• ই-পেপার

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি শুরু, এখন বাংলাদেশ কি করবে?

পথহারা কূটনীতি, ফেরাতে হবে সঠিক পথে

অদিতি করিম
পথহারা কূটনীতি, ফেরাতে হবে সঠিক পথে

বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্কে যখন পুশইন নিয়ে টানাপোড়েন এবং উত্তেজনা, ঠিক তখনই বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে বাংলাদেশে এলেন নতুন ভারতীয় হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী। গত শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার পর তিনি বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ভারতের সাবেক কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা দিনেশ ত্রিবেদী পেশাদার কূটনৈতিক নন। তিনি একজন রাজনীতিবিদ। গত এপ্রিলে ভারত সরকার দিনেশ ত্রিবেদীকে বাংলাদেশে ভারতীয় হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়। দুই দেশের ৫৫ বছরের সম্পর্কের ইতিহাসে ভারত এ প্রথম কোনো রাজনীতিবিদকে দেশটির হাইকমিশনার করে বাংলাদেশে পাঠাল। বাংলাদেশে প্রবেশ করেই দিনেশ ত্রিবেদী বলেন, ‘আমাদের যা পপুলেশন আছে ১৪০ কোটি। তার সঙ্গে ২০ কোটি (বাংলাদেশের) অ্যাড করেছি। ১৬০ কোটি। আমি এখানে যা করতে চাই, তা সব একসঙ্গে হবে। আলাদাভাবে ভাবছি না। দেখছেন না আমি হেঁটে চলে আসছি। একই আকাশ একই বাতাস একই। আমরা মিলেমিশে ভিসার সমাধান করব। শুধু অভিন্ন সীমান্ত নয়, অভিন্ন স্বপ্নও আছে। আমাদের আকাশ এক, বাতাস এক, চ্যালেঞ্জও অনেক ক্ষেত্রে এক। তাই আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। ভালোবাসা আর পারস্পরিক আন্তরিকতার মাধ্যমে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব।’

হাইকমিশনার হিসেবে নিজের অগ্রাধিকারের প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমার একমাত্র অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের সম্পর্ক। আমরা সবাই ভাইবোন। আমাদের পথ ভুল হওয়ার সুযোগ নেই। প্রয়োজন শুধু ভালোবাসা ও পারস্পরিক আন্তরিকতা। তাহলেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শুধু সীমান্তের নয়। বাংলাদেশের মানুষের স্বপ্নের সঙ্গেও আমরা যুক্ত। যারা আমাদের ভাইবোন ও মা-তাদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত করার মধ্য দিয়ে ভারত একটি সুস্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। তা হলো, তারা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে আগ্রহী। তাই বাংলাদেশকেও এখন এ সম্পর্ক উন্নয়নে কূটনৈতিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে। সীমান্তে উত্তেজনা, মানুষ হত্যা, পুশইনের মতো অমানবিক ঘটনা কখনো ভালো সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে না। এটা দুই দেশের সম্পর্কের তিক্ততার প্রকাশ। দুই দেশের জন্যই এ বৈরিতা ক্ষতিকর। বর্তমান বিশ্বে বল প্রয়োগ, যুদ্ধ কোনো সংকটের সমাধান দেয় না। বরং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। ভারতের অযৌক্তিক পুশইন নিয়ে আর কালবিলম্ব না করে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করতে হবে।

