বিশ্বকাপের সৌন্দর্যই হচ্ছে এখানে সব হিসাব সব সময় মেলে না। কাগজে-কলমে যারা শক্তিশালী, মাঠে তারাই সব সময় জেতে না।
প্রায় প্রতি বিশ্বকাপেই এমন কিছু দল আসে, যাদের নিয়ে খুব বেশি আলোচনা হয় না, কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হওয়ার পর তারাই সবচেয়ে বড় চমক হয়ে ওঠে। এবারের বিশ্বকাপে আমার কাছে সেই দলটির নাম কেপ ভার্দে।
সত্যি বলতে, বিশ্বকাপ শুরুর আগে কেপ ভার্দেকে নিয়ে আমার কোনো প্রত্যাশা ছিল না। আমি ভেবেছিলাম, তারা হয়তো অভিজ্ঞতা অর্জন করতেই এসেছে।
গ্রুপে যখন স্পেন ও উরুগুয়ের মতো মতো দুই সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আছে, তখন স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল, কেপ ভার্দের জন্য ম্যাচগুলো খুব কঠিন হবে। কিন্তু ফুটবল আবারও প্রমাণ করেছে, মাঠের লড়াইয়ের আগে কোনো ফল বলে দেওয়া সম্ভব নয়। দুই ম্যাচে কেপ ভার্দের দুই পয়েন্ট। অনেকের কাছে হয়তো সংখ্যাটা খুব বড় কিছু মনে না-ও হতে পারে; কিন্তু এই দুই পয়েন্টের মূল্য বুঝতে হলে দেখতে হবে তারা কাদের বিপক্ষে খেলেছে।
স্পেন ও উরুগুয়ের মতো দল, যাদের বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাস আছে, তাদের বিপক্ষে টানা দুই ম্যাচে ড্র করা কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। প্রথম ম্যাচের পর কেউ হয়তো বলতে পারত, এটা এক দিনের ভালো খেলা। কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচেও একই দৃঢ়তা দেখানোর পর আমার মনে হয়েছে, এটি আর কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি দলের পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের ফল। আমার কাছে মনে হয়েছে, কেপ ভার্দের সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের দলগত নৈপুণ্য।
তারা এমন কোনো দল নয়, যেখানে এক বা দুজন তারকা পুরো ম্যাচের চেহারা বদলে দেন, বরং পুরো দল একসঙ্গে লড়াই করে। সবাই নিজেদের দায়িত্ব বোঝে। মাঠে তাদের মধ্যে একটা বিশ্বাস দেখা যায়, যা অনেক বড় দলেও সব সময় দেখা যায় না। বিশেষ করে তাদের রক্ষণভাগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। আধুনিক ফুটবলে বড় দলগুলোকে আটকানো খুব কঠিন। স্পেনের মতো দল বলের দখল রেখে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে; কিন্তু কেপ ভার্দে অসাধারণ জমাট রক্ষণে সেই চাপ সামলেছে।
গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার কথাও আলাদা করে বলতে হবে। আমার মনে হয়েছে, এই টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত তিনি দলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। একজন ভালো গোলরক্ষক শুধু গোল বাঁচান না, তিনি পুরো রক্ষণভাগকে আত্মবিশ্বাস দেন। ভোজিনিয়া ঠিক সেই কাজটাই করছেন। তবে উন্নতির জায়গাও আছে। উরুগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচে একসময় মনে হয়েছিল, কেপ ভার্দে কিছুটা আত্মতুষ্ট হয়ে পড়েছে। এগিয়ে যাওয়ার পর কয়েক মিনিটের জন্য তাদের মনোযোগে ঘাটতি দেখা যায়। আর আন্তর্জাতিক ফুটবলে সেই সুযোগ বড় দলগুলো খুব কমই নষ্ট করে। উরুগুয়েও করেনি। ভবিষ্যতে আরো বড় সাফল্য পেতে হলে এই জায়গায় তাদের সতর্ক হতে হবে। এখন তাদের সামনে সবচেয়ে বড় সুযোগ নক আউট পর্বে জায়গা করে নেওয়ার। কয়েক সপ্তাহ আগেও হয়তো কেউ এই সম্ভাবনার কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবেনি, কিন্তু আজ সেটা বাস্তবতা। পরের ম্যাচে তারা যদি অন্তত এক পয়েন্ট পায়, তাহলে নক আউটে যাওয়ার সুযোগ আরো উজ্জ্বল হবে। আর জয় পেলে বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গল্পগুলোর একটি লিখে ফেলবে।
কেপ ভার্দের সাফল্য আমাকে আরেকটি বিষয় নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছে। ৪৮ দলের বিশ্বকাপ নিয়ে শুরুতে অনেক বিতর্ক ছিল। অনেকেই বলেছিল, দলের সংখ্যা বাড়লে প্রতিযোগিতার মান কমে যাবে। ছোট দলগুলো বড় ব্যবধানে হারবে। ম্যাচগুলো একপেশে হয়ে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত যা দেখেছি, তাতে আমি অবাক হয়েছি। এই বিশ্বকাপে গোল হচ্ছে, নাটকীয়তা হচ্ছে, অঘটন ঘটছে। ছোট দলগুলো বড় দলগুলোর চোখে চোখ রেখে লড়াই করছে। দর্শক হিসেবে এর চেয়ে বেশি আর কী চাই? আমার বিশ্বাস, বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই। এটি শুধু ট্রফি জয়ের লড়াই নয়, এটি স্বপ্ন দেখার মঞ্চও। এখানে এমন দলও নিজেদের গল্প লিখতে পারে, যাদের নিয়ে কেউ ভাবেনি। কেপ ভার্দে এখন সেই গল্পই লিখছে। তারা আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে ফুটবলে নাম, ইতিহাস কিংবা বাজেট সব সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বিশ্বাস, সাহস এবং দল হিসেবে লড়াই করার মানসিকতা। আর সেই কারণেই আমি বলব, কেপ ভার্দে শুধু ড্র-ই করেনি; তারা পুরো ফুটবলবিশ্বের ভালোবাসা অর্জন করেছে। যদি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তাহলে এবারের বিশ্বকাপে তাদের যাত্রা আরো অনেক দূর যেতে পারে। আর সেটা হলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ তারা এরই মধ্যে প্রমাণ করেছে, ফুটবলে অসম্ভব বলে আসলে কিছু নেই।