বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুলের ফ্রান্স সফর উপলক্ষে ফ্রান্স বিএনপির উদ্যোগে আয়োজিত সংবর্ধনা অনুষ্ঠান শেষ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের প্রস্তুতি ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের ব্যাপক আগ্রহের পরও নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠানটি না হওয়ায় প্রবাসী মহলে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা। আয়োজকরা এর জন্য মন্ত্রীর ব্যস্ত সরকারি সফরসূচি ও তীব্র দাবদাহকে দায়ী করলেও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, সাংগঠনিক সমন্বয়হীনতা ও দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দল এ সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) প্যারিসে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সংবর্ধনা ও প্রবাসীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠান। এ উপলক্ষে ফ্রান্সের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিএনপির নেতাকর্মী, প্রবাসী বাংলাদেশি ব্যবসায়ী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধি এবং কমিউনিটির সদস্যদের উপস্থিত থাকার কথা ছিল। তবে অনুষ্ঠান শুরুর কিছুক্ষণ আগেই এটি স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হয়।
ফ্রান্স বিএনপির নেতাদের ভাষ্য, মন্ত্রীর ব্যস্ত সরকারি সফরসূচি এবং ফ্রান্সজুড়ে চলমান তীব্র দাবদাহের কারণে অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে সময়সূচি ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা তৈরি হয়। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে অংশগ্রহণকারীদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য ও বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অনুষ্ঠানটি স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
তবে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা, অভ্যন্তরীণ অনৈক্য এবং নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতার কারণে অনুষ্ঠান আয়োজনকে ঘিরে জটিলতা তৈরি হয়। বিশৃঙ্খলা এড়াতেই শেষ মুহূর্তে অনুষ্ঠানটি স্থগিত করা হয়েছে বলে তাদের অভিমত।
ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এম এ তাহের বলেন, আমরা স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে সংবর্ধনা জানাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিলাম। কমিউনিটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে অনুষ্ঠানটি নিয়ে যথেষ্ট আগ্রহ ছিল। কিন্তু মন্ত্রীর অত্যন্ত ব্যস্ত সরকারি কর্মসূচি এবং চলমান তীব্র দাবদাহের কারণে নির্ধারিত সময়ে অনুষ্ঠানটি আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
সফরকালে মন্ত্রীর জন্য নির্ধারিত হোটেলের সামনে বিএনপির নেতাকর্মীদের অতিরিক্ত উপস্থিতির কারণে বিরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন পর একজন মন্ত্রীর আগমন স্বাভাবিকভাবেই নেতাকর্মীদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। তবে হোটেলের গ্রাউন্ড ফ্লোরে অতিরিক্ত ভিড় করাটা হয়ত সমীচীন ছিল না।
ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সহ-সভাপতি মাহবুব আলম রাঙ্গা বলেন, অনুষ্ঠান স্থগিতের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বাস্তব পরিস্থিতির আলোকে নেওয়া হয়েছে। হল বুকিং, অতিথি আমন্ত্রণসহ সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে আমরা এ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি।
প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের একটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর সফরকালে বিভিন্ন সরকারি ও কূটনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। সফরের অংশ হিসেবে তিনি স্বাস্থ্যখাতে সহযোগিতা বৃদ্ধি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বাস্থ্যসেবা-সংক্রান্ত বিষয় এবং বাংলাদেশ-ফ্রান্স দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন।
সূত্রটি আরো জানায়, কমিউনিটির উদ্যোগে আয়োজিত কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন বা স্থগিতের বিষয়টি সম্পূর্ণ সংশ্লিষ্ট আয়োজকদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত।
কমিউনিটির বিভিন্ন স্তরে অনুষ্ঠানটি ঘিরে ব্যাপক আগ্রহ থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হওয়ায় অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফ্রান্স বিএনপির সাংগঠনিক সক্ষমতা ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মতে, এমন একটি কর্মসূচি শেষ মুহূর্তে স্থগিত হওয়ায় সাধারণ প্রবাসীদের কাছে সংগঠনের ভাবমূর্তিও কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোন কারণে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে অপারগতা প্রকাশ করেছিলেন, সে বিষয়ে নিশ্চিতভাবে মন্তব্য করার সুযোগ কেবল তাঁরই রয়েছে বলে তারা মনে করেন।
ফ্রান্স বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জুনেদ আহমদ বলেন, মন্ত্রী মহোদয়ের সফর এবং সংবর্ধনা অনুষ্ঠান নিয়ে আমরা দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে বিমানবন্দরে উপস্থিত হই। সেখানে মন্ত্রী মহোদয়ের নিজ এলাকার কিছু লোকজনের উপস্থিতির কারণে অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এটি তিনি ভালোভাবে নেননি। পাশাপাশি আমাদের মধ্যেও সমন্বয়হীনতার একটি স্পষ্ট লক্ষণ দেখা গেছে। এককেন্দ্রিক নেতৃত্বও আজকের পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী।
ফ্রান্স বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক কবির আহমেদ বলেন, একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রবণতাই আজকের এই পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী। সবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে যেকোনো জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলা করে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসে রাজনৈতিক দলগুলোর উদ্যোগে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সম্মানে আয়োজিত এ ধরনের অনুষ্ঠান শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং প্রবাসীদের সঙ্গে সরকারের প্রতিনিধিদের যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে এমন একটি কর্মসূচি শেষ মুহূর্তে স্থগিত হওয়ায় তা স্বাভাবিকভাবেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।