প্রতিবেশীর সঙ্গে উত্তেজনা কারও জন্যই ভালো ফল দেবে না। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশ-ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের স্থল সীমান্তের মোট দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬.৭ কিলোমিটার। এটি বিশ্বের পঞ্চম দীর্ঘতম স্থল সীমান্ত, যা ভারতের পাঁচটি রাজ্য-পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে। এই সীমান্তে উত্তেজনা এবং অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি দুই দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি। শুধু সীমান্ত নয়, দুই দেশের মধ্যে বেশ কিছু বিষয় নিয়ে টানাপোড়েন রয়েছে। পদ্মা, তিস্তাসহ একাধিক নদীর পানির ন্যায্য হিস্সা, ভিসা জটিলতা, ভারতের বন্দরগুলো দেড় বছর ধরে বাংলাদেশকে ব্যবহার করতে না দেওয়ার মতো ইস্যুগুলো নিয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করা দরকার। একটি দেশের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং শান্তির জন্য প্রতিবেশীর সঙ্গে স্বাভাবিক বন্ধুত্বপূর্ণ এবং পারস্পরিক সম্মান ও মর্যাদার সম্পর্ক জরুরি। সবকিছু পাল্টানো যায় কিন্তু প্রতিবেশী বদলানো সম্ভব না। তাই প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনার সম্পর্ক নয় দরকার আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের চেষ্টা। তা ছাড়া বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে গড়ে ওঠা। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সমর্থন ও সহযোগিতা আমাদের বন্ধুত্বের শক্তি। দুই প্রতিবেশীর মধ্যে সমস্যা থাকবেই। কিন্তু সেই সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ হলো আলাপ-আলোচনা। পুশইন করে কিংবা সীমান্তে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব না। ভারতের নতুন রাষ্ট্রদূত আসার মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে আলাপ-আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। দুই দেশকেই এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অবনতি ঘটে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। এ সময় উগ্র ভারত বিরোধিতা নামে অন্তর্বর্তী সরকার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে ভুল পথে নিয়ে যায়। ইউনূস এবং তাঁর উপদেষ্টাদের দায়িত্বহীন ভারত বিদ্বেষী কথাবার্তায় বাংলাদেশের ক্ষতি ছাড়া কোনো লাভ হয়নি। ইউনূস ভারতের সেভেন সিস্টার নিয়ে যে মন্তব্য করেছিলেন তা সুস্পষ্টভাবে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের শামিল। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, ২৬ লাখ ভারতীয় নাগরিক বাংলাদেশে কাজ করে বলে অসত্য তথ্য ছড়িয়ে দুই দেশের সম্পর্ক তিক্ত করেছেন। ইউনূস সরকার বাইরে ভারত বিরোধিতা করে ভিতরে দেশকে আরও বেশি ভারতীয় পণ্যের ওপর নির্ভরশীল করেছেন। ভারত থেকে পণ্য আমদানি বাড়ে ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। কিন্তু ভারতের ভিসা বন্ধ হয়ে যায়, বাংলাদেশের পণ্য ভারতের বন্দর ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। আজকের পুশইন ইউনূস সরকারের ভুল কূটনৈতিক তৎপরতার ফল। শুধু ভারত নয় সারা বিশ্বের সঙ্গেই বাংলাদেশ যেন ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে ড. ইউনূসের ভুল নীতির কারণে। বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক ভালো নয়। বারো লাখ বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে নয় বছর ধরে অবস্থান করছে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল চাপ। রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি নেই। ক্ষমতা নেওয়ার শুরুতে মুহাম্মদ ইউনূসকে ‘আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হলেও, বাস্তবে তার করা কোনো গোল আমরা উদ্যাপন করতে পারিনি। পাকিস্তান ছাড়া আর কোনো দেশের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক সাফল্য নেই। ইউনূস বলেছিলেন, রোহিঙ্গারা এ বছরের (গত বছর) রোজার ঈদ করবেন মিয়ানমারে, সেটা কার্যকর তো হয়নি উল্টো এর মধ্যে অন্তত লাখ দুয়েক রোহিঙ্গা নতুন করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। ক্ষমতা নেওয়ার পর ইউনূস বলেছিলেন, বিশ্ব আমাদের কাছে আসবে। কিন্তু কার্যত, দেড় বছরে বিশ্বের দরজাই বাংলাদেশের জন্য আজ বন্ধ হওয়ার উপক্রম। ইউনূস বলেছিলেন, ইউরোপের যেদেশগুলোর বাংলাদেশে ভিসা সেন্টার নেই, তারা বাংলাদেশে কাজ শুরু করবে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতদের দিল্লি থেকে ঢাকায় দাওয়াত দিয়ে আনেন। কিন্তু, ইউনূস দেড় বছরে একটা দেশেরও ভিসা সেন্টার দিল্লি থেকে ঢাকায় সরিয়ে আনতে পারেননি, ফলে বিদেশে পড়তে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। যেসব দেশে ভিসা ছাড়া বাংলাদেশের নাগরিকরা প্রবেশ করতে পারত, সেই সব দেশের অধিকাংশই ভিসা ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে, বাকি অধিকাংশ দেশ ভিসা দেওয়ার হার কমিয়েছে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের ভিসা এখন সোনার হরিণ। ইউনূস মালয়েশিয়া শ্রমবাজার চালুর ঘোষণা দিয়েছিলেন কিন্তু বাস্তবে তা চালু হয়নি। বহু দেশে জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেছে অন্তর্র্বর্তী সরকারের আমলে। আমেরিকা তো রীতিমতন ভিসার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বাংলাদেশের পাসপোর্টের মান কমে ইয়েমেন, আফগানিস্তান বা ফিলিস্তিন লেভেলে নেমে গেছে।

দেড় বছরে ১৪ বার এবং প্রথম ১২ মাসে ১১ বার বিদেশ সফর করলেও ‘ইউনূস ম্যাজিক’ কার্যত ফেইল করেছে। বাংলাদেশের কূটনীতি আজ পথ হারা। তাই, নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে, আমাদের পররাষ্ট্রনীতিকে সঠিক পথে নিয়ে আসা। বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জন্য কিছু সুখবর নিয়ে এসেছে বিএনপি সরকার। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে নির্বাচিত হয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সাইপ্রাসের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বিশেষ দূত আন্দ্রেয়াস এস কাকোরিসকে ৮ ভোটে পরাজিত করে তিনি এক বছরের জন্য এ পদে নির্বাচিত হয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ চলছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর হচ্ছে মালয়েশিয়া। ২১ জুন প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে বন্ধ শ্রমবাজার খুলবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এটি হবে তারেক রহমানের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি সাফল্য।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো, সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। সেই ভিত্তিকে আবার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নকে দিতে হবে অগ্রাধিকার। পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রাধান্য দিতে হবে কূটনীতিতে। আমরা আশাবাদী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি শিগগিরই পথ খুঁজে পাবে।

বিচারের জন্য বেনজীরকে ফেরাতেই হবে

মন্‌জুরুল ইসলাম
বিচারের জন্য বেনজীরকে ফেরাতেই হবে

ভারত-পাকিস্তান ভাগের আগে আমাদের এ অঞ্চলে পুলিশ বাহিনী গঠিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় পুলিশের ৩৭তম মহাপরিদর্শক ছিলেন বেনজীর আহমেদ। বাংলাদেশ হওয়ার পর আইজিপি তালিকায় তাঁর অবস্থান ২৮তম। তিনি একজন মেধাবী, করিৎকর্মা ও দাপুটে অফিসার ছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনের আলোকিত অংশের চেয়ে ভয়ংকর, অন্ধকার অংশই বেশি। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে তিনি একজন নষ্ট মানুষ। এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা তিনি করেননি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে গুম-খুনসহ সব করেছেন। ঢাকার নাটক-সিনেমার বহু নায়িকাকে নিয়েও আছে অনেক রসালো গল্প। দুর্নীতির বরপুত্র বলা যায় তাঁকে। নামে-বেনামে বেশুমার সম্পদ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও আদালতে মামলা চলছে। অনেক ঘটনার নাটের গুরু বেনজীর আহমেদ দেশ থেকে খুবই নিরাপদে বিদেশে চলে যান। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ১২ জুন দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। এখন বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা। তাঁর সব অপকর্মের সঠিক বিচার এবং উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে দেশে আইনের শাসনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে। আইন ও সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।

১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত ভাগ হওয়ার আগে পুলিশের প্রথম মহাপরিদর্শক ছিলেন জাকির হোসেন। তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ মে আইজিপি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম আইজিপি আবদুল খালেক। তিনি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নিয়োগ লাভ করেন। বর্তমান আইজিপি পুলিশের ৪১তম শীর্ষ কর্মকর্তা। এ পদে অতীতে যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের বেশ কয়েকজন পরবর্তী সময়ে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হয়েছেন, সচিব হয়েছেন, রাষ্ট্রদূত হয়েছেন। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া প্রায় সবাইকে নিয়েই পুলিশ বাহিনী গর্ববোধ করে। অবসরে যাওয়ার পরও অনেক আইজিপি ছিলেন পুলিশ বাহিনীর বাতিঘর। আবার বেনজীরের মতো কয়েকজনের কারণে এ বাহিনী আজ ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারছে না।  চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় আমরা দেখেছি, পুলিশকে আনসার বাহিনী পাহারা দিয়ে রেখেছিল। একটি বাহিনীর এ করুণ অবস্থার জন্য বেনজীর আহমেদ অনেকাংশেই দায়ী। তিনি যখন ঢাকা মহানগরের কমিশনার, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র‌্যাব) মহাপরিচালক এবং সর্বশেষ আইজিপি হয়েছিলেন তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দানবে পরিণত হয়েছিল। তাঁর দম্ভ এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে সিনিয়র-জুনিয়র সহকর্মী, রাজনৈতিক নেতারাও স্তম্ভিত হয়েছেন। তিনি যেসব ক্রাইম করেছেন, সেগুলোর অনেক কিছু¦ই সাধারণ মানুষ জানে না। দুর্নীতি দমন কমিশন বা সরকারের অন্যান্য দপ্তর তাঁর প্রকাশ্য কিছু দুর্নীতি বা অপকর্মের কথা জানে। তবে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত তাঁর ব্যাচমেট, সিনিয়র-জুনিয়র সহকর্মীরা আরও বেশি জানেন। সে সময় অনেকেই ভয়ে মুখ খোলেননি। পুলিশ বাহিনীতে তিনি যাঁর প্রতি রুষ্ট হয়েছেন, তাঁর জীবন অতিষ্ঠ করে দিয়েছেন।

তেমনি একটি ঘটনা তাঁর চাকরিজীবনের মধ্য-সময়ের। ১৯৯৮ সালের ২০ আগস্ট থেকে ২০০০ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি কিশোরগঞ্জের এসপি ছিলেন। সে সময় একজন জুনিয়র সহকর্মীর স্ত্রীর প্রতি কুনজর যায় বেনজীরের। জুনিয়র কর্মকর্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রথমে নিজে নিজে চেষ্টা করলেন। স্ত্রীকে তিনি ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তাতেও  ক্ষান্ত হননি এসপি সাহেব। জুনিয়র শিক্ষানবিশ কর্মকর্তাকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকেন। পরে পরিস্থিতি অনেক দূর পর্যন্ত গড়ায়। বাধ্য হয়ে জুনিয়র কর্মকর্তা আইজিপি বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। সে সময় আইজিপি ছিলেন এ আই বি ওয়াই সিদ্দিকী। ঘটনার সত্যতা তদন্ত করার জন্য আইজিপি দায়িত্ব দেন বেনজীরেরই ব্যাচমেট এক কর্মকর্তাকে। তিনি বিস্তারিত তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পান। তদন্তের স্বার্থে তিনি বেনজীরের বক্তব্য জানতে চাইলে ব্যাচমেট বন্ধুর প্রতি তিনি মহাক্ষিপ্ত হন। সেই ক্ষিপ্ততায় শেষ পর্যন্ত দুই বন্ধুর সম্পর্ক শত্রুতায় পরিণত হয়। ব্যক্তিগত জীবনে এ ধরনের অনেক ঘটনাই তাঁর ব্যাচমেট, বন্ধুমহলের কাছে শোনা যায়। তিনি দুবাইতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর নায়িকা পরীমণি তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুকে লেখেন, ‘মজা’। নায়িকার এই ছোট্ট অথচ অনেক অর্থবহ একটি মাত্র শব্দ নিয়েও নেটিজেনে অনেক আলোচনা হচ্ছে।

বেনজীরের বন্ধুমহল মনে করে, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির যেসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, সেগুলো প্রকৃত দুর্নীতির কাছে নস্যি। তেমনি একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০১২ সালে। মাদকের একটি বড় চালান ধরা পড়ে। তখন বেনজীর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার। মাদক কারবারিরা তখন বেনজীরের কাছে যায়। বেনজীর তাদের সঙ্গে এক হাজার কোটি টাকায় রফা করেন। টাকা লেনদেন হওয়ার পর কাজে হাত দেন বেনজীর। চালানে প্রকৃতই মাদক নাকি অন্য কিছু তা পরীক্ষা করতে স্যাম্পল পাঠানো হয় ল্যাবরেটরিতে। সাত দিন পর ল্যাব রিপোর্টে মাদক হয়ে যায় কেমিক্যাল। মহানন্দে মাদকের চালান নিয়ে চলে যায় মাদক কারবারিরা। এদিকে মাদক কেমিক্যাল হয়ে যাওয়া এবং এক হাজার কোটি টাকা লেনদেনের খবর চলে যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। প্রধানমন্ত্রী বেনজীরকে তলব করেন। বেনজীর যখন প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করেন তখন সেখানে অন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। বেনজীরকে দেখেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসো আসো। তুমি নাকি এক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছ। এত টাকা দিয়ে কি করবা?’ প্রধানমন্ত্রীর কথার ত্বরিত উত্তরে বেনজীর বলেছিলেন, ‘টাকা দিয়ে আমি কিছু করব না। সব টাকা আমি আপনার আওয়ামী লীগের ফান্ডে দিয়ে দেব।’ বেনজীরের এই অত্যন্ত দৃঢ় ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ উত্তরে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে যান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলে সেদিন তিনি বেনজীরকে বিদায় করেন। সেখানে উপস্থিত গোয়েন্দাপ্রধানের মুখ থেকে ঘটনাটি আমি জেনেছি। ওই গোয়েন্দাপ্রধান আরও একটি বড় দুর্নীতির তথ্য আমার সঙ্গে এক আড্ডায় বলেছিলেন। সে ঘটনাও মাদককেন্দ্রিক।

মন্‌জুরুল ইসলাম২২০ কোটি টাকার আরেকটি মাদকের চালান ধরা পড়ে। বেনজীর তখন আইজিপি। মাদক কারবারিরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করার চেষ্টা করে। এতে বাদ সাধেন আইজিপি। তখন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেনজীরকে ডেকে বিষয়টি মীমাংসা করার দায়িত্ব দেন। তখন তিনি সেই আগের ফর্মুলায় মাদকের স্যাম্পল ল্যাব টেস্টে পাঠিয়ে মাদককে কেমিক্যালে রূপান্তর করেন। ১৫০ কোটি টাকার বিনিময়ে এই চালান ছেড়ে দেওয়ার কাজটি করা হয়। এই টাকার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পান ৫০ কোটি টাকা। বাকিটা থাকে বেনজীরের পকেটে। মাদককে কেমিক্যাল বানানোর এই চতুরতায় বেনজীরের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন পুলিশের একটি গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ইংলিশ মাহবুব নামে পরিচিত পুলিশের একজন কর্মকর্তা।

বেনজীরকে নিয়ে এ ধরনের আরও অনেক অজানা কাহিনি আছে, যা পুলিশের, সরকারের অন্যান্য গোয়েন্দা বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানেন। তিনি যখন পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তখন ভয়ে অনেকেই মুখ খোলেননি। কারণ এ দাপুটে কর্মকর্তা মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী বা সমাজের বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তিকেও গুরুত্ব দিতেন না। একবার আলোচিত এক নায়িকাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ও প্রবীণ এক নেতার ভাগনেকে সাদা পোশাকের পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। বিষয়টি নিয়ে ওই নেতা প্রথমে বেনজীরকে ফোন করেন। কিন্তু নেতার ফোন তিনি ধরেননি। অবশেষে নেতা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানান। কিন্তু বেনজীর কোনো কিছুকেই পাত্তা দেননি।

বেনজীরের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ যে লিখে শেষ করা যাবে না। ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ের প্রশ্রয়ে তিনি জনগণের বন্ধু পুলিশ থেকে দানবে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি শুধু নিজে দুর্নীতি, গুম, খুন করেননি-গোটা পুলিশ বাহিনীকেও নষ্ট করে দিয়ে গেছেন। পুলিশ বাহিনীর ভিতরে তিনি একটি বলয় তৈরি করেছিলেন। ওই বলয়ে যাঁরা ছিলেন তাঁরা ছিলেন আরও বেপরোয়া। বিএনপি নেতা  এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের মতো একজন সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাকে পুলিশ কর্মকর্তা হারুন ও বিপ্লব যেভাবে প্রকাশ্যে শারীরিক নির্যাতন করেছেন তা দেশবাসী দেখেছে। এ ধরনের ঘটনা কোনো সভ্য দেশে কল্পনাও করা যায় না। এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার পর রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে বাহবা দেওয়া হয়েছিল।

ব্যক্তি বেনজীর একদিকে যেমন দুর্নীতিবাজ, নারীলিপ্সু অথবা অন্য অনেক অপরাধে অপরাধী হিসেবে নিজেকে মাফিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন; অন্যদিকে পুলিশের মতো একটি বাহিনীকে ধ্বংস করেছেন। এমনিতেই পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে এত সব অপকর্মকে উৎসাহিত করলে দেশের আইনশৃঙ্খলার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। যার খেসারত এখন পুলিশ বাহিনী এবং দেশকে দিতে হচ্ছে। ভাবমূর্তি ফিরিয়ে পেশাদারি দৃঢ়তায় ফিরতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, এর মূল কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের দলনপীড়ন নীতি এবং বেনজীরের বেপরোয়া পুলিশি ব্যবস্থা। সে সময় সেনা, আনসার বাহিনী, এমনকি সাধারণ মানুষ পুলিশকে পাহারা দিয়ে রেখেছিল। এমন কলঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পুলিশের অনেক দিন সময় লাগবে। এটি এই বাহিনীর জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায়। বর্তমান সরকারের বয়স চার মাস। শত চেষ্টা করেও সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারছে না। প্রতিদিনই কোনো না কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। মানুষ হত্যা এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বেনজীরকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সব অপকর্মের সঠিক বিচার করতে হবে। পুলিশ বাহিনীর মধ্যে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে-অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন, সব সময় তার ক্ষমতা একরকম থাকে না। অপরাধীর বিচার অবশ্যই হতে হবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যে পন্থা সরকার অবলম্বন করবে, সেখানে যেন বেনজীরের পক্ষ নিয়ে কেউ কোনো রকম কলকাঠি নাড়ার সুযোগ না পায়। সর্ষের মধ্যে যেন ভূত না থাকে। বেনজীর এত অপরাধ করেছেন যে তার তালিকা করা মুশকিল। অপরাধের কৌশলও তাঁর জানা আছে। আবার অপরাধ থেকে বাঁচার কৌশলও তাঁর জানা। রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো অপকৌশল যদি বেনজীরের হয়ে কাজ করে, তাহলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। পুলিশ বাহিনীতেও শৃঙ্খলা ফিরবে না। আর পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা না ফিরলে সরকারকে পদে পদে বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন

[email protected]

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত সার্বভৌম কূটনীতির পরিচয়

আহসান হাবিব বরুন
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া-চীন সফরের সিদ্ধান্ত সার্বভৌম কূটনীতির পরিচয়

আধুনিক বিশ্বে কূটনীতি আর শুধু রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক রক্ষার মাধ্যম নয়; এটি উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষার একটি কৌশলগত হাতিয়ার। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতির গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন মালয়েশিয়া ও চীন সফরকে নিছক দুটি রাষ্ট্র সফর হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি এমন একটি কূটনৈতিক উদ্যোগ, যা দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশ আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অন্যদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা এবং বিনিয়োগ চ্যালেঞ্জ। স্বাধীনতার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর বাংলাদেশ নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশের পথে এগিয়ে এসেছে। আগামী দিনের লক্ষ্য উন্নত রাষ্ট্রে রূপান্তর। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এখন আর কোনো বিলাসিতা নয়, বরং একটি অপরিহার্য প্রয়োজন।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নেওয়া নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। সফরের ক্রম, আলোচ্যসূচি এবং সম্ভাব্য ফলাফল বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতীকবাদের চেয়ে অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চায়।

মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু রাষ্ট্র। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশটি শুধু একটি অর্থনৈতিক শক্তিই নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের আধুনিক উন্নয়নের অন্যতম সফল মডেল। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি থেকে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প রাষ্ট্রে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য শিক্ষণীয়।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্কের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো জনশক্তি। লক্ষাধিক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কর্মরত রয়েছেন এবং তাঁদের পাঠানো রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আরও সম্প্রসারিত হলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে বর্তমান বিশ্বে শুধু শ্রম রপ্তানি নয়, দক্ষ জনশক্তি গঠনই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। যদি এই সফরে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং উচ্চশিক্ষা সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচিত হয়, তাহলে এর দীর্ঘমেয়াদি সুফল বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিফলিত হবে। কারণ আগামী দিনের প্রতিযোগিতা হবে দক্ষতা ও প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা।
অন্যদিকে মালয়েশিয়ার শিল্প ও বিনিয়োগ খাতেও বাংলাদেশের জন্য বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।
 ইলেকট্রনিকস, হালাল শিল্প, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল অর্থনীতিতে যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলে তা দেশের শিল্পায়নকে নতুন গতি দিতে পারে।

তবে সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় নিঃসন্দেহে চীনকে ঘিরে। গত দুই দশকে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী। দেশের বহু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল সহায়তা রয়েছে।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক উন্নয়নের ইতিহাসে সড়ক, সেতু, রেল, বিদ্যুৎ, বন্দর এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর বহু প্রকল্পের সঙ্গে চীনের সম্পৃক্ততা রয়েছে। ফলে প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফর কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য নয়; বরং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ বর্তমানে যে চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি, তার মধ্যে অন্যতম হলো বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে বিপুল পরিমাণ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে চীনা বিনিয়োগ নতুন শিল্প স্থাপন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প। উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকা তিস্তার সঙ্গে সম্পর্কিত। দীর্ঘদিন ধরে নদীর নাব্যতা সংকট, ভাঙন, পানির স্বল্পতা এবং সেচ সমস্যার কারণে এ অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আধুনিক নদী ব্যবস্থাপনা এবং সেচ অবকাঠামো উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিকে নতুন গতি দিতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রযুক্তিগত সহযোগিতা। বিশ্ব এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে প্রবেশ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট উৎপাদন এবং ডিজিটাল অবকাঠামো আগামী দিনের অর্থনীতির ভিত্তি হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ যদি এসব খাতে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা আকৃষ্ট করতে পারে, তাহলে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

তবে এই সফরগুলোর গুরুত্ব শুধু অর্থনৈতিক দিকেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রশ্নও উঠে আসে। বাংলাদেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেকেই লক্ষ্য করেছেন যে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য মালয়েশিয়া ও চীনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যদিও প্রতিবেশী ভারতও সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছিল বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র কোন দেশকে কখন অগ্রাধিকার দেবে, সেটি সম্পূর্ণ তার নিজস্ব কৌশলগত সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক এবং উন্নয়ন অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

এখানে মনে রাখা দরকার, বিএনপির কূটনৈতিক দর্শন কোনো নতুন বিষয় নয়। স্বাধীনতার ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে যে পররাষ্ট্রনীতি অনুসৃত হয়েছে, তার মূল ভিত্তি ছিল জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক মর্যাদা এবং সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা।

এই ধারাবাহিকতায় তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছ থেকেও একই ধরনের নীতিগত অবস্থান প্রত্যাশিত। কারণ একটি রাজনৈতিক দলের পররাষ্ট্রনীতি কেবল কোনো ব্যক্তির পছন্দ-অপছন্দের বিষয় নয়; এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, আদর্শ এবং জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত।

সুতরাং বিএনপির কূটনৈতিক রেওয়াজে হঠাৎ করে মৌলিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা খুবই কম। দলটি ঐতিহাসিকভাবেই এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, যেখানে কোনো দেশের সঙ্গে বৈরিতা নয়, আবার কোনো দেশের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতাও নয়; বরং জাতীয় স্বার্থকেই সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সীমান্ত পরিস্থিতি, কথিত পুশ-ইন, ভিসা ও কূটনৈতিক যোগাযোগসংক্রান্ত কিছু ঘটনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে নতুন আলোচনা তৈরি হয়েছে। এসব ঘটনাকে অনেকেই দুই দেশের সম্পর্কে বিদ্যমান কিছু অস্বস্তির প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।

