ডানপন্থী উগ্রবাদী শক্তির সমালোচনা করে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপির সংসদ সদস্য ফজলুর রহমান বলেছেন, উগ্রবাদী অপশক্তি দেশকে মধ্যযুগে ফিরিয়ে নিতে চায়। তারা দেশকে বর্বরতার দিকে ঠেলে দিতে চায়। সেই বর্বরতার দিকে আমরা যেতে পারি না।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে ফজলুর রহমান সংস্কৃতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা এবং হাওর অঞ্চলের উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, গ্রামের মানুষের সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের প্রতি এক ধরনের অসহিষ্ণুতা তৈরি করা হচ্ছে। ছোটবেলায় দুর্গাপূজা উপলক্ষে নাটক করা, শীতের রাতে যাত্রাপালা দেখা কিংবা রূপবানের গান শোনার যে গ্রামীণ সংস্কৃতি ছিল, সেটিও কেউ কেউ পছন্দ করেন না। এখন আবার বলা হচ্ছে, ফুটবল খেলা দেখা যাবে না, আর্জেন্টিনা কিংবা ব্রাজিলের সমর্থক হওয়াও না কি অপরাধ।
গাইবান্ধার পলাশবাড়িতে রামমন্দির নির্মাণ নিয়ে চলমান বিতর্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, প্রতিদিনই ‘এটা চাই না, ওটা চাই না’ বলে স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। রামমন্দির নির্মাণের বিরোধিতা করে মিছিল হচ্ছে।
তিনি বলেন, ওরা ১০০টা বা ৩০০টা মূর্তি বানাক, তাতে আমার কী আসে যায়। আমি মুসলমান, আমি আমার মসজিদে নামাজ পড়ব, তারা তাদের মন্দিরে পূজা করবে। একসঙ্গে থাকতেই তো হবে।
মাজারে হামলা ও সুফিবাদবিরোধী কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে বিএনপির এই সংসদ সদস্য বলেন, হজরত খাজা মঈনুদ্দীন চিশতী, শাহজালাল, শাহপরাণ, বায়েজিদ বোস্তামী, খান জাহান আলীসহ অসংখ্য অলি-আউলিয়া মানুষের মধ্যে মানবতা ও সম্প্রীতির শিক্ষা ছড়িয়ে দিয়েছেন। কিন্তু এখন সেই সুফিবাদকেই অস্বীকার করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মাওলানা-মৌলভি সাহেবদের আমি শ্রদ্ধা করি। কিন্তু পীর সাহেবদের দোষটা কী?
মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতা এক টাকা হলেও বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে ফজলুর রহমান বলেন, সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক সম্মানী ২০ হাজার টাকা এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা ২৫ হাজার টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং আহতদের জন্য বিভিন্ন হারে ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছে। তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানকে আমি সম্মান করি। কিন্তু কোনো কারণেই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানী ভাতার সঙ্গে অন্য কারো সম্মানী ভাতার তুলনা হতে পারে না। যদি হয়, তাহলে পাঁচ বছর পর হলেও আমাদের খেসারত দিতে হবে।
বিএনপির অবস্থান তুলে ধরে ফজলুর রহমান বলেন, দলের অধিকাংশ সংসদ সদস্যকে বলতে হয়েছে যে বিএনপি শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দল এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে। অন্যদিকে কেউ কেউ নিজেদের জুলাই আন্দোলন ও সৎ রাজনীতির পক্ষে দাবি করছে। জুলাই আন্দোলনকে অসম্মান না করে মুক্তিযোদ্ধাদের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।
বাজেটে শিক্ষা ও সংস্কৃতি খাতে বরাদ্দের মধ্যে ভারসাম্যের অভাব রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন এমপি ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ভাত আর তরকারির যেমন সম্পর্ক, শিক্ষা ও সংস্কৃতিরও তেমন সম্পর্ক। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বেড়েছে, কিন্তু সংস্কৃতি খাত সেই অনুপাতে গুরুত্ব পায়নি। শিক্ষার সঙ্গে সংস্কৃতির সমন্বয় না হলে সভ্যতা গড়ে উঠবে না।
হাওর অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য পৃথক মন্ত্রণালয় গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার উড়াল সড়ক প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে। প্রকল্পটি পুনর্বিবেচনা করা যায় কি না কিংবা কম খরচে বাস্তবায়নের কোনো সুযোগ আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
বিরোধী দলের ভূমিকা প্রসঙ্গে রসিকতার সুরে তিনি বলেন, সংসদে যদি সবকিছু ‘ফ্রেন্ডলি গেম’-এর মতো হয়ে যায়, তাহলে মানুষ একদিন খেলা দেখতে আসবে, কিন্তু দ্বিতীয় দিন আর আগ্রহ দেখাবে না। তিনি বলেন, “সংসদে যে গেমটা হচ্ছে, কিছুদিন পরে কিন্তু মাঠ খালি পড়ে থাকবে।
এসময় মাজারের সুরক্ষা, সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং হাওরাঞ্চলের উন্নয়নে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানান তিনি।




