জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় অভিযোজন কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা অভাব রয়েছে। সৌর ও বায়ুশক্তির সম্প্রসারণ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবেলায় পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে বিনিয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন উপকূল সুরক্ষা, কৃষি অভিযোজন, নগর জলবায়ু ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ প্রস্তুতি এবং জলবায়ু অর্থায়নকে কেন্দ্র করে সমন্বিত পরিকল্পনা। বাজেট পাসের আগে এসব বিষয়ে পূনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
আরো পড়ুন
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিওনের চেয়ারম্যানের সাক্ষাৎ
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত বাংলাদেশের জন্য আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি এখন বাস্তবতা। প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বন্যা, খরা, অতিবৃষ্টি এবং দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে নতুন নতুন সংকট তৈরি করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর তালিকায় দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অবস্থান ওপরের সারিতে। এমন বাস্তবতায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবেলায় চলতি বাজেটে বিদ্যুৎ খাতে জ্বালানি রূপান্তরের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সরকার আগামী বছরগুলোতে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার বাড়ানোর লক্ষ্যের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছে। সৌরবিদ্যুৎ, ছাদভিত্তিক সোলার ব্যবস্থা, শিল্প খাতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ব্যবহার এবং বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করার বিষয়গুলো প্রস্তাবিত বাজেটে উঠে এসেছে।
আরো পড়ুন
জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু
বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে এ উদ্যোগ প্রয়োজনীয়। কারণ বাংলাদেশ এখনো আমদানি নির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং মূল্য অস্থিরতার ঝুঁকিতে রয়েছে। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক জলবায়ু প্রতিশ্রুতি পূরণেও নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকল্প নেই। তবে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবেলার উদ্যোগ এক বিষয় নয়। একটি প্রশমন ও অন্যটি অভিযোজন। বাংলাদেশের জন্য দ্বিতীয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। যেটা বিবেচনায় নেওয়া দরকার। সেক্ষেত্রে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় অভিযোজন ব্যয় আগামীতে কয়েক গুণ বাড়বে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার এবং ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বৃদ্ধির কারণে লাখো মানুষ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ভোলা ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষি উৎপাদন, সুপেয় পানি এবং জীবিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে। বাজেটে এসব ঝুঁকি মোকাবেলায় নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। এছাড়া দেশের প্রায় ৭০০ কিলোমিটারের বেশি উপকূলরেখা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে রয়েছে। বহু এলাকায় বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে, নদীভাঙন বাড়ছে এবং লবণাক্ত পানি কৃষিজমিতে প্রবেশ করছে। বিভিন্ন সময়ে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়নে বিনিয়োগ করা হলেও জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উপকূল ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা এখনো দৃশ্যমান নয়।
আরো পড়ুন
ঘুমন্ত স্বামীর গোপনাঙ্গ কর্তনের অভিযোগ স্ত্রীর বিরুদ্ধে
সংশ্লিষ্টদের মতে, এবারের বাজেটে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্ব পেলেও সেটিকে একটি সমন্বিত জাতীয় অভিযোজন কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি। কিন্তু বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দের মধ্যে জলবায়ু অভিযোজনের বিষয়টি ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকায় সামগ্রিক চিত্র স্পষ্ট নয়। ফলে সবুজ অর্থনীতির দিকে যাত্রার ঘোষণা থাকলেও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলার পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ এখনো হয়নি। তাই সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বাজেটকে গণমূখী করতে জলবায়ু অভিযোজনের জন্য পৃথক জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন, জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন কৌশল নির্ধারণ, নগর তাপপ্রবাহ মোকাবেলার কর্মসূচি গ্রহণ, উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়ন, জলবায়ু ঝুঁকিভিত্তিক স্থানীয় সরকার অর্থায়ন কাঠামো নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন আহরণের সুনির্দ্দিষ্ট কৌশল নির্ধারণ করা জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
উপকূলের ইস্যুগুলো নিয়ে দীর্ঘ দিন গবেষণা করছেন শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর মোহাম্মদ আলী।
আরো পড়ুন
গরমেও ইউরোপে এসির ব্যবহার কম কেন?
তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় আগামী ২০ থেকে ৩০ বছরের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উপকূল ব্যবস্থাপনা কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। সেখানে শুধু বাঁধ নির্মাণ নয়; ম্যানগ্রোভ বন সম্প্রসারণ, নদী ব্যবস্থাপনা, বিকল্প জীবিকা সৃষ্টি এবং জলবায়ু উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনকেও একই কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে। এক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানীর মতো উপকূলের ইস্যুগুলোতে নীতিগত নির্দেশনা রাখতে হবে। এসব বিষয়ে এরইমধ্যে বিশেষজ্ঞ মতামতসহ সুপারিশ অর্থ মন্ত্রণালয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে জমা দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত বাজেটে বিষয়টি বিবেচনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
আরো পড়ুন
ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত ভেনেজুয়েলাকে আড়াই লাখ ডলার দিলেন নেইমার
বাজেটে জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার জন্য পৃথক কৌশলগত বিনিয়োগের বিষয়টি খুব বেশি স্পষ্ট নয় বলে মনে করেন ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরামের আহ্বায়ক আমিনুর রসুল বাবুল। তিনি বলেন, জলবায়ু সহনশীল কৃষির উন্নয়নে পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষ করে উপকূলের লবণাক্ত জমিতে চাষাবাদ বাড়ানো সম্ভব হলে জলবায়ু উদ্বাস্তুর হার কমানো সম্ভব হবে। এছাড়া নগর জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবেলায় শহরে সবুজ এলাকা বৃদ্ধি, জলাধার সংরক্ষণ, ছায়াবৃক্ষ রোপণ, তাপসহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু বিষয়কে বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।