তবে এ কথাও সত্য যে, বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক কেবল সরকার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল নয়। ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং নিরাপত্তা—সবকিছু মিলিয়ে দুই দেশ একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও অংশীদার।

সেই কারণেই সম্পর্কের ক্ষেত্রে আবেগ নয়, বাস্তবতাই হওয়া উচিত প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কোনো রাষ্ট্র তার নিজস্ব অগ্রাধিকার নির্ধারণ করবে—এটিই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক নিয়ম। কোনো সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের মানদণ্ডে বিচার করা পরিপক্ব কূটনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভারতেরও উপলব্ধি করা উচিত যে আজকের বাংলাদেশ আর দুই দশক আগের বাংলাদেশ নয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক সংযোগ, বঙ্গোপসাগরীয় ভূরাজনীতি এবং ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলগত বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশ্বের বড় শক্তিগুলো এখন বাংলাদেশকে নতুন দৃষ্টিতে দেখছে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে বাংলাদেশের অবস্থান তাকে একটি সম্ভাবনাময় আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও নতুন বাস্তবতার আলোকে পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। সীমান্ত হত্যা, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, বিশেষ করে তিস্তা চুক্তি এবং অন্যান্য অমীমাংসিত বিষয়গুলো দীর্ঘদিন ধরে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলছে। এসব সমস্যার টেকসই সমাধানই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চায়, তেমনি সেই সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মান ও সমমর্যাদার ভিত্তিতে। কারণ আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মূল ভিত্তি হলো সমতা, সহযোগিতা এবং পারস্পরিক স্বার্থ।

আজকের বাংলাদেশ এমন একটি পররাষ্ট্রনীতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা নয়, বরং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, আসিয়ান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলাই হবে ভবিষ্যতের কূটনৈতিক সাফল্যের চাবিকাঠি।

তবে সফরের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে চুক্তির সংখ্যা নয়, বাস্তবায়নের ওপর। অতীতে বহু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতির কারণে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি। তাই এবার প্রয়োজন দ্রুত বাস্তবায়ন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা।

বাংলাদেশের মানুষ এখন বড় বড় ঘোষণার চেয়ে বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চায়। তারা দেখতে চায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে, শিল্প কারখানা গড়ে উঠছে, কৃষি ও প্রযুক্তি খাত এগিয়ে যাচ্ছে এবং তরুণদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

যদি মালয়েশিয়া ও চীন সফর সেই বাস্তব পরিবর্তনের ভিত্তি স্থাপন করতে পারে, তাহলে তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের উন্নয়নের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সবশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া ও চীন সফর কেবল আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কর্মসূচি নয়; এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বৈশ্বিক সম্পৃক্ততার নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ। বিচক্ষণ নেতৃত্ব ও বাস্তবভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই সফর দেশের জন্য টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির নতুন অধ্যায় রচনা করতে সক্ষম হতে পারে।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন
ই-মেইল : [email protected]  

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ : সদিচ্ছার প্রতিফলন, তবে বাস্তবায়নের পথ কঠিন

মাহামুদ হোসেন
প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ : সদিচ্ছার প্রতিফলন, তবে বাস্তবায়নের পথ কঠিন

ক্ষমতায় আসার পর একটি সরকারের প্রথম বাজেট সাধারণত তার রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতির সবচেয়ে স্পষ্ট প্রতিফলন ঘটায়। সেই বিবেচনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট নিঃসন্দেহে বর্তমান সরকারের নীতি-অবস্থান বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এ বাজেটে জনকল্যাণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা এবং অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রতি সরকারের সদিচ্ছা স্পষ্ট। তবে বাজেট কেবল ভালো উদ্দেশ্যের ঘোষণাপত্র নয়; এর প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় বাস্তবায়নের সক্ষমতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দৃঢ়তার মাধ্যমে।

এই বাজেটের ইতিবাচক দিকগুলো অস্বীকার করার সুযোগ নেই। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য খাতে প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দ, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো উদ্যোগ একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ধারণাকে সামনে আনে। বিশেষ করে ৪১ লাখ নারীকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক আর্থিক সহায়তা প্রদানের পরিকল্পনা নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ হতে পারে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের ব্যক্তিশ্রেণির করকাঠামো একসঙ্গে ঘোষণা করা, বৈদ্যুতিক যানবাহনে দীর্ঘমেয়াদি শুল্ক ছাড় এবং ক্রিয়েটিভ ইকোনমি ও স্পোর্টস ইকোনমিকে গুরুত্ব দেওয়ার মতো উদ্যোগ দূরদর্শী পরিকল্পনার ইঙ্গিত দেয়।

