পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে নারীদের পিরিয়ড ও প্রজননস্বাস্থ্য নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা সামাজিকভাবে অস্বস্তিকর ও প্রায় নিষিদ্ধ একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। তবে দুই তরুণ আইনজীবীর আইনি লড়াইয়ের পর দেশটিতে এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে সরকার স্যানিটারি পণ্যের ওপর আরোপিত ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
পাকিস্তানের সরকার সম্প্রতি জাতীয় বাজেটে স্যানিটারি প্যাড ও অন্যান্য স্যানিটারি পণ্যের ওপর থেকে ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই করকে ‘পিরিয়ড ট্যাক্স’ নামে সমালোচনা করে আসছিলেন অধিকারকর্মীরা। তাদের দাবি ছিল, নারীদের জন্য প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসামগ্রীকে বিলাসপণ্য হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।
পাকিস্তানে নারীদের মাসিক একটি স্বাভাবিক শারীরিক প্রক্রিয়া হলেও নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার এখনো অনেকের নাগালের বাইরে। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে মাত্র ১২ শতাংশ নারী বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত স্যানিটারি পণ্য ব্যবহার করেন। বাকি অধিকাংশ নারী কাপড় বা অন্যান্য অস্বাস্থ্যকর উপকরণের ওপর নির্ভর করেন, যা বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
অধিকারকর্মীদের মতে, স্যানিটারি পণ্য ব্যবহারের হার এত কম হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ এর উচ্চ মূল্য। এতদিন এসব পণ্যের ওপর ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর এবং আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ ছিল। অন্যান্য কর যুক্ত হয়ে অনেক ক্ষেত্রে নারীদের এসব পণ্যের জন্য প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হতো।
এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে গত বছরের অক্টোবরে আদালতের দ্বারস্থ হন দুই তরুণ আইনজীবী আহসান জাহাঙ্গীর খান ও মাহনুর ওমর। তারা সরকারের বিরুদ্ধে একটি সাংবিধানিক মামলা করেন। মামলায় স্যানিটারি পণ্যের ওপর আরোপিত কর প্রত্যাহার এবং এসব পণ্যকে বিলাসপণ্য নয়, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জানানো হয়।
মামলায় তারা যুক্তি দেন, অতিরিক্ত করের কারণে স্যানিটারি পণ্যের দাম সাধারণ নারীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। এর ফলে নারীদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তারা আরও বলেন, এই করব্যবস্থা পাকিস্তানের সংবিধানের সমতার নীতির সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।
মামলার পর আদালত সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চায়। জবাবে সরকার প্রথমে দাবি করেছিল, স্যানিটারি পণ্যের ওপর আরোপিত কর বৈষম্যমূলক নয়। সরকারের মতে, এই কর থেকে পাওয়া অর্থ বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা হয়।
তবে কয়েক মাসের মধ্যে সরকারের অবস্থানে পরিবর্তন দেখা যায়। গত সপ্তাহে উপস্থাপিত জাতীয় বাজেটে স্যানিটারি পণ্যের ওপর থেকে ১৮ শতাংশ বিক্রয় কর প্রত্যাহারের ঘোষণা দেওয়া হয়।
পাকিস্তানের অর্থমন্ত্রী মোহাম্মদ আওরঙ্গজেব বলেন, স্যানিটারি পণ্য নারীদের স্বাস্থ্য, মর্যাদা এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এসব পণ্যের ওপর কর প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে মামলার আবেদনকারী দুই আইনজীবী বলছেন, এটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও লড়াই এখনো শেষ হয়নি। তাদের দাবি, শুধু বিক্রয় কর নয়, স্যানিটারি পণ্য উৎপাদনের কাঁচামালের ওপর আরোপিত শুল্কসহ সব ধরনের কর বাতিল করতে হবে। তাহলেই এসব পণ্যের দাম আরো কমবে এবং সাধারণ নারীদের নাগালের মধ্যে আসবে।
অধিকারকর্মীরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কর প্রত্যাহারের পরও স্যানিটারি পণ্যের দাম অনেক নারীর জন্য বেশি থেকে যেতে পারে। কারণ পাকিস্তানের প্রায় ৪৫ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করেন। তাদের অনেকের জন্য এক প্যাকেট স্যানিটারি প্যাড কিনতেও দিনের আয়ের বড় অংশ খরচ করতে হয়।
তবে পর্যবেক্ষকদের মতে, এই আইনি লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন শুধু কর প্রত্যাহার নয়। এর মাধ্যমে পাকিস্তানে প্রথমবারের মতো পিরিয়ড, নারীর স্বাস্থ্য ও মাসিককালীন স্বাস্থ্যসুরক্ষা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের সামাজিক ট্যাবু ভাঙতে এবং এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে এই আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এদিকে মামলাটি এখনো আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের পরও মামলার চূড়ান্ত শুনানি বাকি আছে। আবেদনকারী দুই আইনজীবী আশা করছেন, আদালত ভবিষ্যতে স্যানিটারি পণ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কর ও শুল্ক বাতিলের নির্দেশ দিতে পারে। তাদের ভাষায়, নারীদের জন্য স্যানিটারি পণ্য পুরোপুরি সহজলভ্য না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই লড়াই চলবে।






