পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে বসবাসরত ৫৪ শতাংশ বাঙালিসহ সব সম্প্রদায়ের জন্য একটি অভিন্ন কর নীতি প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ (পিসিএনপি)।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) সকাল ১১টায় বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (ক্রাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি উত্থাপন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংগঠনের কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান কাজী মো. মজিবর রহমান বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘ সময় ধরে বিশেষ শাসনব্যবস্থা এবং ১৯৯৭ সালের চুক্তির মাধ্যমে একটি বিশেষ জনগোষ্ঠীকে অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি সম্প্রতি চারজন সংসদ সদস্য কর্তৃক অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো একটি চিঠির তীব্র প্রতিবাদ জানান। ওই চিঠিতে আয়কর আইন, ২০২৩-এর প্রস্তাবিত সংশোধনী বাতিল করে উপজাতিদের জন্য আগের মতো পূর্ণাঙ্গ আয়কর অব্যাহতি বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছিল।
সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারকে ট্যাক্স দিতে চাই। যারা ট্যাক্স দেয় না, তারা দেশের সার্বভৌমত্ব বিশ্বাস করে না। তারা দেশের স্বাধীনতাও মানে না। ফলে তারা দেশ ও জাতির চরম শত্রু।’
পাহাড়ে সেনা শাসন প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে কোনো সেনা শাসন চলে না। যদি চলত তাহলে জেলা পরিষদ, উন্নয়ন বোর্ড, পার্বত্য মন্ত্রী, হেডম্যান, সার্কেলচিফসহ স্থানীয় সংসদ সদস্য পদে উপজাতিরা থাকত না, সেনাবাহিনীর লোক থাকতেন। আসলে সেনাবাহিনীকে নিয়ে একটা গুজব ছড়ানোর জন্যই এটা বলা হচ্ছে।’
তিনি শান্তিচুক্তি প্রসঙ্গে বলেন, ‘শেখ হাসিনা নাই্, অথচ তার আইনেই এখন পাহাড় চলছে। আমরা চুক্তিকে সম্মান করি। কিন্তু ওই চুক্তি বিশ্বাস করি না, যা বৈষম্যমূলক এবং একটিমাত্র পক্ষকে সুবিধা দেয়।’
তিনি আরো বলেন, ‘পাহাড় নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্রের সঙ্গে আমাদের দেশে অনেক বুদ্ধিজীবী জড়িত। যারা জীবনেও পাহাড়ে যায়নি। অথচ ষড়যন্ত্র করে যাচ্ছেন।’
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক এ এইচ এম ফারুক। তিনি বলেন, ‘আমরা পার্বত্যবাসী সরকারকে কর দিতে চাই। আমরা কোনো বৈষম্য চাই না। একই স্থানে দুই নীতি চলতে পারে না। কর সিস্টেম বাদ দিলে পাহাড়ের উপজাতি-বাঙালি সবারটাই বাদ দিতে হবে।’
তিনি আরো বলেন, ‘পাহাড়ে কথিত শান্তিচুক্তির কালো আইনের বেড়াজালে পার্বত্য বাঙালিরা মৌলিক অধিকার বঞ্চিত, সাংবিধানিক অধিকার বঞ্চিত। তার পরও পার্বত্য বাঙালিদের নিয়ে নানা অভিযোগ, নানা ষড়যন্ত্র করা হয়। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাই।’
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত মূল পয়েন্টগুলো হলো—
অর্থনৈতিক বৈষম্য : ১৯৮৪ সাল থেকে দীর্ঘ চার দশক ধরে করমুক্ত সুবিধা ভোগ করে উপজাতিদের একটি বড় অংশ আজ অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে। তারা ব্যবসা, সরকারি চাকরি এবং ঠিকাদারি খাতের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। অথচ একই অঞ্চলে বসবাসরত বাঙালিরা নিয়মিত কর দিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগার সচল রাখছেন। এতে সরকার একদিকে রাজস্ব পাচ্ছে। অন্যদিকে উপজাতিদের কর না থাকায় প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা কর হারাচ্ছে সরকার।
