kalerkantho

ডিআইজি পার্থ আগে ‘বাণিজ্যকেন্দ্র’ গড়েন চট্টগ্রাম কারাগারে

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৩০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



ডিআইজি পার্থ আগে ‘বাণিজ্যকেন্দ্র’ গড়েন চট্টগ্রাম কারাগারে

বাসায় রাখা অবৈধ ৮০ লাখ টাকাসহ ধরা খাওয়া সিলেটের ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক আগে ছিলেন চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ডিআইজি। যোগদান করেছিলেন ২০১৬ সালের ৮ আগস্ট। আর বদলি সূত্রে চট্টগ্রাম ছেড়ে যান ২০১৮ সালের ১৯ নভেম্বর। মাঝখানের এই ২৬ মাস ধরে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ৯ থেকে সাড়ে ৯ হাজার বন্দি ঘিরে করেছেন ‘বাণিজ্য’। এই ‘বাণিজ্যে’ তাঁর সঙ্গী ছিলেন তৎকালীন সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক ও জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস। অর্থাৎ, দুই বণিক ও এক বিশ্বাসচক্রের জালে আটকা ছিল চট্টগ্রাম কারাগারের বন্দিরা।

ওই তিনজনের সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত কারাকেন্টিন, বন্দিদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা-সাক্ষাৎসহ সব কিছু। অনুগত কিছু কয়েদি এবং কারাগারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে এই চক্র কোটি টাকার বাণিজ্যে জড়িয়ে ছিল। শেষের দিকে অবৈধ অর্থ নিয়ে তিনজনের মধ্যে বিরোধ দেখা দিয়েছিল। গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর জেলার সোহেল রানা বিশ্বাস ভৈরব থেকে টাকা, মাদকসহ গ্রেপ্তারের পর পুরো বিষয়টি ফাঁস হয়েছিল। সব শেষ ঢাকা থেকে গত রবিবার গ্রেপ্তার হন পার্থ গোপাল বণিক। তাঁর বাসা থেকে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জব্দ করে ৮০ লাখ টাকা। আর তৎকালীন সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিকের অনিয়মের বিষয়টি এখনো তদন্ত পর্যায়ে আছে।

গত ২৬ অক্টোবর ৪৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা, দুই কোটি ৫০ লাখ টাকার এফডিআর (স্থায়ী আমানত), এক কোটি ৩০ লাখ টাকার নগদ চেক ও ১২ বোতল ফেনসিডিলসহ রেলওয়ে পুলিশের অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন চট্টগ্রামের জেলার সোহেল রানা। সেই ঘটনায় দায়ের করা একটি মামলা তদন্ত করছে দুদক। এই মামলায় গত রবিবার পার্থ গোপাল ও প্রশান্ত কুমারকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদক কর্মকর্তারা। সকাল থেকে জিজ্ঞাসাবাদের পর বিকেলে পার্থর বাসায় অভিযান চালিয়ে ৮০ লাখ টাকা জব্দ করে দুদক।

দুই বণিক এক বিশ্বাসচক্রের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ

ওই তিনজনই একসঙ্গে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে কর্মরত থাকাকালে তাঁদের ভয়াবহ দুর্নীতির শিকার হয়েছিল বন্দিরা। গত বছরের ২৬ অক্টোবর সোহেল রানা গ্রেপ্তার হওয়ার পর কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছিল চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারের ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য। ওই সময় এই কারাগারে বন্দি ছিলেন চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা ওসমান গণি। তিনি হাজতে বন্দি থাকার সময় দেখেছেন বন্দিদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের দৃশ্য। গত নভেম্বরে জামিনে মুক্তি পাওয়া ওসমান গণি গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠ’র সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘চট্টগ্রাম কারাগারে বন্দিদের কাছ থেকে কৌশলে জোরপূর্বক টাকা আদায় করা হতো। কারাক্যান্টিনে এক কেজি গরুর মাংস বিক্রি হতো ১২০০ টাকায়।’ 

