• ই-পেপার

হ্যাজলউডের বাউন্সারে ভাঙল স্টোকসের হেলমেট

ব্রাজিলের বিপক্ষে খারাপ খেললেই মৃত্যু! হুমকিতে যা করে বসলেন কঙ্গোর ফুটবলার

ক্রীড়া ডেস্ক
ব্রাজিলের বিপক্ষে খারাপ খেললেই মৃত্যু! হুমকিতে যা করে বসলেন কঙ্গোর ফুটবলার
সংগৃহীত ছবি

১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের অনুকূলে ফ্রি-কিক, গোলপোস্ট থেকে প্রায় ২৫ গজ দূরে। রেফারি নিকোলাই রাইনিয়া বাঁশি বাজিয়েছেন। ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা তখনও শট নেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নন। রিভেলিনো বলের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বাকি দুই সতীর্থের সাথে কথা বলছেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, তৎকালীন জায়ারের (বর্তমান নাম, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো) তৈরি করা রক্ষণ দেয়ালের একদম ডানপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক খেলোয়াড় হুট করে লাইন ভেঙে বেরিয়ে এলেন। তিনি বুলেটের গতিতে দৌড়ে গিয়ে ব্রাজিলের ফ্রি-কিক নেওয়ার আগেই বলটাকে লাথি মেরে মাঠের অন্য প্রান্তে পাঠিয়ে দিলেন!

মাঠে উপস্থিত প্রত্যেকে, এমনকি তার নিজের সতীর্থরাও এই কাণ্ড দেখে চরম হতবাক হয়ে গেলেন। রেফারি নিজেকে সামলে নিয়ে পকেট থেকে হলুদ কার্ড বের করলেন। ইলুঙ্গা মৃদু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও, ওটা ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক অর্থহীন যুক্তি।

টেলিভিশনে ইংরেজিতে ধারাভাষ্য দেওয়া জন মটসন তখন নিজের বিস্ময় চেপে রাখতে পারছিলেন না। পরবর্তীতে মটসন এই ঘটনাকে ‘আফ্রিকান অজ্ঞতার এক অদ্ভুত মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেন। আর যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বমিডিয়া এটিকে এভাবেই চিত্রায়িত করে এসেছে। কখনো একে বলা হয়েছে ‘আফ্রিকান অপেশাদারিত্ব’, কখনো বা তাদের ডাকা হয়েছে ‘ফুটবলের জোকার’।

এই হাসাহাসির আড়ালে যে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বা সরাসরি দাবিটি ছিল, তা অত্যন্ত বর্ণবাদী এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতায় ভরা। ভাবটা এমন যেন ইলুঙ্গা ফুটবলের নিয়মকানুনই জানতেন না; তিনি মাঠে একটা ফুটবল পড়ে থাকতে দেখেছেন আর লাথি মেরে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছেন!

কিন্তু আসল সত্যটা এর চেয়ে হাজার গুণ আলাদা ছিল। ইলুঙ্গা কোনো আনাড়ি খেলোয়াড় ছিলেন না। তিনি ছিলেন ঘরোয়া, মহাদেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরের একাধিক শিরোপাজয়ী এক অত্যন্ত অভিজ্ঞ ফুটবলার, যিনি জায়ারের হয়ে ১৯৭৪ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতেছিলেন। ১৯৭১ সাল থেকে তিনি জাতীয় দলের নিয়মিত ডিফেন্ডার। এমন একজন মানুষ ফুটবলের সাধারণ নিয়ম জানেন না, এই দাবিটিই ছিল চরম হাস্যকর।

২০১০ সালে বিবিসির কাছে ইলুঙ্গা নিজেই সেই সত্যের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ফুটবলের নিয়মকানুন খুব ভালো করেই জানতাম। আমি ওটা ইচ্ছে করেই করেছিলাম।’ 

দীর্ঘ ৫২ বছর পর চলতি বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গো আবারও বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার আগে পর্যন্ত, বিশ্বমঞ্চে তাদের শেষ স্মৃতি বলতে মানুষ এই ঘটনাটিকেই মনে রেখেছিল। কিন্তু এই তথাকথিত ‘কমেডি’র আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার ট্র্যাজেডি এবং অত্যন্ত জটিল সত্য।

জায়ারের তৎকালীন স্বৈরশাসক মোবুতু সেসে সেকো খুব ভালো করেই বুঝতেন খেলার আন্তর্জাতিক মূল্য কতখানি। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দেশ শাসন করা এই একনায়ক ১৯৭১ সালে কঙ্গোর নাম বদলে রাখেন জায়ার। তার কাছে খেলাধুলা ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ও দেশের প্রচারণার এক মোক্ষম হাতিয়ার। 

জায়ার যখন প্রথম ব্ল্যাক আফ্রিকান দেশ হিসেবে শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে এবং আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতে ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করল, মোবুতু খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন। পুরো স্কোয়াডকে ডেকে পাঠানো হলো রাষ্ট্রপতির বিলাসবহুল প্রাসাদে। আততায়ীর হাতে খুন হওয়ার ভয়ে মোবুতু তখন প্রাসাদ থেকে খুব একটা বের হতেন না।

ফুটবলাররা সেই জাঁকজমক দেখে যেমন মুগ্ধ হয়েছিলেন, তেমনি ভেতরে ভেতরে এক ধরণের অস্বস্তিও কাজ করছিল। জন স্পার্লিং-এর লেখা ‘ডেথ অর গ্লোরি: দ্য ডার্ক হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইয়ে ইলুঙ্গা বলেছিলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া আমাদের অনেকের কাছে মোবুতুর সাথে দেখা করা মানে ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করার মতো ছিল।’

সেই বৈঠকে মোবুতু বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেন। বিশ্বমঞ্চে দেশের গর্ব তুলে ধরার পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে দেওয়া হবে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি এবং নগদ ২০ হাজার ডলার। একই সঙ্গে পশ্চিম জার্মানির মূল আসরে তাদের জন্য অঢেল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হলো। তারা চার্টার্ড বিমানে করে জার্মানিতে নামলেন, বিমানবন্দর থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো ব্র্যান্ড নিউ মার্সিডিজ বাসে করে এক বিলাসবহুল হোটেলে।

কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হলো যখন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারা স্রেফ ‘সরকারি খরচে প্রমোদভ্রমণ’ করতে দলের সঙ্গে বিশাল বহর নিয়ে জার্মানি গিয়ে হাজির হলেন। এই চাটুকার, নিরাপত্তা কর্মী আর স্যুট-টাই পরা আমলাদের ভিড়ে খেলোয়াড়দের জন্য বরাদ্দকৃত পকেটের টাকা বা দৈনিক ভাতা হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল! 

অবস্থা এতটাই বেগতিক ছিল যে, খেলোয়াড়েরা যখন জার্মানি ঘুরে দেখার জন্য নিজেদের ভাতা চাইলেন, দলের যুগোস্লাভিয়ান কোচ ব্লাগোজে ভিদিনিচ তাদের হোটেলের বাইরে বের হতেই নিষেধ করে দিলেন। ডিফেন্ডার শিমেন বোয়াঙ্গা পরবর্তীতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের মনোবল একদম ভেঙে পড়েছিল। আমাদের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কিছুই পূরণ হচ্ছিল না।’

টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই তারা স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায়। কেনি ডালগ্লিশ, ডেনিস ল-দের সেই শক্তিশালী স্কটিশ দলের বিরুদ্ধে এই হারটি যথেষ্ট সম্মানজনকই ছিল।

কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচের আগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিষাক্ত হয়ে ওঠে। যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে জায়ারের সরকারি কর্মকর্তারা এক নজিরবিহীন সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, তাদের দেশের কোচ ভিদিনিচ আসলে নিজের মাতৃভূমির (যুগোস্লাভিয়ার) কাছে জায়ারের সব গেম-প্ল্যান এবং গোপন কৌশল পাচার করে দিয়েছেন! তারা ঠাণ্ডা মাথায় ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের কাছে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে যে কোচ বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমরা ওনাকে আইসোলেশনে (বন্দি) রেখেছি এবং দলে কিছু বড় পরিবর্তন আনছি।’

টাকা চুরি এবং কোচের ওপর এমন মানসিক নির্যাতনের প্রতিবাদে খেলোয়াড়েরা ম্যাচের আগের রাতে ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অন্তত ৮ জন খেলোয়াড় ম্যাচ বয়কট করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন—যা পরবর্তীতে তাদের জন্য আরো বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।

ম্যাচের প্রস্তুতি তো নষ্ট হয়েছিলই, মাঠের পারফরম্যান্স ছিল আরও ভয়াবহ। মাত্র ১৮ মিনিটের মধ্যে জায়ার ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে আইসোলেশন থেকে মুক্ত হয়ে ডাগআউটে ফেরা কোচ ভিদিনিচ এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এক নম্বর গোলরক্ষক কাজাদি মুয়াম্বাকে তুলে নিলেন, অথচ গোলগুলোর পেছনে তার কোনো ভুলই ছিল না।

এই অদ্ভুত ট্যাকটিক্স কোনো কাজে আসেনি। প্রথমার্ধেই স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৬-০! এরই মধ্যে জায়ার ১০ জনের দলে পরিণত হয়, তবে সেই লাল কার্ডের পেছনেও ছিল এক চরম প্রহসন। চতুর্থ গোলটি হজম করার পর প্রচণ্ড ক্ষোভে ডিফেন্ডার ইলুঙ্গা কলম্বিয়ান রেফারি ওমর দেলগাদোর পেছনে গিয়ে কষিয়ে এক লাথি মারেন! লাথি মেরেই ইলুঙ্গা ভিড়ের মধ্যে পালিয়ে যান। রেফারি যখন ঘুরে তাকালেন, তিনি আসল অপরাধীকে দেখতে পাননি।

ফলে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ ফরোয়ার্ড এনদায়ে মুলাম্বাকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন! যুগোস্লাভিয়ার দুজন খেলোয়াড় রেফারিকে আসল অপরাধী (ইলুঙ্গা)-কে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও রেফারি নিজের ভুল সিদ্ধান্তেই অনড় থাকেন। 

দ্বিতীয়ার্ধে তারা আরও ৩টি গোল খেয়ে ম্যাচটি ৯-০ ব্যবধানে হারে। এই লজ্জাজনক পরাজয়ের পর জায়ারের সরকারি কর্মকর্তারা ড্রেসিংরুমে ঢুকে খেলোয়াড়দের সরাসরি মৃত্যুর হুমকি দেন। ইলুঙ্গার ভাষ্যমতে, তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ‘তোমরা জায়ারের বুকে চুনকালি মেখেছ। মোবুতু বলেছেন, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে যদি তোমরা ৩টির বেশি গোল খাও, তবে তোমরা আর কোনোদিন নিজেদের পরিবার বা জায়ারের মুখ দেখতে পাবে না। তোমাদের সেখানেই শেষ করে দেওয়া হবে।’

এরপরই আসে সেই বিখ্যাত ফ্রি-কিক, যেখানে ব্রাজিলের অনুকূলে থাকা বল দূরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ইলুঙ্গা। ২০১৫ সালে মারা যাওয়ার আগে বিভিন্ন সময়ে তিনি এই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। হয়তো সবগুলো কারণই কোনো না কোনোভাবে সত্য ছিল।

বিবিসির কাছে ২০১০ সালে তিনি দাবি করেছিলেন, ফেডারেশনের কর্তারা যারা তাদের টাকা চুরি করে গ্যালারিতে বসে আরাম করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে তিনি ইচ্ছে করে লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে চেয়েছিলেন। 

