অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে দেশের অর্থনীতি রীতিমতো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এ সময়ে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো গণহারে চাঁদাবাজি ও হামলার শিকার হতে থাকে। জ্বালাও-পোড়াও, মব সন্ত্রাস বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করে। সেই সঙ্গে চলতে থাকে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাদের নানাভাবে হয়রানি করা। মামলা, অ্যাকাউন্ট জব্দ, বিদেশযাত্রায় বাধাসহ নানা কারণে উদ্যোক্তারা হতাশ হয়ে পড়েন। অন্যদিকে ঋণের উচ্চ সুদের হার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, ডলার সংকট, আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়াসহ নানা কারণে ধুঁকতে থাকে ব্যবসা-বাণিজ্য। বৈশ্বিক পরিস্থিতিও নেতিবাচক চাপ সৃষ্টি করে। ফলে বিনিয়োগে স্থবিরতা নেমে আসে। ব্যবসা-বাণিজ্যে রীতিমতো ধস নামে। বহু কারখানা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। আর ব্যবসা-বাণিজ্যের এমন দুরবস্থার কারণে অনেক ঋণগ্রহীতাই ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন। ফলে দ্রুত বাড়তে থাকে খেলাপি ঋণ।
ব্যাংকারদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে ব্যাংক খাতে অনিয়ম, জালিয়াতি, প্রতারণা ও দুর্নীতির উচ্চমাত্রার প্রভাবে খেলাপি ঋণ অনেক বৃদ্ধি পায়। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। তারা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ২০২৪ সালের জুনে খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়ায় দুই লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। আর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে খেলাপি ঋণের উল্লম্ফন ঘটে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, গত ডিসেম্বর মাস শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল পাঁচ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা ছাড়ে ২০২৬ সালের মধ্য ফেব্রুয়ারিতে। আর মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ বাড়ে আরো ৩১ হাজার ৪৮৭ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দীর্ঘদিন থেকে নানা ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে উচ্চ সুদের হার, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধ এবং আমাদের দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্যতম। এত দিন কোনো নির্বাচিত সরকার ছিল না। তাই বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি তলানিতে নেমেছে। অন্তর্বর্তী সরকার কোনো বিনিয়োগ পরিবেশ তৈরি করতে পারেনি। তাই আমরা ব্যবসাও করতে পারিনি। বেসরকারি খাতকে সহায়তা না করে সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যের আরো ক্ষতি করেছে। তারা ছিল একটি ব্যবসাবিরোধী সরকার। শুধু বাণিজ্য খাত নয়, ওই সরকার ব্যাংকগুলোকে দুর্বল ঘোষণা করার মাধ্যমে পঙ্গু করে দিয়ে গেছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘এখন নির্বাচিত সরকার এসেছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে বিনিয়োগ ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমরা আশাবাদী।’
অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির কঠোর কড়াকড়িতে বলতে গেলে ঋণই পাচ্ছেন না বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা-ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত থেকে বেসরকারি খাতের ঋণের এমন দুর্ভাগ্যজনক চিত্রই পাওয়া গেছে। গত মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৭২ শতাংশে এসে ঠেকেছে। এটি গত দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক দুই দশকের বেশি তথ্য সংরক্ষণ করে না। তাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বাস্তবে এটিই বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম ঋণপ্রবাহ।
আমরা মনে করি, দ্রুততম সময়ে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। উদ্যোক্তা-বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। আমরা আশা করি, নির্বাচিত সরকার সেই লক্ষ্যে দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।


