সামর্থ্য যেমনই হোক, সব বাবার কাছেই তার কন্যা রাজকন্যা। বাবা হলো কন্যার আশ্রয়, ভরসা আর সাহস। কিন্তু সেই বাবাও শেষ পর্যন্ত বাঁচাতে পারলেন না নিজের সন্তানকে।
দিল্লির ফুটপাতে ঘুমন্ত ১০ বছর বয়সী কন্যাসন্তানকে তুলে নিয়ে গেছে এক অ্যাপভিত্তিক ট্যাক্সিচালক। বিপদ বুঝে মেয়েটি চিৎকার করে বলেছিল, ‘পাপা, মুঝে বাচালো’ (বাবা, আমাকে বাঁচাও)। মেয়ের আর্তনাদে বাবার ঘুম ভাঙলেও ট্যাক্সির গতির সঙ্গে দৌড়ে পেরে ওঠেননি তিনি। পরে পুলিশ ৪ ঘণ্টার এক চিরুনি অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত চালককে গ্রেপ্তার করলেও, ততক্ষণে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে শিশুটিকে।
সোমবার (২২ জুন) ভোররাতে দিল্লির সিডিআর চক এলাকায় এই নির্মম ও নৃশংস ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ এই ঘটনায় অভিযুক্ত ২৫ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক বাবলুকে গ্রেপ্তার করেছে।
জানা গেছে, ভুক্তভোগী শিশুটির পরিবার মূলত বিহারের বাসিন্দা। জীবিকার তাগিদে সপরিবারে দিল্লিতে এসে প্রথমে একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন তারা। তবে দিনমজুর বাবার আয়ে সামর্থ্য না কুলালে একপর্যায়ে পুরো পরিবার দিল্লির ফুটপাতে থাকা শুরু করে। বাবাকে সাহায্য করতে ১০ বছরের ওই শিশুটি রাস্তায় বেলুন বিক্রি করত।
অন্য সব দিনের মতো রোববার (২১ জুন) রাতেও শিশুটি বাবা-মা, দুই বোন ও এক ভাইয়ের সঙ্গে ফুটপাতে ঘুমিয়ে ছিল। সোমবার ভোর ৪টার দিকে একটি ট্রিপে যাওয়ার পথে চালক বাবলুর নজর পড়ে ঘুমন্ত মেয়েটির ওপর। পুলিশ জানায়, চালক বাবলু সে সময় মাতাল অবস্থায় ছিল এবং ভোর ৪টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ফুটপাতের পাশে গাড়ি থামিয়ে ওঁত পেতে বসে ছিল। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে সে শিশুটিকে গাড়িতে তুলে নিয়ে দ্রুত গতিতে পালিয়ে যায়।
গাড়িতে তোলার সময় মেয়েটির আর্তচিৎকারে বাবার ঘুম ভেঙে যায়। চোখের সামনে মেয়েকে নিয়ে গাড়িটি চলে যেতে দেখে তিনি পেছনে দৌড়াতে থাকেন। কিন্তু গাড়ির গতির সঙ্গে পেরে না উঠে অসহায় বাবা দ্রুত একটি পিসিও (পাবলিক কল অফিস) থেকে ফোন করে পুলিশের সাহায্য চান।
খবর পেয়ে দিল্লি পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে নামে। গাড়িটির খোঁজে এলাকার শতাধিক সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হয়। একটি ফুটেজে গাড়িটি দেখা গেলেও তার রেজিস্ট্রেশন নম্বর স্পষ্ট ছিল না। তবে পুলিশ রাইড-শেয়ারিং অ্যাপগুলোর কাছ থেকে ওই এলাকার ট্রিপ সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে অনুরোধ পাঠায়। একই সঙ্গে জিপিএস ট্র্যাকিং ও মোবাইল লোকেশন ব্যবহার করে পুলিশ পশ্চিম দিল্লির বিকাশপুরী এলাকায় গাড়িটির অবস্থান শনাক্ত করে এবং সেখান থেকেই বাবলুকে গ্রেপ্তার করে।
জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত বাবলু নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে। সে পুলিশকে জানায়, অপহরণের পর সে শিশুটিকে গুরুগ্রাম-ফরিদাবাদ রোডের একটি নির্জন এলাকায় নিয়ে যায়। সেখানে শিশুটিকে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করে লাশ ফেলে পালিয়ে আসে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পরে পুলিশ শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ জানায়, এমন ভয়ংকর অপরাধ করার পরও বাবলু ছিল সম্পূর্ণ নির্বিকার। শিশুটির মরদেহ ফেলে রেখে সে ওই গাড়ি দিয়েই আরেকটি ট্রিপ নেয় এবং বিকাশপুরী এলাকায় যাত্রী নামানোর পরপরই পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। বাবলুর পরিবারও বিহারে থাকে।
এদিকে মঙ্গলবার (২৩ জুন) পুলিশ অভিযুক্ত বাবলুকে নিয়ে ঘটনার তদন্ত ও আলামত সংগ্রহে ঘটনাস্থলে যায়। সেখানে পুলিশের হেফাজত থেকে বাবলু পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ তার পায়ে গুলি চালায়। বর্তমানে সে পুলিশি হেফাজতে চিকিৎসাধীন।
পুলিশি তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া বাবলুর বিরুদ্ধে এর আগেও বিহারে একাধিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার রেকর্ড রয়েছে। কোনো ধরনের যাচাই-বাছাই (ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন) ছাড়া একজন চিহ্নিত অপরাধীকে চালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট অ্যাপভিত্তিক ক্যাব সংস্থাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
অপরাধী ধরা পড়েছে এবং আদালতে তার বিচার হবে। কিন্তু ফুটপাতে বেলুন বিক্রি করা সেই ছোট্ট শিশুটি আর কোনো দিন বাবার কোলে ফিরবে না। আর যতদিন বেঁচে থাকবেন, এই দিনমজুর বাবার কানে হয়তো প্রতিনিয়ত বাজবে মেয়ের সেই শেষ আকুতি—‘বাবা, আমাকে বাঁচাও।’