• ই-পেপার

প্রায় ১০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে উ. কোরিয়া

গুগল ছেড়ে ওপেনএআইয়ে যোগ দিচ্ছেন এআই পথিকৃৎ নোয়াম শাজির

অনলাইন ডেস্ক
গুগল ছেড়ে ওপেনএআইয়ে যোগ দিচ্ছেন এআই পথিকৃৎ নোয়াম শাজির
সংগৃহীত ছবি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব নোয়াম শাজির গুগল ছেড়ে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা 'ওপেনএআই'-এ যোগ দিচ্ছেন। তার এই সিদ্ধান্তকে গুগলের এআই পরিকল্পনার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।

গুগলের প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জেমিনি এআই মডেলের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন শাজির। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ওপেনএআইয়ে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি লেখেন, 'আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমি ওপেনএআইয়ে যোগ দিচ্ছি। সেখানে অসাধারণ একটি দলের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছি।' শাজিরের এই ঘোষণার পর প্রযুক্তি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ তিনি শুধু একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নন, বরং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর হিসেবেও পরিচিত।

নোয়াম শাজিরকে বর্তমান এআই বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন হিসেবে ধরা হয়। টাইম ম্যাগাজিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকাতেও তার নাম রয়েছে। গুগলে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় কাজ করেছেন তিনি। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানের একেবারে শুরুর দিকে যোগ দেন এবং সে সময় গুগলের প্রথম ১০০ কর্মীর একজন ছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং অন্যান্য বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের পেছনে যে প্রযুক্তি কাজ করছে, তার ভিত্তি তৈরিতে শাজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্রের সহলেখক ছিলেন তিনি। এ গবেষণাকেই বর্তমান বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম প্রযুক্তির সূচনা হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তীতে এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং অন্যান্য জনপ্রিয় এআই সেবা।

শাজির ২০২০ সালে তার সহকর্মী ড্যানিয়েল ডি ফ্রেইতাসের সঙ্গে গুগলে 'মীনা' নামে একটি উন্নত কথোপকথনভিত্তিক চ্যাটবট তৈরি করেন। পরে এই প্রযুক্তিকে আরো উন্নত করে 'ল্যামডা' নামে নতুন সংস্করণ তৈরি করা হয়। তিনি চেয়েছিলেন সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এই প্রযুক্তি উন্মুক্ত করা হোক। তার বিশ্বাস ছিল, এই চ্যাটবট ভবিষ্যতে সার্চ প্রযুক্তিকে আমূল বদলে দিতে পারবে। তবে নিরাপত্তা, ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম নিয়ে উদ্বেগের কারণে গুগলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই পরিকল্পনায় সম্মতি দেয়নি। এ নিয়ে হতাশ হয়ে ২০২১ সালে গুগল ছেড়ে দেন শাজির। গুগল ছাড়ার পর শাজির নিজের এআই কম্পানি 'ক্যারেক্টার.এআই' প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ২০২৪ সালে গুগল একটি বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে তাকে আবার প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনে। ওই চুক্তির মূল্য ছিল ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। গুগলে ফিরে তিনি জেমিনি এআই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি আবার প্রতিষ্ঠান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। গুগল থেকে দ্বিতীয়বার বিদায় নেওয়ার সময় শাজির বলেন, সিদ্ধান্তটি নেওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। 

শাজিরের ওপেনএআইয়ে যোগ দেওয়ার খবর প্রকাশের পর নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান। তিনি বলেন, ওপেনএআইয়ের শুরু থেকেই নোয়াম এমন একজন, যার সঙ্গে তিনি সবচেয়ে বেশি কাজ করতে চেয়েছিলেন। এতে শুধু ১০ বছর সময় লেগেছে। তার আশা, এই অপেক্ষা সার্থক হবে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, শাজিরের মতো একজন গবেষকের যোগদান ওপেনএআইয়ের গবেষণা ও পণ্য উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করবে।


