বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের মহানাটকীয়তার মাঝেই নতুন এক বিতর্কের জন্ম দিল ফিফা। বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর বাঁচা-মরার লড়াইয়ের আগে মাঠের খেলা ছাপিয়ে এখন আলোচনায় ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থার এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত। আর এই নাটকের নেপথ্যে সরাসরি জড়িয়ে গেলেন খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্পের এক ফোন কলেই যেন ‘ম্যাজিক’ দেখাল ফিফা! বসনিয়ার বিপক্ষে লাল কার্ড দেখে নিষিদ্ধ হওয়া মার্কিন স্ট্রাইকার ফোলারিন বালোগানকে এক ম্যাচ নিষিদ্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থেকে অবিশ্বাস্যভাবে সরে এসেছে জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সংস্থা।
বসনিয়ার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানের জয়ের ম্যাচে টুর্নামেন্টে নিজের তৃতীয় গোলটি পেয়েছিলেন ২৫ বছর বয়সী বালোগান। তবে দ্বিতীয়ার্ধে প্রতিপক্ষের তারিক মুহারোমোভিচের অ্যাঙ্কেলে বুট দিয়ে আঘাত করায় ভিএআর পর্যালোচনার পর তাকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান রেফারি। নিয়ম অনুযায়ী পরের ম্যাচে তার খেলা অসম্ভব ছিল। কিন্তু খবরের ভেতরের খবর হলো, এই নিষেধাজ্ঞার পরেই ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোকে সরাসরি ফোন করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অনুরোধ জানান লাল কার্ডের সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করার।
এর পরপরই ফিফা এক বিবৃতিতে ঘোষণা করে, বেলজিয়ামের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচেই মাঠে নামতে পারবেন বালোগান। তবে লাল কার্ডের সিদ্ধান্তটি পুরোপুরি বাতিল করা হয়নি, বরং ‘ফিফা ডিসিপ্লিনারি কোড’-এর ২৭ নম্বর ধারা অনুযায়ী তার এক ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা এক বছরের জন্য ‘প্রবেশন’ বা স্থগিতাদেশে রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, আগামী এক বছরের মধ্যে বালোগান এমন গুরুতর ফাউল আর না করলে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না।
ফিফার এই নজিরবিহীন সিদ্ধান্তের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি একে একটি ‘মহাবিপদ ও অবিচার’ থেকে মুক্তি হিসেবে উল্লেখ করে সিদ্ধান্তের প্রশংসা করেন। মার্কিন কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোও শুরু থেকেই দাবি করে আসছিলেন যে, ওটা কোনোভাবেই লাল কার্ড ছিল না।
মার্কিন সকার ফেডারেশন স্বাভাবিকভাবেই এই ঘোষণায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে। দলের তারকা ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিচ জানান, অনুশীলনে যাওয়ার পথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি দেখে প্রথমে নিজেদের চোখকেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না তারা।
ফিফার এমন ‘বিশেষ’ সিদ্ধান্তে চরম বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে রয়্যাল বেলজিয়ান ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। ফিফার নিয়মাবলী ও টুর্নামেন্টের বাইলজ তুলে ধরে তারা এই সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বেলজিয়াম ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের দাবি, ফিফা কোডের ২৭ নম্বর ধারা দিয়ে এই সিদ্ধান্তকে জায়েজ করার চেষ্টা করা হলেও, একই কোডের ৬৬.৪ ধারা এবং টুর্নামেন্ট রেগুলেশনের ১০.৫ ধারা অনুযায়ী, সরাসরি বা দুটি হলুদ কার্ডের কারণে লাল কার্ড দেখলে পরবর্তী ম্যাচে নিষেধাজ্ঞা ‘স্বয়ংক্রিয়ভাবে’ কার্যকর হবে। চলতি বিশ্বকাপের আগের সব লাল কার্ডের ক্ষেত্রে এই নিয়মই কঠোরভাবে মানা হয়েছে। ফলে বালোগানের ক্ষেত্রে এই ছাড় ফিফার নিজস্ব আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
ফুটবল বিশ্বকাপে অবশ্য রাজনৈতিক প্রভাব বা আপিলের মুখে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম নয়।
১৯৬২ বিশ্বকাপে চিলির বিপক্ষে সেমিফাইনালে লাল কার্ড পেয়েছিলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি গ্যারিঞ্চা। কিন্তু চিলির দর্শক ও তৎকালীন চিলিয়ান প্রেসিডেন্ট হোর্হে আলেসান্দ্রির জোরালো জোরাজুরিতে ফাইনালে খেলার অনুমতি পান তিনি। ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়াকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ব্রাজিলকে চ্যাম্পিয়ন করতে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
এদিকে, গত বছর বাছাইপর্বে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে লাল কার্ড দেখে তিন ম্যাচ নিষিদ্ধ হয়েছিলেন পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। তবে ফিফা শেষ দুই ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করায় বিশ্বকাপের শুরুর ম্যাচগুলো খেলতে পেরেছিলেন সিআর-সেভেন।




