kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ জানুয়ারি ২০২০। ১০ মাঘ ১৪২৬। ২৭ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪১     

হাসপাতালপাড়ায় আতঙ্কের নাম কাজী কবির

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হাসপাতালপাড়ায় আতঙ্কের নাম কাজী কবির

রাজধানীর শেরেবাংলানগরের সরকারি ৯টি হাসপাতালে ঠিকাদারি কাজের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কাজী কবিরুল ইসলাম ওরফে কাজী কবিরের হাতে। শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সহযোগী ও হত্যাসহ আটটি মামলার আসামি এই কাজী কবির কোনো ঠিকাদার দরপত্রে অংশ নিতে গেলেই তাঁকে গুলি করে হত্যার হুমকি দেন। তাঁর রয়েছে কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। তাঁর বড় ভাই সরকারি হিসাব নিরীক্ষণ কর্মকর্তা কাজী জাহিদ হাসান তারিফ এসব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। একচেটিয়া কারবারে তাঁরা এরই মধ্যে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন।

দুই কাজী সহোদরের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগীরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করেছেন। তবে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাজী কবির। অন্যদিকে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তারিফ ফোন কেটে দেন।

কে এই কাজী কবির : ভুক্তভোগীসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, কুষ্টিয়ার কুমারখালী এলাকার কাজী মুহায়মেনের তিন ছেলের মধ্যে কাজী কবির ছোট। বড় ভাই কাজী জরিপের মাধ্যমেই উত্থান হয় তাঁর। কাজী জরিপ ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকারের আমলে সন্ত্রাসী ইফতেখার রহমান খান ডালুর হাত ধরে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে বিএনপির সংসদ সদস্য মেজর (অব.) আবদুল মান্নানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয় জরিপের। ওই সময়ের সন্ত্রাসী আব্দুল লতিফের সহযোগী পরিচয়ে শেরেবাংলানগরে প্রভাব বিস্তার করেন তিনি। ১৯৯৫ সালে টেন্ডারবাজির বিরোধে প্রতিপক্ষের সন্ত্রাসীদের গুলিতে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিহত হন কাজী জরিপ। ভাইয়ের মৃত্যুর পর কাজী তারিফ হাসপাতালের ঠিকাদারি ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেন। পরবর্তীতে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে নেন কাজী কবির। ওই সময় তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সহযোগী হিসেবে সেভেন স্টার গ্রুপে যোগ দেন। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় এলে সংসদ সদস্য মোসাদ্দেক হোসেন ফালু ও কমিশনার আনোয়ার হোসেনের কর্মী হন কবির। ২০০৩ সালে খুন হন শেরেবাংলানগরের হাসপাতালের ঠিকাদার কাজী হাফিজ দোলন। এই খুনের মামলার এজাহারনামীয় আসামি কাজী কবির।

ঠিকাদার দোলনকে হত্যার আগে ২০০০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর গুলি করা হয়, সে সময় তিনি তেজগাঁও থানায় কাজী কবিরের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। ২০০৭ সালের ৩ জুলাই কবিরকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই সময় পুলিশ জানায়, সুব্রত বাইনের সহযোগী কাজী কবির। তাঁর বিরুদ্ধে দোলন হত্যা ছাড়াও কাফরুল থানায় সাতটি মামলা আছে।

তবে মামলা থাকার বিষয়টি অস্বীকার করে কাজী কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দোলন হত্যা মামলায় আমার নাম নেই। এ ছাড়া কোনো মামলা নেই আমার নামে।’

হাসপাতালপাড়ার আতঙ্ক : কাজী কবিরের দৌরাত্ম্য থেকে রক্ষা পেতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে দুই দফায় আবেদন করেছেন একজন ঠিকাদার। দুদকেও আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী আরেক ঠিকাদার। এক ঠিকাদারের অভিযোগ, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের দরপত্র প্রক্রিয়া শুরুর পর কাজী কবির মোবাইল ফোনে তাঁকে হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করেন। অস্ত্র হাতে কবির ঠিকাদারদের অনেকবার ভয় দেখিয়েছেন।