শাজিরের নিয়োগকে ওপেনএআইয়ের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত মাসে ওপেনএআই গোপনে প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির আবেদন জমা দিয়েছে। একই পথে হাঁটছে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকও।  বিশ্লেষকদের মতে, শাজিরের মতো বিশ্বখ্যাত এআই গবেষকের যোগদান বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতে পরিচিত হওয়ার অনেক আগেই নিজের অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন নোয়াম শাজির। কিশোর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্র দলের হয়ে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ৩৫তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেন। সেখানে পূর্ণ নম্বর পেয়ে স্বর্ণপদক জয় করেন। পরে বৃত্তি নিয়ে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রথম সেমিস্টারেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উইলিয়াম লোয়েল পুটনাম গণিত প্রতিযোগিতায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে তিনি ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত দলকে জাতীয় পর্যায়ে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনে নেতৃত্ব দেন। পড়াশোনা শেষে অল্প সময়ের জন্য ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির স্নাতকোত্তর কর্মসূচিতে ভর্তি হলেও ডিগ্রি শেষ করার আগেই গুগলে যোগ দেন তিনি।

শাজিরের ওপেনএআইয়ে যোগদান দেখিয়ে দিচ্ছে, বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দক্ষ এআই গবেষকদের নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। যেখানে সাধারণ অনেক কর্মী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় আছেন, সেখানে এআই বিশেষজ্ঞদের চাহিদা ও মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। এর উদাহরণ দেখা গেছে গত বছরও। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিক মেটা ১৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে স্কেল এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সান্দর ওয়াংকে নিজেদের দলে যুক্ত করে নেয়। বর্তমানে তিনি মেটার সুপারইনটেলিজেন্স ল্যাবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

প্রযুক্তি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, নোয়াম শাজিরের ওপেনএআইয়ে যোগদান শুধুমাত্র একটি চাকরি পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে নেতৃত্বের লড়াই আরো তীব্র হওয়ার ইঙ্গিতও বটে। 
 

আবার বিতর্কে ‘ড্যান্সিং গার্ল’

অনলাইন ডেস্ক
আবার বিতর্কে ‘ড্যান্সিং গার্ল’
ছবি : সংগৃহীত।

শিল্প-সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতার সীমারেখা নিয়ে বিতর্ক যুগ যুগ ধরে। এটা ঠিক শ্লীলতা দেখায় সাধারণের চোখ আর শিল্পী-সাহিত্যিকের চোখ এক নয়। সাধারণে যা নগ্নতা, শিল্পীর তুলিতে বা সাহিত্যিকের কলমে তা হয়ে ওঠে সৌন্দর্য্য। 
আবার শিল্পকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অশ্লীলতাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টাও কম নয়। কাটতি বাড়াতেও অনেকে নগ্নতা বা অশ্লীলতাকে শিল্পের আড়াল দেয়ার চেষ্টা করেন।

ভারতে আবার শিল্পে শালীনতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এবার বিতর্কের কেন্দ্রে ’ড্যান্সিং গার্ল’। সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত মুখ, চার ইঞ্চি উচ্চতার ব্রোঞ্জ মূর্তি ’ড্যান্সিং গার্ল’-এর কপালটাই খারাপ। চার হাজার বছর আগে মহেঞ্জোদারোর কোনো শিল্পী নিপুণ দক্ষতায় আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে বানিয়েছিলেন তাকে। তারপর দীর্ঘ সময় মাটির নিচেই চাপা পড়েছিল সেটি। ঠিক এক শ বছর আগে ১৯২৬ সালে পুরাতাত্ত্বিক খননের সময় মহেঞ্জোদারোর একটি সাধারণ বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা হয় ‘ড্যান্সিং গার্ল’কে। 

আগের চার হাজার বছর আরামে ঘুমালেও উদ্ধারের পর থেকেই তার ঘুম হারাম। গত এক শ বছরে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল ড্যান্সিং গার্ল। শালীনতার সীমা নিয়ে বিতর্ক তো আছেই, আছে মালিকানা বিতর্ক, ধর্মীয় বিতর্ক, এমনকি নামকরণ নিয়েও নানা মত আছে।
 
বিতর্ক যতই হোক, তাতে কিন্তু ড্যান্সিং গার্লের সৌন্দর্য্যের কমতি হয় না। চার হাজার আগে বানানো এমন নিখূঁত ভাস্কর্য বরং আধুনিক সময়ের শিল্পবোদ্ধাদেরও বিস্মিত করে। চার ইঞ্চি উচ্চতার ড্যান্সিং গার্লের দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে তিনটি বাঁক আছে, একেবারে ত্রিভঙ্গ মূর্তি। এর ডান হাতটি কোমরে রাখা এবং বাঁ হাতটি বাম উরুর ওপর আলতো করে নামানো। এর ডান পা সোজা এবং বাঁ পাটি হাঁটু থেকে সামান্য বাঁকানো। মূর্তির মাথাটি সামান্য পেছনের দিকে হেলানো এবং থুতনিটি আত্মবিশ্বাসের সাথে উঁচানো। এর চোখ দুটি বড় এবং নিচের দিকে অর্ধ-নিমীলিত। ঠোঁট দুটি বেশ চওড়া এবং নাকটি চ্যাপ্টা, যা আদি ভারতীয় উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত দেয়। 

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো ড্যান্সিং গার্লের সাজসজ্জা। কাঁধ থেকে কবজি পর্যন্ত পুরো বাঁ হাতটি প্রায় ২৪-২৫টি চুড়ি বা বালা দিয়ে ঢাকা। ডান হাতে রয়েছে চারটি বালা—দুটি কনুইয়ের ওপরে এবং দুটি কবজিতে। তার গলায় রয়েছে তিন পাটির নেকলেস। মাথার চুলগুলো অত্যন্ত পরিপাটি করে বাঁধা ও খোঁপা করে ঘাড়ের একপাশে ঝুলানো। চার হাজার বছর আগে সমস্যা না হলেও আমাদের আধুনিক মানুষদের সমস্যা হলো ড্যান্সিং গার্লের গায়ে কোনো পোশাক নেই। এখানেই বারবার সামনে চলে আসে বিতর্ক।

ভারতে সাম্প্রতিক বিতর্ক উস্কে দিয়েছে পাঠ্যপুস্তকে নতুন স্টাইলের ড্যান্সিং গার্লের অন্তর্ভূক্তি। ভারতের ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং- এনসিইআরটি প্রণীত ষষ্ঠ শ্রেনীর সমাজবিজ্ঞান বইতে ‘ড্যান্সিং গার্ল’-এর ছবিতে বুক থেকে নিচের বেশকিছু অংশ ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়েই বিতর্কের ঝড়। 

অনেকেই বলছেন, ড্যান্সিং গার্ল চার হাজার পুরোনো চমৎকার একটি শিল্পকর্ম। এটিকে আধুনিক সময়ের শ্লীল-অশ্লীলের চশমায় দেখাই উচিত নয়। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই সমালোচনায় সায় দিচ্ছেন এনসিইআরটি-এর টেক্সটবুক ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান মাইকেল ড্যানিও নিজেই। তার মতে, নগ্নতা মানেই অশ্লীল, এই ভাবনা ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার অংশ। 

আমরা ঔপনিবেশিকতার থেকে ভারতীয় শিক্ষাকে মুক্ত করার কথা বলেও এই মূর্তিকে যদি যথাযথভাবে উপস্থাপন না করি, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও একটা বড় সমস্যা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ক্লাস সিক্সের শিক্ষকদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছিলাম। কারও মনে হয়নি এই মূর্তি অশ্লীল। তবু আমাকে বলা হয়েছিল এই মূর্তি ক্লাস সিক্সের বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত নয়, আমাদের টিমও এই কথার সঙ্গে একমত হতে পারেনি।’ বোঝাই যাচ্ছে বেচারা ড্যানিও ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপের মুখে ড্যান্সিং গার্লকে অবগুণ্ঠিত করেছেন।

বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, পুরোনো  প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলাকে আধুনিক নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করা যায় কি না বা উচিত কি না। অনেকেই বলছেন, এটা ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায়, স্পষ্ট ইতিহাস বিকৃতি। শালীনতার আধুনিক চশমায় সবকিছু বিচার করলে, খাজুরাহো, ইলোরাসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রাচীন ভাস্কর্যকেও পাল্টে দিতে হবে বা আড়াল করতে হবে।

আগেই বলেছে, গত শত বছরে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে ড্যান্সিং গার্ল। ১৯২৬ সালে যখন মূর্তিটি উদ্ধার হয়, তখন ভারতবর্ষ ছিল অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারত। আবিষ্কারের পর প্রথমে এটিকে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে রাখা হয়েছিল। দিল্লী তখন নতুন রাজধানী। তাই দিল্লিকে নতুন করে সাজাতে হরপ্প-মহেঞ্জাদারোয় উদ্ধার হওয়া পুরাকীর্তি দিল্লীতে এনে ঠাঁই দেয়া হয় জাতীয় জাদুঘরে। 

কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সিন্ধু সভ্যতার বেশিরভাগ এবং মূল অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। তাই পাকিস্তান সিন্ধু সভ্যতার পুরাকীর্তি ফেরত চায়। দীর্ঘ আলোচনায় দুপক্ষ অর্ধেক অর্ধেক ভাগাভাগিতে সম্মত হয়। কিন্তু শালীনতার দোহাই দিয়ে পাকিস্তান ড্যান্সিং গার্লকে নেয়নি। 

দেশভাগের পর লাখো মানুষকে ধর্মীয় কারণে দেশ ছাড়তে হয়েছে। শালীনতার দোহাইয়ে একটা ব্রোঞ্জ মূর্তিও ফিরে পায়নি তার শিকড়। পাকিস্তানের মহেঞ্জাদারো থেকে উদ্ধার হওয়া ড্যান্সিং গার্ল এখন দিল্লির জাতীয় জাদুঘরে! 

২০১৭ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দাবি করেন, এই মূর্তিটি আসলে ‘দেবী পার্বতী’র রূপ। তবে মূলধারার ঐতিহাসিকেরা এই ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ড্যান্সিং গার্ল নিয়ে বিতর্কের আসলে শেষ নেই। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মিউজিয়াম মেলার আসর বসে ভারতে। ওই মেলার মাসকট ঠিক করা হয় ড্যান্সিং গার্লকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই মাসকট উদ্বোধন করতেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। মাসকটে ড্যান্সিং গার্লকে পরানো হয়েছিল গোলাপী রংয়ের ব্লাউজ জাতীয় পোশাক।

আর নিম্নাঙ্গে ছিল গুজরাতি ঐতিহ্যবাহী নকশা সংবলিত একটি হলুদ ধুতির মতো পোশাক। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক ধ্যানধারণার সাথে মেলাতে গিয়ে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক সত্যকে বিকৃত ও জোরপূর্বক ‘শালীন’ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ড্যান্সিং গার্লের নামকরণ নিয়েও আছে বিতর্ক। মহেঞ্জদোরোর উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দেয়া ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক জন মার্শাল উদ্ধারের পর এর নাম দিয়েছিলেন ‘ড্যান্সিং গার্ল’। তখন ব্রিটিশরা ভারতের নাচনেওয়ালীদের সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। আদর করে তারা নৃত্যপটিয়সী নারীদের নাম দিয়েছিলেন ‘নচ গার্ল’। হয়তো ‘নাচ’কেই ইংরেজি উচ্চারণে ’নচ’ বলা হতো। উদ্ধারের পর মার্শালের হয়তো মূর্তিটির ভঙ্গিকে নাচের মূদ্রা মনে হয়েছে, তাই তিনি নাচ গার্লদের সাথে মিলিয়ে নাম দিয়েছিলেন ‘ড্যান্সিং গার্ল’। 

তবে আধুনিক গবেষকদের মতে, এটি কেবলই একজন আত্মবিশ্বাসী নারীর প্রতিকৃতি এবং আদিম সমাজে একে কোনো অশ্লীল দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি করা হয়নি। বিতর্ক যাই হোক নাম আর পাল্টায়নি।

আসলে আমরা যতই বিতর্ক করি, যতই শালীনতার চশমায় দেখি, ইতিহাস বদলানো যাবে না। অতীতকে বর্তমানের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ঢেকে না রেখে, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বোঝার চেষ্টা করাই সভ্যতার জন্য মঙ্গলজনক।

আইএসএসের রুশ মডিউলে লিক, নিরাপদ আশ্রয়ে পাঁচ নভোচারী

অনলাইন ডেস্ক
আইএসএসের রুশ মডিউলে লিক, নিরাপদ আশ্রয়ে পাঁচ নভোচারী
ছবি: রয়টার্স

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে (আইএসএস) বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার সমস্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় পাঁচ নভোচারীকে জরুরি ভিত্তিতে নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে হয়। শুক্রবার প্রায় দুই ঘণ্টা তারা স্টেশনের সঙ্গে সংযুক্ত একটি মহাকাশযানে অবস্থান করেন এবং প্রয়োজনে স্টেশন ছেড়ে সরে যাওয়ার প্রস্তুতি নেন।

একই সময়ে স্টেশনের রাশিয়ান অংশে থাকা একটি ফাটল মেরামতের চেষ্টা চলছিল। পরে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে নিরাপদ আশ্রয়ের নির্দেশ প্রত্যাহার করা হয় এবং নভোচারীদের আবার মহাকাশ স্টেশনে ফিরে যেতে বলা হয়। নাসা জানিয়েছে, শুক্রবার সকালে তাদের মিশন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র পাঁচ নভোচারীকে স্টেশনের সঙ্গে যুক্ত স্পেসএক্সের ক্রু ড্রাগন মহাকাশযানে যেতে নির্দেশ দেয়। সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর সেই নির্দেশ তুলে নেওয়া হয়। এ সময় নাসা এবং রাশিয়ার মহাকাশ সংস্থা রসকসমসের কর্মকর্তারা স্টেশন থেকে কত দ্রুত বাতাস বেরিয়ে যাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করছিলেন।


আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের প্রধান দুই অংশীদার নাসা ও রসকসমস কয়েক মাস ধরে স্টেশনের রাশিয়ান অংশে থাকা জভেজদা সার্ভিস মডিউলের বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছে। জভেজদা মডিউল মহাকাশ স্টেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এখানেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। কয়েক বছর ধরেই এই অংশে ছোট ছোট ফাটল ও বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার বিষয় নিয়ে উদ্বেগ ছিল। রসকসমস শুক্রবার জানায়, তাদের বিশেষজ্ঞরা দুটি লিক বা বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার স্থান শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে একটি দ্রুত মেরামত করা হয়েছে। অন্যটি বন্ধ করার প্রস্তুতি চলছিল। সংস্থাটি জানায়, এই সমস্যার কারণে নভোচারীদের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো ঝুঁকি তৈরি হয়নি। স্টেশনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থাও হুমকির মুখে পড়েনি।

নাসার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত কয়েক মাসে পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। কিন্তু শুক্রবার বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার হার হঠাৎ বেড়ে যায়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আগে প্রতিদিন প্রায় এক পাউন্ড পরিমাণ বাতাস বের হচ্ছিল। শুক্রবার তা বেড়ে প্রতিদিন দুই পাউন্ডের সমপর্যায়ে পৌঁছে যায়। এর ফলে পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ে এবং নিরাপদ আশ্রয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়।

