kalerkantho

শুক্রবার । ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬। ৮ রবিউস সানি ১৪৪১     

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে আসার মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা

১৭ নভেম্বর, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৮ মিনিটে



প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীতে আসার মতো তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা

রচনা

বর্ষাকাল

ভূমিকা : বাংলাদেশের ছয়টি ঋতুর মধ্যে বর্ষা দ্বিতীয় ঋতু। সাধারণত আষাঢ় ও শ্রাবণ এই দুই মাস বর্ষাকাল। কিন্তু আমাদের দেশে বর্ষার আগমন অনেক আগেই ঘটে। কোনো কোনো সময় এই বর্ষা জ্যৈষ্ঠ মাসে আরম্ভ হয়ে আশ্বিন মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়।

বর্ষার বৈশিষ্ট্য :

বর্ষার ঝর ঝর সারা দিন ঝরছে

মাঠ-ঘাট থৈ থৈ খাল-বিল ভরছে

গ্রীষ্মের প্রখর উত্তাপে যখন সব প্রাণিকুল অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে, এক ফোঁটা বৃষ্টির জন্য সবাই ছটফট করতে থাকে, তখনই বর্ষা আসে ঝমঝম শব্দে। কখনো আকাশে ভেঙে নামে বৃষ্টির ঢল। খাল-বিল, নদী-নালা ভরে ওঠে। শুরু হয় ব্যাঙের ঘ্যাঁঘর ঘ্যাঁঘর একটানা ডাক। আকাশ সব সময়ই কালো মেঘে ঢাকা থাকে।

বর্ষার প্রাকৃতিক রূপ :

বাদলের ধারা ঝরে ঝর ঝর

আউশের ক্ষেত জলে ভর ভর

কালি মাখা মেঘে ওপারে আঁধার ঘনায়েছে দেখ চাহিরে

ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।

              (আষাঢ় : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

বর্ষার অবিরাম বৃষ্টিতে যেমন নদ-নদী, খাল-বিল ভরে ওঠে, তেমনি ক্ষেত-খামার ভরে ওঠে পানিতে। গ্রামের বাড়িগুলো দ্বীপের মতো মনে হয়। ছোট ছোট ডিঙি নৌকা আর ভেলা বেয়ে গ্রামের মানুষ বড় রাস্তায় আসে। বর্ষার পানিতে মাঠে মাঠে সতেজ হয়ে ওঠে ধান, পাটের চারা। বিলে-ঝিলে হেলেঞ্চা, কলমিলতা আর শাপলার সমারোহ দেখা যায়। বনে বনে ফোটে কদম, কেয়া, গন্ধরাজ প্রভৃতি সুগন্ধি ফুল। বৃষ্টিধোয়া সবুজ গাছপালা ঘেরা গ্রাম হয়ে ওঠে পটে আঁকা ছবির মতো।

বর্ষার উপকারিতা : এ ঋতু বাঙালির জীবনে আনে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা। বাংলার কৃষক এ ঋতুতে বীজ বোনে, চারাগাছ তোলে এবং রোপণ করে। বড় নদী আর হাওর-বাঁওড় থেকে ভেসে আসা ছোট-বড় নানা জাতের মাছ ছড়িয়ে পড়ে বিলে-পুকুরে-ডোবা-নালায়। বর্ষাই বাংলাকে করে শস্যশ্যামল। বাংলার অন্ন-বস্ত্র, তার সমস্ত ঐশ্বর্য বর্ষার দাক্ষিণ্যের ওপর নির্ভরশীল। প্রকৃতিতে দেখা যায় রকমারি ফলের আয়োজন। এ সময় নদীপথে যাতায়াত ও পরিবহন সহজসাধ্য হয়। এ জন্য বর্ষা বাঙালির আদরের ঋতু।

বর্ষার যাতায়াত ও অসুবিধা : বর্ষাকালের সুবিধার সঙ্গে কিছু অসুবিধাও রয়েছে। কখনো কখনো অতি বর্ষণে দেখা দেয় বন্যা। ডুবে যায় ফসলের মাঠ, বাড়িঘর। শহরের রাস্তাঘাট, বস্তি ডুবে যায়। চারদিকে জলাবদ্ধতার কারণে ময়লা ও দূষিত পানিতে নানা ধরনের রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যায়। গ্রামে নদীপথে যাতায়াতে সুবিধা থাকলেও অতি বর্ষণে শহরে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় গরিব মানুষের দুঃখ-কষ্টের অন্ত থাকে না। কবির ভাষায়—           

