাকা ছোট্ট আকবর যখন বিশ্বজয়ে নেতৃত্ব দিতে পেরেছেন, তখন পরের পর্যায়ে যাওয়ার আশাতেও ভরসা রাখা যায় নিশ্চয়ই!

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা