• ই-পেপার

মধ্যপ্রাচ্যে ২২০০ মেরিন সেনা মোতায়েনের পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের

জি৭ সম্মেলনে ট্রাম্প বললেন, ‘আমিই বস’

অনলাইন ডেস্ক
জি৭ সম্মেলনে ট্রাম্প বললেন, ‘আমিই বস’
ছবি : সংগৃহীত।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার এক বৈঠকে বিশ্বনেতাদের বলেন, ‘আমিই বস’। একই সঙ্গে তিনি ও জি৭ নেতারা ইউক্রেন যুদ্ধে অগ্রগতি স্বীকার করেন এবং রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপের সিদ্ধান্ত নেন।

ফ্রান্সের অবকাশকেন্দ্র এভিয়ান-লে-বেঁ-এ ১৫ থেকে ১৭ জুন অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলনের সময় ট্রাম্পের এই মন্তব্য আসে। বৈঠকে তিনি এক যৌথ বিবৃতির পর বিশ্বনেতাদের সামনে এই কথা বলেন।

ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি এবং তার মিত্ররা সম্মেলনে এসে ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, ইউক্রেনের প্রতিরোধ সফল হচ্ছে এবং শান্তি চুক্তির শর্ত নির্ধারণের অবস্থায় রাশিয়া নেই।

গত বছর কানাডায় অনুষ্ঠিত জি৭ শীর্ষ সম্মেলন ইউক্রেন বিষয়ে কোনো যৌথ অবস্থান ছাড়াই শেষ হয়েছিল। তবে এবার ভার্সাই প্রাসাদে এক নৈশভোজের আগে ইমানুয়েল ম্যাখোঁ ও ট্রাম্প উভয়েই সম্মেলনকে সফল বলে আখ্যা দেন। তবে মস্কোকে শান্তি আলোচনায় আনা নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে। 

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তাবিষয়ক এক অধিবেশনে বসার সময় ট্রাম্প সাংবাদিক ও জি৭ নেতাদের উদ্দেশে আবারও ‘আমিই বস’ মন্তব্যটি করেন।


 

হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণের প্রস্তুতি, লোহিত সাগরে যাচ্ছে জার্মানির দুটি জাহাজ

অনলাইন ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণের প্রস্তুতি, লোহিত সাগরে যাচ্ছে জার্মানির দুটি জাহাজ
সংগৃহীত ছবি

জার্মানি সম্ভাব্য মাইন অপসারণ অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে দুটি নৌযান লোহিত সাগরের দিকে পাঠাচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী বরিস পিস্টোরিয়াস। 

তিনি বলেন, ভবিষ্যতে হরমুজ প্রণালিতে মাইন অপসারণের প্রয়োজন হতে পারে। সেই সম্ভাবনাকে সামনে রেখে এই প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ব্রাসেলসে ন্যাটোর এক বৈঠকে যোগ দিতে গিয়ে তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। 

পিস্টোরিয়াস বলেন, তাদের মাইন অপসারণকারী জাহাজ 'ফুলদা' এবং সরবরাহ জাহাজ 'মোজেল' সুয়েজ খাল পেরিয়ে লোহিত সাগরের দিকে যাচ্ছে। এই জাহাজ দুটি সম্ভাব্য মাইন অপসারণ অভিযানের অংশ হিসেবে সেখানে মোতায়েন করা হচ্ছে। তবে এখনই কোনো চূড়ান্ত অভিযান শুরু হচ্ছে না। হরমুজ প্রণালিতে কোনো মাইন অপসারণ অভিযান শুরু করতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অনুমোদন লাগবে। ইরান এবং ওমানের সম্মতি ছাড়া এমন কোনো অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব নয় বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, এই ধরনের কোনো অভিযান বাস্তবে আদৌ শুরু হবে কি না, তা ভবিষ্যতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হওয়া রাজনৈতিক আলোচনার অগ্রগতির ওপর নির্ভর করবে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ হিসেবে বিবেচিত। এই পথ দিয়েই বিশ্বজুড়ে তেল ও জ্বালানির একটি বড় অংশ পরিবহন করা হয়। তাই এখানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নষ্ট হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে মাইন বা বিস্ফোরক থাকার আশঙ্কা দেখা দিলে তা আন্তর্জাতিক নৌচলাচলের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সেই কারণে বিভিন্ন দেশ আগেই প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে।

পিস্টোরিয়াস ন্যাটোর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অংশ নিতে ব্রাসেলসে গিয়ে ইউরোপ ও ন্যাটোর সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। জার্মানির এই পদক্ষেপকে ন্যাটোর সামুদ্রিক নিরাপত্তা কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। জার্মান প্রতিরক্ষামন্ত্রী জানান, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সমঝোতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হলে মাইন অপসারণ অভিযান বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

গুগল ছেড়ে ওপেনএআইয়ে যোগ দিচ্ছেন এআই পথিকৃৎ নোয়াম শাজির

অনলাইন ডেস্ক
গুগল ছেড়ে ওপেনএআইয়ে যোগ দিচ্ছেন এআই পথিকৃৎ নোয়াম শাজির
সংগৃহীত ছবি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব নোয়াম শাজির গুগল ছেড়ে চ্যাটজিপিটি নির্মাতা 'ওপেনএআই'-এ যোগ দিচ্ছেন। তার এই সিদ্ধান্তকে গুগলের এআই পরিকল্পনার জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।

গুগলের প্রকৌশল বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং জেমিনি এআই মডেলের অন্যতম প্রধান ব্যক্তি ছিলেন শাজির। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি ওপেনএআইয়ে যোগ দেওয়ার ঘোষণা দেন। তিনি লেখেন, 'আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমি ওপেনএআইয়ে যোগ দিচ্ছি। সেখানে অসাধারণ একটি দলের সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় আছি।' শাজিরের এই ঘোষণার পর প্রযুক্তি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ তিনি শুধু একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নন, বরং আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভিত্তি গড়ে তোলার অন্যতম কারিগর হিসেবেও পরিচিত।

নোয়াম শাজিরকে বর্তমান এআই বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন হিসেবে ধরা হয়। টাইম ম্যাগাজিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০০ ব্যক্তির তালিকাতেও তার নাম রয়েছে। গুগলে দীর্ঘ দুই দশকের বেশি সময় কাজ করেছেন তিনি। ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠানের একেবারে শুরুর দিকে যোগ দেন এবং সে সময় গুগলের প্রথম ১০০ কর্মীর একজন ছিলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, আজকের চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং অন্যান্য বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের পেছনে যে প্রযুক্তি কাজ করছে, তার ভিত্তি তৈরিতে শাজির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি যুগান্তকারী গবেষণাপত্রের সহলেখক ছিলেন তিনি। এ গবেষণাকেই বর্তমান বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এলএলএম প্রযুক্তির সূচনা হিসেবে দেখা হয়। পরবর্তীতে এই প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে চ্যাটজিপিটি, জেমিনি এবং অন্যান্য জনপ্রিয় এআই সেবা।

শাজির ২০২০ সালে তার সহকর্মী ড্যানিয়েল ডি ফ্রেইতাসের সঙ্গে গুগলে 'মীনা' নামে একটি উন্নত কথোপকথনভিত্তিক চ্যাটবট তৈরি করেন। পরে এই প্রযুক্তিকে আরো উন্নত করে 'ল্যামডা' নামে নতুন সংস্করণ তৈরি করা হয়। তিনি চেয়েছিলেন সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য এই প্রযুক্তি উন্মুক্ত করা হোক। তার বিশ্বাস ছিল, এই চ্যাটবট ভবিষ্যতে সার্চ প্রযুক্তিকে আমূল বদলে দিতে পারবে। তবে নিরাপত্তা, ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি এবং প্রতিষ্ঠানের সুনাম নিয়ে উদ্বেগের কারণে গুগলের শীর্ষ নেতৃত্ব এই পরিকল্পনায় সম্মতি দেয়নি। এ নিয়ে হতাশ হয়ে ২০২১ সালে গুগল ছেড়ে দেন শাজির। গুগল ছাড়ার পর শাজির নিজের এআই কম্পানি 'ক্যারেক্টার.এআই' প্রতিষ্ঠা করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই প্রতিষ্ঠানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এরপর ২০২৪ সালে গুগল একটি বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে তাকে আবার প্রতিষ্ঠানে ফিরিয়ে আনে। ওই চুক্তির মূল্য ছিল ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার। গুগলে ফিরে তিনি জেমিনি এআই প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। তবে এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে তিনি আবার প্রতিষ্ঠান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। গুগল থেকে দ্বিতীয়বার বিদায় নেওয়ার সময় শাজির বলেন, সিদ্ধান্তটি নেওয়া তার জন্য সহজ ছিল না। 

শাজিরের ওপেনএআইয়ে যোগ দেওয়ার খবর প্রকাশের পর নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যান। তিনি বলেন, ওপেনএআইয়ের শুরু থেকেই নোয়াম এমন একজন, যার সঙ্গে তিনি সবচেয়ে বেশি কাজ করতে চেয়েছিলেন। এতে শুধু ১০ বছর সময় লেগেছে। তার আশা, এই অপেক্ষা সার্থক হবে। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, শাজিরের মতো একজন গবেষকের যোগদান ওপেনএআইয়ের গবেষণা ও পণ্য উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরো শক্তিশালী করবে।


শাজিরের নিয়োগকে ওপেনএআইয়ের জন্য একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত মাসে ওপেনএআই গোপনে প্রাথমিক শেয়ার বিক্রির আবেদন জমা দিয়েছে। একই পথে হাঁটছে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকও।  বিশ্লেষকদের মতে, শাজিরের মতো বিশ্বখ্যাত এআই গবেষকের যোগদান বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করবে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতে পরিচিত হওয়ার অনেক আগেই নিজের অসাধারণ মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন নোয়াম শাজির। কিশোর বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্র দলের হয়ে হংকংয়ে অনুষ্ঠিত ৩৫তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে অংশ নেন। সেখানে পূর্ণ নম্বর পেয়ে স্বর্ণপদক জয় করেন। পরে বৃত্তি নিয়ে ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার প্রথম সেমিস্টারেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উইলিয়াম লোয়েল পুটনাম গণিত প্রতিযোগিতায় ষষ্ঠ স্থান অর্জন করেন। ১৯৯৬ ও ১৯৯৭ সালে তিনি ডিউক বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত দলকে জাতীয় পর্যায়ে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনে নেতৃত্ব দেন। পড়াশোনা শেষে অল্প সময়ের জন্য ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির স্নাতকোত্তর কর্মসূচিতে ভর্তি হলেও ডিগ্রি শেষ করার আগেই গুগলে যোগ দেন তিনি।

শাজিরের ওপেনএআইয়ে যোগদান দেখিয়ে দিচ্ছে, বর্তমানে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দক্ষ এআই গবেষকদের নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। যেখানে সাধারণ অনেক কর্মী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে চাকরি হারানোর আশঙ্কায় আছেন, সেখানে এআই বিশেষজ্ঞদের চাহিদা ও মূল্য ক্রমেই বাড়ছে। এর উদাহরণ দেখা গেছে গত বছরও। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের মালিক মেটা ১৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের বিশেষ চুক্তির মাধ্যমে স্কেল এআইয়ের প্রতিষ্ঠাতা আলেক্সান্দর ওয়াংকে নিজেদের দলে যুক্ত করে নেয়। বর্তমানে তিনি মেটার সুপারইনটেলিজেন্স ল্যাবের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

প্রযুক্তি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, নোয়াম শাজিরের ওপেনএআইয়ে যোগদান শুধুমাত্র একটি চাকরি পরিবর্তনের ঘটনা নয়। এটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পে নেতৃত্বের লড়াই আরো তীব্র হওয়ার ইঙ্গিতও বটে। 
 

আবার বিতর্কে ‘ড্যান্সিং গার্ল’

অনলাইন ডেস্ক
আবার বিতর্কে ‘ড্যান্সিং গার্ল’
ছবি : সংগৃহীত।

শিল্প-সাহিত্যে শ্লীলতা-অশ্লীলতার সীমারেখা নিয়ে বিতর্ক যুগ যুগ ধরে। এটা ঠিক শ্লীলতা দেখায় সাধারণের চোখ আর শিল্পী-সাহিত্যিকের চোখ এক নয়। সাধারণে যা নগ্নতা, শিল্পীর তুলিতে বা সাহিত্যিকের কলমে তা হয়ে ওঠে সৌন্দর্য্য। 
আবার শিল্পকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে অশ্লীলতাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টাও কম নয়। কাটতি বাড়াতেও অনেকে নগ্নতা বা অশ্লীলতাকে শিল্পের আড়াল দেয়ার চেষ্টা করেন।

ভারতে আবার শিল্পে শালীনতা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। এবার বিতর্কের কেন্দ্রে ’ড্যান্সিং গার্ল’। সিন্ধু সভ্যতার সবচেয়ে পরিচিত মুখ, চার ইঞ্চি উচ্চতার ব্রোঞ্জ মূর্তি ’ড্যান্সিং গার্ল’-এর কপালটাই খারাপ। চার হাজার বছর আগে মহেঞ্জোদারোর কোনো শিল্পী নিপুণ দক্ষতায় আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে বানিয়েছিলেন তাকে। তারপর দীর্ঘ সময় মাটির নিচেই চাপা পড়েছিল সেটি। ঠিক এক শ বছর আগে ১৯২৬ সালে পুরাতাত্ত্বিক খননের সময় মহেঞ্জোদারোর একটি সাধারণ বাড়ির ধ্বংসাবশেষ থেকে উদ্ধার করা হয় ‘ড্যান্সিং গার্ল’কে। 

আগের চার হাজার বছর আরামে ঘুমালেও উদ্ধারের পর থেকেই তার ঘুম হারাম। গত এক শ বছরে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল ড্যান্সিং গার্ল। শালীনতার সীমা নিয়ে বিতর্ক তো আছেই, আছে মালিকানা বিতর্ক, ধর্মীয় বিতর্ক, এমনকি নামকরণ নিয়েও নানা মত আছে।
 
বিতর্ক যতই হোক, তাতে কিন্তু ড্যান্সিং গার্লের সৌন্দর্য্যের কমতি হয় না। চার হাজার আগে বানানো এমন নিখূঁত ভাস্কর্য বরং আধুনিক সময়ের শিল্পবোদ্ধাদেরও বিস্মিত করে। চার ইঞ্চি উচ্চতার ড্যান্সিং গার্লের দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে তিনটি বাঁক আছে, একেবারে ত্রিভঙ্গ মূর্তি। এর ডান হাতটি কোমরে রাখা এবং বাঁ হাতটি বাম উরুর ওপর আলতো করে নামানো। এর ডান পা সোজা এবং বাঁ পাটি হাঁটু থেকে সামান্য বাঁকানো। মূর্তির মাথাটি সামান্য পেছনের দিকে হেলানো এবং থুতনিটি আত্মবিশ্বাসের সাথে উঁচানো। এর চোখ দুটি বড় এবং নিচের দিকে অর্ধ-নিমীলিত। ঠোঁট দুটি বেশ চওড়া এবং নাকটি চ্যাপ্টা, যা আদি ভারতীয় উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীর শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ইঙ্গিত দেয়। 

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো ড্যান্সিং গার্লের সাজসজ্জা। কাঁধ থেকে কবজি পর্যন্ত পুরো বাঁ হাতটি প্রায় ২৪-২৫টি চুড়ি বা বালা দিয়ে ঢাকা। ডান হাতে রয়েছে চারটি বালা—দুটি কনুইয়ের ওপরে এবং দুটি কবজিতে। তার গলায় রয়েছে তিন পাটির নেকলেস। মাথার চুলগুলো অত্যন্ত পরিপাটি করে বাঁধা ও খোঁপা করে ঘাড়ের একপাশে ঝুলানো। চার হাজার বছর আগে সমস্যা না হলেও আমাদের আধুনিক মানুষদের সমস্যা হলো ড্যান্সিং গার্লের গায়ে কোনো পোশাক নেই। এখানেই বারবার সামনে চলে আসে বিতর্ক।

ভারতে সাম্প্রতিক বিতর্ক উস্কে দিয়েছে পাঠ্যপুস্তকে নতুন স্টাইলের ড্যান্সিং গার্লের অন্তর্ভূক্তি। ভারতের ন্যাশনাল কাউন্সিল অফ এডুকেশনাল রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং- এনসিইআরটি প্রণীত ষষ্ঠ শ্রেনীর সমাজবিজ্ঞান বইতে ‘ড্যান্সিং গার্ল’-এর ছবিতে বুক থেকে নিচের বেশকিছু অংশ ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এ নিয়েই বিতর্কের ঝড়। 

অনেকেই বলছেন, ড্যান্সিং গার্ল চার হাজার পুরোনো চমৎকার একটি শিল্পকর্ম। এটিকে আধুনিক সময়ের শ্লীল-অশ্লীলের চশমায় দেখাই উচিত নয়। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই সমালোচনায় সায় দিচ্ছেন এনসিইআরটি-এর টেক্সটবুক ডেভেলপমেন্ট কমিটির প্রধান মাইকেল ড্যানিও নিজেই। তার মতে, নগ্নতা মানেই অশ্লীল, এই ভাবনা ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতার অংশ। 

আমরা ঔপনিবেশিকতার থেকে ভারতীয় শিক্ষাকে মুক্ত করার কথা বলেও এই মূর্তিকে যদি যথাযথভাবে উপস্থাপন না করি, তাহলে বুঝতে হবে কোথাও একটা বড় সমস্যা রয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ক্লাস সিক্সের শিক্ষকদের সঙ্গে আমরা কথা বলেছিলাম। কারও মনে হয়নি এই মূর্তি অশ্লীল। তবু আমাকে বলা হয়েছিল এই মূর্তি ক্লাস সিক্সের বাচ্চাদের জন্য উপযুক্ত নয়, আমাদের টিমও এই কথার সঙ্গে একমত হতে পারেনি।’ বোঝাই যাচ্ছে বেচারা ড্যানিও ইচ্ছার বিরুদ্ধে চাপের মুখে ড্যান্সিং গার্লকে অবগুণ্ঠিত করেছেন।

বিতর্কের মূল প্রশ্ন হলো, পুরোনো  প্রাচীন ভারতীয় শিল্পকলাকে আধুনিক নৈতিকতার মানদণ্ডে বিচার করা যায় কি না বা উচিত কি না। অনেকেই বলছেন, এটা ইতিহাসের সঙ্গে অন্যায়, স্পষ্ট ইতিহাস বিকৃতি। শালীনতার আধুনিক চশমায় সবকিছু বিচার করলে, খাজুরাহো, ইলোরাসহ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রাচীন ভাস্কর্যকেও পাল্টে দিতে হবে বা আড়াল করতে হবে।

আগেই বলেছে, গত শত বছরে বারবার বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে আসে ড্যান্সিং গার্ল। ১৯২৬ সালে যখন মূর্তিটি উদ্ধার হয়, তখন ভারতবর্ষ ছিল অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারত। আবিষ্কারের পর প্রথমে এটিকে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের লাহোরে রাখা হয়েছিল। দিল্লী তখন নতুন রাজধানী। তাই দিল্লিকে নতুন করে সাজাতে হরপ্প-মহেঞ্জাদারোয় উদ্ধার হওয়া পুরাকীর্তি দিল্লীতে এনে ঠাঁই দেয়া হয় জাতীয় জাদুঘরে। 

কিন্তু ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর সিন্ধু সভ্যতার বেশিরভাগ এবং মূল অংশ পাকিস্তানের অন্তর্ভূক্ত হয়। তাই পাকিস্তান সিন্ধু সভ্যতার পুরাকীর্তি ফেরত চায়। দীর্ঘ আলোচনায় দুপক্ষ অর্ধেক অর্ধেক ভাগাভাগিতে সম্মত হয়। কিন্তু শালীনতার দোহাই দিয়ে পাকিস্তান ড্যান্সিং গার্লকে নেয়নি। 

দেশভাগের পর লাখো মানুষকে ধর্মীয় কারণে দেশ ছাড়তে হয়েছে। শালীনতার দোহাইয়ে একটা ব্রোঞ্জ মূর্তিও ফিরে পায়নি তার শিকড়। পাকিস্তানের মহেঞ্জাদারো থেকে উদ্ধার হওয়া ড্যান্সিং গার্ল এখন দিল্লির জাতীয় জাদুঘরে! 

২০১৭ সালে বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক দাবি করেন, এই মূর্তিটি আসলে ‘দেবী পার্বতী’র রূপ। তবে মূলধারার ঐতিহাসিকেরা এই ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেছেন।

ড্যান্সিং গার্ল নিয়ে বিতর্কের আসলে শেষ নেই। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মিউজিয়াম মেলার আসর বসে ভারতে। ওই মেলার মাসকট ঠিক করা হয় ড্যান্সিং গার্লকে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ওই মাসকট উদ্বোধন করতেই নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়। মাসকটে ড্যান্সিং গার্লকে পরানো হয়েছিল গোলাপী রংয়ের ব্লাউজ জাতীয় পোশাক।

আর নিম্নাঙ্গে ছিল গুজরাতি ঐতিহ্যবাহী নকশা সংবলিত একটি হলুদ ধুতির মতো পোশাক। সমালোচকেরা অভিযোগ করেন, বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক ধ্যানধারণার সাথে মেলাতে গিয়ে প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক সত্যকে বিকৃত ও জোরপূর্বক ‘শালীন’ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, ড্যান্সিং গার্লের নামকরণ নিয়েও আছে বিতর্ক। মহেঞ্জদোরোর উদ্ধার কাজে নেতৃত্ব দেয়া ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক জন মার্শাল উদ্ধারের পর এর নাম দিয়েছিলেন ‘ড্যান্সিং গার্ল’। তখন ব্রিটিশরা ভারতের নাচনেওয়ালীদের সাথে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। আদর করে তারা নৃত্যপটিয়সী নারীদের নাম দিয়েছিলেন ‘নচ গার্ল’। হয়তো ‘নাচ’কেই ইংরেজি উচ্চারণে ’নচ’ বলা হতো। উদ্ধারের পর মার্শালের হয়তো মূর্তিটির ভঙ্গিকে নাচের মূদ্রা মনে হয়েছে, তাই তিনি নাচ গার্লদের সাথে মিলিয়ে নাম দিয়েছিলেন ‘ড্যান্সিং গার্ল’। 

তবে আধুনিক গবেষকদের মতে, এটি কেবলই একজন আত্মবিশ্বাসী নারীর প্রতিকৃতি এবং আদিম সমাজে একে কোনো অশ্লীল দৃষ্টিকোণ থেকে তৈরি করা হয়নি। বিতর্ক যাই হোক নাম আর পাল্টায়নি।

আসলে আমরা যতই বিতর্ক করি, যতই শালীনতার চশমায় দেখি, ইতিহাস বদলানো যাবে না। অতীতকে বর্তমানের নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে ঢেকে না রেখে, তার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে বোঝার চেষ্টা করাই সভ্যতার জন্য মঙ্গলজনক।