kalerkantho

রবিবার । ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ১০ রবিউস সানি ১৪৪১     

প্রথম দিনেই পতাকা ওড়ালেন দীপু চাকমা

শাহজাহান কবির, কাঠমাণ্ডু থেকে   

৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রথম দিনেই পতাকা ওড়ালেন দীপু চাকমা

সোনা জয়ের উচ্ছ্বাস দীপু চাকমার। ছবি : মীর ফরিদ

গুয়াহাটিতে গতবার এক দিন, দুই দিন কেটে যায়। প্রায় সব দলের জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে, বাংলাদেশের বাজে না। অবশেষে তৃতীয় দিনে মাবিয়া আক্তার সোনা জিতলেন এবং পতাকাকে স্যালুট করে তাঁর অঝোরে কান্না। কাঠমাণ্ডুতে দেশকে সেই অপেক্ষায় রাখেননি দীপু চাকমা। গেমস উদ্বোধনের পর কাল প্রথম দিনই বাংলাদেশকে প্রথম সোনা এনে দিয়েছেন এই তায়কোয়ান্দো খেলোয়াড়।

ললিতপুরের সাতদোবাতো স্পোর্টস কমপ্লেক্সে এবার অনেক খেলার ভেন্যু। শ্যুটিং, সাঁতার, বক্সিংও হবে এই ভেন্যুতে। কালই শুরু হয়েছে কারাতে ও তায়কোয়ান্দো। ২০১০ সাফ গেমসে চারটি সোনা জেতা কারাতে ঘিরে এবার আশা ছিলই। হাসান খানের একক কাতা ইভেন্টটিও ছিল কাল। কিন্তু মেয়েদের এককে হুমায়রা আক্তারের যে পারফরম্যান্স, ২০১০-এর সোনাজয়ী সানও তাঁর চেয়ে ভালো কিছু করে দেখাতে পারেননি। চারজনের মধ্যে জিতেছেন ব্রোঞ্জ।

মেয়েদের দলগত কাতায়ও নেপাল আর পাকিস্তানের দাপট। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজাও গম্ভীর মুখে কারাতে হলে।

অনেকটা নিরাশ হয়েই এরপর পাশের ভেন্যু তায়কোয়ান্দোতে যাওয়া। কে জানত দীপু চাকমা সেখানে এমন চমক নিয়ে অপেক্ষায়। ৩০-ঊর্ধ্ব কেজিতে তাঁর লড়াই পুমসে-তে। কাতার মতোই এই ইভেন্ট, প্রথমবার যোগ হয়েছে গেমসে। এখানে অনেকটা ছায়া লড়াই। অর্থাৎ অদৃশ্য প্রতিপক্ষকে সামনে রেখে তাঁকে ঘায়েল করার জন্য নিয়ম মেনে যত রকম কসরত আর কায়দা-কানুন দেখানো যায়। তাতে প্রথম রাউন্ডে দীপু এগিয়ে গেলেন সবার চেয়ে ৮.২৮ পয়েন্ট নিয়ে। অন্যান্য প্রতিযোগীর মধ্যে সেখানে শ্রীলঙ্কার লক্ষ্মণের সর্বোচ্চ ৮.১৪। দ্বিতীয় রাউন্ডে দীপুর স্কোর ৭.৯৬। লক্ষ্মণ তাঁর চেয়েও ভালো করলেন। কিন্তু মোট পয়েন্টে ছাড়িয়ে যেতে পারলেন না। পিছিয়ে থাকলেন ভারতের প্রতিযোগী। এর পরই লাল-সবুজের উচ্ছ্বাস বাঁধ ভাঙে। ২০১৬-তে ভারত, আফগানিস্তানের আধিপত্য ছিল তায়কোয়ান্দোতে। এবার ভারত আসবে না—এমন খবরেই বাংলাদেশের বাড়তি সম্ভাবনা উঁকি দিয়েছিল। কিন্তু নানা দেন-দরবার করে ভারত শেষ পর্যন্ত দল পাঠিয়েছে তায়কোয়ান্দোতে। কিন্তু দীপুকে থামানো যায়নি।