বর্তমানে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে দুটি মিশনের মোট সাতজন নভোচারী অবস্থান করছেন। এর মধ্যে ক্রু-১২ মিশনের চার সদস্য ফেব্রুয়ারিতে স্টেশনে পৌঁছান। তারা হলেন নাসার নভোচারী জেসিকা মেয়ার ও জ্যাক হ্যাথাওয়ে, ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার নভোচারী সোফি আদেনো এবং রসকসমসের মহাকাশচারী আন্দ্রেই ফেদিয়ায়েভ। এ ছাড়া নভেম্বরে পৌঁছানো আরেকটি দলের সদস্য হিসেবে রয়েছেন মার্কিন নভোচারী ক্রিস্টোফার উইলিয়ামস এবং রাশিয়ার দুই মহাকাশচারী সের্গেই কুদ-সভারচকভ ও সের্গেই মিকায়েভ। নাসার তথ্য অনুযায়ী, নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া পাঁচজনের মধ্যে ক্রু-১২ দলের চার সদস্য এবং ক্রিস্টোফার উইলিয়ামস ছিলেন।

নাসার ওই কর্মকর্তা জানান, রাশিয়ার দুই মহাকাশচারী কুদ-সভারচকভ ও মিকায়েভ ফাটলের সম্ভাব্য অবস্থানে পৌঁছাতে একটি করাত ব্যবহারের পরিকল্পনা করেছিলেন। তবে এই পদ্ধতি নিয়ে নাসার কর্মকর্তাদের আপত্তি ছিল। তারা মনে করেন, এমন কাজ চলার সময় ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। এ কারণেই হিউস্টনের মিশন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে নভোচারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে নির্দেশ দেয়। পরে রসকসমস সাময়িকভাবে মেরামতের কাজ বন্ধ করলে নাসা নিরাপদ আশ্রয়ের নির্দেশ প্রত্যাহার করে। নাসার মুখপাত্র বেথানি স্টিভেন্স বলেন, বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে রসকসমসের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ চালিয়ে যাবে নাসা।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে নিরাপদ আশ্রয়ের নির্দেশ খুবই বিরল ঘটনা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মহাকাশের আবর্জনার সঙ্গে সংঘর্ষের সম্ভাবনা এবং বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার মতো প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে এমন জরুরি প্রটোকল চালু করা হয়েছে। স্টেশনের ২৭ বছরের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত কোনো নভোচারীকে জরুরি কারণে পুরোপুরি সরিয়ে নিতে হয়নি।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে একটি বিল নিয়ে আলোচনা চলছে, যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের কার্যকাল আরো দুই বছর বাড়িয়ে ২০৩২ সাল পর্যন্ত নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই প্রস্তাবের পক্ষে রয়েছেন রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ এবং ডেমোক্র্যাট সিনেটর মারিয়া ক্যান্টওয়েল। তারা সিনেটের বাণিজ্য, বিজ্ঞান ও পরিবহন বিষয়ক কমিটির শীর্ষ পর্যায়ের সদস্য। আইনপ্রণেতারা বলছেন, মহাকাশে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি এবং ভবিষ্যৎ মহাকাশ কর্মসূচির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে স্টেশনটির কার্যকাল বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নেতারা প্রস্তাবিত বিল নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন।
 

এইচপিভি টিকায় তরুণীদের জরায়ুমুখের ক্যানসারে মৃত্যু নেমেছে শূন্যে

অনলাইন ডেস্ক
এইচপিভি টিকায় তরুণীদের জরায়ুমুখের ক্যানসারে মৃত্যু নেমেছে শূন্যে
ছবি: রয়টার্স

ইংল্যান্ডে জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে ব্যবহৃত এইচপিভি (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস) টিকা এখন পর্যন্ত প্রায় ২০০ জনের জীবন বাঁচিয়েছে বলে নতুন এক গবেষণায় উঠে এসেছে। আন্তর্জাতিক চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী 'ল্যানসেট'-এ প্রকাশিত এই গবেষণাকে এ ধরনের প্রথম বিশ্লেষণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০০৮ সালে স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের জন্য এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি চালু হওয়ার পর থেকে জরায়ুমুখের ক্যানসারে মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই রোগে কোনো মৃত্যুর ঘটনা রেকর্ড করা হয়নি। গত পাঁচ বছরের কোনো সময়ে এমন পরিস্থিতি আগে দেখা যায়নি। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, টিকাদান কর্মসূচি না থাকলে এই সময়ে অন্তত ২৩ জন তরুণীর মৃত্যুর আশঙ্কা ছিল। গবেষণার প্রধান গবেষক এবং লন্ডনের কুইন মেরি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক পিটার সাসিয়েনি বলেন, একটি মাত্র টিকা কোনো নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসারকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে দূর করার পথে নিয়ে যেতে পারে, এটি সত্যিই বিস্ময়কর। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, যারা ১২ বা ১৩ বছর বয়সে এইচপিভি টিকা নিয়েছিল, তাদের ৩০ বছর বয়সের আগেই জরায়ুমুখের ক্যানসারে মারা যাওয়ার ঝুঁকি এখন প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। অথচ টিকাদান কর্মসূচি শুরুর আগে এই বয়সী নারীদের মধ্যে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০টি মৃত্যুর ঘটনা ঘটত।

টিকার ইতিবাচক প্রভাব সত্ত্বেও যুক্তরাজ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসার এখনও নারীদের অন্যতম সাধারণ ক্যানসার। দেশটিতে নারীদের মধ্যে এটি ১৪তম সর্বাধিক শনাক্ত হওয়া ক্যানসার। প্রতি বছর প্রায় ৩ হাজার ৩০০ জন নারী নতুন করে এই রোগে আক্রান্ত হন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ক্যানসারের প্রায় ৯৯ শতাংশের জন্য দায়ী এইচপিভি ভাইরাস। সাধারণত ত্বকের ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এইচপিভি সংক্রমণ কোনো চিকিৎসা ছাড়াই সেরে যায়, তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি শরীরের কোষে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটায়। সেই পরিবর্তন অনেক বছর পর ক্যানসারে রূপ নিতে পারে। গবেষণার লেখকদের মতে, আগামী বছরগুলোতে আরো বেশি মানুষ টিকা নিলে এবং ইতোমধ্যে টিকা নেওয়া প্রজন্মের বয়স বাড়লে জরায়ুমুখের ক্যানসারে মৃত্যুর হার আরো কমবে।

গবেষণার অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠান ক্যানসার রিসার্চ ইউকে এই ফলাফলকে 'অবিশ্বাস্য একটি মাইলফলক' হিসেবে বর্ণনা করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী মিশেল মিচেল বলেন, এইচপিভি টিকা যে জরায়ুমুখের ক্যানসার প্রতিরোধে অত্যন্ত কার্যকর, তা আগেই জানা ছিল। তবে নতুন গবেষণা প্রথমবারের মতো স্পষ্টভাবে দেখাল যে এই টিকা সরাসরি মানুষের জীবনও বাঁচাচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ইংল্যান্ডে বর্তমানে টিকা গ্রহণের হার এখনও সুপারিশকৃত মাত্রার নিচে রয়েছে। 

ইংল্যান্ডের বাসিন্দা অ্যালেক্সান্দ্রা লেগ এইচপিভি টিকাদান কর্মসূচি চালুর ঠিক আগে স্কুল জীবন শেষ করেছিলেন। ফলে তিনি টিকা নেওয়ার সুযোগ পাননি। ২০২১ সালে, নিজের বিয়ের প্রস্তুতির সময় ৩০ বছর বয়সে তার জরায়ুমুখের ক্যানসার ধরা পড়ে। অ্যালেক্সান্দ্রা বলেন, চিকিৎসকের কাছে ক্যানসারের কথা শোনার পর তার মনে হয়েছিল তিনি ঠিকমতো শ্বাস নিতে পারছেন না। তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন এবং সামনে কী হবে তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে ছিলেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে তার পেটের ভেতরের কিছু লিম্ফ নোড অপসারণ করা হয়। তবে চিকিৎসকেরা তার জরায়ুমুখের একটি অংশ সংরক্ষণ করতে সক্ষম হন। ফলে ভবিষ্যতে সন্তান ধারণের সুযোগ বজায় থাকে। চিকিৎসার এক বছরের মধ্যেই তিনি কন্যাসন্তানের মা হন। তার মেয়ের নাম আইভি। শিশুটির মধ্য নাম রাখা হয় ‘মারভেলা’, যার অর্থ অলৌকিক ঘটনা। অ্যালেক্সান্দ্রা বলেন, গর্ভাবস্থার পুরো সময়টিই ছিল ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভরা। কারণ যেকোনো সময় তিনি সন্তানকে হারানোর আশঙ্কায় ছিলেন। তিনি মনে করেন, যদি তিনি এইচপিভি টিকা নেওয়ার সুযোগ পেতেন, তাহলে হয়তো তাকে এত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হতো না। তিনি বলেন, তিনি এই টিকার সমর্থক। টিকা নেওয়ার বয়স হলে তার মেয়ে সবার আগে এই টিকা নেবে।

অধ্যাপক পিটার সাসিয়েনি বলেন, বর্তমানে যে পরিমাণ মৃত্যু কমেছে, সেটি আসলে বড় পরিবর্তনের কেবল শুরু। তার ভাষায়, টিকা নেওয়া প্রজন্মের বয়স যত বাড়বে, তত বেশি মানুষ জরায়ুমুখের ক্যানসার থেকে সুরক্ষা পাবে এবং আরো অনেক জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, নতুন গবেষণা আবারও প্রমাণ করেছে যে এইচপিভি টিকাদানের হার উচ্চ পর্যায়ে ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি।

যুক্তরাজ্য সরকার ২০৪০ সালের মধ্যে জরায়ুমুখের ক্যানসারকে জনস্বাস্থ্যের বড় সমস্যা হিসেবে নির্মূল করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, দেশটিতে টিকা গ্রহণের হার কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে নেই। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ইংল্যান্ডে ১৫ বছর বয়সের মধ্যে ৭৬ শতাংশ মেয়ে এইচপিভি টিকা নিয়েছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জরায়ুমুখের ক্যানসার কার্যকরভাবে নির্মূল করতে এই হার কমপক্ষে ৯০ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন। মিশেল মিচেল বলেন, যেসব এলাকায় টিকা নেওয়ার হার কম, সেখানে দ্রুত ও বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া এখন সরকারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এইচপিভি টিকা নেওয়া হলেও নারীদের নিয়মিত জরায়ুমুখ পরীক্ষা করানো জরুরি। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ২৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী নারীদের নিয়মিত জরায়ুমুখ পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। আগে এই পরীক্ষাকে স্মিয়ার টেস্ট বলা হতো। এদিকে ২০১৯ সাল থেকে দেশটিতে ছেলেদেরও এইচপিভি টিকা দেওয়া হচ্ছে। এই টিকা তাদের মলদ্বার, পুরুষাঙ্গ, গলা ও মুখের কিছু ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়। পাশাপাশি তাদের মাধ্যমে নারীদের মধ্যে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও হ্রাস করে। ইংল্যান্ডের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা বিভাগ বলেছে, নতুন গবেষণা এইচপিভি টিকার অসাধারণ কার্যকারিতা স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বিভাগের এক মুখপাত্র জানান, সরকার টিকা গ্রহণের হার বাড়াতে কাজ করছে। এর অংশ হিসেবে কমিউনিটি ফার্মেসির মাধ্যমে অতিরিক্ত টিকাদান কর্মসূচি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি যেসব নারী এখনও জরায়ুমুখ পরীক্ষা করাতে আসেননি, তাদের কাছে বাড়িতে ব্যবহারযোগ্য এইচপিভি পরীক্ষার কিটও পাঠানো হচ্ছে।

স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের আশা, এসব উদ্যোগের মাধ্যমে আরো বেশি মানুষ এই জীবনরক্ষাকারী সুরক্ষার আওতায় আসবে এবং ভবিষ্যতে জরায়ুমুখের ক্যানসারে মৃত্যু আর কমে আসবে।