ফ্রান্সে অনিয়মিতভাবে অবস্থানরত এবং জননিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচিত বিদেশিদের প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ মেয়াদ বাড়িয়ে ২১০ দিন করা হয়েছে। বিতর্কিত এ আইন মঙ্গলবার (১৬ জুন) পার্লামেন্টে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে। সরকারের দাবি, বহিষ্কার প্রক্রিয়া আরো কার্যকর করা এবং জননিরাপত্তা জোরদার করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে বিরোধী দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো এটিকে ব্যক্তিস্বাধীনতার পরিপন্থী বলে সমালোচনা করেছে।
ফরাসি পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে অনুমোদনের পর নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিও বিলটির পক্ষে চূড়ান্ত সম্মতি দেয়। ভোটাভুটিতে ৩৪৫ জন সংসদ সদস্য বিলটির পক্ষে এবং ১৭৭ জন বিপক্ষে ভোট দেন। সরকার, ডানপন্থি দলগুলো এবং কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালি বিলটিকে সমর্থন করে।
বর্তমানে ফ্রান্সে প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ সময়সীমা ৯০ দিন। সন্ত্রাসবাদে দণ্ডিত বিদেশিদের ক্ষেত্রে তা ১৮০ দিন। নতুন আইনের আওতায় নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এ সময়সীমা বাড়িয়ে সর্বোচ্চ ২১০ দিন পর্যন্ত করা যাবে।
আইন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ফরাসি ভূখণ্ড ত্যাগের নির্দেশ (ওকিউটিএফ) থাকতে হবে। পাশাপাশি অতীতে গুরুতর অপরাধে অন্তত পাঁচ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত হতে হবে এবং তাকে জননিরাপত্তার জন্য বাস্তব ও গুরুতর হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হতে হবে। এসব শর্ত পূরণ হলে বহিষ্কার কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত তাকে প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে রাখা যাবে।
নতুন আইনে সন্ত্রাসবাদে দণ্ডিত বিদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক আটকের সর্বোচ্চ মেয়াদ ১৮০ দিন থেকে বাড়িয়ে ২১০ দিন করা হয়েছে।
বিলটি পাস হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লকর্নু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, রাজনৈতিক অবস্থানের চেয়ে কার্যকারিতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তার ভাষায়, ‘ফরাসিদের নিরাপত্তাই আমাদের একমাত্র দিকনির্দেশনা।’
আইনটিতে আরেকটি নতুন বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এর আওতায় প্রশাসনের প্রতিনিধিরা প্রয়োজন মনে করলে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের বাধ্যতামূলক মনোরোগ মূল্যায়নের নির্দেশ দিতে পারবেন। সরকারের দাবি, সম্ভাব্য সন্ত্রাসী ঝুঁকি মোকাবিলায় এ ব্যবস্থা সহায়ক হবে।
তবে বিরোধীরা এ বিধানের সমালোচনা করেছে। সোশ্যালিস্ট পার্টির সংসদ সদস্য রোমাঁ এসকেনাজি বলেন, প্রস্তাবিত আইনটি মানসিক স্বাস্থ্য, সন্ত্রাসবাদ ও অভিবাসন—এই তিনটি পৃথক বিষয়কে একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলেছে। বামপন্থি দলগুলো ইতোমধ্যে বিষয়টি সাংবিধানিক পরিষদে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।
আইনটির সমর্থক কয়েকজন সংসদ সদস্য ২০২৪ সালের আলোচিত ‘ফিলিপিন’ হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। ওই ঘটনায় অভিযুক্ত মরক্কোর এক নাগরিকের বিরুদ্ধে ফ্রান্স ছাড়ার নির্দেশ জারি ছিল এবং ঘটনার আগে তিনি একটি প্রশাসনিক আটক কেন্দ্র থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন।
তবে সমালোচকদের দাবি, নতুন আইন কার্যকর থাকলেও ওই হত্যাকাণ্ড প্রতিরোধ করা সম্ভব হতো না। সংসদ সদস্য অঁদি কেরব্রা বলেন, অভিযুক্তকে ৭০ দিনের মাথায় মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। সে সময় বিদ্যমান আইনেই তাকে ৯০ দিন পর্যন্ত আটকে রাখার সুযোগ ছিল। ফলে আটকের মেয়াদ বাড়ানো হলেও ওই ঘটনার পরিণতি ভিন্ন হতো না।
ফ্রান্সে অনিয়মিত অবস্থানে থাকা বিদেশিদের বহিষ্কারের উদ্দেশ্যে প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে রাখা হয়। তবে ইউরোপীয় আইন অনুযায়ী এটি একটি ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা, যা কেবল শেষ অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করা উচিত।
অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন লা সিমাদের মতে, বহিষ্কার কার্যকর করার জন্য ব্যক্তিস্বাধীনতায় কম হস্তক্ষেপকারী অন্য কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে তবেই প্রশাসনিক আটক ব্যবহার করা উচিত।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ফ্রান্সের মূল ভূখণ্ডে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ বিদেশিকে প্রশাসনিক আটক কেন্দ্রে রাখা হয়েছে। মায়োতসহ ফরাসি ওভারসিজ অঞ্চলগুলোর হিসাব যুক্ত করলে এ সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজারে পৌঁছায়।










