ইট-পাথরের নগরে বন্দি শিশু-কিশোরদের মোবাইলের পর্দা থেকে বের করে আবার খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদে। জবাবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশের খেলার মাঠ ও পার্কগুলো দখলদার এবং মাদকসেবীদের কবল থেকে মুক্ত করে জনসাধারণের জন্য নিরাপদ করার আশ্বাস দিয়েছেন।
সোমবার (৮ জুন) জাতীয় সংসদ অধিবেশনে কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ বিধিতে আনা জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশনে নোটিশটি উত্থাপন করেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনি। তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের পার্ক ও খেলার মাঠ একসময় শিশু-কিশোরদের আনন্দ আর বয়স্কদের অবসরের জায়গা ছিল। কিন্তু এখন অনেক মাঠ ও পার্ক মাদক কারবারি, বখাটে ও অবৈধ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। কোথাও শিশু পার্কের নামে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে, কোথাও হাট-বাজার বসিয়ে মাঠের অস্তিত্ব সংকুচিত করা হয়েছে। ফলে নিরাপদ পরিবেশের অভাবে শিশুরা মাঠ ছেড়ে মোবাইল ফোনের ভার্চুয়াল জগতে আশ্রয় নিচ্ছে।
খেলার মাঠকে নগরের ‘ফুসফুস’ উল্লেখ করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ঢাকা সিটির ১২৯টি ওয়ার্ডে মাত্র ২৩৫টি খেলার মাঠ রয়েছে। এর মধ্যে সাধারণ মানুষ ব্যবহার করতে পারে মাত্র ৪২টি মাঠ। বাকি মাঠগুলোর বড় অংশ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ধূপখোলা মাঠ, শ্যামলী মাঠ এবং মিরপুরের কয়েকটি মাঠে নিয়মিত বাজার বসিয়ে খেলার পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ঢাকায় ১২৬টি মাঠ হারিয়ে গেছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ পরিবেশে গড়ে তুলতে মাঠ ও পার্ক রক্ষায় তিনি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।
জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, উত্থাপিত তথ্যের বেশিরভাগই সত্য। বিগত সরকারের আমলে রাজনৈতিক ও দলীয় প্রভাব খাটিয়ে বহু মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান দখল করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেগুলো উদ্ধার করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় ২৫৬টি পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়ন ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চলছে। গুলিস্তানের শহীদ মতিউর রহমান পার্ককে হকার ও অপরাধীদের দখলমুক্ত করে আধুনিক পার্কে রূপান্তর করা হয়েছে। এছাড়া মতিঝিল পার্ক, নবাবগঞ্জ পার্ক, রসুলবাগ মাঠ, খিলগাঁও-বাসাবো মাঠ, সাদেক হোসেন খোকা মাঠ, হাজারীবাগ পার্ক ও আমলীগোলা খেলার মাঠসহ বিভিন্ন স্থানে উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে। পাশাপাশি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩৮টি মাঠ ও পার্ক আধুনিকায়ন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম ও খুলনাসহ অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকাতেও নতুন মাঠ ও পার্ক নির্মাণ এবং সংস্কার কার্যক্রম চলছে। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় এখন প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইন্টার-স্কুল ফুটবল ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা দেশব্যাপী জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
পরে একটি সম্পূরক প্রশ্নে নিলুফার চৌধুরী মনি মাঠ ও পার্কে মাদকসেবীদের বিচরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানতে চান, শিশু-কিশোরদের মাদকের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে।
জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, দেশের অন্যতম বড় সামাজিক ব্যাধি মাদক। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মাদক ব্যবসায়ী ও সেবীদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করা হয়েছে। তবে শুধু আইন প্রয়োগ করে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। মাদকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যুবসমাজ, সামাজিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সরকারের সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে মাঠ ও পার্কগুলো আরও নিরাপদ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।






