মুহূর্তটি হতে পারত পরম আনন্দ আর বাঁধভাঙা উদযাপনের। ঠিক ৪০ বছর আগে নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছিল কানাডা। চার দশক পর ঘরের মাঠে, কানায় কানায় পূর্ণ ভ্যানকুভার স্টেডিয়ামের গর্জনের সামনে কাতারকে ৬-০ গোলে গুঁড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম জয়ের ইতিহাস গড়ল তারা। এই জয়ে শেষ ৩২-এর টিকিটও প্রায় নিশ্চিত ‘দ্য রুকস’দের। কিন্তু এমন এক ঐতিহাসিক ও গৌরবময় দিনকে ম্লান করে দিল ইসমায়েল কোনের এক ক্যারিয়ার হুমকিতে ফেলা ভয়ংকর চোট। পুরো কানাডা শিবিরে এখন আনন্দের চেয়ে কান্নার রোলই বেশি।
ঘটনাটি ঘটে ম্যাচের দ্বিতীয়ার্ধের অষ্টম মিনিটে, কানাডা তখন ৩-০ গোলে এগিয়ে। ২৪ বছর বয়সী তারকা মিডফিল্ডার কোনে বল রিসিভ করার পরপরই কাতারের আসিম মাদিবো অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে তাকে চ্যালেঞ্জ করেন।
কোনে এবং তার আশেপাশের খেলোয়াড়দের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়াই বুঝিয়ে দিচ্ছিল কতটা ভয়াবহ ছিল সেই ফাউল। মাঠে লুটিয়ে পড়া কোনের চোখে-মুখে তখন তীব্র যন্ত্রণার ছাপ, পা ভেঙে যাওয়ার দৃশ্যটি ছিল স্পষ্ট।
সতীর্থরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে ছুটে আসেন, রেফারি দ্রুত খেলা থামিয়ে মেডিকেল টিমকে মাঠে ডাকেন। ওদিকে অপরাধবোধে মাথায় হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন কাতার ডিফেন্ডার মাদিবো। মাঠে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে উত্তেজনা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, হাতাহাতির উপক্রম হয়।
চোটের ভয়াবহতা এতটাই ছিল যে, চলতি বিশ্বকাপ তো বটেই, কোনের ফুটবল ক্যারিয়ারই এখন বড় শঙ্কায়। তবে স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার সময়ও গ্যালারির দিকে তাকিয়ে বুড়ো আঙুল উঁচিয়ে দর্শকদের সান্ত্বনা দিতে দেখা যায় এই অকুতোভয় ফুটবলারকে।
ম্যাচ শেষে অশ্রুসিক্ত চোখে কানাডার কোচ জেসি মার্শ বলেন, ‘ঘটনাটি একদম আমাদের চোখের সামনে ঘটেছে। হাড় ভেঙে যাওয়ার শব্দ আমরা সবাই শুনতে পেয়েছি। আমি এখনো ইসমায়েলের সঙ্গে কথা বলতে পারিনি, ও হাসপাতালে আছে। অস্ত্রোপচারের প্রস্তুতি চলছে।’
মার্শ আরো বলেন, ‘চোটের ধরন দেখে দলের সবাই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে। কোনে আমাদের দলের হৃদপিণ্ড। ওকে হারানো আমাদের জন্য এক বিশাল ক্ষতি।’
তবে কোনের সেই স্ট্রেচারে শুয়ে সমর্থকদের হাত নাড়ার দৃশ্যটি ছুঁয়ে গেছে কোচকে। তিনি বলেন, ‘এটিই ইসমায়েল। আর এই দলটার চরিত্রও অসাধারণ। আমি বছরের পর বছর ধরে এই দলটার মানসিক শক্তির কথা বলে আসছি। সবাই ভেতরে ভেতরে চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমাদের খেলায় মনোযোগ ধরে রাখতেই হতো।’
মনোযোগ তারা ধরে রেখেছিল ঠিকই। কোনের বিদায়ের পর স্তব্ধ গ্যালারি আর মাঠের খেলোয়াড়রা যেন এক সুতোয় গেঁথে গেলেন। কানাডা আরও তিনটি গোল করে কাতারের জাল ছিন্নভিন্ন করে দেয়।
দ্বিতীয়ার্ধের পানিবিরতির (হাইড্রেশন ব্রেক) সময় ডাগআউটে কেঁদে ফেলেন কোচ মার্শ। আর কোনের বদলি হিসেবে নামা নাথান সালিবা দলের চতুর্থ গোলটি করার পর কোনের জার্সি উঁচিয়ে ধরে সতীর্থের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করেন।
মার্শ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, ‘ও আগের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ফিরবে এবং দুর্দান্ত ক্যারিয়ার গড়বে। ওয়াটার ব্রেকের সময় আমি ছেলেদের বলেছিলাম—কোনে চাইত আমরা ম্যাচটা শেষ করি, ছেলেরা সেটাই করেছে।’
মার্শ নিশ্চিত করেছেন যে, কাতারের মাদিবো ম্যাচ শেষে কানাডার ড্রেসিংরুমে এসে কোনের কাছে ক্ষমা চেয়েছেন। মার্শের বলেন, ‘ও ড্রেসিংরুমে এসেছিল দুঃখপ্রকাশ করতে। আমার মনে হয় না ও ইচ্ছা করে এত ভয়ংকর ফাউল করেছে। আমি ওকে দোষ দিচ্ছি না, তবে ওদের ড্রেসিংরুমের বেঞ্চের আচরণ আমি বুঝতে পারিনি।’
এই ফাউলের কারণে মাদিবো লাল কার্ড দেখেন। এর আগে প্রথমার্ধে তাজন বুকাননকে ফাউল করে লাল কার্ড পেয়েছিলেন হোমাদ আল আমিন। ফলে ৯ জনের দল নিয়ে ম্যাচ শেষ করতে হয় কাতারকে।