সংবিধান ও সম-অধিকারের লঙ্ঘন : নাগরিক পরিষদের মতে, নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে অনন্তকাল করমুক্ত রাখা সংবিধানে বর্ণিত নাগরিকদের সম-অধিকার নীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। পাহাড়ের অনগ্রসরতার দোহাই দিয়ে এই সুবিধা চিরস্থায়ী করার প্রচেষ্টা অগ্রহণযোগ্য।
ভুল তথ্যের প্রতিবাদ : সংসদ সদস্যরা পাহাড়ের অনগ্রসরতার যে চিত্র (যেমন : সুপেয় পানির অভাব, স্বাস্থ্যসেবা ও সড়কের অভাব) তুলে ধরেছেন, তাকে ‘একপেশে ও বিভ্রান্তিকর’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। নাগরিক পরিষদের মতে, পাহাড়ে অনগ্রসরতা থাকলে তা বাঙালি ও উপজাতি উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য। কিন্তু চিঠিতে বাঙালিদের দুঃখ-কষ্ট, বঞ্চনার কথা সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
রাজনৈতিক ক্ষোভ : খাগড়াছড়ির বাঙালি সংসদ সদস্য আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া উপজাতি এমপিদের সঙ্গে ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়। একে স্থানীয় বাঙালি জনগোষ্ঠীর স্বার্থের পরিপন্থী এবং ‘পিঠে ছুরি মারা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
ভবিষ্যত শঙ্কা ও দাবি : নাগরিক পরিষদের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয় যে, শুধু উপজাতিদের জন্য কর মওকুফ বহাল রাখলে পাহাড়ে বড় বড় ব্যবসায়িক সিন্ডিকেট গড়ে উঠবে, যা দেশের মূল অর্থনৈতিক রাজস্ব নীতিকে পঙ্গু করে দেবে। এটি পাহাড়ে বসবাসরত বাঙালি ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে ধ্বংস করার একটি নীলনকশা বলেও তারা মন্তব্য করেন।
সরকারের প্রতি কোনো প্রকার রাজনৈতিক হুমকিতে মাথা নত না করার অনুরোধও জানিয়েছে সংগঠনটি। পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি ও অর্থনৈতিক সমতা নিশ্চিত করতে প্রস্তাবিত আয়কর সংশোধনী কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং সব নাগরিকের জন্য একই নীতিতে কর আরোপ করার জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ অতিথি ছিলেন, সংগঠনের লিগ্যাল এইড কমিটির সভাপতি অ্যাডভোকেট পারভেজ তালুকদার, সাংগঠনিক সম্পাদক, শেখ আহমেদ রাজু, দপ্তর সম্পাদক
মো. শাহজালাল, ছাত্র পরিষদের কেন্দ্রীয় সভাপতি শাহাদাত হোসেন কায়েশ ও সাংগঠনিক সম্পাদক রাসেল মাহমুদ।
প্রসঙ্গত, আয়কর আইন ২০২৩-এর ১৯নং অনুচ্ছেদে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়দের জন্য আয়কর অব্যাহতির বিষয়টি বহাল রাখা হয়েছে। এটি মূলত ‘আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪’-এর ৬ষ্ঠ তফশিলের ২৭নং অনুচ্ছেদে বর্ণিত সুবিধারই ধারাবাহিকতা। তবে বর্তমানে আয়কর আইন ২০২৩-এর ৬ষ্ঠ তফসিলে একটি সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছে। এই সংশোধনীর মূল উদ্দেশ্য হলো উপজাতিদের জন্য পূর্বে বিদ্যমান পূর্ণাঙ্গ আয়কর অব্যাহতির সুবিধা বাতিল করা বা পরিবর্তন আনা। যাতে উৎস অনুসারে, পাহাড়ে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে উপজাতি ও বাঙালি নির্বিশেষে সব নাগরিকের জন্য একটি অভিন্ন কর নীতি কার্যকর করা যায়।
প্রস্তাবিত এই সংশোধনী বাতিলের জন্য গত ২১ জুন পার্বত্য চট্টগ্রামের চার সংসদ সদস্য অর্থমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ চিঠি পাঠান। ফলে পাহাড়ে এই নিয়ে চরম বির্তক ও বৈষম্য বিরাজ করছে।