• ই-পেপার

বিদেশি টি-টোয়েন্টি লিগে খেলার অনুমতি চান রবিন উথাপ্পা

ফের বাড়তি সুবিধা? মেসির রেকর্ড গড়া গোল নিয়ে প্রশ্ন

ক্রীড়া ডেস্ক
ফের বাড়তি সুবিধা? মেসির রেকর্ড গড়া গোল নিয়ে প্রশ্ন

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা এফএ কাপ ফুটবল দুনিয়ায় যেখানেই চোখ রাখা যাক না কেন, ‘ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি’ বা ভিএআর যেন প্রতি সপ্তাহেই নতুন কোনো বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে। এবার তো মঞ্চটা আরও বড়, ১০৪ ম্যাচের মহাকাব্যিক ফিফা বিশ্বকাপ!

বিশ্বকাপের বড় ম্যাচগুলোর প্রধান প্রধান বিতর্কিত ঘটনা, ভিএআর প্রোটোকল এবং ইএসপিএন-এর চুলচেরা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে আর্জেন্টিনা বনাম অস্ট্রিয়া ম্যাচের একটি বহুল আলোচিত ঘটনা।

সেদিন মাঠে লিওনেল মেসি যখন নিজের রেকর্ড ভাঙা বিশ্বকাপ গোলটি উদযাপন করছিলেন, তখন অস্ট্রিয়া শিবিরের চোখে-মুখে ছিল চরম হতাশা আর ক্ষোভ। তাদের দাবি ছিল, গোলের ঠিক আগের মুহূর্তে বিল্ড-আপে অস্ট্রিয়ান ডিফেন্ডার জাভার শ্লাগারের ওপর ফাউল করেছিলেন আর্জেন্টিনার আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। আর সেই ফাউল থেকেই মূলত বল কেড়ে নিয়ে গোলটি পায় আর্জেন্টিনা। তবে মাঠে থাকা মূল রেফারি অস্ট্রিয়ার সেই আবেদন নাকচ করে গোলের বাঁশি বাজান।

অন-ফিল্ড রেফারির দেওয়া গোলের সিদ্ধান্তটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে ভিএআর এবং এটিকে সম্পূর্ণ সঠিক গোল হিসেবে ঘোষণা করে।

গোল হওয়ার আগের অ্যাটাকিং ফেজটি (আক্রমণের মুহূর্ত) অত্যন্ত সতর্কতার সাথে পর্যবেক্ষণ করে ভিএআর প্যানেল। তারা নিশ্চিত হন যে, গোলের বিল্ড-আপে কোনো ফাউল হয়নি। ম্যাক অ্যালিস্টার এবং শ্লাগারের মধ্যকার শারীরিক সংঘর্ষটিকে মাঠের রেফারির কোনো ‘স্পষ্ট ভুল’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। আর তাই মাঠের রেফারিকে অন-ফিল্ড রিভিউ (পিচসাইড মনিটর দেখার) দেওয়ার মতো কোনো যৌক্তিক কারণ খুঁজে পায়নি ভিএআর।

ক্রীড়া বিষয়ক সংবাদমাধ্যম ইএসপিএন এর মতে, ম্যাক অ্যালিস্টার ও শ্লাগারের মধ্যকার সেই ধাক্কাধাক্কিতে ভিএআর হস্তক্ষেপ না করে একদম সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছে। কারণ, ঘটনাটি আদৌ ফাউল ছিল কিনা, তা নিয়ে যথেষ্ট বিতর্কের অবকাশ আছে।

সংঘর্ষের মুহূর্তে অস্ট্রিয়ান খেলোয়াড় শ্লাগারের পা মাটিতে শক্ত অবস্থানে ছিল না। বরং তার নিজের শরীরী মুভমেন্ট এবং ভরবেগই ম্যাক অ্যালিস্টারের দিকে ধাবিত হয়েছিল, যা আলটিমেটলি এই শারীরিক সংঘাতের অন্যতম কারণ।

চলতি বিশ্বকাপে ভিএআর-এর হস্তক্ষেপের ন্যূনতম সীমা বেশ উঁচুতে রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মাঠের রেফারিং দল যখন একবার ঘটনাটিকে ফাউল না বলে ইশারা করেছে, তখন শতভাগ নিশ্চিত কোনো ভুল প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত ভিএআর-এর পক্ষে গোল বাতিলের সুপারিশ করার কোনো নিয়ম নেই।

নকআউটে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কে?

