kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৪ ফাল্গুন ১৪২৬ । ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০। ২ রজব জমাদিউস সানি ১৪৪১

হলফ করে গোঁজামিল যাচাই নেই ইসিতে

কাজী হাফিজ   

২০ জানুয়ারি, ২০২০ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হলফ করে গোঁজামিল যাচাই নেই ইসিতে

স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা অনুসারে এ নির্বাচনের প্রত্যেক প্রার্থীকে ব্যক্তিগত সাত ধরনের তথ্য নির্ধারিত ফরমে হলফনামার মাধ্যমে মনোনয়নপত্রের সঙ্গে জমা দিতে হয়। কিন্তু ঢাকার দুই সিটির এবারের নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকের হলফনামায় নানা অসংগতি রয়েছে। অনেকে সম্পূর্ণ তথ্য দেননি বা তথ্য গোপন করেছেন। আবার কারো কারো তথ্য অসম্পূর্ণ। মনোনয়নপত্রের সঙ্গে আয়কর রিটার্ন জমার রসিদ জমা দেওয়া এবং তা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশের বিধান থাকলেও সেটা মানা হয়নি। নির্বাচন কমিশনের দায়িত্বও এ বিষয়ে দায়সারা গোছের। অসম্পূর্ণ ও অস্পষ্ট তথ্যের হলফনামা দিয়ে কিভাবে প্রার্থীরা রিটার্নিং অফিসারের বাছাইয়ে বৈধতা পেলেন তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

আবার আপাতদৃষ্টিতে যেসব হলফনামায় পূর্ণ তথ্য রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, সেগুলো সঠিক কি না তা যাচাইয়েও নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগের কোনো দৃষ্টান্ত নেই। ফলে যে উদ্দেশ্যে এই হলফনামা নেওয়ার বিধান তা পুরোপুরি সফল হতে পারছে না বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন।

নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, ঢাকা দক্ষিণের ৭৫ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী আবতার রহমানের হলফনামায় শিক্ষাগত যোগ্যতার ঘরটি ফাঁকা। ঢাকা দক্ষিণের ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. মাহাবুবুল আলমের হলফনামার বদলে স্থান পেয়েছে তাঁর আয়কর রিটার্ন। ঢাকা দক্ষিণের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. তারিকুল ইসলাম সজীবের হলফনামাটি এত অস্পষ্ট যে তা থেকে সব তথ্য জানা

সম্ভব নয়। দক্ষিণের ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের মো. দেলোয়ার হোসেন নির্ধারিত ফরমে হলফনামা দেননি। ভিন্ন ধরনের ওই হলফনামায় মামলার তথ্য পৃথক শিটে দেওয়ার কথা বলা হলেও নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে তা নেই। দক্ষিণ সিটির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী জজ মিয়া পেশার ঘরে উল্লেখ করেছেন ‘প্রযোজ্য নয়’।

ঢাকা উত্তর সিটির কাউন্সিলর প্রার্থীদের অনেকের হলফনামায়ও এ ধরনের অস্পষ্ট ও অসম্পূর্ণ তথ্য রয়েছে। ৫৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী অতীতে মামলার তথ্য সম্পর্কে লিখেছেন ‘মনে নেই’। একই ওয়ার্ডের প্রার্থী মো. সোহেল শেখ ব্যবসা বা পেশার বিবরণীর ঘর ফাঁকা রেখেছেন। ৫০ নম্বর ওয়ার্ডে প্রার্থী দেওয়ান শেখের হলফনামায়ও পেশা বা ব্যবসার বিবরণীর ঘর ফাঁকা। ৪৮ নম্বর ওয়ার্ডের ‘স্বশিক্ষিত’ প্রার্থী নিজের পেশা হিসেবে উল্লেখ করেছেন ‘চাকুরি, ব্যবস্থাপক’। কিন্তু আয়ের ঘরে চাকরি থেকে আয়ের উল্লেখ নেই। ৪৬ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী মো. আতিকুর রহমানের মামলা সম্পর্কিত তথ্য অস্পষ্ট। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে উত্তরের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের প্রার্থী আব্দুর রব নান্নুর হলফনামাটির ঠাঁই হয়েছে আরেক প্রার্থী মো. রুহুল আমিনের হলফনামার ঘরে। এতে তিনি নিজের ব্যবসা বা পেশার বিবরণীর ঘরে লিখেছেন ‘ব্যবসা ও সম্মানী ভাতা’ কিন্তু এর কোনো বিবরণ নেই।

৫ নম্বর ওয়ার্ডে সাত প্রার্থীর মধ্যে তিন প্রার্থীর হলফনামা নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ হয়নি। অন্য আরো কিছু ওয়ার্ডের ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। আবার বেশ কয়েকজন প্রার্থীর হলফনামা পরীক্ষা করে দেখা যায়, ওই সব প্রার্থীর বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের জন্য একাধিক মামলা থাকলেও তা তাঁরা গোপন করেছেন।

বিষয়টি সম্পর্কে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হলফনামায় কোনো প্রার্থী অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে রিটার্নিং অফিসারের বাছাইয়ে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাওয়ার কথা। পরেও বিষয়টি নজরে আসলে নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, প্রার্থীরা সঠিক তথ্য দিচ্ছেন কি না তা যাচাইয়ে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। নিজেদের জনবল না থাকলেও সরকারের বিভন্নি সংস্থা, যেমন—দুদক, এনবিআরের সহযোগিতা নেওয়া যেতে পারে। হলফনামার তথ্য যচাই না হলে এগুলো সংগ্রহ করার মূল উদ্দেশ্যই পূরণ হবে না।

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মোবারক বলেন, ‘সিটি করপোরেশন নির্বাচন বিধিমালার বিধি ১৩(৩) (ঙ)  মোতাবেক হলফনামায় অসত্য তথ্য প্রদানের জন্য মনোনয়নপত্র বাতিল করা যায়। তা ছাড়া এ ধরনের অপরাধে  দণ্ডবিধির ১৮১ ধারা অনুসারে অনূর্ধ্ব তিন বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড হতে পারে।’

সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “আমরা ঢাকা দুই সিটির নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণের কাজ করছি। এতে নানা ধরনের অসংগতি রয়েছে। আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার তথ্য পাচ্ছি না। এসব কারণে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু তা হয়নি। নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে দায়িত্ব পালন করার কথা তা করছে না। প্রচুর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নিজেদেরকে ‘পেস্ট অফিসের’ ভূমিকায় রেখেছে।”

অস্পষ্ট বা অসম্পূর্ণ তথ্যের হলফনামা দিয়ে কিভাবে একজন প্রার্থী রিটার্নিং অফিসারের বাছাইয়ে বৈধ হতে পারেন—এ প্রশ্নে ঢাকা দক্ষিণের রিটার্নিং অফিসার আবদুল বাতেন গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ধরনের হলফনামা সম্পর্কে ওই প্রার্থীর কোনো প্রতিপক্ষ আপত্তি জানালে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। নির্বাচন কমিশন স্ব-উদ্যোগে কোনো ব্যবস্থা নেয় না। এ ছাড়া প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পরও হলফনামায় তথ্য গোপনের অভিযোগ পেলে স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালার ৯১ ধারা অনুসারে ব্যবস্থা নিতে পারে।’

উল্লেখ্য, স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) নির্বাচন বিধিমালার ৯১ ধারার ১ উপবিধিতে বলা হয়েছে, ‘আইন বা এই বিধিমালায় যাহা কিছু থাকুক না কেন, যদি কোন উৎস হইতে প্রাপ্ত রেকর্ড কিংবা লিখিত রিপোর্ট হইতে কমিশনের নিকট প্রতীয়মান হয় যে, মেয়র বা কাউন্সিলর পদে প্রতিদ্বন্দ্বী কোন প্রার্থী বা তাহার নির্বাচনী এজেন্ট এই বিধিমালার কোন বিধান লঙ্ঘন করিয়াছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করিতেছেন এবং অনরূপ লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের চেষ্টার জন্য তিনি মেয়র বা কাউন্সিলর নির্বাচনের অযোগ্য হইতে পারেন, তাহা হাইলে কমিশন তাত্ক্ষণিকভাবে বিষয়টি সম্পর্কে তাত্ক্ষণিক তদন্তের নির্দেশ প্রদান করিতে পারিবে।’

এরপর এ ধারার ২ উপবিধিতে বলা হয়েছে, ‘১ উপবিধি এর অধীনে তদন্ত রিপোর্ট প্রাপ্তির পর কমিশন যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, কোন প্রতিদ্বন্দ্বী কোন প্রার্থী বা তাহার নির্বাচনী এজেন্ট বা তাহার পক্ষে তাহার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্মতিতে অন্য কোন ব্যক্তি এই বিধিমালার কোন বিধান লঙ্ঘন করিয়াছেন বা লঙ্ঘনের চেষ্টা করিতেছেন এবং অন্যরূপ লঙ্ঘন বা লঙ্ঘনের চেষ্টার জন্য তিনি মেয়র বা কাউন্সিলর নির্বাচনের অযোগ্য হইতে পারেন, তাহা হাইলে কমিশন তাত্ক্ষণিকভাবে লিখিত আদেশ দ্বারা উক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করিতে পারিবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা