kalerkantho

শুক্রবার । ১২ আগস্ট ২০২২ । ২৮ শ্রাবণ ১৪২৯ । ১৩ মহররম ১৪৪৪

দেশিদের পায়ে গোলের হাহাকার

অনলাইন ডেস্ক   

২ জুলাই, ২০২২ ১৩:২৫ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



দেশিদের পায়ে গোলের হাহাকার

আরেকটি প্রিমিয়ার ফুটবল লিগ শেষ হওয়ার পথে। কিন্তু এই লিগ দেশের ফুটবলে নতুন কিছু যোগ করতে পারেনি। বিদেশি ফুটবলারে সুসজ্জিত লিগে দেশি ফুটবলাররা আরেকটি মৌসুম পার করেছেন। পারফরম্যান্সের বিচারে নিজেদের আলাদা করতেও পারবেন না।

বিজ্ঞাপন

তাই জাতীয় দলের চেহারায়ও আলাদা আকর্ষণ যোগ হয় না। ফুটবলের এই মলিন চেহারার কারণ খোঁজার চেষ্টা করেছেন সনৎ বাবলা। আজ থাকছে শেষ পর্ব।

যেকোনো ফুটবল দলের সেন্টার ফরোয়ার্ডকে নিয়ে থাকে বাড়তি আকর্ষণ। তিনি গোল করেন, তাই আলাদা নজর থাকে তাঁর ওপর। লাল-সবুজের দলে এই পজিশনের মর্যাদাহানি হয়েছে বেশ। তাঁকে ঘিরে আকর্ষণ ও প্রত্যাশা কোনোটিই থাকে না।

গত দেড় দশকের পরম্পরায় বাংলাদেশ দলে এখনো গোলের মানুষের সংকট।
জাতীয় দলের কোচেরও অজানা নয় স্ট্রাইকার সংকটের কথা। তাই ট্রেনিংয়ে যাঁকে পছন্দ হয়, তাঁকে খেলিয়ে দেন ওই পজিশনে। সুবাদে সর্বশেষ এশিয়া কাপ বাছাইয়ে লাল-সবুজের জার্সিতে অভিষেক হয়ে গেল সাজ্জাদ হোসেনের। এবং যথারীতি গোলহীন। ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ ও টুর্নামেন্টে তিন ম্যাচে প্রথম একাদশে শুরু করেও নিজেকে অকার্যকর প্রমাণ করেছেন ২৭ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড। আসলে কে কার্যকর হবেন, ঘরোয়া লিগ দেখে তা বোঝার উপায় নেই। আলাদা করে চোখে পড়ে না গোলের সেরকম কোনো দেশি কারিগরকে। বাংলাদেশের নাগরিকত্ব পাওয়া নাইজেরিয়ান ফরোয়ার্ড এলিটা কিংসলে বাদে আর কাউকে আলাদা করা যাবে না গুণে মানে।

১০ ম্যাচে কিংসলের গোল ছয়টি। ম্যাচের হিসাবে গোলের সংখ্যাটা ভালো। পরের পরিসংখ্যানে এই পারফরম্যান্স হয়ে যাচ্ছে দুর্দান্ত। কারণ ১০ ম্যাচের আটটিতেই বসুন্ধরা কিংসের এই ফরোয়ার্ড বদলি হয়ে নামেন এবং মোট ২৪৬ মিনিট খেলে করেছেন ছয় গোল! গোলের সঙ্গে তাঁর বিশেষ সখ্যর পরও লাল-সবুজের জার্সি ভাগ্যে জোটেনি। কারণ হিসেবে বাফুফে কোচের অপছন্দ, তাঁর ৩২ বছর বয়সের কথা বলা হলেও আসল সমস্যা অন্য জায়গায়। ফিফার নিয়মে তাঁর ‘ন্যাচারালাইজেশন’ নিয়ে সন্দেহ থাকায় ঝুঁকি নিচ্ছে না বাফুফে।

চলমান লিগে গোলের পরিসংখ্যানে এরপর আছেন সাইফ স্পোর্টিংয়ের ফয়সাল আহমেদ ফাহিম ও আবাহনীর জুয়েল রানা। সর্বশেষ জাতীয় দলের সদস্য ২০ বছর বয়সী ফাহিম ১৭ ম্যাচে করেছেন পাঁচ গোল। আর ১৪ ম্যাচ খেলা জুয়েল রানার গোলসংখ্যাও একই। এরপর চার গোল করে আছে বসুন্ধরা কিংসের সুমন রেজা (১৩ ম্যাচে), সাইফের সাজ্জাদ হোসেন (১৪ ম্যাচে) ও শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের মোহাম্মদ জুয়েলের (১৭ ম্যাচে)। ম্যাচের সঙ্গে গোলসংখ্যাটা বেমানান বৈকি। এঁদের মধ্যে সেন্টার ফরোয়ার্ড হিসাব করলে সুমন ও সাজ্জাদ, বাকিরা সবাই খেলেন উইংয়ে।

কিন্তু মূল সমস্যা সেন্টার ফরোয়ার্ডে। সাইফ স্পোর্টিংয়ের কোচ ডিয়েগো ক্রুসিয়ানি সমস্যার মূলে দেখেন লিগে বিদেশি সেন্টার ফরোয়ার্ডের আধিক্য, ‘সব দলেই বিদেশি সেন্টার ফরোয়ার্ড, দেশি কারো খেলার সুযোগ নেই। অবস্থা বদলাতে লিগের নিয়মে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। ’ বিদেশি সেন্টার ফরোয়ার্ড একটা কারণ, কিন্তু তাঁদের সঙ্গে লড়ে দলে জায়গা করে নেওয়ার কথা বলেন বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। সেই মানের ফুটবলার কি আসলে দেশে আছে? বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক আর্জেন্টাইন কোচ অতীতকে সামনে এনে বলছেন, ‘২০০৫ সালে বাংলাদেশ দলে অনেক ফরোয়ার্ড ছিল। আলফাজ, এমিলি, ফরহাদ, টিপু, কাঞ্চনসহ অনেক বিকল্প ছিল আমার হাতে, সে তুলনায় এখনকার দলে অনেক সংকট। লিগেও দেখছি না সেরকম কাউকে। এখন খুব জরুরি হচ্ছে সারা দেশে ফুটবল চর্চা বাড়ানো এবং ফুটবলার উত্পাদন করা। ঢাকার বাইরে একাডেমির দরকার নেই, নিয়মিত খেলা এবং বাচ্চাদের ট্রেনিং প্রগ্রাম হলেই চেহারা বদলে যাবে। লাতিন আমেরিকায় রাস্তায় খেলেই অনেক ফুটবলার বড় হয়েছে। ’

আশি-নব্বইয়ের দশকে সেরকম উন্মাদনা ছিল এ দেশেও। ফুটবলার আসত ঢাকার বাইরে থেকে। হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতো প্রতিটি পজিশনে। সেই দিন গত, এখন একজন সেন্টার ফরোয়ার্ড খুঁজে বের করাই কঠিন। শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্রের কোচ জুলফিকার মাহমুদ মিন্টুও কাউকে দেখছেন না, ‘উঠতি কোনো স্ট্রাইকার আমার চোখে পড়েনি। বক্সে ফার্স্ট টাচ ঠিক না হলে গোলের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে স্ট্রাইকারের। চলতি বলে ভলি মারতে না জানলে সুযোগ শেষ। পজিশন সেন্স না থাকলে গোল পাওয়া কঠিন। বক্সে অফ দ্য বল খেলতে জানলে সতীর্থের গোলের সুযোগ তৈরি হয়। শুধু স্ট্রাইকার কেন, আমাদের ফুটবলারদের গলদ গোড়ায়। তারা ভুল শিখে বড় হয়, তাই শীর্ষ পর্যায়ে গিয়ে পারে না। ’

স্ট্রাইকারের এমন আকালে জাতীয় দলের সাবেক কোচ সাইফুল বারী টিটু বিকল্প পথে হাঁটার পরামর্শ দিচ্ছেন, ‘আমাদের স্ট্রাইকার সংকট নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে যখন এই শূন্যতা তখন বিকল্প পদ্ধতিতে হাঁটতে হবে। সারা বিশ্বে স্ট্রাইকারদের কদর বেশি, কারণ গোল করতে লাগে বিশেষ দক্ষতা। দক্ষ স্ট্রাইকার তৈরির জন্য ১০-১১ বছর বয়সী বাচ্চাদের নিয়ে বিশেষ কিছু করতে হবে। শারীরিক উচ্চতা ও কিছু বেসিক টেকনিক দেখে বাছাই করা বাচ্চাদের একদম পদ্ধতিগত ট্রেনিংয়ে রেখে ভবিষ্যতের স্ট্রাইকার তৈরির একটা প্রগ্রাম সাজানো যায়। ’ এ রকম বিকল্প উদ্যোগ না নিলে দেশিদের পায়ে গোলের হাহাকার লেগেই থাকবে। কোটি কোটি টাকার লিগ শুধু বিদেশি সৌরভই ছড়াবে।



সাতদিনের সেরা