তিনি বলেন, ‘আমাকে যেদিন সন্ধ্যায় কারাগারে নেওয়া হয়, সেই রাতে ‘আমদানি ওয়ার্ডে’ রাখা হয়। সেখানে খাবার দেওয়া হয়নি। পরদিন কারাগারের বিভিন্ন ভবনের ১২০টি ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা আমদানি ওয়ার্ডে আসেন। পরে জেনেছি ওই লোকেরা ওয়ার্ডগুলো নিলামে নিয়েছেন। তাঁরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী বন্দিদের নিজেদের ওয়ার্ডে নিয়ে যান। এরপর বন্দিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে টাকা আদায় করা হতো। প্রতিজন হাজতির কাছ থেকে দুই থেকে দশ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হতো। আর ক্যান্টিনে এক কেজি ফার্মের মুরগি বিক্রি হতো ৬০০ টাকায়, আর রান্নার জন্য দিতে হতো ২০০ টাকা। আমরা কয়েকজন বন্দি ভাগ করে মুরগি কিনে খেতাম। কারণ, কারাগারের খাবার মুখে দেওয়ার মতো ছিল না। এমন ‘বাজে’ খাবার রান্না হয় সেখানে। একটু ভালো থাকতে হলে হাসপাতালে সিট ‘কিনতে’ হতো ১০ হাজার টাকা ব্যয়ে। প্রকৃত রোগীদের সিট না দিয়ে সেখানেও চলত সিট বাণিজ্য। রোগীদের ফ্লোরে রেখে সিট বিক্রি করা হতো।

ওয়ার্ড নিলাম বিষয়ে ওসমান গণি বলেন, ‘কারাগারে বন্দির সংখ্যা বেশি হওয়ায় সব বন্দি ওয়ার্ডের ভেতরে থাকার সুযোগ পেত না। যারা টাকা দিত, তাদের ভেতরে রাখা হতো। অন্যদের ভবনের বাইরে বারান্দায় থাকতে হতো। স্বজনরা কারা অফিসে গিয়ে বন্দির সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চাইলে দিতে হতো এক হাজার ৬০০ টাকা, তৃতীয় তলায় ৩০০, নিচ তলায় ২০০ টাকা। ফ্রিতে দেখা-সাক্ষাৎ করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও সাধারণত সেই সুযোগ কেউ খুব বেশি পেত না।

কারা অভ্যন্তরে মাদকের ছড়াছড়ি ছিল বলেও দাবি করেছেন সাবেক এই হাজতি বন্দি। সেখানে ইয়াবা, ফেনসিডিল ও গাঁজা বিক্রি হতো। মাদকসেবীরা উচ্চমূল্যে মাদক কিনে সেবন করত। দুই বণিক ও এক বিশ্বাসচক্রের সময় গড়ে সাড়ে ৯ হাজার বন্দি থাকত চট্টগ্রাম কারাগারে। ওই সময় প্রাপ্ত তথ্যমতে, আমদানি ওয়ার্ড, সাধারণ ওয়ার্ড, হাসপাতাল, ক্যান্টিন, রান্নাঘর, দেখা-সাক্ষাৎ এবং মাদক ও রাজনৈতিক মামলায় জামিনের পর পুনরায় পুলিশের হাতে তুলে দেওয়ার নাম করে আদায় করা মোটা অঙ্কের টাকাসহ দৈনিক পাঁচ লাখের বেশি টাকা আদায় হতো। মাসে বাণিজ্য হতো দেড় কোটি টাকার মতো। আবার কারাগারে খাবার সরবরাহকারী ঠিকাদারের কাছ থেকেও মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করত এই চক্র।

চক্রের বিশ্বস্ত কারা কর্মকর্তা, কারারক্ষী ও কয়েদিদের বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত করে বন্দিদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার পর বণিক-বিশ্বাসচক্র ভাগবাটোয়ারা করত বলে শুনেছেন ওসমান গণি। গ্রেপ্তারের পর সোহেল রানা বিশ্বাস দাবি করেছিলেন, উদ্ধারকৃত টাকাগুলো ডিআইজি প্রিজন পার্থ গোপাল বণিক ও সিনিয়র জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিকের। কিন্তু ওই সময় পার্থ ও প্রশান্ত দুজনই কালের কণ্ঠ’র কাছে দাবি করেছিলেন, জেলার সোহেল রানা বিশ্বাসের কাছ থেকে উদ্ধারকৃত টাকা তাঁদের নয়। সোহেল রানা অসত্য তথ্য দিয়েছেন।

ওই ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে অন্য কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে ‘দুই বণিককে’ও বদলি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। তবে সোহেল রানা গ্রেপ্তারের ঘটনায় দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় তদন্ত কার্যক্রম চলমান রাখে দুকক। এই মামলায় পার্থ ও প্রশান্তকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক।

গতকাল চট্টগ্রাম বিভাগের কারা উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ফজলুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওই সময় চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে নানা অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত করছে দুদক। বর্তমানে কারাগারে কোনো ধরনের অনিয়ম নেই।’

মন্তব্য