তবে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘ডেথ অর গ্লোরি’র জন্য স্পার্লিংকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাখ্যা। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ম্যাচ চলাকালীন তখন স্কোর ২-০। ঠিক তখনই ব্রাজিল এক বিপজ্জনক ফ্রি-কিক পায়। ইলুঙ্গা বলেন, ‘আমি প্যানিক করে ফেলেছিলাম। রিভেলিনো ওই দূরত্ব থেকে কী করতে পারে তা সবাই জানত। আমি ভাবলাম, স্কোর যদি ৩-০ হয়ে যায়, তবে আমরা আর বাড়ি ফিরতে পারব না, আমাদের মেরে ফেলা হবে! তাই ব্রাজিলের শট নেওয়ার আগে সময় নষ্ট করার জন্য আমি দৌড়ে গিয়ে বলটা লাথি মেরে উড়িয়ে দিই।’

অবশ্য ইলুঙ্গার সর্তীর্থদের অনেকে এই মৃত্যুর হুমকির বিষয়টি মানতে চাননি। দলের গোলরক্ষক মোহামেদ কালাম্বে বলেছিলেন, ‘ইলুঙ্গা একটু রাগী আর নার্ভাস স্বভাবের মানুষ ছিল। ওটা একটা আবনরমাল রিঅ্যাকশন ছিল। মোবুতু আমাদের শাস্তি দিতে পারতেন, কিন্তু হেরে যাওয়ার জন্য মেরে ফেলবেন—তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’

বিশ্বকাপ শেষে জায়ার দল যখন দেশে ফিরল, তাদের কোনো বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়নি। সেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া গাড়ি, বাড়ি বা ২০,০০০ ডলারের এক সেন্টও কেউ পায়নি। খেলোয়াড়দের একটা বড় অংশ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হন। অনেকে দেশ ছেড়ে ইউরোপে পালিয়ে যান। দলের স্ট্রাইকার কাকোকো স্টুটগার্টের মার্সিডিজ ফ্যাক্টরিতে কাজ নেন, বোয়াঙ্গা ফ্রান্সে আর ইলুঙ্গার সন্তানেরা যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হন।

কিন্তু জায়ার ফুটবলের এই সোনালী প্রজন্মের অনেকেই শেষ জীবনে চরম অভাবের মধ্যে, রাষ্ট্রের অবহেলায় মারা যান। মৃত্যুর আগে ইলুঙ্গা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের অনেকে আজ যাযাবরের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। আমি যদি আবার জীবনটা শুরু করতে পারতাম, তবে ফুটবলার না হয়ে কঠোর পরিশ্রমী একজন কৃষক হতাম।’

গল্প লিখতেই থাকুক কেপ ভার্দে

জামাল ভূঁইয়া
গল্প লিখতেই থাকুক কেপ ভার্দে

বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হচ্ছে এখানে সব হিসাব সব সময় মেলে না। কাগজে-কলমে যারা শক্তিশালী, মাঠে তারাই সব সময় জেতে না।

প্রায় প্রতি বিশ্বকাপেই এমন কিছু দল আসে, যাদের নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না, কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর তারাই সবচেয়ে বড় চমক হয়ে ওঠে। এবারের বিশ্বকাপে আমার কাছে সেই দলটির নাম কেপ ভার্দে।

সত্যি বলতে, বিশ্বকাপ শুরুর আগে কেপ ভার্দেকে নিয়ে আমার কোনো প্রত্যাশা ছিল না। আমি ভেবেছিলাম, তারা হয়তো অভিজ্ঞতা অর্জন করতেই এসেছে।