ক্রীড়া ডেস্ক
নকআউটে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ কে?
ছবি : রয়টার্স

অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে এক ম্যাচ বাকি থাকতেই বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব বা শেষ ৩২ নিশ্চিত করেছিল বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। আর আজ সকালে জর্ডান-আলজেরিয়া ম্যাচের ফলাফলের পর ‘জে’ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হওয়াটাও নিশ্চিত হয়ে গেছে লিওনেল মেসিদের। গ্রুপসেরা হওয়ার পর এখন ফুটবল দুনিয়ায় তুমুল জল্পনা, রাউন্ড অব ৩২-এ কার মুখোমুখি হচ্ছে আলবিসেলেস্তেরা। 

গ্রুপ পর্বের এখনও এক ম্যাচ বাকি থাকলেও টুর্নামেন্টের নিয়ম অনুযায়ী, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় আর্জেন্টিনাকে লড়তে হবে ‘এইচ’ গ্রুপের রানার্সআপ দলের বিরুদ্ধে। আর এই ‘এইচ’ গ্রুপেই রয়েছে স্পেন, উরুগুয়ে, কেপ ভার্দে এবং সৌদি আরব। আগামী শনিবার সকাল ৬টায় এই গ্রুপের শেষ রাউন্ডে মুখোমুখি হবে স্পেন-উরুগুয়ে এবং সৌদি আরব-কেপ ভার্দে। এই দুই ম্যাচের ফলের ওপরই ঝুলে আছে মেসিদের প্রতিপক্ষের ভাগ্য।

চলুন দেখে নেওয়া যাক জটিল সব সমীকরণে আর্জেন্টিনার সামনে পড়তে পারে কোন দল—

স্পেন হবে যদি
উরুগুয়ে যদি শেষ ম্যাচে স্পেনকে হারিয়ে দেয় এবং অন্য ম্যাচে সৌদি আরব ও কেপ ভার্দে ড্র করে, তবে স্পেন রানার্সআপ হিসেবে আর্জেন্টিনার সামনে পড়বে। এমনকি উরুগুয়ে জিতলে এবং সৌদি আরব কেপ ভার্দেকে হারালেও স্প্যানিশদের রানার্সআপ হওয়ার পথ তৈরি হতে পারে।

কেপ ভার্দে হবে যদি
স্পেন যদি উরুগুয়েকে হারিয়ে দেয় এবং কেপ ভার্দে সৌদিকে হারায়, তবে স্পেন হবে গ্রুপসেরা আর কেপ ভার্দে রানার্সআপ। আবার স্পেন জিতলে এবং কেপ ভার্দে-সৌদি ম্যাচ ড্র হলেও আফ্রিকার দেশটিই হবে আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ।

সৌদি আরব হবে যদি 
স্পেন উরুগুয়েকে হারালে এবং সৌদি আরব কেপ ভার্দেকে বড় ব্যবধানে হারালে রানার্সআপ হবে সৌদি। আবার স্পেন-উরুগুয়ে ম্যাচ ড্র হলে এবং সৌদি আরব কেপ ভার্দেকে হারালেও সমীকরণ একই থাকবে। সেক্ষেত্রে ২০২২ বিশ্বকাপের পর আবারও বিশ্বমঞ্চে মেসিদের সামনে পড়ার সুযোগ পাবে সৌদি।

উরুগুয়ে হবে যদি
যদি শেষ ম্যাচে উরুগুয়ে এবং কেপ ভার্দে উভয় দলই জয় তুলে নেয়, তবে রানার্সআপ নির্ধারণে আসবে গোল ব্যবধানের হিসাব। বর্তমানে দুই দলেরই গোল ব্যবধান শূন্য এবং গোল সংখ্যাও সমান (২টি করে)।

গোল ও ব্যবধান সমান থাকলে দেখা হবে ‘ফেয়ার প্লে’ বা কার্ডের হিসাব। যেখানে কেপ ভার্দের চেয়ে একটি হলুদ কার্ড কম দেখে এখন পর্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থানে এগিয়ে আছে উরুগুয়ে।

আবার যদি শেষ রাউন্ডের দুটি ম্যাচই ড্র হয়, তাহলেও উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দের মধ্যে গোল পার্থক্য, গোল সংখ্যা, ফেয়ার প্লে এবং শেষ পর্যন্ত ফিফা র‌্যাঙ্কিং বিবেচনা করে রানার্সআপ নির্ধারণ করা হবে।

পয়েন্ট টেবিলের বর্তমান চিত্র বলছে, আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে কেপ ভার্দে। ভোজিনহার নেতৃত্বে আফ্রিকার এই ছোট দেশটি সৌদিকে হারাতে পারলে ইতিহাস গড়ে নকআউটে মেসিদের মুখোমুখি হবে। তবে উরুগুয়ে যদি স্পেনকে স্তব্ধ করে দেয়, তবে নাটকীয়ভাবে নকআউটের শুরুতেই দেখা যেতে পারে আর্জেন্টিনা-স্পেন হাইভোল্টেজ মহারণ! সব উত্তর মিলবে আগামী শনিবার সকাল ৬ টায় গ্রুপ ‘এইচ’-এর শেষ দুটি ম্যাচের ফল হাতে পাওয়ার পর। 
 

ব্রাজিলের বিপক্ষে খারাপ খেললেই মৃত্যু! হুমকিতে যা করে বসলেন কঙ্গোর ফুটবলার

ক্রীড়া ডেস্ক
ব্রাজিলের বিপক্ষে খারাপ খেললেই মৃত্যু! হুমকিতে যা করে বসলেন কঙ্গোর ফুটবলার
সংগৃহীত ছবি

১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের অনুকূলে ফ্রি-কিক, গোলপোস্ট থেকে প্রায় ২৫ গজ দূরে। রেফারি নিকোলাই রাইনিয়া বাঁশি বাজিয়েছেন। ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা তখনও শট নেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নন। রিভেলিনো বলের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বাকি দুই সতীর্থের সাথে কথা বলছেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, তৎকালীন জায়ারের (বর্তমান নাম, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো) তৈরি করা রক্ষণ দেয়ালের একদম ডানপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক খেলোয়াড় হুট করে লাইন ভেঙে বেরিয়ে এলেন। তিনি বুলেটের গতিতে দৌড়ে গিয়ে ব্রাজিলের ফ্রি-কিক নেওয়ার আগেই বলটাকে লাথি মেরে মাঠের অন্য প্রান্তে পাঠিয়ে দিলেন!

মাঠে উপস্থিত প্রত্যেকে, এমনকি তার নিজের সতীর্থরাও এই কাণ্ড দেখে চরম হতবাক হয়ে গেলেন। রেফারি নিজেকে সামলে নিয়ে পকেট থেকে হলুদ কার্ড বের করলেন। ইলুঙ্গা মৃদু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও, ওটা ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক অর্থহীন যুক্তি।

টেলিভিশনে ইংরেজিতে ধারাভাষ্য দেওয়া জন মটসন তখন নিজের বিস্ময় চেপে রাখতে পারছিলেন না। পরবর্তীতে মটসন এই ঘটনাকে ‘আফ্রিকান অজ্ঞতার এক অদ্ভুত মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেন। আর যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বমিডিয়া এটিকে এভাবেই চিত্রায়িত করে এসেছে। কখনো একে বলা হয়েছে ‘আফ্রিকান অপেশাদারিত্ব’, কখনো বা তাদের ডাকা হয়েছে ‘ফুটবলের জোকার’।

এই হাসাহাসির আড়ালে যে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বা সরাসরি দাবিটি ছিল, তা অত্যন্ত বর্ণবাদী এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতায় ভরা। ভাবটা এমন যেন ইলুঙ্গা ফুটবলের নিয়মকানুনই জানতেন না; তিনি মাঠে একটা ফুটবল পড়ে থাকতে দেখেছেন আর লাথি মেরে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছেন!