বর্ষাকালে পল্লীভাসে চতুর্দিকে বারি

বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর দেয় না খেয়া পাড়ি

উপসংহার : কিছু অসুবিধা থাকলেও আমাদের দেশে বর্ষা ঋতুর অবদানই সবচেয়ে বেশি। এ ঋতুর কারণেই আমাদের দেশ শস্যশ্যামলা বর্ষার পলি মাটিতে ফসলের জমির উর্বরা শক্তি বেড়ে যায়। সারা বছরের প্রাণশক্তির জোগান এ ঋতুই দেয়। তাই বর্ষা আমাদের সবার প্রিয় ঋতু।

শীতের সকাল

ভূমিকা :

‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন আমলকীর ওই ডালে ডালে,

পাতাগুলি শিরশিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে’

ষড়ঋতুর বিচিত্র খেলায় পৌষ ও মাঘ মাস নিয়ে শীত আসে। এই শীত আসে কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে উত্তরের হিমেল বাতাসে ভর করে। শীত ঋতুর নির্দিষ্ট দুটি মাস থাকলেও এ দেশে কার্তিক মাস থেকেই শীত পড়তে শুরু করে আর ফাল্গুন মাস পর্যন্ত শীত শীত ভাব থাকে। পত্র-পল্লবহীন গাছপালা কুয়াশায় ঢাকা থাকে। তাই শীতের সকাল অন্য সব ঋতু থেকে আলাদা বৈশিষ্ট্যে ভরা।

শীতের সকাল :

‘হিম হিম শীত শীত/শীত বুড়ি এলো রে,

কনকনে ঠাণ্ডায়/দম বুঝি গেল রে’।

শীতের সকাল থাকে কখনো হালকা, কখনো বা ঘন কুয়াশায় ঢাকা। হু হু করা হিমেল বাতাসের ঝাপটায় এ সময় সবার হাত-পা-কান ঠাণ্ডা হয়ে আসে। পাড়াগাঁয়ের খেটে খাওয়া মানুষ সেই প্রবল শীত উপেক্ষা করেই ক্ষেতে-খামারে কাজে লেগে যায়। শিশু ও বুড়োরা আগুনে শরীর গরম করার জন্য শুকনো পাতা খড়-কুটো জড়ো করে। সূর্য ওঠার আগেই গ্রামে গ্রামে খেজুরগাছ থেকে রসের হাঁড়ি নামিয়ে কনকনে ঠাণ্ডা সেই রস পান করে। তবে শহরে দালানকোঠা, কলকারখানার ঘনত্বের কারণে শীতের তীব্রতা কম থাকে। ঘর থেকে বাইরে বের হওয়ার জন্য শহরের মানুষ শীতে গরম কাপড় পরে নেয়।

শীতের ফলমূল ও শাকসবজি : শীতকালে প্রকৃতিতে রুক্ষতা, শুষ্কতা বিরাজ করলেও এ সময় বাজারে প্রচুর শাকসবজি ও ফলমূল পাওয়া যায়। শাকসবজির মধ্যে রয়েছে—সরিষা, কলাই, পালংশাক, লালশাক ও লাউশাক। ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, শালগম, মুলা, বিট, শিম, বরবটি, টমেটো ইত্যাদি টাটকা সবজি খেতে খুব স্বাদ। এ সময় দেশি ফলমূলও প্রচুর পাওয়া যায়। যেমন—কলা, কমলালেবু, আঙুর, আতা, ডালিম, বরই, জাম্বুরা, লেবু।

শীতের পিঠাপুলি : পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশিতে বিষম খেয়ে

আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।

শীতকাল মানেই পিঠাপুলির ধুম। শুধু গ্রামেই নয়, শহরেও এই পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। রাস্তার পাশে ভোর না হতেই দেখা যায়, মাটির চুলা জ্বালিয়ে ভাপা, চিতই, পাটিসাপটা, পুলি ও তেলের নানা রকম পিঠা তৈরি করতে। নানা রকম মজাদার পিঠা খাওয়ার মধ্য দিয়ে শহরেও শীতকালটা জমে ওঠে।

উপসংহার : শীতকালে গরম কাপড়ের অভাবে গরিব মানুষের কষ্ট হলেও ঝড়-বৃষ্টি হয় না বলে কাজকর্ম ও চলাফেরায় কষ্ট কম হয়। এ ঋতুতে গাছপালা পত্র-পল্লবহীন হলেও এ ঋতুই মানুষকে প্রাণচঞ্চল ও আনন্দমুখর করে তোলে। শীতের সময়ই শহর ও গ্রামে নানা মেলা, পার্বণ মিশিয়ে সারা দেশটা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। তাই কষ্ট হলেও এ ঋতু ধনী-গরিব সবার জন্যই উপভোগ্য।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ

ভূমিকা :                                               একাত্তরের মধ্যে আছে স্বপ্ন, সাহস, যুদ্ধ

গর্ব, অহং, শক্তি, আবেগ প্রাণের তাপে শুদ্ধ।

     (অগ্নিঝরা একাত্তর : হাসান হাফিজ)

১৯৭১ সালে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে। এর জন্য ৩০ লাখ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এই ইতিহাস বেদনার হলেও গৌরবের মহিমায় ভাস্বর।

মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি :                            বাংলার মাটি বড় শক্ত

সোজা নয় শহীদের রক্ত

স্বাধীনতা চাই পথ চলবার

মুখ ফুটে হক কথা বলবার।

                     (ছড়া : সুকুমার রায়)

 

১৯৪৭ সালে ভারত উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটে, ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তানের একটি অংশ পূর্ব পাকিস্তানের মাতৃভাষা বাংলা আর পশ্চিম পাকিস্তানের ভাষা হলো উর্দু। কিন্তু স্বাধীনতার পরপরই ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের গভর্নর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে ঘোষণা দিলে পূর্ব বাংলার মানুষ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ‘রাষ্ট্র ভাষা বাংলা চাই’ এই আন্দোলন ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষাশহীদদের আত্মদানের মাধ্যমে বাংলা রাষ্ট্র ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু তার পরও পাকিস্তানিদের দুঃশাসন, বৈষম্য কমেনি। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরের নামে টালবাহানা শুরু করে। তারই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গুবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম’ বলে জাতিকে মুক্তির সংগ্রামে আহ্বান জানান। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।

মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ :                       যুদ্ধ আর মুক্তিযুদ্ধ

দিকে দিকে মুক্তিসেনা

মাটি ছুঁয়ে নেয় যে শপথ

জন্মভূমির মান দেবে না।

   (সূর্যোদয়ে স্বাধীনতা : শামসুর রাহমান)

১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতেই বর্বর পাকিস্তানি বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাস, ইপিআর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনসহ নানা আবাসিক এলাকায় তারা আক্রমণ চালিয়ে নির্বিচারে হত্যা করে ঘুমন্ত মানুষকে। অসহায় বাঙালিদের অনেকেই আশ্রয় গ্রহণ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতে। সেখানে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ প্রশিক্ষণ। এ দেশের ছাত্র-জনতা, সামরিক-বেসামরিক মানুষের সমন্বয়ে মুক্তিবাহিনী গঠন করা হয়। মুক্তিবাহিনী গেরিলা যুদ্ধের রীতি অবলম্বন করে পাকিস্তানি বাহিনীকে বিপর্যস্ত করে। অবশ্য আমাদের দেশের স্বাধীনতাবিরোধী একটা গোষ্ঠী পাকিস্তানিদের সহায়তা করে। তারা ছিল—রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী নামে পরিচিত। দীর্ঘ ৯ মাস ধরে পাকিস্তানিদের হত্যাকাণ্ডের পর অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনী নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে। কবির ভাষায়—

হানাদারের সঙ্গে জোরে/লড়ে মুক্তিসেনা

তাদের কথা দেশের মানুষ/কখনো ভুলবে না।

      (রৌদ্র লেখে জয় : শামসুর রাহমান)

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা : লাখ লাখ নারী-পুরুষ শিশুর রক্তে ভেজা আমাদের স্বাধীনতা। মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদানের বিনিময়ে আমরা আজ মুক্ত স্বাধীন দেশে উন্নত জীবনযাপন করতে পারছি। এই যুদ্ধই বাঙালিকে ‘বীর জাতি’ হিসেবে বিশ্বে প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। তাই বাঙালির জাতীয় জীবনে গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম।

উপসংহার : মুক্তিযুদ্ধ আমাদের গর্বের স্বাক্ষর। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা আমরা পেয়েছি তা রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সবার।

তাড়িয়ে আঁধার, কষ্ট-ব্যথা, দুঃখ করে শেষ,

বিজয় সুখে হাসছে এখন আমার বাংলাদেশ।

   (মায়ের হাসি স্বাধীনতা : রাশেদ রউফ)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা