• ই-পেপার

ফার্মগেটে প্রতিরোধের প্রথম ব্যারিকেড

  • আসাদুজ্জামান খান এমপি

লাতিন ফুটবল পুরাণের খোঁজে

ড. আলা উদ্দিন

লাতিন ফুটবল পুরাণের খোঁজে

ফুটবল বিশ্বকাপের সময় এলেই বাংলাদেশ এক অদ্ভুত রূপ ধারণ করে। এই রূপান্তরের কোনো অর্থনৈতিক বা যৌক্তিক সমীকরণ নেই। ভৌগোলিক মানচিত্রে যে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের অবস্থান এ দেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে, যাদের ভাষা আমাদের চেনা নয়, যাদের কৃষ্টি-কালচারের সঙ্গে আমাদের রোজকার জীবনের বিন্দুমাত্র সংযোগ নেইতাদের জয়-পরাজয়ে এ দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃত্স্পন্দন থমকে যায়। বাংলাদেশ ফুটবল দল ফিফা র‌্যাংকিংয়ে অনেক পিছিয়ে, কখনো বিশ্বকাপ খেলার সুযোগ পায়নি। অথচ বিশ্বকাপের এক মাস এ দেশে যে উন্মাদনা তৈরি হয়, তা দেখলে কোনো বিদেশির পক্ষে আন্দাজ করাই অসম্ভব যে এই টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের কোনো দলই নেই। বিশ্বের আর কোথাও কোনো ভিনদেশি দলকে নিয়ে এমন সর্বগ্রাসী আবেগ, এমন নিঃশর্ত উন্মাদনা আর পাড়া-মহল্লায় তর্কের ঝড় ওঠার নজির মেলা ভার। এই যে নিজের দেশকে ছাপিয়ে অন্য দেশের পতাকাকে বুকে টেনে নেওয়া, টাকা খরচ করে ছাদে বিশালাকার পতাকা ওড়ানো কিংবা দল হেরে গেলে ভাত না খেয়ে ঘরে বসে থাকাএ কি শুধুই বিনোদন, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে আমাদের বাঙালি সমাজের গভীর কোনো মনস্তাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সত্য?

এই বিস্ময়কর ফুটবল সংস্কৃতির শিকড় খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে সময়ের এক ধারাবাহিক বিবর্তনে, যেখানে বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসের সঙ্গে দল পছন্দের এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল যখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, তখন বাকি দলগুলোর আগেই তারা বাংলাদেশে এক ধরনের প্রাথমিক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। তবে সে সময় মানুষের ঘরে ঘরে টিভির সংখ্যা ছিল ভীষণ কম। এর ওপর সত্তরের দশকের শুরুতে ভয়াবহ বন্যা আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে এই ভালো লাগাটা সবার মাঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছড়িয়ে পড়ার বা প্রাতিষ্ঠানিক জনপ্রিয়তা পাওয়ার সুযোগ পায়নি। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ দুর্ভিক্ষ, রাজনৈতিক সহিংসতা ইত্যাদি কারণে বাংলাদেশে খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। সেবার অবশ্য বিজয়ী হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি। এরপর ১৯৭৮ সালে যখন আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলো, তখন সাদা-কালো টিভির হাত ধরে তারা এ দেশের মানুষের নজরে আসে, তখনো বাংলাদেশে টেলিভিশনের সংখ্যা ছিল সীমিত। ফলে উন্মাদনাটা নির্দিষ্ট কিছু গণ্ডির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।

লাতিন ফুটবল পুরাণের খোঁজেআসল বিস্ফোরণটা ঘটল আশির দশকে, যা বাংলাদেশের সমাজ ও প্রযুক্তির ইতিহাসে এক বড় সন্ধিক্ষণ। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের সময় রঙিন টিভির আগমন ফুটবলকে এ দেশে এক অভূতপূর্ব তুঙ্গে নিয়ে যায়। মেক্সিকো বিশ্বকাপ যখন এ দেশের ড্রয়িংরুমে রঙিন পর্দায় হাজির হলো, ঠিক তখনই বাঙালি তার ফুটবল ঈশ্বরকে খুঁজে পেলতিনি ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। সেবার আর্জেন্টিনার এই বিশ্বজয় ব্রাজিলের পাশাপাশি আর্জেন্টিনাকেও এ দেশের মানুষের হৃদয়ে সমান জনপ্রিয় দলে পরিণত করে। ম্যারাডোনা ও আর্জেন্টিনার এই নতুন উন্মাদনা আগে থেকে সুপ্ত থাকা ব্রাজিল ও পেলে প্রীতিকে এক চিরন্তন প্রতিপক্ষ হিসেবে জাগিয়ে তোলে এবং ফুটবল-ভাবনা সমাজে প্রায় সমভাগে বিস্তৃত হয়ে পড়ে।

এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়, ব্রাজিলের পাসিং নৈপুণ্য আর খেলার শৈল্পিক ধরন তো ছিলই, পাশাপাশি আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে ফুটবলের জাদুকর কালো মানিক পেলের ওপর লেখা প্রবন্ধটি শিশুদের মনে শৈশব থেকেই লাতিন ফুটবলের প্রতি এক গভীর মোহ তৈরি করে দিয়েছিল। ফলে ১৯৮৬ সালের পর থেকে এ দেশের সমাজ অবচেতনেই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েএকদল ব্রাজিলের নান্দনিক ফুটবলের ভক্ত, অন্য দল ম্যারাডোনার অতিমানবীয় জাদুর অনুসারী। এই যে শৈশবের ভালো লাগা আর স্মৃতির মেলবন্ধন, তা-ই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বাহিত হয়ে আজকের এই মহীরুহে পরিণত হয়েছে।

তবে এই আবেগের গভীরতা শুধু খেলার মাঠের নান্দনিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর পেছনে রয়েছে এক অবদমিত রাজনৈতিক ও সামাজিক মনস্তত্ত্ব। বাঙালি জাতি হিসেবে দীর্ঘকাল উপনিবেশবাদের শৃঙ্খলে বন্দি ছিল। শোষণ, বঞ্চনা আর অধিকার আদায়ের লড়াই আমাদের ইতিহাসের অংশ। ফলে অবচেতনেই মানুষ শোষিতের পক্ষে দাঁড়াতে ভালোবাসে। আশির দশকে যখন লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর ফুটবল এ দেশে জনপ্রিয় হচ্ছে, তখন বাঙালি আসলে ইউরোপের পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে লাতিন আমেরিকার ফুটবলারদের নান্দনিক লড়াইয়ের মাঝে নিজেদেরই এক ধরনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পেয়েছিল।

ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যারাডোনার সেই একক লড়াই কিংবা ফকল্যান্ড যুদ্ধের ক্ষত বুকে নিয়ে আর্জেন্টিনার ফুটবলীয় প্রতিশোধবাঙালির কাছে তা শুধু খেলা ছিল না, তা ছিল শোষকের বিরুদ্ধে শোষিতের এক পরম বিজয়। বাংলাদেশের মানুষ ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তির চেয়ে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর সঙ্গে একাত্মতা বোধ করে বেশি। কারণ উভয়ের ইতিহাস ও যন্ত্রণার গল্পটা একই সুতায় গাঁথা। ম্যারাডোনা বা পেলের সেই খাটো গড়ন, দারিদ্র্য জয় করে বিশ্বজয়ের গল্প আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। তাই লাতিন আমেরিকার শৈল্পিক ছন্দোময় নান্দনিক ফুটবল পরাশক্তিগুলো বাংলাদেশের কাছে এক অদৃশ্য যুদ্ধজয়ের প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশ সমাজের আরেকটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য হলো সামাজিক গোত্রবাদ বা এক ধরনের যৌথ আবেগ। আমাদের সমাজে মানুষ একা বাঁচতে চায় না, সে সব সময় কোনো না কোনো দলের অংশ হতে চায়। রাজনীতি হোক বা পাড়ার ক্লাববাঙালি নিজের একটি দলগত পরিচয় খুঁজতে ভালোবাসে। ফুটবল বিশ্বকাপ আমাদের এই দলগত পরিচয় প্রকাশের সবচেয়ে বড় মঞ্চ এনে দেয়। যখন একজন মানুষ তার বাড়ির ছাদে ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকা উড়ায়, তখন সে আসলে সমাজকে বার্তা দেয় যে সে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর অংশ। এই পতাকা উড়ানো বা জার্সি পরা শুধু একটি দলকে সমর্থন করা নয়, এটি হচ্ছে নিজের অস্তিত্ব ও আবেগকে দৃশ্যমান করার এক আকুল প্রয়াস। এক অদ্ভুত সুন্দর কৌতুকও এ সমাজে দেখা যায়; কখনো কখনো সাধারণ মানুষ চট করে এমন সব দেশের পতাকা কিনে বসে, যেমনহন্ডুরাস বা আইসল্যান্ড, যাদের নামও হয়তো তারা আগে শোনেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে এই অদ্ভুত সমর্থন কখনো কখনো এত দূর গড়ায় যে সেই সুদূর হন্ডুরাসের মানুষও অভিভূত হয়ে বাংলাদেশের ক্রিকেট দলকে সমর্থন করা শুরু করে। এই যে সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের এক অদ্ভুত আত্মিক যোগাযোগ, তা শুধু বাঙালির এই অকৃত্রিম ও শর্তহীন আবেগের কারণেই সম্ভব।

অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন, এই উন্মাদনা কি তবে শুধুই এক ধরনের পলায়নপর মানসিকতা? আমাদের দেশের নিজস্ব ফুটবলের যখন এই জরাজীর্ণ দশা, তখন অন্য দেশের জন্য এই প্রাণ বিসর্জন দেওয়া কি এক ধরনের হীনম্মন্যতা নয়? কিন্তু গভীর সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, এটি হীনম্মন্যতা নয়, বরং এটি হলো বিনোদনের চরম সংকটগ্রস্ত একটি সমাজে আনন্দের এক পাক্ষিক উৎসব। সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে যখন বিনোদনের সুযোগ সীমিত, অর্থনৈতিক টানাপোড়েন আর নাগরিক জীবনের ব্যস্ততা যখন মানুষকে ক্লান্ত করে তোলে, তখন বিশ্বকাপ ফুটবল আসে এক পশলা মেঘের মতো। এই এক মাস মানুষ তার সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে একটি সম্পূর্ণ অচেনা দেশের জয়ে আনন্দে মেতে উঠতে পারে, আবার পরাজয়ে কাঁদতে পারে। এই কান্না বা হাসি মানুষকে তার বাস্তব জীবনের জাঁতাকল থেকে সাময়িক মুক্তি দেয়। এটি এক ধরনের সামষ্টিক থেরাপি, যা পুরো সমাজকে একসঙ্গে হাসায় এবং কাঁদায়। তবে এই ভিনদেশি দলের প্রতি অন্ধ ভালোবাসা কিন্তু নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসাকে বিন্দুমাত্র খাটো করে না। এ দেশের সাধারণ মানুষকে যদি প্রশ্ন করা হয়যদি কখনো বাংলাদেশ ফুটবল দল বিশ্বকাপে খেলে এবং প্রতিপক্ষ যদি হয় আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিল, তবে তারা কাকে সমর্থন করবে? উত্তর আসে দ্বিধাহীন চিত্তেবাংলাদেশ। আমাদের ক্রিকেট দল যখন বিশ্বমঞ্চে লড়ে, তখন এই পুরো দেশ এক রঙে, অর্থাৎ লাল-সবুজে একাকার হয়ে যায়। সেখানে কোনো ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার অস্তিত্ব থাকে না। সুতরাং এই বিশ্বকাপ ফুটবলকে কেন্দ্র করে যে উন্মাদনা, তা দেশপ্রেমের অভাব নয়, বরং তা হলো খেলাধুলার প্রতি বাঙালির এক চিরন্তন, আদিম এবং নিঃশর্ত ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

যেদিন বাংলাদেশ সত্যি ফুটবল বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করবে, সেদিন হয়তো পাড়া-মহল্লায় এই ভিনদেশি পতাকাগুলোর মেলা আর দেখা যাবে না। সেদিন দেশজুড়ে উড়বে শুধু একটিই পতাকাআমাদের লাল-সবুজ। কিন্তু যত দিন না সেই স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে, তত দিন বাঙালি এই লাতিন আমেরিকার বা ফ্রান্স, জার্মানি বা অন্য কোনো দেশের ফুটবল জাদুকরদের পায়েই সঁপে দেবে তার সব আবেগ, আর প্রতি চার বছর পর বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়ে প্রমাণ করবেফুটবল আসলেই কোনো সীমানা মানে না, আর তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো এই বাংলাদেশ।

লেখক : নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও একটি জাতির অঙ্গীকার

মেজর জেনারেল এইচ আর এম রোকন উদ্দিন (অব.)

জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও একটি জাতির অঙ্গীকার

অনেক সমস্যার আবর্তে জুলাই বিপ্লবের দুই বছর হয়ে গেল। জুলাই বিপ্লবের সাফল্য একটি জাতির অদম্য চেতনা ও সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির মহাকাব্যিক দলিল। এটি কোনো একক রাজনৈতিক দল, অভিজাত শ্রেণি বা মতাদর্শিক গোষ্ঠীর কৃতিত্ব ছিল না, বরং এটি ছিল একটি স্বতঃস্ফূর্ত ও প্রকৃত জাতীয় জাগরণআঘাত, ক্ষোভ, আশা ও সংকল্পের একত্র বিস্ফোরণ, যা সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে একত্র করেছিল। এই বিপ্লব জন্ম নিয়েছিল বছরের পর বছর ধরে চলা নিপীড়ন, অবিচার ও রাজনৈতিক দমনের গভীর ক্ষত থেকে। এটি ছিল এমন একটি জাতির সম্মিলিত চিৎকার, যাদের দীর্ঘদিন নীরব করে রাখা হয়েছিল, কিন্তু এককণ্ঠে বলে উঠেছিলআর না! এই গণজাগরণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ছাত্রসমাজজাতির বিবেক ও অগ্রভাগের যোদ্ধারা। তারা ভয় না পেয়ে রাজপথে নেমেছিল, কঠোর দমননীতির মুখেও পিছু হটেনি। তাদের সাহস অনুপ্রাণিত করেছিল দেশের তরুণ প্রজন্মকে। তাদের স্লোগান ছড়িয়ে পড়েছিল শহর থেকে শহরে, ক্যাম্পাস থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং জাগিয়ে তুলেছিল অনেক ক্লান্ত, হতাশ হৃদয়কে। তাদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, পেশাজীবী এবং শিশু কোলে মায়েরা, যাঁরা সবাই একটি লক্ষ্যেই ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেনস্বৈরশাসন থেকে মুক্তি ও গণতান্ত্রিক মর্যাদার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তাঁরা সম্মিলিতভাবে ভেঙে দিয়েছিলেন সেই ভয়ের দুর্গ, যার ওপর দীর্ঘদিন ধরে দাঁড়িয়ে ছিল আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা।

জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও একটি জাতির অঙ্গীকারএই ঐতিহাসিক ও রূপান্তরকামী অর্জনের কৃতিত্ব কোনো একক নেতা বা সংগঠনের নয়, বরং প্রত্যেক নাগরিকের, যারা মিছিল করেছে, প্রতিবাদ করেছে, প্রার্থনা করেছে, কর্মীদের আশ্রয় দিয়েছে, সত্য ছড়িয়েছে কিংবা শুধু ভয়কে না বলে দাঁড়িয়ে থেকেছে। এটি ছিল আত্মিক ও নৈতিক এক বিপ্লবনিরস্ত্র, কিন্তু দৃঢ়। এটি কোনো বিদেশি সহায়তায় নয়, বরং দেশের মানুষের অভ্যন্তরীণ ন্যায়ের প্রতি তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও স্বাধীনতার তৃষ্ণা থেকেই জন্ম নিয়েছিল। আর তাই যখন বিপ্লবের পতাকা উড়ল এবং ভয়ভীতির প্রাচীর ভাঙতে শুরু করল, তখন জনগণ একটি জাতীয় শপথ নিলআর কখনো বিভাজন ও দাসত্বের শৃঙ্খলে ফিরে যাবে না। তারা অঙ্গীকার করল যে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকবে এবং গড়বে একটি নতুন বাংলাদেশ। একটি দেশ, যেখানে থাকবে না দুর্নীতি বা দমননীতি; থাকবে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, মানবিকতা ও আইনের শাসন।

কিন্তু ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয়, একটি শাসন পতনের পরেই মূল সংগ্রাম শুরু হয়। সামনে যে পথ, তা কণ্টকাকীর্ণচোখে দেখা যায় এমন শত্রুর চেয়ে গোপন ষড়যন্ত্র আরো বিপজ্জনক। সেই পুরনো শক্তিরাই এখন ছদ্মবেশে, কখনো আমলাতন্ত্রে, কখনো বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার প্রভাবক, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ সুবিধাভোগী রূপে বিপ্লবের চেতনা হাইজ্যাক করার চক্রান্তে লিপ্ত। বিপ্লব শুধু প্রতীকী বিজয়ে থেমে থাকলে চলবে না। এই আগুনকে এখন জ্বালাতে হবে নীতিতে, সংস্কারে, আর অদম্য সতর্কতায়। এটি আত্মতৃপ্ত হওয়ার সময় নয়, এটি স্পষ্টতা, অঙ্গীকার এবং টানা লড়াইয়ের সময়। ঐক্যের যে শপথ জনগণ নিয়েছিল, সেটি যেন শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ না থাকে। তা প্রতিফলিত হোক প্রতিটি কাজে, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে, প্রতিটি পরিবারে। যে স্বপ্নে লাখো মানুষ জেগে উঠেছিল, সেই স্বপ্নকেই এখন বাস্তব নির্মাণে রূপ দিতে হবেচিন্তায়, কাঠামোতে ও জাতীয় চরিত্রে। জুলাই বিপ্লব তার পূর্ণতা পাবে তখনই, যখন সেই নতুন বাংলাদেশ বাস্তবিক অর্থে গড়ে উঠবে। এখন, যখন বিপ্লবের ধুলা একটু একটু করে বসে যাচ্ছে, ঠিক তখনই একটি ভয়ংকর নতুন যুদ্ধের মঞ্চ প্রস্তুত হচ্ছেএটি আর উন্মুক্ত দমন নয়, এটি আর রক্তাক্ত বিদ্রোহ নয়; এটি হচ্ছে তথ্যযুদ্ধ, মানসিক ধোঁয়াশা এবং কৌশলগত ষড়যন্ত্র। এই যুদ্ধ চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়, বিদেশি সংবাদপত্রে, কূটনৈতিক চ্যানেলে এবং এমনকি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর মধ্যেও। এখানেই এখন বাংলাদেশের আত্মার জন্য চলছে এক নতুন যুদ্ধ।

বর্তমানে এটি ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে পতিত স্বৈরাচারের প্রতি অনুগত গোষ্ঠীগুলো এবং সীমান্তপারের প্রভাবশালী শক্তিগুলো একত্রে কাজ করছে নতুন করে গড়ে ওঠা জাতীয় ঐক্যকে ধ্বংস করতে এবং জনগণের বিপ্লবকে ব্যর্থ করতে। এই অভ্যন্তরীণ সুযোগসন্ধানী ও বিদেশি ষড়যন্ত্রীদের জোট এখন একটি ভয়ংকর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেট্যাংক বা পুলিশি দমন-পীড়নের মাধ্যমে নয়, বরং প্রচারণা, গুজব, ছলনামূলক কূটনীতি এবং মানসিক যুদ্ধের মাধ্যমে। তাদের লক্ষ্য অত্যন্ত সরল, কিন্তু মারাত্মকবিপ্লবের চেতনাকে ভেতর থেকে দুর্বল করে দেওয়া, জনগণের মধ্যে আবার বিভাজন সৃষ্টি করা এবং নতুন বাংলাদেশের অঙ্কুরোদগম হওয়ার আগেই তাকে ধ্বংস করে দেওয়া।

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যেগুলো জনগণের সেবায় নিয়োজিত থাকার কথা, সেগুলো আজও আগের সরকারের অনুগতদের দ্বারা দখলীকৃতযাঁদের নিয়োগ হয়েছিল দক্ষতার জন্য নয়, বরং অন্ধ আনুগত্যের বিনিময়ে। এই অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী আজও নীরব, নিষ্ক্রিয় কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাদানকারী হয়ে আছেযখন দেশটির সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ঐক্য, দক্ষতা ও সংস্কারের। তাদের এই নিষ্ক্রিয়তা নিরপেক্ষ নয়, এটি ধীর বিষক্রিয়ার মতো বিশ্বাসঘাতকতা।

কিন্তু এর চেয়েও বেশি মারাত্মক হলো ভুয়া ও ষড়যন্ত্রমূলক বয়ান তৈরির আন্তর্জাতিক প্রচারণা। একটি সুস্পষ্ট প্যাটার্ন লক্ষ করা যাচ্ছেপুনরাবৃত্তি ও কৃত্রিমভাবে তৈরি কিছু বিষয়ের জোরালো প্রচার চালানো হচ্ছে, ইসলামিক মৌলবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে’—এই ভীতিজনক বয়ানটি পশ্চিমা বিশ্বের নিরাপত্তা মনস্তত্ত্বকে খোঁচাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাকিস্তানের আইএসআই সক্রিয়এই ধরনের অভিযোগে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ নেই, তবু আঞ্চলিক নিরাপত্তার অজুহাতে বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ তৈরি করা হচ্ছে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগ, যেগুলো উদ্দেশ্যমূলকভাবে অতিরঞ্জিত বা সম্পূর্ণ মনগড়া, যাতে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিদেশি কূটনীতিকদের হস্তক্ষেপ আহবান করা যায়। এই গল্পগুলো সত্য বা সহানুভূতির জায়গা থেকে তৈরি নয়, বরং এগুলো কৌশলগতভাবে তৈরি করা মিথ্যা, যার উদ্দেশ্য হলো সন্দেহ সৃষ্টি, জনগণকে বিভক্ত করা, বিপ্লবকে অবৈধ প্রমাণ করা এবং সহানুভূতির ছায়ায় বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ প্রশস্ত করা। যারা এই বয়ানগুলোর কারিগর, তারা জানে দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ওপর কিভাবে আন্তর্জাতিক প্রচারণাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। তারা ভাবছে বাংলাদেশকেও আগের মতো ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু তারা ভুলে গেছেএটি আর সেই পুরনো বাংলাদেশ নয়।

আজকের জনগণ অনেক বেশি সচেতন। তারা দেখতে পেয়েছে, কিভাবে আগের সরকার ছিল বিদেশি স্বার্থের প্রতিনিধি। তারা বুঝে গেছেপ্রকৃত হুমকি শুধু বাইরের কোনো শক্তির নয়, বরং তাদের মধ্যেই রয়েছে, যারা রাজনৈতিক সুবিধা বা বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতার জন্য নিজেদের বিবেক বিক্রি করে দেয়। এই বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি একটি কৌশলগত জাগরণও বটে। এখনকার দেশপ্রেমিকরা জানেমুক্তি কোনো এক দিনের ঘটনা নয়, এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা প্রতিদিন রক্ষা করতে হয় মিথ্যা, ষড়যন্ত্র এবং বিশ্বাসঘাতকদের হাত থেকে। এই সময় আমাদের দরকার শুধু আবেগতাড়িত ঐক্য নয়, কৌশলগত স্পষ্টতা, তথ্যসচেতনতা, প্রাতিষ্ঠানিক সতর্কতা ও সত্যের প্রতি আপসহীন দায়বদ্ধতা। কোনো গুজব যেন প্রশ্নহীন না থাকে, কোনো চক্রান্ত যেন অবহেলায় পার পেয়ে না যায়। এই দেশের শত্রুতারা হোক বিদেশি দূতাবাসে কিংবা স্থানীয় বোর্ডরুমে; তাদের সাহসিকতা, প্রমাণ এবং জাতীয় সংকল্পের মাধ্যমে মোকাবেলা করতেই হবে। বাংলাদেশ রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে তার বিপ্লব অর্জন করেছে। এখন সময় এসেছে সেই বিপ্লবকে শৃঙ্খলা, প্রজ্ঞা ও অবিচল ঐক্যের মাধ্যমে রক্ষা করার। যাত্রা শুধু স্বৈরাচার অপসারণে শেষ নয়, এর পরিণতি হতে হবে একটি সার্বভৌম, সত্যনিষ্ঠ ও জনগণনির্ভর প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা।

এই সংকটময় সময়ে সত্যিকারের দেশপ্রেমিকদের থাকতে হবে সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ। সংগ্রাম এখন শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি অস্তিত্বের প্রশ্ন। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে ভেতরের বিশ্বাসঘাতকদের ও বাইরের হুমকির প্রতি। যারা দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কাজ করে, তাদের পরিচয়, পদ বা পতাকা যা-ই হোক না কেন, তাদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনতেই হবে। এটি কোনো দলের দায়িত্ব নয়, এটি জাতীয় দায়িত্বরাজনীতির ঊর্ধ্বে, পক্ষপাতিত্বের বাইরের একটি কর্তব্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিহিত রয়েছে ঐক্য, সততা ও সংস্কারের মধ্যে। রাজনৈতিক দলগুলোকে এখন দায়িত্ব নিতে হবেক্ষমতা দখলের জন্য নয়, বরং নিজেদের শুদ্ধ করতে, দুর্নীতি দূর করে নিঃস্বার্থভাবে দেশের সেবা করতে। বিভেদের রাজনীতি, তোষণের সংস্কৃতি এবং বিদেশি স্বার্থে আপসের ঐতিহ্যএসব এখনই বন্ধ করতে হবে। তাহলেই আমরা এগিয়ে যেতে পারব এক নতুন যুগেন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও প্রকৃত জনগণের শাসনের যুগে। আমরা এই পর্যন্ত এসেছি শুধু টিকে থাকার জন্য নয়, পরিবর্তনের জন্য। এখন আর পিছিয়ে যাওয়ার সময় নয়।

আসুন, একসঙ্গে গড়ি এমন এক বাংলাদেশযে দেশ গর্বের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকবে, যেখানে থাকবে না কোনো স্বৈরাচার, থাকবে না কোনো বিদেশি প্রভাব, থাকবে শুধু এ দেশের মানুষের স্বপ্ন ও আদর্শের প্রতিফলন।

লেখক : সাবেক সামরিক কূটনীতিক, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক

উচ্চশিক্ষায় ওবিইর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রয়াস এবং বাস্তবতা

মাছুম বিল্লাহ

উচ্চশিক্ষায় ওবিইর মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি তৈরির প্রয়াস এবং বাস্তবতা

আউটকাম বেইসড এডুকেশন (ওবিই) এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে পাঠ্যবিষয়ের তুলনায় বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় নির্দিষ্ট কোর্স শেষে শিক্ষার্থীরা কী ধরনের যোগ্যতা অর্জন করবে এবং সেই দক্ষতার মূল্যায়ন কিভাবে হবেসেদিকে। এর মাধ্যমে বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিক গুণাবলি, প্রায়োগিক দক্ষতা, যোগাযোগ সক্ষমতা এবং সমস্যা সমাধানের দক্ষতা অর্জনের ওপর জোর দেওয়া হয়। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২০ সালে ওবিই কারিকুলাম চালুর সুপারিশ করে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৩টি অনুষদের অধীনে ৮৪টি বিভাগ এবং ১৩টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। এর মধ্যে কলা ও চারুকলা অনুষদের বেশির ভাগ বিভাগে ওবিই চালু করা হয়েছে বলে পত্রিকা মারফত খবর দেখলাম। তবে বিজ্ঞান ও আইন অনুষদের কোনো বিভাগেই এখনো এই কারিকুলাম চালু হয়নি। ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের মাত্র দুটি বিভাগে ওবিই কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষকসংকট, প্রশিক্ষণের অভাব এবং বড় আকারের শ্রেণিকক্ষের কারণে এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা রয়েছে।

এখানে যেটি হওয়া উচিত ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাও তাই যে বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মনোযোগী করা, তাদের পাঠ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যেও কিভাবে আনন্দময় করা যায়, উচ্চশিক্ষা কিভাবে মানবিক ও সামাজিক করা যায় সেদিকে। যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারীরা শুধু জ্ঞানের ভাণ্ডার হয়ে বসে না থেকে বরং সমাজের চাহিদা অনুযায়ী নিজেরা কাজ করবেন এবং অন্যদেরও করাতে পারবেন। এসব বিষয়ের গবেষণার ফল সবার মাঝে ছড়িয়ে দেবেন। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য লেভেলের শিক্ষকদের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও  প্রশিক্ষণ নিতে হচ্ছে কিভাবে তাঁদের শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে ও নির্দিষ্ট বিষয়ে পাঠ দেওয়ার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারে। এগুলো তাঁদের তৈরি করার কথা ছিল সব পর্যায়ের শিক্ষকদের জন্য। তাঁদের গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ তথ্য অন্যান্য শিক্ষকের মাঝে বিতরণ করার কথা ছিল। কিন্তু হয়েছে উল্টো! অন্যের তৈরি করা শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কিভাবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর মাধ্যমে অর্জন করানো যায়, সেটি নিয়ে চলছে প্রশিক্ষণ।

এর বেশ কিছু কারণও আছে। যেমনবিশ্ববিদ্যালয়জীবনে দেখেছি, যাঁরা শিক্ষক (ব্যতিক্রম আছে), তাঁরা শুধু নিজের বিষয়ে নোট মুখস্থ করে, নির্দিষ্ট কিছু পাঠের ওপর জোর দিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছেন। কিন্তু সমাজ, রাজনীতি, মানবিকতা, সামাজিকতা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি, দেশের পরিস্থিতিএসব বিষয়ে তাঁরা ছিলেন বেখেয়ালি। তাঁরা পড়ে পড়ে  প্রথম বিভাগ অর্জন করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন এবং তাঁরাও প্রায় এ রকমই কিছু শিক্ষার্থী তৈরি করছেন। অন্যদিকে যাঁরা চারদিকের জ্ঞান রাখেন, প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার পাশাপাশি রাজনীতি, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড, খেলাধুলাসহ বিভিন্ন ধরনের সামাজিক কাজ করেন, তাঁরা সিভিল সার্ভিসে যোগ দিচ্ছেন। যাঁরা শুধু একটি বিষয়ে ইনটেলেকচুয়ালি গভীরে না গিয়ে সব দিকে মোটামুটি স্মার্ট, তাঁরা হচ্ছেন আমলা ও রাজনীতিবিদ। এ ধরনের বিষয় আশির দশক পর্যন্ত একেবারে বেমানান ছিল না। কিন্তু তার পরের দশকগুলোতে এগুলোকেও ছাপিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢুকে পড়েছেন শুধু পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীও না, আবার আমলা হওয়ার আশায় যাঁরা শুধু নিজ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত না থেকে বাইরের অনেক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত, তাঁরাও না। প্রধানত পার্টিতন্ত্রের জোরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতায় ঢুকে পড়েছে একটি বড় অংশ, যারা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার বারোটা বাজিয়েছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সমাজের কেউ এখন প্রকৃত শিক্ষকই মনে করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা, তথাকথিত জ্ঞানদানসবকিছুই একেবারে গৌণ হয়ে পড়েছে। 

সরকার টেকনিক্যাল সেন্টারের মতো দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা শুরু করল। মনে হচ্ছে যে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে এক ধরনের ট্রেনিং সেন্টার, যেখান থেকে শিক্ষার্থীরা পাস করে বের হলেই সমাজে যেসব পেশার চাহিদা আছে, তারা সেগুলো পূরণ করে ফেলবে এবং বেকার থাকবে না। উচ্চশিক্ষা নিয়ে এই উল্টো ধারণা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। আমাদের দরকার প্লাম্বার, আমাদের দরকার রেডিও-টিভি-ফ্রিজ মেরামত করার লোক, দরকার গাড়ির মেকানিক, আমাদের প্রয়োজন কৃষিবিজ্ঞানী ও কৃষি প্রকৌশলী, কিন্তু তাঁদের বড় অভাব। আপনার বাসায় বাথরুমে কিংবা কিচেনে সমস্যা হয়েছে, সঠিক লোক পাবেন না। লোক ডেকেছেন, সে আসছে চার-পাঁচ দিন পর। কারণ তাদের প্রচুর চাহিদা। অথচ একটি প্রতিষ্ঠানে একজন বা দুজন এমবিএ প্রার্থী চাওয়া হয়েছে, গিয়ে হাজির হবেন ৫০০ কিংবা ৬০০ জন। চাওয়া হয়েছে এসএসসি বা উচ্চ মাধ্যমিক পাস পিয়ন, দেখবেন ২০০ দরখাস্ত পড়েছে মাস্টার্স আর গ্র্যাজুয়েট। এই বাস্তবতার আলোকে যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, সেটি কে নেবে? সবাই ভাবে, রাষ্ট্র নেবে। রাষ্ট্র নেয় না। দায়িত্বে যাঁরা থাকেন, তাঁরা কিছু জনপ্রিয় কথা বলে থাকেন! তা না হলে পূর্ববর্তী সরকার উচ্চশিক্ষার যে মহাক্ষতি করে গেছে, তারই পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। ছোট ছোট জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে, সেটিকে আরো বেগবান করার চেষ্টা চলছে। জনপ্রতিনিধিরা আসল সমস্যায় না গিয়ে তাঁদের নিজ নিজ এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে চান। এর মানে কী, তা আমাদের বুঝে আসে না।

আপাতদৃষ্টিতে বাজারমুখী দক্ষতার চমৎকার আলোচনা ও সাইনবোর্ড বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু উচ্চশিক্ষার সঙ্গে এই ধারণা কতটা যায়! লোকপ্রশাসন বিভাগে যাঁরা পড়াশোনা করেন, তাঁরা দেশের লোকপ্রশাসন, পার্শ্ববর্তী এবং উন্নত বিশ্বের কিছু লোকপ্রশাসন সম্পর্কে ধারণা রাখেন। কিন্তু প্রকৃত প্রশাসন চালাতে হলে তাঁকে প্রশাসনে আসতে হবেতারপর পরিস্থিতির সঙ্গে যুদ্ধ করে, বহু ধাক্কা খেয়ে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করতে হয়। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, লোকপ্রশাসনে যাঁরা পড়াশোনা করেছেন, তাঁরা সবাই কি প্রশাসক হবেন? তাঁদের জন্য এত পোস্ট কি খালি আছে? তাঁরা সবাই প্রশাসনে গেলে অন্য বিষয়ের শিক্ষার্থীদের কী হবে? একইভাবে যাঁরা পদার্থবিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন, তাঁরা সবাই কি অ্যাটমিক এনার্জি বা এই জাতীয় প্রতিষ্ঠানেই চাকরি করবেন? বাস্তবে আমরা কী দেখতে পাই? বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা; যেমনপ্রকৌশল, কৃষি, চিকিৎসাবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন থেকে পাস করে বেশ কয়েক দশক ধরে অনেকেই নিজেদের বিভাগীয় চাকরি বা প্রসপেকটাস বাদ দিয়ে সাধারণ চাকরি, বিশেষ করে প্রশাসনে চলে আসছেন, এমনকি ব্যাংকে চাকরি করছেন, পুলিশ প্রশাসনে চাকরি করছেন। কারণ উচ্চশিক্ষায় বিষয়ভিত্তিক চাকরি নেই। আর বিশেষায়িত বিষয় পড়ে যাঁদের বিশেষ সেবা করা দরকার ছিল, রাষ্ট্র তা-ও নিশ্চিত করতে পারেনি। অথচ আউটকাম বেইসড কারিকুলামের ওপর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই রোগের চিকিৎসা কতটা সারানো যাবে, সেটি একটি বিরাট প্রশ্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে যে বিভাগেই পড়ুক না কেন, সবাই প্রথম বর্ষ থেকেই বিসিএস গাইড পড়া শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লাইব্রেরির বই ও জার্নাল থাকে আনটাচড, অথচ লাইব্রেরিতে বসার জায়গা নেই, লাইব্রেরিতে ঢোকার জন্য লম্বা লাইন। তারা সবাই জানে পাঠ্যবিষয় পড়ে কোনো লাভ নেই, পড়তে হবে সাধারণ জ্ঞান, সাধারণ বিজ্ঞান আর ইংরেজি ও গণিত। তাহলে বিসিএসসহ যেকোনো চাকরির দরখাস্ত করা যাবে, চাকরির পরীক্ষায় ভালো করা যাবে। আর তাই সবাই সেদিকে ছুটছে। এই বাস্তবতার সঙ্গে ওবিই প্রশিক্ষণ কতটা এবং কিভাবে সমন্বয় করবে, সেটি আমাদের ভেবে দেখার সময় এসেছে।

সরকারি পলিটেকনিক থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের টেকনিক্যাল নলেজ নেই, বাস্তব অভিজ্ঞতা নেই। কারণ তারা প্র্যাকটিক্যাল কাজ শেখেনি, রাজনীতি করেছে। তবে ব্যতিক্রম আছে। যারা টেকনিক্যাল কাজ শিখছে নিতান্ত অসহায় অবস্থায়, রাস্তার পাশে, চিপার ভেতর কোনো কারখানায়; সমাজে তাদের চাহিদা রয়েছে। এগুলোকে কিভাবে উন্নত করা যায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া যায় এখন কাজ করতে হবে সেগুলো নিয়ে। কারণ সমাজে তাদের প্রয়োজন। যেমনএকজন গাড়ির ড্রাইভারের বেতন ২০ হাজার থেকে ৩০ হাজার পর্যন্ত, অথচ একজন এমবিএ পাস করা গ্র্যাজুয়েটের বেতন ১০ হাজার টাকা, একজন মাধ্যমিকের শিক্ষকের বেতন ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা। এটি বর্তমান সমাজের চাহিদা ও বাস্তবতা! সরকার এগুলো কিভাবে সমন্বয় করবে, সেটি নিয়ে দরকার বাস্তব পরিকল্পনা। কিন্তু আমরা শুনি আরো কোথায় কোথায় বিশ্ববিদ্যালয় হবে অর্থাৎ সমাজে আরো বেকার কিভাবে বানানো যায়, সেদিকে হাঁটা। আরো শুনি কারিকুলাম পরিবর্তন করতে হবে, তাহলে সবাই যেন চাকরি পেয়ে যাবে ইত্যাদি! আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম বেইসড কারিকুলাম থাকবে, যাতে শিক্ষার্থীরা পাস করার পর চাকরি পায়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, উচ্চশিক্ষা নির্দিষ্ট বাটখারায় পরিমাপযোগ্য পণ্য নয়, উচ্চশিক্ষা টেকনিক্যাল বিষয় নয়, উচ্চশিক্ষা নির্দিষ্ট কিছু প্রশিক্ষণ, গ্রেড আর লেসন প্ল্যানের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়। উচ্চশিক্ষার ধারণা ব্যাপক, উচ্চশিক্ষা বৈশ্বিক জ্ঞান, বিশেষ জ্ঞান নিয়ে গভীরভাবে আলোচনা করে, যার প্রকাশ ঘটে নতুন কিছু আবিষ্কার, নতুন কিছু উদ্ভাবনের মাধ্যমে। চার বছরের অনার্স আর এক বা দুই বছরের মাস্টার্স পড়ে ওই বিষয়েই চাকরি ম্যানেজ করতে হবেএই ধারণা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়। এ জন্য আমাদের কলেজ বা বিশেষায়িত টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার প্রতিষ্ঠা দরকার, যেখানে সাধারণ বিষয়াবলিও থাকবে, তবে টেকনিক্যাল জ্ঞান ও বাস্তব অভিজ্ঞতা শেখানো হবে বিশাল অঙ্কের শিক্ষার্থীকে। সেই চাহিদা বা ছাঁচে বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণা হতে পারে না।

লেখক : শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক এবং প্রেসিডেন্ট ইংলিশ টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ

(ইট্যাব)

পাহাড়ধস ও প্রাণহানি রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ

পাহাড়ধস ও প্রাণহানি রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপ

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি জেলাগুলোতে পাহাড়ধস এখন আর শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এটি একটি নিয়মিত ও মানবসৃষ্ট প্রাণঘাতী ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছে। গত এক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বৃষ্টিপাতের ধরন যেমন বদলেছে, তেমনি অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা ও নির্বিচারে বনায়ন ধ্বংসের ফলে পাহাড়গুলোর মাটির অভ্যন্তরীণ বাঁধন সম্পূর্ণ আলগা হয়ে পড়েছে। ফলে বর্ষা এলেই অপরিকল্পিত বসতি আর কম ভাড়ার মারণফাঁদে থাকা শত শত দরিদ্র মানুষের ওপর আছড়ে পড়ছে পাহাড়ি ধস, কেড়ে নিচ্ছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। এই ধারাবাহিক মৃত্যুর মিছিল থামাতে এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার আমূল পরিবর্তন করতে স্থির ও পুরনো ডেটাভিত্তিক ব্যবস্থার বাইরে গিয়ে বাস্তব সময়ভিত্তিক গতিশীল ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি, আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা চালুকরণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পুনর্বাসনে অবিলম্বে রাষ্ট্রীয় ও কারিগরি কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল, বিশেষ করে রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার এবং বৃহত্তর সিলেটের পাহাড়গুলোর গঠনশৈলী সমতলের চেয়ে একদম আলাদা। এই পাহাড়ের মাটি মূলত অসংলগ্ন বেলেপাথর, পলি ও দো-আঁশ মাটির মিশ্রণে গঠিত, যা ভূতাত্ত্বিকভাবে অত্যন্ত ভঙ্গুর। শুষ্ক মৌসুমে এই মাটিতে গভীর ফাটল সৃষ্টি হয় এবং বর্ষা মৌসুমে যখন দীর্ঘস্থায়ী অতিভারি বর্ষণ ঘটে, তখন ওই ফাটল দিয়ে পানি ঢুকে মাটি অতিরিক্ত ভারী হয়ে পড়ে। এর ফলে মাটির ভেতরের সংহতি শক্তি বা বাঁধন সম্পূর্ণ আলগা হয়ে আস্ত পাহাড়ের ঢাল নিচে ধসে পড়ে। এই প্রাকৃতিক সংবেদনশীলতার সঙ্গে গত কয়েক দশকে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত পাহাড় কাটা, নির্বিচারে বনায়ন ধ্বংস এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ।

পাহাড়ধস ও প্রাণহানি রোধে প্রয়োজন কার্যকর পদক্ষেপপরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে সংঘটিত ভূমিধসের ঘটনাগুলোর প্রায় ৮৩ শতাংশই ঘটে থাকে বর্ষাকালীন মৌসুমে জুন থেকে আগস্ট মাসের অতিবৃষ্টির সময়। গত এক দশকের বিভিন্ন প্রকাশনার তথ্যানুযায়ী, বছরভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির খতিয়ান বিশ্লেষণ করলে একটি ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। যেমন২০১৫ সালের জুন-জুলাইয়ে কক্সবাজার ও বান্দরবানে পাহাড়ধস ও ঢলের কারণে অন্তত ২৩ জন প্রাণ হারায়। ১৯ জুলাই চট্টগ্রামের মতিঝর্ণা এবং নাজির পাহাড় এলাকায় পাহাড় ও সীমানাপ্রাচীর ধসে ছয়জন নিহত হয় এবং ফায়ার সার্ভিসের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর মোট ২৩টি পাহাড়ধসের ঘটনায় ৩৯ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়।

এরপর ২০১৭ সালের ১৩ জুন বাংলাদেশ ইতিহাসের ভয়াবহতম ভূমিধস বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়, যখন রাঙামাটিতে ২৪ ঘণ্টায় রেকর্ড ৩৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের কারণে একযোগে পাঁচটি জেলার ১৪৫টি স্থানে ভূমিধস ঘটে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ঘটনায় পাঁচজন সেনা সদস্যসহ মোট ১৬০ জন নিহত এবং ১৮৭ জন আহত হয়, যার ফলে প্রায় ছয় হাজার বসতবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয় এবং ৮০ হাজার মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পরবর্তী সময়ে ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে রোহিঙ্গা শিবিরের ভূ-প্রকৃতি পরিবর্তনের কারণে কক্সবাজার অঞ্চলে এবং পাহাড়ি ঢলের কারণে বান্দরবান ও চট্টগ্রামে নিয়মিত বিরতিতে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। ২০১৮ সালের ১১-১২ জুন রাঙামাটির নানিয়ারচরে পাহাড়ধসে ১১ জন, ৩ জুলাই বান্দরবানের লামায় চারজন এবং ২৫ জুলাই কক্সবাজারের রামুতে পাঁচজনসহ মোট ২৫ জন মারা যায়। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে মাত্র ৭২ ঘণ্টায় ১৪ ইঞ্চি বৃষ্টিপাতে ২৬টি ধসের ঘটনা ঘটে, আর পুরো বর্ষা মৌসুমে মোট ১৭ জন নিহত এবং ৯০ জন আহত হয়।

২০২০ সালে করোনা মহামারির লকডাউনের মধ্যে অতিবৃষ্টিতে পাহাড়ধস ঘটলে রোহিঙ্গা শিবিরে ১৪ জন নিহত এবং ৪১ জন আহত হয়। ২০২১ সালের জুলাই ও আগস্টের শেষ ভাগে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের ফলে ২৬ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়। ২০২২ সালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ি এলাকায় চারজন, শ্রীমঙ্গলের চা-বাগানে চারজন নারী শ্রমিক এবং কক্সবাজারের রামুতে একই পরিবারের চারজনসহ মোট ১৩ জন প্রাণ হারায়।

২০২৩ সালের আগস্টের প্রথম সপ্তাহে টানা বর্ষণে পার্বত্য বান্দরবানের ৯০ শতাংশ এলাকা বন্যার পানিতে তলিয়ে যায় এবং উখিয়া, আলীকদম, নাইক্ষ্যংছড়ি, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন স্থানে পাহাড়ধসে মোট ১৩ জন নিহত এবং ১২ জন আহত হয়। ২০২৪ সালের ১৮-১৯ জুন সিলেট অঞ্চলে ২৪২ মিলিমিটার এবং সুনামগঞ্জে ২২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, আর দেশব্যাপী ভূমিধসে মোট ২১ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়; যার মধ্যে উখিয়া ক্যাম্পে ছোট-বড় অনেক ভূমিধসের ঘটনা ঘটে এবং ১০ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে সিলেটের গোলাপগঞ্জে টিলাধসে একই পরিবারের চারজন ঘুমন্ত অবস্থায় মারা যায়, আর পুরো বছরে মোট সাতজন নিহত এবং ১০ জন আহত হয়।

চলতি মৌসুমে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে (৫ থেকে ৯ জুলাই) অতিবৃষ্টির ফলে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি অঞ্চলগুলোতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় নেমে আসে এবং পাহাড়ধস ও বন্যায় মোট ৩০ জন মারা যায় এবং ৪০ জন আহত হয়। জেলাভিত্তিক হিসাবে এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ১৯ জন মারা যায় কক্সবাজারে, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে পাঁচজন করে এবং রাঙামাটিতে একজন মারা যায়। তবে খাগড়াছড়িতে কোনো প্রাণহানি না হলেও সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ভূমিধসে নিহতদের সামাজিক পরিচয় বিশ্লেষণ করলে একটি নির্মম সামাজিক সত্য বেরিয়ে আসে। নিহতদের প্রায় শতভাগই দেশের দরিদ্রতম শ্রেণি এবং জলবায়ু শরণার্থী। নদীভাঙন বা সমতলে কাজ হারিয়ে যেসব মানুষ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মতো বাণিজ্যিক শহরগুলোতে আসে, তারা নিরাপদ আবাসন মেলাতে পারে না। শহরের নিরাপদ আবাসন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় তারা বাধ্য হয়ে পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে স্থানীয় প্রভাবশালী দখলদারদের মাধ্যমে অবৈধভাবে গড়ে তোলা স্বল্প ভাড়ার ঘরে সপরিবারে থাকতে শুরু করে। কম ভাড়ায় বাসস্থান পাওয়ার এই অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতাটিই মূলত তাদের মৃত্যুর ঝুঁকিতে ঠেলে দিচ্ছে। অন্যদিকে ২০০৭ সালে চট্টগ্রামে ১২৭ জনের প্রাণহানির পর গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটির ৩৬ দফা সুপারিশের বেশির ভাগই গত দেড় দশকে আলোর মুখ দেখেনি। প্রশাসনের উচ্ছেদ অভিযানগুলো মূলত বর্ষা মৌসুমের শুরুতে লোক-দেখানো মাইকিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে এবং শুকনা মৌসুম আসামাত্রই পুনরায় পাহাড় কাটার সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে ওঠে।

এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। বাংলাদেশে ভূমিধস ঝুঁকি নিয়ে গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গবেষণা হয়েছে এবং দেশের বহু বিজ্ঞানী ও প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে কাজ করছে। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগসহ দেশি-বিদেশি গবেষকরা পার্বত্য চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, টেকনাফ ও কক্সবাজার অঞ্চলের ভূমিধস ঝুঁকি, ঐতিহাসিক ভূমিধস ইনভেন্টরি  এবং বিভিন্ন ভূপৃষ্ঠীয় ও স্থানিক নিয়ামকগুলোর পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক নিয়ে একাধিক উচ্চমানের গবেষণা ও ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি করেছেন। একইভাবে বৃষ্টিপাত, ভূতত্ত্ব, ঢালের প্রকৃতি, ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন এবং মানবিক কর্মকাণ্ডের প্রভাব নিয়েও বিস্তারিত কাজ হয়েছে।

তবু কেন প্রতিবছর ভূমিধসে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে? কেন এখনো আমরা এমন একটি নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি, যা কার্যকরভাবে প্রাণহানি কমাতে সক্ষম? এর প্রধান কারণ হলো, ভূমিধসের ঝুঁকি কোনো স্থির বিষয় নয়, এটি অত্যন্ত গতিশীল। আমাদের বেশির ভাগ মডেল বা ঝুঁকি মানচিত্র তৈরি হয় একটি নির্দিষ্ট সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে। কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অনিয়ন্ত্রিত বসতি স্থাপন, নতুন রাস্তা নির্মাণ এবং ভূমি ব্যবহারের দ্রুত পরিবর্তনের ফলে ঝুঁকির ধরন ও মাত্রা প্রতি মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে। আজ যে এলাকাটিকে মডেলে মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ দেখানো হচ্ছে, ছয় মাস পর সেখানে প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নির্বিচারে পাহাড় কাটার কারণে তা তীব্র ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে পুরনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা স্থির মডেলগুলো পরিবর্তনশীল বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না।

ভবিষ্যতের ভূমিধস ব্যবস্থাপনায় আমাদের শুধু গবেষণাপত্র বা স্থির ঝুঁকি মানচিত্রের ওপর নির্ভর করে বসে থাকলে চলবে না, বরং স্থির মানচিত্রের পরিবর্তে আমাদের প্রয়োজন বাস্তব সময়ভিত্তিক অথবা নিয়মিত হালনাগাদকৃত গতিশীল তথ্যভাণ্ডার। ভূমিধস পূর্বাভাস ও ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেলগুলোকে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তত প্রতিবছর নতুন স্যাটেলাইট ডেটা ও মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ভিত্তিতে পুনর্নির্মাণ ও হালনাগাদ করতে হবে। একই সঙ্গে বৃষ্টিপাতের থ্রেশহোল্ড (বৃষ্টির পরিমাণ ও সময়কাল) এবং মাটির আর্দ্রতা রিয়াল টাইম মনিটরিং করার আধুনিক ওয়েব-জিআইএস ভিত্তিক সতর্কবার্তা সিস্টেম গড়ে তুলতে হবে, যার মাধ্যমে ভূমিধস ঘটার অন্তত আট থেকে ১২ ঘণ্টা আগে অতিঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশের মানুষকে সম্পূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। তবে এ ধরনের প্রযুক্তিগত মডেল তখনই পরিপূর্ণতা পাবে, যখন এতে সরকারের নীতিনির্ধারক, বিজ্ঞানী, স্থানীয় প্রশাসন, এনজিও এবং উপজাতীয় ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীসহ সব খাতের বা সেক্টরের অংশীজনদের সক্রিয় প্রতিনিধিত্ব ও সমন্বয় নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। সার্বিক ও সমন্বিত এই উদ্যোগই শুধু পারে পাহাড়ের কান্না থামিয়ে মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে রক্ষা করতে।

পাহাড়ি অঞ্চলের সুরক্ষায় স্থায়ী ও কঠোর টেকসই সমাধানেই এখন নজর দিতে হবে। এর জন্য পাহাড়ি জেলাগুলোর ভূ-প্রকৃতি বিবেচনা করে একটি বিশেষায়িত এবং কঠোর কারিগরি ও প্রকৌশল নির্দেশিকা প্রস্তুত করতে হবে, যেখানে কৃত্রিম দেয়ালের চেয়ে প্রকৃতির ওপর জোর দিয়ে পাহাড়ের ঢাল ধরে রাখতে বিন্না ঘাস এবং গভীর শিকড়যুক্ত স্থানীয় গাছ রোপণ বাধ্যতামূলক করা জরুরি। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্টকারী এবং অবৈধ পাহাড় কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ত ভূমিগ্রাসী ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী কঠোর জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করতে হবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক জবাবদিহি ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের এমন সমন্বিত বাস্তবায়নই শুধু পারে আমাদের পাহাড়গুলোকে রক্ষা করতে এবং বর্ষার চিরচেনা মারণফাঁদ থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে।

লেখক : অধ্যাপক, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ফার্মগেটে প্রতিরোধের প্রথম ব্যারিকেড | কালের কণ্ঠ