যুক্তরাজ্যের উত্তর আয়ারল্যান্ডে ছুরি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অভিবাসনবিরোধী বিক্ষোভে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। এ ঘটনায় সুদানের নাগরিক বলে ধারণা করা ৩০ বছর বয়সী এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। এরপর মঙ্গলবার যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ’ বলে নিন্দা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বেলফাস্টের বিভিন্ন এলাকায় মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা জড়ো হয়ে বাড়িঘর, একটি বাস, গাড়ি এবং ব্যারিকেডে আগুন ধরিয়ে দেয়। সামাজিক মাধ্যমে যাচাইকৃত ভিডিওতে দেখা গেছে, একাধিক বাড়ি আগুনে পুড়ছে এবং জরুরি সেবার যানবাহন ঘটনাস্থলে ছুটে যাচ্ছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের পাশাপাশি নিউটাউন অ্যাবি ও কিলকিলেসহ আশপাশের এলাকায়ও গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। ইংল্যান্ড, ওয়েলস ও স্কটল্যান্ডের কিছু শহরেও বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিল বলেন, ‘মুখোশধারী একটি দল পরিবারগুলোকে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে।’
পুলিশ জানিয়েছে, ছুরি হামলার ঘটনায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। হামলায় আরেকজন গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর পরই এলাকায় বিক্ষোভ আরো তীব্র হয়ে ওঠে।
সোমবার রাতে উত্তর বেলফাস্টে ঘটে যাওয়া ছুরি হামলার একটি ভিডিও একজন প্রত্যক্ষদর্শী ধারণ করেন এবং পরে তা সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ও ভাইরাল হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, এক ব্যক্তি রক্তাক্ত আরেকজনকে মাটিতে চেপে ধরে একাধিকবার আক্রমণ করছে। পরে পথচারী ও পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে হামলাকারীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে এক্সে অভিবাসনবিরোধী ও ডানপন্থী বিভিন্ন অ্যাকাউন্ট ভিডিওটি ব্যাপকভাবে শেয়ার করে এবং প্রতিবাদের আহ্বান জানায়।
এতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন ডানপন্থী ব্যক্তিত্বসহ বিলিয়নেয়ার ইলন মাস্কও বিক্ষোভের আহ্বান ও বিভিন্ন পোস্ট আবার শেয়ার করেন। বিতর্কিত আন্দোলনকারী টমি রবিনসন দেশব্যাপী সমাবেশের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘কেবল বারবার এবং জোরালোভাবে প্রতিবাদ করলেই পরিবর্তন সম্ভব।’
উত্তর আয়ারল্যান্ডে ছুরি হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা ও বিক্ষোভের ঘটনাকে বিদেশিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক সহিংসতা হিসেবে নিন্দা জানিয়েছেন স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ের নেতারা।
উত্তর আয়ারল্যান্ডের ফার্স্ট মিনিস্টার মিশেল ও’নিল ‘এক্স’-এ দেওয়া এক পোস্টে বলেন, উত্তর বেলফাস্টের হামলাটি ছিল ‘জঘন্য ও অন্যায়’, তবে এই ঘটনাকে ব্যবহার করে নিরীহ মানুষদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে। তিনি বলেন, বর্ণবাদ, ভয়ভীতি ও সহিংসতা যেখানেই ঘটুক না কেন, তা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারও সোমবার রাতের ছুরি হামলাকে ‘ভয়াবহ’ ও ‘জঘন্য’ বলে উল্লেখ করে বলেন, দেশের রাস্তায় এমন সহিংসতা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না।
এদিকে ব্যাংগর, গ্লাসগো ও লন্ডনসহ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন শহরেও ছোট ছোট বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে কট্টর ডানপন্থী বিক্ষোভকারীরা পুলিশের মুখোমুখি হয় এবং অভিবাসনবিরোধী স্লোগান দেয়।
বেলফাস্টের আইনপ্রণেতা ক্লেয়ার হানা বিবিসির নিউজনাইটকে বলেন, কিছু অনলাইন কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক মন্তব্য এই ঘটনাকে উসকে দিয়ে বিভেদ ও সহিংসতা বাড়াচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু মানুষ গায়ের রঙের ভিত্তিতে বিদেশিদের লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে।
অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, উত্তর আয়ারল্যান্ডজুড়ে পরিস্থিতি এখনো অস্থির এবং কিছু জায়গায় গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। তারা সবাইকে শান্ত থাকার এবং শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার আহ্বান জানিয়েছে।
পুলিশ সার্ভিস অব নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সহকারী প্রধান কনস্টেবল রায়ান হেন্ডারসন বলেন, জনগণকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে এবং সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা থেকে দূরে থাকতে অনুরোধ করা হচ্ছে।
বেলফাস্টের ছুরি হামলা
পুলিশ জানিয়েছে, সোমবার স্থানীয় সময় রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে বেলফাস্টের ক্যানার্ড এভিনিউয়ে ৪০-এর কোঠায় থাকা এক ব্যক্তি ছুরিকাহত হন।
পুলিশ সার্ভিস অব নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডের সহকারী প্রধান কনস্টেবল রায়ান হেন্ডারসন জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি রান্নাঘরের ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে। হামলায় ভুক্তভোগীর চোখে গুরুতর আঘাত লাগে এবং পিঠ ও মুখেও মারাত্মক জখম হয়। বর্তমানে তিনি হাসপাতালে গুরুতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন আছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সুদানের নাগরিক বলে মনে করা এক ব্যক্তিকে পরে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তি ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্যারিস থেকে ডাবলিনে এসে উত্তর আয়ারল্যান্ডে প্রবেশ করেন এবং সেখানে পৌঁছে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। তাকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
হেন্ডারসন বলেন, এই হামলার সঙ্গে সন্ত্রাসবাদের কোনো সম্পর্ক আছে, এমন কোনো প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। তবে তদন্ত এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরো জানান, সন্দেহভাজন ব্যক্তি উত্তর আয়ারল্যান্ডে বৈধভাবে বসবাস করছিলেন। ঘটনার পর থেকে তিনি পুলিশি হেফাজতে আছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টা, জনসমক্ষে ধারালো অস্ত্র বহন এবং হত্যার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। বুধবার তাকে আদালতে হাজির করার কথা রয়েছে।





