kalerkantho

সাঁওতালপল্লীতে আগুন হত্যা

পুলিশের চার্জশিট ঘিরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ

গাইবান্ধা প্রতিনিধি   

৩০ জুলাই, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



পুলিশের চার্জশিট ঘিরে ক্ষোভ-বিক্ষোভ

গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার সাঁওতালপল্লীতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যার ঘটনায় ‘মূল হোতাদের বাদ দিয়ে’ পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) দাখিল করা চার্জশিটে ক্ষুব্ধ ও স্তম্ভিত সাঁওতাল এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল বাঙালি সংগঠনগুলো। সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটি এর প্রতিবাদে আজ মঙ্গলবার গাইবান্ধা জেলা শহরে মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ এবং ৯ আগস্ট ‘আদিবাসী দিবসে’ গোবিন্দগঞ্জে বিক্ষোভ সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে।

সাঁওতালসহ আন্দোলনকারী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ভাষ্য—এই চার্জশিটে প্রধান আসামি সাবেক এমপি অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ, রংপুর চিনিকলের তৎকালীন এমডি আব্দুল আউয়াল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, ইক্ষু খামারের ম্যানেজার আবদুল মজিদ, জনপ্রতিনিধিসহ অনেকের নাম না থাকায় তা গ্রহণযোগ্য নয়। সাহেবগঞ্জ-বাগদা ফার্ম ভূমি উদ্ধার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি ফিলিমন বাসকে বলেন, স্থানীয় আদিবাসী-বাঙালিদের একটিই দাবি, নিরপেক্ষ অধিকতর তদন্ত করে বাদ পড়া প্রভাবশালীদের নাম অভিযোগপত্রে যুক্ত করা হোক।

সিপিবি নেতা অ্যাডভোকেট মুরাদুজ্জামান রব্বানী বলেন, ওই দিন বসতি উচ্ছেদের কোনো আইনি আদেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে ছিল না। উচ্ছেদের নামে অগ্নিসংযোগ, হত্যার সঙ্গে যুক্ত জনপ্রতিনিধি বা কর্মকর্তাদের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

সাঁওতাল নেত্রী প্রিসিলা মুরমু বলেন, সাঁওতালরা দীর্ঘদিন থেকে এই হত্যা মামলার সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। অবিলম্বে এই মামলার চার্জশিট সংশোধন করে থমাস হেমব্রম কর্তৃক ৩৩ জনের নাম উল্লেখ করে যে মামলা করা হয়েছে, তার আলোকে চার্জশিট প্রদান করা হোক। তিনি আরো বলেন, ‘যেসব আসামির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে ভিডিও ফুটেজ, ছবি ও চাক্ষুষ সাক্ষ্য রয়েছে। এই চার্জশিটের বিরুদ্ধে আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় যাব।’

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রেসিডিয়াম সদস্য মিহির ঘোষ বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া সাঁওতালদের বসতি থেকে উচ্ছেদকালে সন্ত্রাসীদের হামলা, নির্যাতন, মারধর, অগ্নিসংযোগের ভিডিও ফুটেজ সুস্পষ্টভাবে সব কিছুর প্রমাণ দেয়। সেখানে অগ্নিসংযোগে পুলিশ সদস্যদের অংশ নিতেও দেখা গেছে। সেখানে হত্যাকাণ্ডও ঘটেছে। তার পরও চার্জশিটে তাঁদের নাম নেই। এটি কেন হলো, তা আমাদের বোধগম্য নয়।’

আদিবাসী-বাঙালি সংহতি পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, ‘মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে গাইবান্ধার তৎকালীন চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. শহীদুল্লাহ তদন্ত করে  ২০১৭ সালের ৩০ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেন; যেখানে তিনি বলেন, সাঁওতালদের বাড়িঘরে আগুন লাগানোর জন্য স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি ও সেই সময় দায়িত্বরত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কতিপয় সদস্য দায়ী।’ সিরাজুল ইসলাম বাবু বলেন, এতে পুলিশ সদস্যদের কথা  উঠে আসে। এই প্রতিবেদন অনুযায়ী তদন্ত সাপেক্ষে তাঁদের নাম অভিযোগপত্রে আসা উচিত।

এ ব্যাপারে পিবিআই গাইবান্ধার সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, দুই পুলিশ সদস্য এসআই মাহবুবুর রহমান ও কনস্টেবল সাজ্জাদ হোসেনের নামে অভিযোগ উঠলে তাঁদের সাসপেন্ড করা হয়। পরে একজন অ্যাডিশনাল এসপি বিষয়টি তদন্ত করেন। তাঁর প্রতিবেদন অনুযায়ী দেখা যায়, আগুন লাগার সময় ঘটনাস্থল থেকে ওই দুই অভিযুক্ত প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ছিলেন। আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, পিবিআইয়ের তদন্তকারী কর্মকর্তারা অনেক অনুসন্ধান করে এবং ভিডিও দেখেও অগ্নিসংযোগের সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত  পুলিশ সদস্যদের শনাক্ত করতে পারেননি।

গত রবিবার পিবিআইয়ের সহকারী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকার গোবিন্দগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট পার্থ ভদ্রের  আদালতে চাঞ্চল্যকর এই মামলার চার্জশিট দাখিল করেন। ধারাবাহিকভাবে আড়াই বছর ধরে এই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা হচ্ছেন পিবিআইয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আকতার হোসেন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার হোসেন (বর্তমানে মৃত), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আবদুল হাই সরকার, গোবিন্দগঞ্জ থানার এসআই আব্দুল গফুর ও ইন্সপেক্টর আল মামুন মোহাম্মদ নাজমুল আহম্মেদ।

মন্তব্য