গ্রুপে যখন স্পেন ও উরুগুয়ের মতো মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল, কেপ ভার্দের জন্য ম্যাচগুলো খুব কঠিন হবে। কিন্তু ফুটবল আবারও প্রমাণ করেছে, মাঠের লড়াইয়ের আগে কোনো ফল বলে দেওয়া সম্ভব নয়। দুই ম্যাচে কেপ ভার্দের দুই পয়েন্ট। অনেকের কাছে হয়তো সংখ্যাটা খুব বড় কিছু মনে না-ও হতে পারে; কিন্তু এই দুই পয়েন্টের মূল্য বুঝতে হলে দেখতে হবে তারা কাদের বিপক্ষে খেলেছে।

স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দল, যাদের বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস আছে, তাদের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে ড্র করা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। প্রথম ম্যাচের পর কেউ হয়তো বলতে পারত, এটা এক দিনের ভালো খেলা। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেও একই দৃঢ়তা দেখানোর পর আমার মনে হয়েছে, এটি আর কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি দলের পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের ফল। আমার কাছে মনে হয়েছে, কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দলগত নৈপুণ্য।

তারা এমন কোনো দল নয়, যেখানে এক বা দুজন তারকা পুরো ম্যাচের চেহারা বদলে দেন, বরং পুরো দল একসঙ্গে লড়াই করে। সবাই নিজেদের দায়িত্ব বোঝে। মাঠে তাদের মধ্যে একটা বিশ্বাস দেখা যায়, যা অনেক বড় দলেও সব সময় দেখা যায় না। বিশেষ করে তাদের রক্ষণভাগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আধুনিক ফুটবলে বড় দলগুলোকে আটকানো খুব কঠিন। স্পেনের মতো দল বলের দখল রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে; কিন্তু কেপ ভার্দে অসাধারণ জমাট রক্ষণে সেই চাপ সামলেছে।

গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার কথাও আলাদা করে বলতে হবে। আমার মনে হয়েছে, এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত তিনি দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। একজন ভালো গোলরক্ষক শুধু গোল বাঁচান না, তিনি পুরো রক্ষণভাগকে আত্মবিশ্বাস দেন। ভোজিনিয়া ঠিক সেই কাজটাই করছেন। তবে উন্নতির জায়গাও আছে। উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে একসময় মনে হয়েছিল, কেপ ভার্দে কিছুটা আত্মতুষ্ট হয়ে পড়েছে। এগিয়ে যাওয়ার পর কয়েক মিনিটের জন্য তাদের মনোযোগে ঘাটতি দেখা যায়। আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে সেই সুযোগ বড় দলগুলো খুব কমই নষ্ট করে। উরুগুয়েও করেনি। ভবিষ্যতে আরো বড় সাফল্য পেতে হলে এই জায়গায় তাদের সতর্ক হতে হবে। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ নক আউট পর্বে জায়গা করে নেওয়ার। কয়েক সপ্তাহ আগেও হয়তো কেউ এই সম্ভাবনার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি, কিন্তু আজ সেটা বাস্তবতা। পরের ম্যাচে তারা যদি অন্তত এক পয়েন্ট পায়, তাহলে নক আউটে যাওয়ার সুযোগ আরো উজ্জ্বল হবে। আর জয় পেলে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গল্পগুলোর একটি লিখে ফেলবে।