রাঙামাটির এই তরুণ সেনাবাহিনীর চাকরি নিয়ে যখন তায়কোয়ান্দোতে নিজের খেলোয়াড়ি ক্যারিয়ার শুরুর কথা ভাবছেন তখন শ্রীলঙ্কায় চলছিল ২০০৬ এসএ গেমস। বাংলাদেশের হার্ডলার মাহফিজুর রহমান মিঠু ও সাঁতারু শাহজাহান আলী রনির সঙ্গে সেই আসরে তৃতীয় সোনাটি জিতেছিলেন তায়কোয়ান্দোর মিজানুর রহমান। তিনিও সেনাবাহিনীর। দীপুর স্বপ্নের পরিধিটা বাড়িয়ে নিতে তাই আর বেগ পেতে হয়নি। অবশেষে দক্ষিণ এশিয়ার মুকুটও উঠল তাঁর মাথায়, ‘এই সোনা জয়ের সঙ্গে আর কিছুকে মেলানো যাবে না। আমার জীবনের সেরা অর্জন। এই একটা স্বপ্ন নিয়েই আমি তায়কোয়ান্দো শুরু করেছিলাম। অবশেষে তা পূরণ হলো আমার।’

সেটি এই গেমসের প্রথম সোনা হওয়াতে দীপুর আনন্দটা হয়েছে দ্বিগুণ, ‘গতবার একটা সোনার জন্য আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছিল জানি। এবার প্রথম দিনই আমি দেশকে সোনা এনে দিলাম। এটা আরো বেশি আনন্দের। আমার বিশ্বাস অন্যান্য ডিসিপ্লিনেও আমাদের দেশ আরো ভালো করবে।’

২০১৩-এর বাংলাদেশ গেমস দিয়েই প্রথম দীপুর পাদপ্রদীপের আলোয় আসা, সেই আসরে দুটি সোনা জেতার পর এই গেমসের আগ পর্যন্ত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে অন্তত তাঁকে হারাতে পারেনি কেউ। এর মধ্যে মালয়েশিয়া এবং এই নেপালেই আন্তর্জাতিক তায়কোয়ান্দোতে তিনি সোনা জিতেছেন। কিন্তু গেমসের এই অর্জনের সঙ্গে আর কিছুকে মেলাতে পারেন না, ‘গেমসে যেমন করে জাতীয় সংগীত বাজে, পতাকা ওঠানো হয়—এর সঙ্গে যে আবেগ তার আসলে তুলনা চলে না।’

দীপু এরপর মিশ্র পুমসে-তে অবশ্য ব্রোঞ্জ জিতেছেন মৌসুমির সঙ্গে। প্রথম দিন একক ইভেন্টে দীপুর ওই চমক না থাকলে অবশ্য কারাতের মতো ব্রোঞ্জময়ই থাকত তায়কোয়ান্দো। এদিন মোট ছয়টি ব্রোঞ্জ জিতেছে তারা। একক পুমসে-তে জিতেছেন আনিকা আক্তার, নুরুন্নাহার, কামরুল ও মেহেদী। মিশ্র পেয়ারে আরেকটা ব্রোঞ্জ রুমা ও নুরুদ্দীনের। ঢাকা ছাড়ার আগেই তায়কোয়ান্দোতে অন্তত দুটি সোনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ফেডারেশন সম্পাদক মাহমুদুল ইসলাম রানা। আজ আরেকটি সোনার আশা তাই থাকছেই এই খেলাটিতে। ২০০৬-এর সোনাজয়ী মিজান এখনো আছেন লড়াইয়ে। নিজের কথা না বললেও তরুণদের ঘিরে তাঁরও আশা, ‘দীপুর সামর্থ্য নিয়ে আমার একদমই সন্দেহ ছিল না। তারপরও প্রতিযোগিতায় নিজের সেরাটা মেলে ধরাটা গুরুত্বপূর্ণ। আশা করি তাঁর এই সাফল্যের অনুপ্রেরণায় অন্যরাও ভালো কিছু উপহার দেবে।’

 

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা