মাঠের ফুটবলে আর্জেন্টিনার ফুটবলশৈলী যেমন মুগ্ধতা ছড়ায়, তেমনি বিতর্ক আর কুখ্যাতিও যেন তাদের ইতিহাসের সমান্তরাল পথচলা। ‘যেকোনো মূল্যে জিততেই হবে’—লাতিন পরাশক্তিদের এই আগ্রাসী মানসিকতা বিশ্বমঞ্চে বারবার জন্ম দিয়েছে চরম বিতর্কের।
কখনো রেফারিকে ফাঁকি দিয়ে হাত দিয়ে গোল করে ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ কীর্তি, কখনো আবার সামরিক জান্তার ছায়ায় পেরুকে গোলবন্যায় ভাসানোর কালো অধ্যায়। ফিফা যেখানে ‘মাই গেম ইজ ফেয়ার প্লে’ স্লোগানে পরিচ্ছন্ন ফুটবলের জয়গান গায়, সেখানে আর্জেন্টাইন ফুটবলের ইতিহাস যেন অনেক সময়ই হেঁটেছে উল্টো পথে। আর এই সব বিতর্ককে ছাপিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিতর্কিত ঘটনা হিসেবে টিকে আছে ১৯৯০ বিশ্বকাপের সেই ‘হলি ওয়াটার কেলেঙ্কারি’।
১৯৯০ সালের ২৪ জুন, ইতালির তুরিনে রাউন্ড অব সিক্সটিনের হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। তৎকালীন ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা সেবার ইনজুরি আর অফ-ফর্মে জর্জরিত। প্রথম ম্যাচেই ক্যামেরুনের কাছে হেরে কোনোমতে গ্রুপ পর্বের তৃতীয় দল হয়ে নকআউটে পা রেখেছিল ম্যারাডোনার দল। অন্যদিকে, কোচ সেবাস্তিও ল্যাজারনির অধীনে গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচ জিতে উড়ছিল ব্রাজিল। তাই মাঠের লড়াইয়ে ফেভারিট ছিল সেলেসাওরাই।
খেলার শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার ওপর চড়াও হয়ে খেলতে থাকে ব্রাজিল। দুঙ্গা ও অ্যালেমাওর মিডফিল্ড দাপটে কোণঠাসা ছিল আর্জেন্টিনা। গোলপোস্টের বাধায় গোল পাচ্ছিল না সেলেসাওরা। ব্রাজিলের অন্যতম প্রধান অস্ত্র ছিলেন লেফটব্যাক ব্রাঙ্কো, যিনি একা হাতে ম্যারাডোনাকে বোতলবন্দি করে রেখেছিলেন।
দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনার পেদ্রো ত্রগলিও ইনজুরিতে পড়লে বেশ কিছুক্ষণ খেলা বন্ধ থাকে। আর মাঠের এই বিরতিই বদলে দেয় ম্যাচের ভাগ্য! খেলা শুরু হতেই দেখা গেল, আগের সেই চনমনে ব্রাঙ্কো হুট করেই ঝিমিয়ে পড়েছেন। এই সুযোগে ম্যাচের ৮১ মিনিটে সেই ব্রাঙ্কোকে অনায়াসে ফাঁকি দিয়ে ডিফেন্স ভেঙে ক্লদিও ক্যানিজিয়াকে পাস বাড়ান ম্যারাডোনা। গোলকিপার তাফারেলকে একা পেয়ে বল জালে জড়াতে ভুল করেননি ক্যানিজিয়া। স্রোতের বিপরীতে ১-০ গোলে ম্যাচ জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে যায় আর্জেন্টিনা।
ম্যাচ শেষেই ব্রাঙ্কো অভিযোগ করেছিলেন, খেলা বন্ধ থাকার সময় আর্জেন্টিনার ফিজিও মিগুয়েল ডি লরেঞ্জোর কাছ থেকে জল নিয়ে পান করার পরেই তার মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করে। তখন আর্জেন্টিনার মিডিয়া একে ‘পাগলের প্রলাপ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।
কিন্তু দীর্ঘ ১৫ বছর পর, ২০০৫ সালে খোদ ডিয়েগো ম্যারাডোনা আর্জেন্টিনার এক টিভি চ্যানেলে বোমা ফাটান। তিনি স্বীকার করেন, সেদিন ব্রাঙ্কোকে দেওয়া জলের বোতলে আসলেই ঘুমের ওষুধ মেশানো হয়েছিল! এই স্বীকারোক্তির পর তোলপাড় শুরু হয় ফুটবল বিশ্বে। ব্রাজিলের তৎকালীন কোচ ল্যাজারনি একে ‘জঘন্য নোংরা খেলা’ বলে ফিফার কাছে শাস্তির দাবি জানান।
ফরোয়ার্ড বেবেতোও নিশ্চিত করেন, ফিজিও লরেঞ্জো পরে তার কাছে অপরাধ স্বীকার করেছিলেন। যদিও কোচ কার্লোস বিলার্দো ও ফিজিও লরেঞ্জো জনসমক্ষে বিষয়টি অস্বীকার করেন।
ততদিনে ১৫ বছর পেরিয়ে যাওয়ায় ব্রাজিলের ফুটবল ফেডারেশন (সিবিএফ) অফিশিয়াল কোনো নালিশ করেনি। তবে ফুটবলপ্রেমীরা বলেন, প্রকৃতি নিজেই এর বিচার করে দিয়েছিল। এই ঘটনার ঠিক পরের ম্যাচেই (১৯৯০ ফাইনাল) বিতর্কিত পেনাল্টিতে কেঁদে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল ম্যারাডোনাকে। আর ১৯৯৪ বিশ্বকাপে ডোপ টেস্টে পজিটিভ হয়ে নিষিদ্ধ হন তিনি।
অন্যদিকে, প্রতারণার শিকার হওয়া সেই ব্রাজিলই ১৯৯৪ সালে প্রথম দল হিসেবে জিতে নেয় চতুর্থ বিশ্বকাপ।