কেপ ভার্দের সাফল্য আমাকে আরেকটি বিষয় নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে শুরুতে অনেক বিতর্ক ছিল। অনেকেই বলেছিল, দলের সংখ্যা বাড়লে প্রতিযোগিতার মান কমে যাবে। ছোট দলগুলো বড় ব্যবধানে হারবে। ম্যাচগুলো একপেশে হয়ে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা দেখেছি, তাতে আমি অবাক হয়েছি। এই বিশ্বকাপে গোল হচ্ছে, নাটকীয়তা হচ্ছে, অঘটন ঘটছে। ছোট দলগুলো বড় দলগুলোর চোখে চোখ রেখে লড়াই করছে। দর্শক হিসেবে এর চেয়ে বেশি আর কী চাই? আমার বিশ্বাস, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই। এটি শুধু ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, এটি স্বপ্ন দেখার মঞ্চও। এখানে এমন দলও নিজেদের গল্প লিখতে পারে, যাদের নিয়ে কেউ ভাবেনি। কেপ ভার্দে এখন সেই গল্পই লিখছে। তারা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ফুটবলে নাম, ইতিহাস কিংবা বাজেট সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বাস, সাহস এবং দল হিসেবে লড়াই করার মানসিকতা। আর সেই কারণেই আমি বলব, কেপ ভার্দে শুধু ড্র-ই করেনি; তারা পুরো ফুটবলবিশ্বের ভালোবাসা অর্জন করেছে। যদি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে এবারের বিশ্বকাপে তাদের যাত্রা আরো অনেক দূর যেতে পারে। আর সেটা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ তারা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে, ফুটবলে অসম্ভব বলে আসলে কিছু নেই।  

আলজেরিয়ার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে বিদায় নিশ্চিত জর্ডানের

ক্রীড়া ডেস্ক
আলজেরিয়ার দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনে বিদায় নিশ্চিত জর্ডানের
ছবি : রয়টার্স

খাদের কিনারা থেকে কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয়, সান ফ্রান্সিসকো বে স্টেডিয়ামে সেটাই যেন আরো একবার প্রমাণ করল আলজেরিয়া। ম্যাচের শুরুতে পিছিয়ে পড়ার পরও দুর্দান্তভাবে ম্যাচে ফিরে ‘জে’ গ্রুপের লড়াইয়ে জর্ডানকে ২-১ গোলে হারিয়েছে তারা। এই রোমাঞ্চকর জয়ে টুর্নামেন্টের নকআউট পর্বে খেলার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখল আলজেরিয়ানরা।

অন্য দিকে আলজেরিয়ার আনন্দের দিনে চরম হতাশা জর্ডান শিবিরে। টুর্নামেন্টে টানা দুই ম্যাচে হারের তেতো স্বাদ পাওয়ায় গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ঘণ্টা বেজে গেল মধ্যপ্রাচ্যের এই দলটির।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে জমে ওঠে লড়াই। তবে প্রথমার্ধেই গোল হজম করে ব্যাকফুটে চলে যায় আলজেরিয়া। জর্দানের হয়ে ৩৬তম মিনিটে গোল করেন আলরাশদান।

গোল খেয়েও মনোবল না হারিয়ে আক্রমণের ধার বাড়ায় আলজেরিয়া। দ্বিতীয়ার্ধে একের পর এক ধারালো আক্রমণে জর্ডানের রক্ষণভাগকে নাস্তানাবুদ করে দেয় আলজেরিয়ার ফরোয়ার্ডরা।

শেষ পর্যন্ত ৬৯তম মিনিটে নাদির বেনবুয়ালির গোলে সমতায় আসে আলজেরিয়া। এরপর ৮২ মিনিটের মাথায় গোল করে আলজেরিয়াকে জয় এনে দেন আমিনে গুইরি।

আগামী রবিবার সকাল ৮ টায় অস্ট্রিয়ার মুখোমুখি হবে আলজেরিয়া। দুই দলেরই সমান তিন পয়েন্ট থাকায় ম্যাচের জয়ী দল সরাসরি যাবে শেষ ৩২-এ। অন্য ফল আসলে অপেক্ষা করতে হবে গ্রুপের তৃতীয় স্থান দখলের জটিল সমীকরণে।

ক্লোসাকে ছুঁয়ে ছুটছেন এমবাপ্পে, ভাঙলেন মেসি-রোনালদোর রেকর্ড

ক্রীড়া ডেস্ক
ক্লোসাকে ছুঁয়ে ছুটছেন এমবাপ্পে, ভাঙলেন মেসি-রোনালদোর রেকর্ড
ছবি : রয়টার্স

