গাজায় যুদ্ধ চলাকালে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ ও নিরাপত্তা বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে। এর ফলে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। একই সঙ্গে অধিকৃত পশ্চিম তীরেও যুদ্ধাপরাধ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের একটি স্বতন্ত্র তদন্ত কমিশন।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, পূর্ব জেরুজালেম ও ইসরায়েল বিষয়ক জাতিসংঘের স্বতন্ত্র আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন। প্রতিবেদনে ২০২৩ সালের সাত অক্টোবর হামাসের হামলার পর শুরু হওয়া যুদ্ধ থেকে ফিলিস্তিনি শিশুদের ওপর সংঘটিত বিভিন্ন ঘটনার বিশদ পর্যালোচনা করা হয়েছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, গাজা যুদ্ধে নিহতদের প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের সাত অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সাত অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত ২০ হাজার ১৭৯ ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। কমিশনের চেয়ারম্যান শ্রীনিবাসন মুরালিধর বলেন, তদন্তে পাওয়া প্রমাণ থেকে দেখা যাচ্ছে যে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ফিলিস্তিনি শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করেছে এবং হত্যা করেছে। তার মতে, শিশুদের বিরুদ্ধে এই ধরনের হামলা শুধু প্রাণহানিই ঘটায়নি, বরং ফিলিস্তিনি জনগণের ভবিষ্যৎ ও টিকে থাকার সক্ষমতাকেও দুর্বল করেছে।
এর আগে গত সেপ্টেম্বরেও একই কমিশন এক প্রতিবেদনে অভিযোগ করেছিল যে, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালিয়েছে। সেই প্রতিবেদনে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুসহ কয়েকজন শীর্ষ ইসরায়েলি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এসব কর্মকাণ্ডে উসকানি দেওয়ার অভিযোগও আনা হয়েছিল। তবে ইসরায়েল শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। নতুন প্রতিবেদন প্রকাশের পর জেনেভায় ইসরায়েলের মিশন এক বিবৃতিতে জানায়, তারা এই প্রতিবেদন সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করছে। ইসরায়েলের ভাষ্য, প্রতিবেদনটি একপেশে এবং এতে হামাসের কর্মকাণ্ড ও কৌশলকে উপেক্ষা করা হয়েছে। তারা দাবি করেছে, ইসরায়েল সব সময় শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় এবং ইচ্ছাকৃতভাবে শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার অভিযোগ ভিত্তিহীন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজায় আগের যেকোনো বড় সংঘাতের তুলনায় এবার শিশু মৃত্যুর হার বেশি ছিল। তুলনামূলক তথ্য তুলে ধরে কমিশন বলেছে, ২০০৮-০৯ এবং ২০১৪ সালের গাজা সংঘাতে শিশুদের মৃত্যু মোট হতাহতের প্রায় ২৪ শতাংশ ছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধে সেই হার বেড়ে প্রায় ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে। কমিশনের মতে, শিশু হতাহতের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়লেও ইসরায়েলি বাহিনী ঘনবসতিপূর্ণ আবাসিক এলাকায় শক্তিশালী বিস্ফোরক ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম অস্ত্র ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন অনেক হামলা হয়েছে যেখানে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক শিশু নিহত হয়েছে। কমিশনের মতে, এসব ঘটনা ইঙ্গিত দেয় যে শিশুদের ওপর হামলা কেবল দুর্ঘটনাবশত ঘটেনি। কমিশনের মতে, শিশুদের একটি গোষ্ঠী হিসেবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। কারণ ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী পুরো বেসামরিক জনগণকেই হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মনে করত। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, যুদ্ধের কারণে গাজার শিশুদের জীবন ও বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নিয়মিত বোমা হামলা, বারবার বাস্তুচ্যুতি, খাদ্য ও ওষুধের সংকট এবং মানবিক সহায়তা প্রবেশে বাধার কারণে অনেক শিশু অপুষ্টি ও অনাহারের শিকার হয়েছে। এর ফলে এমন অনেক মৃত্যু ঘটেছে, যা প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। কমিশন বলছে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় নবজাতকদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও কমে গেছে। হাসপাতাল ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে হামলার কারণে গর্ভপাতের ঘটনাও বেড়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, গাজার প্রায় সব শিশুই কোনো না কোনো মাত্রার মানসিক আঘাতের শিকার হয়েছে এবং তাদের মানসিক সহায়তা প্রয়োজন। তবে ইসরায়েল দাবি করেছে, প্রতিবেদনে টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা, চিকিৎসাকর্মীদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া এবং অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপনের মতো উদ্যোগগুলোর কথা উল্লেখ করা হয়নি। একই সঙ্গে তারা অভিযোগ করেছে, হামাস মানবিক সহায়তা ও হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ জ্বালানি অন্য কাজে ব্যবহার করে। যদিও হামাস এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের পরিস্থিতিও তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে। কমিশন বলেছে, সেখানে ফিলিস্তিনি শিশুদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এ ছাড়া গণগ্রেপ্তার ও আটক অভিযানের সময় নির্যাতন, যৌন নির্যাতন এবং লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে আটক ফিলিস্তিনি ছেলেশিশুদের সঙ্গে নিয়মিত দুর্ব্যবহার করা হয়েছে বলে কমিশনের দাবি। তাদের জোর করে কাপড় খুলতে বাধ্য করা, মারধর করা এবং খাবার থেকে বঞ্চিত করার মতো ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের মতে, এসব কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের মধ্যে পড়ে। বিশেষ করে নির্যাতন এবং এমন আচরণ, যা গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতির কারণ হয়। তবে ইসরায়েল এই অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটির দাবি, পশ্চিম তীরে নিরাপত্তা বাহিনীর পদক্ষেপগুলো নিয়মিত নিরাপত্তা হুমকি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড মোকাবিলার অংশ। তাদের মতে, প্রতিবেদনে পরিস্থিতির প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়নি।