কিন্তু সদিচ্ছা যতই প্রশংসনীয় হোক, বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হলো প্রশাসনিক কাঠামোর দুর্বলতা। বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, জবাবদিহির অভাব এবং অদক্ষতার ভার বহন করছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে কর প্রশাসনে মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। করদাতা হয়রানি বন্ধ, অটোমেশন বাস্তবায়ন এবং ফেসলেস অ্যাসেসমেন্ট চালু করা শুধু নীতিগত ঘোষণার বিষয় নয়; এগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন মানসিকতা পরিবর্তন, দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

এডিপি বাস্তবায়নের অতীত রেকর্ডও সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের হার ধারাবাহিকভাবে কমেছে। লক্ষ্যমাত্রা বাড়লেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা সেই হারে বাড়েনি। ফলে প্রস্তাবিত ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপিতে উল্লেখযোগ্য বাস্তবায়ন ঘাটতির ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো বড় উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মাঠপর্যায়ে ডিজিটাল অবকাঠামো এখনো দুর্বল, কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত দক্ষতায় ঘাটতি রয়েছে এবং মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

অর্থনৈতিক নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আছে। একদিকে ব্যাপক করছাড় ও অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে রেকর্ড রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মূল্যস্ফীতি কমানোর লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে, কিন্তু একই সঙ্গে ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করা হলেও উচ্চ সুদের হার কমানোর সুস্পষ্ট রোডম্যাপ অনুপস্থিত। এসব লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে হলে শক্তিশালী সমন্বিত অর্থনৈতিক কৌশল দরকার, যা বাজেট বক্তৃতায় যথেষ্ট স্পষ্টভাবে দেখা যায় না।

বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো এনবিআর রাজস্ব ৫৬ শতাংশ বাড়ানোর মতো উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যের বিপরীতে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনার অভাব। বেসরকারি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি কয়েক গুণ বাড়ানোর লক্ষ্যও প্রশংসনীয়, কিন্তু বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, সুদের হার, নীতি-স্থিতিশীলতা এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর না হলে এ লক্ষ্য বাস্তবায়ন কঠিন হবে। মূল্যস্ফীতি কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে রাজস্ব ও মুদ্রানীতির ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অপরিহার্য; কিন্তু সেই সমন্বয়ের ধাপভিত্তিক রূপরেখা আরো পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন।

সরকারের ঘোষিত পুনরুদ্ধার, পুনরুজ্জীবন ও পুনর্গঠনের ত্রিস্তরীয় কৌশল ধারণাগতভাবে সঠিক। কিন্তু প্রথম ধাপ মাত্র এক বছরে সম্পন্ন করার পরিকল্পনা অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী বলে মনে হয়। প্রতিটি ধাপের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা, মাইলস্টোন, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান এবং জবাবদিহির কাঠামো না থাকলে এ ধরনের কৌশল শেষ পর্যন্ত আকর্ষণীয় স্লোগানেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়ানো। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য ত্রৈমাসিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে এবং সেগুলো পূরণে ব্যর্থ হলে দৃশ্যমান জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখতে হবে। একই সঙ্গে একটি বাস্তবসম্মত সংশোধিত বাজেটের প্রস্তুতিও এখন থেকেই নেওয়া উচিত। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্নির্ধারণ করা গেলে সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা কমবে না; বরং বাড়বে।

অর্থনৈতিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি পূরণে দেশীয় অর্থনীতিবিদ, পেশাদার হিসাববিদ, বেসরকারি খাতের বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের প্রযুক্তিগত সহায়তা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হবে। এটি দুর্বলতার স্বীকৃতি নয়; বরং দায়িত্বশীল ও দূরদর্শী নেতৃত্বের পরিচায়ক। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সংস্কার ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। খেলাপি ঋণ কমানো, মূলধন পর্যাপ্ততা পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এখন সময়ের দাবি।

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে একটি সদিচ্ছাপূর্ণ ও জনকল্যাণমুখী বাজেট বলা যায়। তবে গণতান্ত্রিক সরকারের দায়িত্ব কেবল ভালো উদ্দেশ্য ঘোষণা করা নয়; সেই উদ্দেশ্যকে কার্যকর নীতিতে এবং নীতিকে দৃশ্যমান ফলাফলে রূপান্তর করা। সদিচ্ছা যদি বাস্তবে রূপ না পায়, তবে তা শেষ পর্যন্ত জনগণের কাছে হতাশার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এই বাজেটের সাফল্য তাই সংখ্যার বিশালতায় নয়, বরং বাস্তবায়নের সততা, দক্ষতা এবং জবাবদিহির ওপর নির্ভর করবে।

মাহামুদ হোসেন এফসিএ
আর্থিক খাতের বিশ্লেষক ও সাবেক কাউন্সিল মেম্বার আইসিএবি