একের পর এক গোল মিসের মহড়া দিল ব্রাজিল, কিন্তু আর্লিং হালান্ড কি আর এমন সুযোগ হেলায় হাতছাড়া করবেন? না, তিনি ভুলের শাস্তি দিতে ভুল করেননি। শেষ ১০ মিনিটে দুইবার ব্রাজিলের জালে পাঠিয়েছেন বল। পরে ম্যাচের যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে নেইমার এক গোল শোধ দিলেও তা যথেষ্ট ছিল না পাঁচ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের জন্য। এতেই হেক্সা মিশনে ভঙ্গ দিয়ে বাড়ি ফিরে যেতে হচ্ছে নেইমারদের।
আর্লিং হলান্ডের অতিমানবীয় জোড়া গোলে ব্রাজিলকে ২-১ ব্যবধানে স্তব্ধ করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পা রাখল নরওয়ে। আর তাতেই ১৯৯০ সালের পর এই প্রথম শেষ ১৬’র দেয়াল টপকাতে না পেরে অশ্রুসিক্ত বিদায় ঘটল কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যদের।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে ম্যাচের শুরু থেকেই বলের দখল ধরে রেখে আধিপত্য বিস্তার করে নরওয়ে। আর্লিং হলান্ড আর মার্টিন ওডেগার্ডরা নিজেদের রক্ষণ জমাট রেখে সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। শুরুতে রোমাঞ্চ ছড়ায় ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই, যখন ব্রাজিলের জাল কাঁপিয়েছিল নরওয়েজিয়ানরা। যদিও আলেকজান্ডার সরলথের অফসাইডের কারণে সে যাত্রা বেঁচে যায় পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
এর ঠিক সাত মিনিট পরই ম্যাচে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ আসে ব্রাজিলের সামনে। ১০ মিনিটে বক্সের ভেতর ম্যাথিউস কুনহাকে ফাউল করেন ক্রিস্টোফার আয়ের। ভিএআর দেখে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজালে ডেডলক ভাঙার মোক্ষম সুযোগ পায় সেলেসাওরা। কিন্তু স্পট কিক থেকে ব্রুনো গিমারাইসের দুর্বল শট বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে রুখে দেন নরওয়ে গোলরক্ষক অরিয়ান নাইল্যান্ড। পেনাল্টি মিসের এই মহড়া যেন ম্যাচের বাকি অংশেরই এক ট্র্যাজিক পূর্বাভাস ছিল।
প্রথমার্ধের মাঝের সময়টায় খেলা কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও বিরতির ঠিক আগে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে উত্তাপ বাড়ে। ৩১ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির নিচু শট নস্যাৎ করেন নাইল্যান্ড। ৪০ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়র কয়েকজনকে কাটিয়ে দুর্দান্ত এক শট নিলেও নরওয়েজিয়ান গোলকিপারের হাঁটুতে লেগে বল পোস্টে লেগে বাইরে চলে যায়। বিরতির ঠিক আগে ওডেগার্ডের নিশ্চিত গোলের শট রুখে দিয়ে ব্রাজিলের ত্রাতা হন আলিসন বেকার।
দ্বিতীয়ার্ধে আক্রমণের ধার বাড়াতে কুনহার বদলে তরুণ তুর্কি এন্দ্রিককে মাঠে নামান আনচেলত্তি। কিন্তু ৫৯ মিনিটে ভিনিসিয়ুসের রক্ষণচেরা পাস ধরে একা গোলরক্ষককে পেয়েও বল পোস্টের বাইরে মারেন এন্দ্রিক। গোল মিসের এই চড়া মূল্যই দিতে হয়েছে ব্রাজিলকে। ৬৮ মিনিটে আসে সেই বহুল প্রতীক্ষিত মুহূর্ত, যখন বেঞ্চ ছেড়ে চলতি বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো মাঠে নামেন নেইমার জুনিয়র।
কিন্তু ম্যাচের চিত্রনাট্য ততক্ষণে লিখে ফেলেছেন ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হলান্ড। ৮০ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের মাপা ক্রসে শূন্যে ভেসে বুলেট হেডে আলিসনকে পরাস্ত করেন হলান্ড। নরওয়ের ডাগআউট তখন বুনো উল্লাসে মাতোয়ারা। সমতায় ফিরতে মরিয়া ব্রাজিল যখন একের পর এক সুযোগ নষ্ট করছে, ঠিক ৯০ মিনিটে ব্রাজিলের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দেন সেই হলান্ডই। আবারও শেলদেরুপের পাসে ডি-বক্সের বাইরে ফাঁকায় বল পেয়ে বাঁ পায়ের জোরালো শটে ২-০ গোলের লিডে ব্রাজিলের হেক্সার স্বপ্ন চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেন এই স্ট্রাইকার। লিওনেল মেসি ও কিলিয়ান এমবাপ্পের পাশে বসে বিশ্বকাপে নিজের ৭ম গোলটি উদযাপন করেন এই সিটি তারকা।
যোগ করা ৮ মিনিটের অন্তিম মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে এক গোল শোধ করেন বদলি নামা নেইমার। তবে ওই গোল কেবল ব্যবধানই কমিয়েছে। ম্যাচ শেষে কোটি ফুটবলপ্রেমীর মনে একটাই আক্ষেপের সুর ভেসে বেড়াচ্ছিল—কোচ আনচেলত্তি কি তাঁর ‘সেরা অস্ত্র’ নেইমারকে মাঠে নামাতে বড্ড বেশি দেরি করে ফেললেন? যদি আরও আগে নামতেন, তবে হয়তো প্রথমার্ধের পেনাল্টি মিসের গল্পটা অন্যরকম হতে পারতো!