প্রথম দুই বিশ্বকাপেই ফাইনাল খেলার রোমাঞ্চ, আর বিশ্বজয়ের স্বাদ পাওয়া কিলিয়ান এমবাপ্পের ক্যারিয়ারের শুরুটাই হয়েছে রূপকথার মতো। তবে ফরাসি এই অধিনায়ক যে কেবল শুরুতেই থামার পাত্র নন, তার প্রমাণ মিলছে চলতি বিশ্বকাপে। নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপ খেলতে নেমে তিনি যেন আরও বেশি রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছেন। মাত্র ১৬ ম্যাচ খেলেই তিনি ছুঁয়ে ফেলেছেন বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলশিকারী জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসাকে।

২০১৪ সালে যখন জার্মান কিংবদন্তি ক্লোসা আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান, তখন তার নামের পাশে ছিল ২৪ ম্যাচে ১৬ গোলের মহাকীর্তি। দীর্ঘ এক যুগ ধরে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনটি তারই দখলে ছিল। কিন্তু চলতি আসরে সেই সিংহাসনে প্রথম আঘাত হানেন লিওনেল মেসি। এবারের বিশ্বকাপে নিজের প্রথম ম্যাচেই ক্লোসাকে ছোঁয়ার পর, গত ম্যাচে ১৮তম গোল করে এককভাবে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেন এই আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তবে এই রেকর্ড গড়তে ম্যাচ খেলেছেন ২৮ টি। 

মজার ব্যাপার হলো, মেসির এই কীর্তির কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই ইরাকের বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে জোড়া গোল করে বসেন এমবাপ্পে। আর তাতেই মাত্র ১৬ ম্যাচে ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ডে ভাগ বসালেন এই ফরাসি ফরোয়ার্ড। চলতি বিশ্বকাপে এই দুই মহাতারকার শীর্ষস্থান দখলের যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা কোথায় শেষ হয় তাই এখন দেখার বিষয়। 

এদিকে বিশ্বকাপের টানা তিন বা তার বেশি ম্যাচে অন্তত দুটি করে গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন এমবাপ্পে। ইতিহাসের মাত্র চতুর্থ পুরুষ ফুটবলার হিসেবে এই ক্লাবে যোগ দিলেন তিনি। এর আগে ১৯৩০ সালে গুইয়ের্মো স্তাবিলে, ১৯৫৪ সালে স্যান্ডর কোচিস (৪ ম্যাচ) এবং সাম্প্রতিক সময়ে লিওনেল মেসি এই রেকর্ড গড়েছিলেন।

বিশ্বকাপে এ নিয়ে ষষ্ঠবারের মতো কোনো নির্দিষ্ট ম্যাচে একাধিক গোল করলেন এমবাপ্পে। যার মধ্যে রয়েছে পাঁচটি জোড়া গোল এবং একটি অনবদ্য হ্যাটট্রিক।

এমবাপের খেলার ধরনেও এসেছে দারুণ পরিবর্তন। বিশ্বকাপে তার প্রথম ১৩টি গোলের মধ্যে মাত্র একটি এসেছিল পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে। অথচ শেষ ৩টি গোলের দুটিই তিনি করেছেন দূরপাল্লার শটে, বক্সের বাইরে থেকে।

আন্তর্জাতিক ফুটবলে শততম ম্যাচ খেলার মাইলফলক স্পর্শ করার পর গোলের তালিকায় এমবাপের অবস্থান এখন অষ্টম। ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা দুই কিংবদন্তিকেও ছাড়িয়ে গেছেন এমবাপে। নিজের শততম আন্তর্জাতিক ম্যাচ শেষে লিওনেল মেসির গোল ছিল ৪৬টি এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ছিল মাত্র ৩৭টি। সেই তুলনায় ৬০ গোল করা এমবাপে যে ভবিষ্যতের আরো বড় কোনো রেকর্ডের দিকে ছুটছেন, তা বলাই বাহুল্য। 

হ্যাজলউডের বাউন্সারে ভাঙল স্টোকসের হেলমেট | কালের কণ্ঠ