২১ বছর বয়সী গ্যাভিন হিঙ্কলে আর তার বাগদত্তা ২০ বছর বয়সী ম্যাডেলিন ফক্স তখন স্বপ্নে উড়ছিলেন, ভালোবাসার ওড়া। মাত্র এক সপ্তাহ পর তাদের বিয়ে। সে অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা, সামনে পড়ে থাকা গোটা জীবন সাজানোর গল্প- সব মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। হঠাৎ একটি ফোর্ড গাড়ি যমদূত হয়ে এসে তাদের বহনকারী টেসলার মাঝ বরাবর ধাক্কা দেয়। দুমড়ে-মুচড়ে যায় তাদের গাড়িটি। দুমড়ে মুচড়ে যায় দুই তরুণ প্রাণের স্বপ্নও। গ্যাভিন স্বপ্ন থেকে স্বপ্নে হারিয়ে যান। ম্যাডেলিন বেঁচে আছেন, তবে বেঁচে না থাকলেই বোধহয় ভালো হতো। স্বপ্ন হারিয়েছেন, প্রিয়তম চলে গেছে চিরতরে, নিজের জীবন আটকে গেছে বিছানায়। কিছুদিন কোমায় থেকে ম্যাডেলিন এখন স্থায়ী পঙ্গুত্বের শিকার।
যে গাড়িটি যমদূত হয়ে এসেছিল সেটি চালাচ্ছিলেন গ্লিন উইলবার্ন নামক একজন ডেপুটি শেরিফ। তিনিও রাস্তায় একটি গুলির খবর পেয়ে সাইরেন বাজিয়ে, লাল বাতি জ্বালিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটছিলেন। অবশ্য দুর্ঘটনার ঠিক আগে তিনি জানতে পারেন, তার আগেই অন্য পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌছে গেছে এবং সন্দেহভাজন গাড়িটিও আর সেখানে নেই।
একজন দায়িত্বরত ডেপুটি শেরিফের সিগনাল অমান্য করা গাড়ির ধাক্কায় নিহত হয়েছেন একজন, গুরুতর আহত হয়েছেন আরো একজন। তাই ঘটনাটি তুমুল আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনাটি ঘটেছে ক্যালিফোর্নিয়ার বিউমন্ট এলাকায়। গত সেপ্টেম্বরে এই দুর্ঘটনার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। তবে ঘটনার ৯ মাস পর নতুন করে আবার আলোচনা শুরু হয়েছে, কারণ রিভারসাইড কাউন্টি অফিসের ডেপুটি শেরিফ ৪২ বছর বয়সী উইলবার্নের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনুষ্ঠানিকভাবে আমলে নিয়ে তার বিচার শুরুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অসতর্ক গাড়ি চালিয়ে হত্যা এবং অসতর্ক গাড়ি চালিয়ে গুরুতর আহত করার অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার ১৪ বছরের কারাদন্ড হতে পারে।
গত সপ্তাহে রিভারসাইড কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিস থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বিচার শুরুর কথা জানিয়ে বলা হয়, উইলবার্নকে প্রশাসনিক ছুটিতে রাখা হয়েছে এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিস জানায়, ‘একটি গুলির খবর পেয়ে উইলবার্ন বিউমন্ট থেকে ক্যালিমিসায় যাচ্ছিলেন। চেরি ভ্যালি বুলেভার্ড দিয়ে আনুমানিক ঘণ্টায় ১০০ মাইল গতিতে যাওয়ার সময় উইলবার্ন একটি ইন্টারসেকশনে প্রবেশ করেন এবং সিগনাল অমান্য করে ঘণ্টায় প্রায় ৭১ মাইল গতিতে চলা একটি বেসামরিক গাড়িকে পাশ থেকে ধাক্কা দেন। ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির অফিসের দায়ের করা ফৌজদারি অভিযোগে বলা হয়, উইলবার্ন চরম অবহেলার সাথে গাড়ি চালাচ্ছিলেন। তিনি সিট বেল্ট পড়া ছিলেন না। তদন্তে দেখা গেছে, ধাক্কা লাগার ঠিক আগ মুহূর্তে উইলবার্ন সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা করেছিলেন, স্টিয়ারিং হুইলটি ডানদিকে ঘুরিয়েছিলেন, এক্সিলারেটর থেকে পা সরিয়ে নিয়েছিলেন, ব্রেক চেপেছিলেন, ফলে গতি অনেকটাই কমে এসেছিল। তারপরও অতিরিক্ত গতির কারণে তিনি সিগনালে থামতে পারেননি।
ক্যালিফোর্নিয়া হাইওয়ে পেট্রোলের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘উইলবার্নের অবহেলাই ছিল চালক গ্যাভিনের মৃত্যু এবং যাত্রী ম্যাডেলিনের গুরুতর আঘাতের কারণ।’ গ্যাভিনের পরিবার ডিস্ট্র্রিক্ট অ্যাটর্নির এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেছেন, আইনের লোকের বেপরোয়া কর্মকান্ড ঠেকাতে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। একজন দায়িত্বরত ডেপুটি শেরিফের বিরুদ্ধে হতার মত গুরুতর অভিযোগ আমলে নেয়া প্রমাণ করে, আইন সবার জন্য সমান। তবে একইসঙ্গে এই ঘটনায় বেশকিছু বিষয় সামনে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান? দুর্ঘটনায় উইলবার্ন নিজেও আহত হয়েছিলেন। তবে তার আঘাত গুরুতর ছিল না। কিন্তু দুর্ঘটনার পর আসা উদ্ধারকারীরা গুরুতর আহত গ্যাভিন ও ম্যাডেলিনকে ফেলে সামান্য আহত হওয়া ডেপুটি শেরিফকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারা উইলিবার্নকেই আগে হাসপাতালে নিয়ে যায়। অথচ দ্রুত হাসপাতালে নিতে পারলে গ্যাভিন বেঁচে যেতে পারতেন, ম্যাডেলিনের ক্ষতিও অনেক কম হতে পারতো। এখানে আইনের ব্যত্যয় ঘটেছে বলে অনেকে মনে করেন।
একজন দায়িত্বরত ডেপুটি শেরিফের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের স্পর্শকাতরতার বিষয়টিও মাথায় আছে প্রসিকিউটরদের। রিভারসাইড কাউন্টির জেলা অ্যাটর্নি মাইকেল হেস্ট্রিন বলেছেন, ‘যখন কোনো মামলায় কর্মরত আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তা জড়িত থাকেন, তখন সেই ঘটনার পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করা আমাদের দায়িত্ব। যার মধ্যে রয়েছে যে ঘটনা শুনে ডেপুটি শেরিফ ছুটে যাচ্ছিলেন তার ধরন, ডেপুটি শেরিফের প্রতিক্রিয়া এবং জরুরি যানবাহন পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনি মানদণ্ড।’ তবে দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত ম্যাডেলিনের পরিবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘আইন সবার জন্য সমান। কোনো ব্যাজ, পদবি বা অবস্থান কাউকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে রাখতে পারে না, বিশেষ করে যখন কারো বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের ফলে এমন বিধ্বংসী পরিণতি ঘটে।’ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘গ্যাভিন এবং ম্যাডেলিনের সাথে যা ঘটেছে তা ঠেকানো সম্ভব ছিল। ডেপুটি শেরিফকে উল্লেখযোগ্য কর্তৃত্ব এবং দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি জরুরি যানবাহন চালানোর সাথে সম্পর্কিত বাধ্যবাধকতাগুলো বুঝতেন। আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তারা অবশ্য কিছু আইনী বিশেষ অধিকার পান। কিন্তু সে বিশেষ অধিকারগুলো কেবল তখনই কার্যকর হয়, যখন অন্যদের নিরাপত্তার প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে তা প্রয়োগ করা হয়।’
এ মামলার শুনানির তারিখ এখনও ঠিক হয়নি। তবে সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তার পাওয়া বিশেষ অধিকার, জরুরি যানবাহন পরিচালনার নীতি, উদ্ধারকারীদের অগ্রাধিকার নীতি- এমন অনেকগুলো গুরুতর বিষয় এখানে নিষ্পত্তি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গ্যাভিন ও মাডেলিনের পরিবারও ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন। ম্যাডেলিনের বাবা-মা এক বিবৃতিতে বলছেন, ‘আশা করি এ বিচার একটি স্পষ্ট বার্তা দেবে যে, যাদের ওপর জনগণকে রক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তাদের কর্মকাণ্ড যখন অকল্পনীয় ক্ষতির কারণ হয়, তখন তাদেরও অবশ্যই জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।’