আইন অনুযায়ী, কারো বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে তাঁকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার বিধান নেই। কিন্তু কাজী কবিরকে দুটি অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। সূত্র মতে, এই লাইসেন্স পেতে মামলার তথ্য গোপন করে ভুয়া ঠিকানা ও পরিচয় ব্যবহার করেছেন কাজী কবির।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের জুলাই মাসে ‘উষা এসসি লিমিটেড’ নামের প্রতিষ্ঠানের দুই কর্মকর্তাকে হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে অস্ত্র হাতে হুমকি দিয়ে বের করে দেন কবির। ওই বছরের অক্টোবরে অভিযোগকারী ঠিকাদারকেও অস্ত্র দেখিয়ে গুলি করে মারার হুমকি দেন। কয়েক বছর ধরেই হুমকি দিয়ে কাজী কবির তাঁকে দরপত্রে অংশগ্রহণে বাধা দিচ্ছেন বলে ওই ঠিকাদারের অভিযোগ।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, কাজী কবির ও তাঁর সহযোগী রুবেল ও পরাগের হাতে সব সময় অস্ত্র থাকে। দুটি পিস্তল ও একটি শট গান বহন করে তারা। কবিরের সহযোগীদের মধ্যে আরো আছে শিপন, রশিদ, নজরুল, কামরুল, আকরাম, পিচ্চি আনোয়ার।

জানতে চাইলে কাজী কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) ছাড়া কিছুই করা সম্ভব নয়। সব আইন মেনেই আমাকে অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে।’

কবির আরো বলেন, ‘হাসপাতালে যেসব কাজের দরপত্র আহ্বান করা হয় সেগুলোতে অংশ নিয়ে আমি সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে কাজ পেয়ে আসছি। আমি লুকিয়ে থাকি না। কর্ম করার কারণে প্রতিপক্ষ থাকতে পারে।’

ভয় দেখিয়ে একচেটিয়া কারবার : ভুক্তভোগী ও হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানায়, ভাই তারিফের সঙ্গে মিলে কাজী কবির কাজী এন্টারপ্রাইজ, প্রভী ইন্টারন্যাশনাল, কবির এন্টারপ্রাইজ, জে ডিলাক্স ইন্টারন্যাশনাল, ট্রেড লিংকসহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের নামে শেরেবাংলানগরের সরকারি ৯টি হাসপাতালের ৯০ শতাংশ ঠিকাদারি কাজ নিয়ন্ত্রণ করেন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে সেখানে তাঁদের দাপট। এরই মধ্যে শতকোটি টাকার মালিক বনে গেছেন তাঁরা। মালয়েশিয়ায় গড়েছেন ‘সেকেন্ড হোম’। সেখানে হুন্ডির মাধ্যমে কোটি টাকা পাচার করেছেন। মোহাম্মদীয়া হাউজিং এলাকার ২ নম্বর রোডের ৩/এ নম্বর বাড়িসহ দুটি বাড়ি ও কয়েকটি ফ্ল্যাট আছে দুই ভাইয়ের। কুষ্টিয়ায় আছে শত বিঘা জমি।

সংশ্লিষ্টরা জানায়, ২০০৮ সাল থেকে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের ক্যান্টিন ও ফার্মেসি তাঁদের দখলে রয়েছে। এ ছাড়া রোগীর পথ্য (খাবার) সরবরাহ খাতের এক কোটি ৪০ লাখ টাকা, কেমিক্যালসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ দুই কোটি ২০ লাখ, ওষুধ সরবরাহ এক কোটি ৮০ লাখ, ভারী যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র পাঁচ কোটি ৬০ লাখ, আউটসোর্সিংয়ের ৬০ লাখ টাকার কাজ তাঁদের দখলে। এ ছাড়া কলেজ অংশের বিভিন্ন যন্ত্রপাতির তিন কোটি টাকা এবং আউটসোর্সিংয়ের ৪০ লাখ টাকার কাজ হাতিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।

এভাবে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ১০ কোটি টাকার কাজ; কিডনি হাসপাতালের দুই কোটি ৩৫ লাখ, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের ৬০ লাখ টাকা, জাতীয় অর্থোপেডিক ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (পঙ্গু) ৪৫ লাখ, নিউরো সায়েন্স হাসপাতালের এক কোটি ২০ লাখ, বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ৩০ লাখ, মানসিক হাসপাতালের ৩০ লাখ টাকার কাজও তারিফ ও কবিরের হাতে। সব মিলিয়ে প্রতি অর্থবছরে হাসপাতালগুলোতে গণপূর্তের প্রায় দেড় শ কোটি টাকার কাজ করেন এই দুই ভাই।

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা