বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সচেতনতা সপ্তাহ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৫ সাল থেকে প্রতিবছর ১৮-২৪ নভেম্বর বিশ্ব অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল সচেতনতা সপ্তাহ পালন করে আসছে। এই ভয়ংকর সংক্রমণের বিস্তৃতি রোধে ব্যক্তি, স্বাস্থ্যকর্মী ও নীতিনির্ধারক পর্যায়ে সচেতনতা বৃদ্ধিই এ সপ্তাহ পালনের উদ্দেশ্য। এ লক্ষ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পাঁচটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে কর্মকৌশল প্রণয়ন করেছে। আর এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালস : সতর্কতার সঙ্গে পরিচালনা করুন। ঘটনা : ১ মেজবাউদ্দিন সাহেবের বয়স ৬৫ বছর। ১০ বছর ধরে তাঁর ডায়াবেটিস। পার্কে হাঁটেন নিয়মিত। মাসখানেক আগে এক সকালে হাঁটতে গিয়ে ইটের আঘাতে পায়ে ক্ষত তৈরি হয়। আস্তে আস্তে ক্ষত ছড়ায় হাঁটু পর্যন্ত। কয়েক দিন আগে ভর্তি হন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তাঁর পায়ের ক্ষত থেকে পুঁজ নিয়ে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগে পরীক্ষা করা হয়। এতে দেখা যায় মাঝারি ও উচ্চ শক্তির সব অ্যান্টিবায়োটিক তাঁর ক্ষত সৃষ্টিকারী জীবাণুর বিরুদ্ধে অকার্যকর। এই ফলাফলে চিকিৎসকরা অত্যন্ত অসহায় বোধ করেন। অবশেষে পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নিতে হয় সার্জারি বিভাগকে। মেজবাউদ্দিন সাহেবের এ পরিণতির জন্য দায়ী মূলত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু দ্বারা সংক্রমণ। এই অবস্থার নাম অ্যান্টিবায়োটিক/অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স কী? স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক ‘পেনিসিলিন’ আবিষ্কার করেন ১৯২৮ সালে, জীবাণুঘটিত রোগের চিকিৎসায়, যা যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী অনেক অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কার রোগের চিকিৎসাকে সহজতর করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জীবাণুও হয়েছে স্মার্ট ও শক্তিশালী। অ্যান্টিবায়োটিক জাতীয় শক্তিশালী অনেক ওষুধকে অকার্যকর করার জন্য জীবাণুরাও নিজেদের করেছে উন্নত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সংজ্ঞা মতে, অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স তখন বলা হয় যখন ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক, ভাইরাস ও অন্যান্য পরজীবী জীবাণু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এমনভাবে পরিবর্তিত হয় যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ তাদের আর ধ্বংস করতে পারে না। এতে যেকোনো সংক্রমণের চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়ে এবং জটিল ও প্রাণঘাতী রোগ দ্রুত বিস্তার লাভ করে। বিশ্ব পরিস্থিতি সর্বজনীন স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা তথা উন্নয়নের জন্য অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স এক বিরাট হুমকি। বিশ্বের সর্বত্র সব বয়স ও লিঙ্গের মানুষের এটা হতে পারে। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধী জীবাণুর সংক্রমণে ২০১৯ সালে বিশ্বে ১২ লাখ ৭০ হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোলের (সিডিসি) হিসাব মতে, শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবছর প্রায় ২৮ লাখ মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু সংক্রমণ হয়। ২০১৯ সালে এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যু হয় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের। বাংলাদেশ পরিস্থিতি উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধী সংক্রমণের সঠিক সংখ্যা পাওয়া না গেলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো এই সংখ্যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় ব্যাকটেরিয়ার প্রকার ও অ্যান্টিবায়োটিকের ধরনভেদে উচ্চ মাত্রার ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণ, যেমন : মূত্রনালির সংক্রমণের ৫৪-৯৪ শতাংশ, শ্বাসনালির ক্ষেত্রে ৪-৮৯ শতাংশ লক্ষ করা যায়। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানের যৌথ গবেষণায় দেখা যায়, টাইফয়েডের জন্য দায়ী ‘সালমোনেলা টাইফি’ জীবাণুটি এজিথ্রোমাইসিন নামের অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ৭৩ শতাংশ, সিপ্রোফ্লক্সাসিনের বিরুদ্ধে ৮৭ শতাংশ এবং সেফট্রিএক্সোনের বিরুদ্ধে ৬৭ শতাংশ সংক্রমণে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। এ ছাড়া এসব গবেষণায় মৎস্য খাদ্য, পশু খাদ্য ও কৃষিক্ষেত্রে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের যথেচ্ছ ব্যবহারের চিত্রও উঠে এসেছে। ঘটনা : ২ শামীম একজন গার্মেন্ট কর্মী। বয়স ২২ বছর। দুই দিন ধরে জ্বর। তিনি ফার্মেসিতে গিয়ে জ্বরের কথা বলে ওষুধ নিতে চাইলে দোকানি তাঁকে ১০টি প্যারাসিটামলের সঙ্গে তিনটি এজিথ্রোমাইসিন জাতীয় ওষুধ দিতে চান। টাকা কম থাকায় তিনি একটিমাত্র এজিথ্রোমাইসিন কিনেন। পরদিন জ্বর চলে যাওয়ায় তিনি আর ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি। শামীম অসচেতনভাবে হলেও তাঁর শরীরের জীবাণুকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হতে সাহায্য করেছেন। কারণ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। অন্যান্য জীবের মতো ব্যাকটেরিয়াও বেঁচে থাকার জন্য নিজেকে অভিযোজিত করে অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তোলে। পরবর্তী সময়ে এই প্রতিরোধক্ষমতা ‘ডিএনএ’-এর মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মে বাহিত হয়। এই পরিবর্তিত জীবাণু এরপর ওষুধ প্রতিরোধী সংক্রমণ ঘটাতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ইনফেকশন সৃষ্টিকারী ব্যাকটেরিয়ার উদ্ভব একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া হলেও এর জন্য অনেক কারণ দায়ী। আর সেগুলো হচ্ছে : ♦ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের যথেচ্ছ, অপ্রয়োজনীয় ও অতি ব্যবহার। ♦ সঠিক রোগ নির্ণয়ের আগে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা। ♦ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের সঠিক মাত্রা ও ব্যবহার কাল নিশ্চিত না করা। ♦ প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এ ধরনের ওষুধের ক্রয়-বিক্রয়। ♦ জনগণ ও ওষুধ বিক্রেতা উভয়ের অজ্ঞতা। ♦ চিকিৎসক কর্তৃক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সম্পর্কে রোগীকে যথাযথ কাউন্সেলিং করা। ♦ যথাযথ আইনের অভাব ও বিদ্যমান আইনের প্রয়োগের অভাব। ♦ পশু খাদ্য, মৎস্য খাদ্য ও কৃষিতে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল জাতীয় ওষুধের লাগামহীন ব্যবহার। ♦ হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানগুলোয় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও বিস্তার রোধের অপ্রতুল ব্যবস্থা। ঘটনা : ৩ আট বছরের স্কুলছাত্রী সারা টাইফয়েডে আক্রান্ত। তার রক্তে উপস্থিত জীবাণু নিয়ে কালচার-সেনসিটিভিটি পরীক্ষা করা হয়। এতে মুখে খাওয়ার স্বল্প মূল্যের সব অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর ধরা পড়ে। ফলে সারাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় শিরায় ওষুধ দেওয়ার জন্য। সারার বাবা একজন ভ্যানচালক। চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তিনি ভ্যানটি বিক্রি করেন। এতে পরিবারটির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সমস্যার গভীরতা : আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও ওপরের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝায় যায় সমস্যাটি অত্যন্ত গভীর। অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল প্রতিরোধী সংক্রমণ যত বিস্তার লাভ করবে, মৃত্যু হার তত বাড়বে। শুধু তা-ই নয়, প্রথম সারির সহজলভ্য ও স্বল্পমূল্যের ওষুধের বিরুদ্ধে সহজে জীবাণু প্রতিরোধ গড়তে পারে বলে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসায়ও উচ্চমূল্যের, দুর্লভ অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োজন হয়। সাধারণভাবে এসব ওষুধ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শিরায় প্রয়োগ করতে হয়। এতে নিশ্চিতভাবে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ে এবং মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়ে উন্নয়ন ব্যাহত হয়। করণীয় ♦ শুধু রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ মতো অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে। ♦ চিকিৎসককে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রিপশন করার জন্য চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। ♦ ওষুধের মাত্রা ও সেবনকাল মেনে চলতে হবে। ♦ একজনের বেঁচে যাওয়া বা অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অন্যজন সেবন করবে না (রোগের লক্ষণ এক হলেও)। ♦ সংক্রমণ প্রতিরোধে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা। ♦ যেসব প্রতিষ্ঠানে অ্যান্টিবায়োটিকসমৃদ্ধ মাছের খাবার, পোল্ট্রি ফিড ব্যবহার করা হয়, তাদের বর্জন করা। ♦ শুধু সঠিকভাবে রোগ নির্ণয়ের পরই সঠিক মাত্রায় প্রয়োজনীয় জীবাণুরোধক ওষুধ প্রদান করতে হবে। লেখক : সহকারী অধ্যাপক মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