কিন্তু আসল সত্যটা এর চেয়ে হাজার গুণ আলাদা ছিল। ইলুঙ্গা কোনো আনাড়ি খেলোয়াড় ছিলেন না। তিনি ছিলেন ঘরোয়া, মহাদেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরের একাধিক শিরোপাজয়ী এক অত্যন্ত অভিজ্ঞ ফুটবলার, যিনি জায়ারের হয়ে ১৯৭৪ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতেছিলেন। ১৯৭১ সাল থেকে তিনি জাতীয় দলের নিয়মিত ডিফেন্ডার। এমন একজন মানুষ ফুটবলের সাধারণ নিয়ম জানেন না, এই দাবিটিই ছিল চরম হাস্যকর।

২০১০ সালে বিবিসির কাছে ইলুঙ্গা নিজেই সেই সত্যের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ফুটবলের নিয়মকানুন খুব ভালো করেই জানতাম। আমি ওটা ইচ্ছে করেই করেছিলাম।’ 

দীর্ঘ ৫২ বছর পর চলতি বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গো আবারও বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার আগে পর্যন্ত, বিশ্বমঞ্চে তাদের শেষ স্মৃতি বলতে মানুষ এই ঘটনাটিকেই মনে রেখেছিল। কিন্তু এই তথাকথিত ‘কমেডি’র আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার ট্র্যাজেডি এবং অত্যন্ত জটিল সত্য।

জায়ারের তৎকালীন স্বৈরশাসক মোবুতু সেসে সেকো খুব ভালো করেই বুঝতেন খেলার আন্তর্জাতিক মূল্য কতখানি। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দেশ শাসন করা এই একনায়ক ১৯৭১ সালে কঙ্গোর নাম বদলে রাখেন জায়ার। তার কাছে খেলাধুলা ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ও দেশের প্রচারণার এক মোক্ষম হাতিয়ার। 

জায়ার যখন প্রথম ব্ল্যাক আফ্রিকান দেশ হিসেবে শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে এবং আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতে ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করল, মোবুতু খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন। পুরো স্কোয়াডকে ডেকে পাঠানো হলো রাষ্ট্রপতির বিলাসবহুল প্রাসাদে। আততায়ীর হাতে খুন হওয়ার ভয়ে মোবুতু তখন প্রাসাদ থেকে খুব একটা বের হতেন না।

ফুটবলাররা সেই জাঁকজমক দেখে যেমন মুগ্ধ হয়েছিলেন, তেমনি ভেতরে ভেতরে এক ধরণের অস্বস্তিও কাজ করছিল। জন স্পার্লিং-এর লেখা ‘ডেথ অর গ্লোরি: দ্য ডার্ক হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইয়ে ইলুঙ্গা বলেছিলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া আমাদের অনেকের কাছে মোবুতুর সাথে দেখা করা মানে ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করার মতো ছিল।’

সেই বৈঠকে মোবুতু বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেন। বিশ্বমঞ্চে দেশের গর্ব তুলে ধরার পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে দেওয়া হবে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি এবং নগদ ২০ হাজার ডলার। একই সঙ্গে পশ্চিম জার্মানির মূল আসরে তাদের জন্য অঢেল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হলো। তারা চার্টার্ড বিমানে করে জার্মানিতে নামলেন, বিমানবন্দর থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো ব্র্যান্ড নিউ মার্সিডিজ বাসে করে এক বিলাসবহুল হোটেলে।

কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হলো যখন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারা স্রেফ ‘সরকারি খরচে প্রমোদভ্রমণ’ করতে দলের সঙ্গে বিশাল বহর নিয়ে জার্মানি গিয়ে হাজির হলেন। এই চাটুকার, নিরাপত্তা কর্মী আর স্যুট-টাই পরা আমলাদের ভিড়ে খেলোয়াড়দের জন্য বরাদ্দকৃত পকেটের টাকা বা দৈনিক ভাতা হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল! 

অবস্থা এতটাই বেগতিক ছিল যে, খেলোয়াড়েরা যখন জার্মানি ঘুরে দেখার জন্য নিজেদের ভাতা চাইলেন, দলের যুগোস্লাভিয়ান কোচ ব্লাগোজে ভিদিনিচ তাদের হোটেলের বাইরে বের হতেই নিষেধ করে দিলেন। ডিফেন্ডার শিমেন বোয়াঙ্গা পরবর্তীতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের মনোবল একদম ভেঙে পড়েছিল। আমাদের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কিছুই পূরণ হচ্ছিল না।’

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই তারা স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায়। কেনি ডালগ্লিশ, ডেনিস ল-দের সেই শক্তিশালী স্কটিশ দলের বিরুদ্ধে এই হারটি যথেষ্ট সম্মানজনকই ছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচের আগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিষাক্ত হয়ে ওঠে। যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে জায়ারের সরকারি কর্মকর্তারা এক নজিরবিহীন সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, তাদের দেশের কোচ ভিদিনিচ আসলে নিজের মাতৃভূমির (যুগোস্লাভিয়ার) কাছে জায়ারের সব গেম-প্ল্যান এবং গোপন কৌশল পাচার করে দিয়েছেন! তারা ঠাণ্ডা মাথায় ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের কাছে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে যে কোচ বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমরা ওনাকে আইসোলেশনে (বন্দি) রেখেছি এবং দলে কিছু বড় পরিবর্তন আনছি।’

টাকা চুরি এবং কোচের ওপর এমন মানসিক নির্যাতনের প্রতিবাদে খেলোয়াড়েরা ম্যাচের আগের রাতে ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অন্তত ৮ জন খেলোয়াড় ম্যাচ বয়কট করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন—যা পরবর্তীতে তাদের জন্য আরো বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।

ম্যাচের প্রস্তুতি তো নষ্ট হয়েছিলই, মাঠের পারফরম্যান্স ছিল আরও ভয়াবহ। মাত্র ১৮ মিনিটের মধ্যে জায়ার ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে আইসোলেশন থেকে মুক্ত হয়ে ডাগআউটে ফেরা কোচ ভিদিনিচ এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এক নম্বর গোলরক্ষক কাজাদি মুয়াম্বাকে তুলে নিলেন, অথচ গোলগুলোর পেছনে তার কোনো ভুলই ছিল না।

এই অদ্ভুত ট্যাকটিক্স কোনো কাজে আসেনি। প্রথমার্ধেই স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৬-০! এরই মধ্যে জায়ার ১০ জনের দলে পরিণত হয়, তবে সেই লাল কার্ডের পেছনেও ছিল এক চরম প্রহসন। চতুর্থ গোলটি হজম করার পর প্রচণ্ড ক্ষোভে ডিফেন্ডার ইলুঙ্গা কলম্বিয়ান রেফারি ওমর দেলগাদোর পেছনে গিয়ে কষিয়ে এক লাথি মারেন! লাথি মেরেই ইলুঙ্গা ভিড়ের মধ্যে পালিয়ে যান। রেফারি যখন ঘুরে তাকালেন, তিনি আসল অপরাধীকে দেখতে পাননি।

ফলে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ ফরোয়ার্ড এনদায়ে মুলাম্বাকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন! যুগোস্লাভিয়ার দুজন খেলোয়াড় রেফারিকে আসল অপরাধী (ইলুঙ্গা)-কে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও রেফারি নিজের ভুল সিদ্ধান্তেই অনড় থাকেন। 

দ্বিতীয়ার্ধে তারা আরও ৩টি গোল খেয়ে ম্যাচটি ৯-০ ব্যবধানে হারে। এই লজ্জাজনক পরাজয়ের পর জায়ারের সরকারি কর্মকর্তারা ড্রেসিংরুমে ঢুকে খেলোয়াড়দের সরাসরি মৃত্যুর হুমকি দেন। ইলুঙ্গার ভাষ্যমতে, তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ‘তোমরা জায়ারের বুকে চুনকালি মেখেছ। মোবুতু বলেছেন, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে যদি তোমরা ৩টির বেশি গোল খাও, তবে তোমরা আর কোনোদিন নিজেদের পরিবার বা জায়ারের মুখ দেখতে পাবে না। তোমাদের সেখানেই শেষ করে দেওয়া হবে।’

এরপরই আসে সেই বিখ্যাত ফ্রি-কিক, যেখানে ব্রাজিলের অনুকূলে থাকা বল দূরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ইলুঙ্গা। ২০১৫ সালে মারা যাওয়ার আগে বিভিন্ন সময়ে তিনি এই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। হয়তো সবগুলো কারণই কোনো না কোনোভাবে সত্য ছিল।

বিবিসির কাছে ২০১০ সালে তিনি দাবি করেছিলেন, ফেডারেশনের কর্তারা যারা তাদের টাকা চুরি করে গ্যালারিতে বসে আরাম করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে তিনি ইচ্ছে করে লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে চেয়েছিলেন। 

তবে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘ডেথ অর গ্লোরি’র জন্য স্পার্লিংকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাখ্যা। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ম্যাচ চলাকালীন তখন স্কোর ২-০। ঠিক তখনই ব্রাজিল এক বিপজ্জনক ফ্রি-কিক পায়। ইলুঙ্গা বলেন, ‘আমি প্যানিক করে ফেলেছিলাম। রিভেলিনো ওই দূরত্ব থেকে কী করতে পারে তা সবাই জানত। আমি ভাবলাম, স্কোর যদি ৩-০ হয়ে যায়, তবে আমরা আর বাড়ি ফিরতে পারব না, আমাদের মেরে ফেলা হবে! তাই ব্রাজিলের শট নেওয়ার আগে সময় নষ্ট করার জন্য আমি দৌড়ে গিয়ে বলটা লাথি মেরে উড়িয়ে দিই।’

অবশ্য ইলুঙ্গার সর্তীর্থদের অনেকে এই মৃত্যুর হুমকির বিষয়টি মানতে চাননি। দলের গোলরক্ষক মোহামেদ কালাম্বে বলেছিলেন, ‘ইলুঙ্গা একটু রাগী আর নার্ভাস স্বভাবের মানুষ ছিল। ওটা একটা আবনরমাল রিঅ্যাকশন ছিল। মোবুতু আমাদের শাস্তি দিতে পারতেন, কিন্তু হেরে যাওয়ার জন্য মেরে ফেলবেন—তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’

বিশ্বকাপ শেষে জায়ার দল যখন দেশে ফিরল, তাদের কোনো বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়নি। সেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া গাড়ি, বাড়ি বা ২০,০০০ ডলারের এক সেন্টও কেউ পায়নি। খেলোয়াড়দের একটা বড় অংশ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হন। অনেকে দেশ ছেড়ে ইউরোপে পালিয়ে যান। দলের স্ট্রাইকার কাকোকো স্টুটগার্টের মার্সিডিজ ফ্যাক্টরিতে কাজ নেন, বোয়াঙ্গা ফ্রান্সে আর ইলুঙ্গার সন্তানেরা যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হন।

কিন্তু জায়ার ফুটবলের এই সোনালী প্রজন্মের অনেকেই শেষ জীবনে চরম অভাবের মধ্যে, রাষ্ট্রের অবহেলায় মারা যান। মৃত্যুর আগে ইলুঙ্গা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের অনেকে আজ যাযাবরের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। আমি যদি আবার জীবনটা শুরু করতে পারতাম, তবে ফুটবলার না হয়ে কঠোর পরিশ্রমী একজন কৃষক হতাম।’

গল্প লিখতেই থাকুক কেপ ভার্দে

জামাল ভূঁইয়া
গল্প লিখতেই থাকুক কেপ ভার্দে

বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হচ্ছে এখানে সব হিসাব সব সময় মেলে না। কাগজে-কলমে যারা শক্তিশালী, মাঠে তারাই সব সময় জেতে না।

প্রায় প্রতি বিশ্বকাপেই এমন কিছু দল আসে, যাদের নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না, কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর তারাই সবচেয়ে বড় চমক হয়ে ওঠে। এবারের বিশ্বকাপে আমার কাছে সেই দলটির নাম কেপ ভার্দে।

সত্যি বলতে, বিশ্বকাপ শুরুর আগে কেপ ভার্দেকে নিয়ে আমার কোনো প্রত্যাশা ছিল না। আমি ভেবেছিলাম, তারা হয়তো অভিজ্ঞতা অর্জন করতেই এসেছে।

গ্রুপে যখন স্পেন ও উরুগুয়ের মতো মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল, কেপ ভার্দের জন্য ম্যাচগুলো খুব কঠিন হবে। কিন্তু ফুটবল আবারও প্রমাণ করেছে, মাঠের লড়াইয়ের আগে কোনো ফল বলে দেওয়া সম্ভব নয়। দুই ম্যাচে কেপ ভার্দের দুই পয়েন্ট। অনেকের কাছে হয়তো সংখ্যাটা খুব বড় কিছু মনে না-ও হতে পারে; কিন্তু এই দুই পয়েন্টের মূল্য বুঝতে হলে দেখতে হবে তারা কাদের বিপক্ষে খেলেছে।

স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দল, যাদের বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস আছে, তাদের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে ড্র করা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। প্রথম ম্যাচের পর কেউ হয়তো বলতে পারত, এটা এক দিনের ভালো খেলা। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেও একই দৃঢ়তা দেখানোর পর আমার মনে হয়েছে, এটি আর কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি দলের পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের ফল। আমার কাছে মনে হয়েছে, কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দলগত নৈপুণ্য।

তারা এমন কোনো দল নয়, যেখানে এক বা দুজন তারকা পুরো ম্যাচের চেহারা বদলে দেন, বরং পুরো দল একসঙ্গে লড়াই করে। সবাই নিজেদের দায়িত্ব বোঝে। মাঠে তাদের মধ্যে একটা বিশ্বাস দেখা যায়, যা অনেক বড় দলেও সব সময় দেখা যায় না। বিশেষ করে তাদের রক্ষণভাগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আধুনিক ফুটবলে বড় দলগুলোকে আটকানো খুব কঠিন। স্পেনের মতো দল বলের দখল রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে; কিন্তু কেপ ভার্দে অসাধারণ জমাট রক্ষণে সেই চাপ সামলেছে।

গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার কথাও আলাদা করে বলতে হবে। আমার মনে হয়েছে, এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত তিনি দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। একজন ভালো গোলরক্ষক শুধু গোল বাঁচান না, তিনি পুরো রক্ষণভাগকে আত্মবিশ্বাস দেন। ভোজিনিয়া ঠিক সেই কাজটাই করছেন। তবে উন্নতির জায়গাও আছে। উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে একসময় মনে হয়েছিল, কেপ ভার্দে কিছুটা আত্মতুষ্ট হয়ে পড়েছে। এগিয়ে যাওয়ার পর কয়েক মিনিটের জন্য তাদের মনোযোগে ঘাটতি দেখা যায়। আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে সেই সুযোগ বড় দলগুলো খুব কমই নষ্ট করে। উরুগুয়েও করেনি। ভবিষ্যতে আরো বড় সাফল্য পেতে হলে এই জায়গায় তাদের সতর্ক হতে হবে। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ নক আউট পর্বে জায়গা করে নেওয়ার। কয়েক সপ্তাহ আগেও হয়তো কেউ এই সম্ভাবনার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি, কিন্তু আজ সেটা বাস্তবতা। পরের ম্যাচে তারা যদি অন্তত এক পয়েন্ট পায়, তাহলে নক আউটে যাওয়ার সুযোগ আরো উজ্জ্বল হবে। আর জয় পেলে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গল্পগুলোর একটি লিখে ফেলবে।

কেপ ভার্দের সাফল্য আমাকে আরেকটি বিষয় নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে শুরুতে অনেক বিতর্ক ছিল। অনেকেই বলেছিল, দলের সংখ্যা বাড়লে প্রতিযোগিতার মান কমে যাবে। ছোট দলগুলো বড় ব্যবধানে হারবে। ম্যাচগুলো একপেশে হয়ে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা দেখেছি, তাতে আমি অবাক হয়েছি। এই বিশ্বকাপে গোল হচ্ছে, নাটকীয়তা হচ্ছে, অঘটন ঘটছে। ছোট দলগুলো বড় দলগুলোর চোখে চোখ রেখে লড়াই করছে। দর্শক হিসেবে এর চেয়ে বেশি আর কী চাই? আমার বিশ্বাস, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই। এটি শুধু ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, এটি স্বপ্ন দেখার মঞ্চও। এখানে এমন দলও নিজেদের গল্প লিখতে পারে, যাদের নিয়ে কেউ ভাবেনি। কেপ ভার্দে এখন সেই গল্পই লিখছে। তারা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ফুটবলে নাম, ইতিহাস কিংবা বাজেট সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বাস, সাহস এবং দল হিসেবে লড়াই করার মানসিকতা। আর সেই কারণেই আমি বলব, কেপ ভার্দে শুধু ড্র-ই করেনি; তারা পুরো ফুটবলবিশ্বের ভালোবাসা অর্জন করেছে। যদি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে এবারের বিশ্বকাপে তাদের যাত্রা আরো অনেক দূর যেতে পারে। আর সেটা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ তারা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে, ফুটবলে অসম্ভব বলে আসলে কিছু নেই।  

বিদেশি টি-টোয়েন্টি লিগে খেলার অনুমতি চান রবিন উথাপ্পা | কালের কণ্ঠ