kalerkantho

রবিবার । ২৬ জুন ২০২২ । ১২ আষাঢ় ১৪২৯ । ২৫ জিলকদ ১৪৪৩

প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অপব্যবহার

ড. দিলীপ কুমার সাহা   

১৬ মে, ২০২২ ০৩:৪০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অপব্যবহার

দেশের শহর থেকে গ্রামের পাড়া-মহল্লায় ছড়িয়ে পড়ছে মাদকদ্রব্য। কর্মক্ষম তরুণ ও যুবসমাজ জীবন বিনাশকারী নতুন বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অর্থনৈতিক সূচকে উপহার হিসেবে খ্যাত ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ ভোগ করছে এখন বাংলাদেশ, যার মূল অবদান শুধু এই কর্মক্ষম ও শক্তির আধার তরুণ ও যুবসমাজেরই। বাংলাদেশে জনসংখ্যার ৪৯ শতাংশ বয়সে তরুণ ও যুবক।

বিজ্ঞাপন

দেশে মাদকাসক্তের প্রায় ৮০ শতাংশই কিশোর, তরুণ ও যুবক।

১৬ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশে এখন মাদকসেবীর সংখ্যা প্রায় ৮০ লাখ। মাদকের চাহিদা এবং মাদক সরবরাহ একে অন্যের পরিপূরক। প্রতিনিয়ত চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জোগান ও সরবরাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আবার নতুন মাদকের প্রতিও মাদকাসক্তদের আকর্ষণ থাকে। কারণ একটি মাদক অনেক দিন ব্যবহারের ফলে নির্দিষ্ট মাত্রার মাদক সব সময় মাদকাসক্তকের জন্য কার্যকর থাকে না। একসময় বাংলাদেশে মাদক হিসেবে শুধু গাঁজা, আফিম ও অ্যালকোহল ব্যবহার করা হতো। পরে ১৯৯০ সালের দিকে আসে নতুন মাদক হেরোইন ও ফেনসিডিল। ২০০০ সালে যুক্ত হয় ব্যথানিরোধক ইনজেকশনযুক্ত মাদক, ২০০৫ সালের পরে যুক্ত হয় ইয়াবাসহ অন্যান্য স্লিপিং পিল। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ২৫ ধরনের মাদক ব্যবহৃত হচ্ছে। ইয়াবার বিরুদ্ধে দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর শক্ত অবস্থানের কারণে মাদক কারবারিরা নতুন মাদকের ট্রানজিশন পিরিয়ডের প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। একটি মাদকের এক বা দুই দশক পর্যন্ত চাহিদা থাকে, এরপর কৌশলগত ও নতুন চাহিদার কারণেই নতুন নতুন মাদক যুক্ত করে এই মাদক কারবারিরা।

বর্তমানে প্রেসক্রিপশন ড্রাগও হয়ে উঠছে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রেসক্রিপশন ড্রাগ একটি ফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগ, যা আইনিভাবে একটি মেডিক্যাল প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে বিতরণ করার কথা। বর্তমানে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ তৃতীয় বৃহত্তম ব্যবহৃত মাদক। এই ওষুধের অপব্যবহার করেও সহজেই আসক্ত হতে পারে অনেকেই। এর মধ্যে মূলত ব্যথানাশক সিরাপ, ঘুমের ওষুধ প্রভৃতি নিত্যপ্রয়োজনীয় ওষুধ উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সংক্রামক ব্যাধির মতো ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রেসক্রিপশন ড্রাগের এই অপব্যবহার ওষুধের ওপর এক ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করে। ফলে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি কোনো ওষুধ বারংবার ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। কোনো পণ্য বা ওষুধের বিপরীত ক্রিয়া বা অপব্যবহার হতেই পারে। তবে জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থে তা পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব সংশ্লিষ্টদের। অনেক সময় এটা দেখা গেছে যে প্রচলিত মাদকের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও জোগান না থাকায় অনেক সময় মাদকাসক্তরা প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অপব্যবহার করে মাদকের চাহিদা মেটায়।

প্রেসক্রিপশন ড্রাগ যা মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তার মধ্যে রয়েছে বেদনানাশক, চিত্তপ্রশমনকারী, প্রশান্তিদায়ক, নিদ্রাকারক পিল, চেতনাশক, জ্বর ও প্রদাহ উপশমকারী ইত্যাদি। এই প্রেসক্রিপশন ড্রাগের চরম অপব্যবহার এবং মাদক হিসেবে ব্যবহার প্রতিরোধে রোগী, বিক্রেতা (ফার্মাসিস্ট), ফিজিশিয়ানসহ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের ভূমিকা পালন করতে হবে।

ফেনসিডিল নামের একপ্রকার কফ সিরাপ আছে, যার একটি উপাদান হলো কোডিন, যা একপ্রকার চেতনা হরণকারী ওষুধ, যা মন, আচার-আচরণ বা মেজাজের ওপর ক্রিয়াশীল এবং স্বপ্নের উপলব্ধির অনুভূতি সৃষ্টি করে; তা আমাদের দেশে মাদক হিসেবে একসময় ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও ব্যাপক প্রসার লাভ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হয়েছিল বিধায় সরকার এর উৎপাদন ও বিক্রি নিষিদ্ধ করে। তবে এটা এখনো পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে এ দেশে ব্যাপকভাবে অবৈধ পথে আসে এবং অপব্যবহার হয়। বর্তমানে কিছু প্রেসক্রিপশন ড্রাগ যেমন টাপেন্টা ১০০ একটি ব্যথানাশক। তবে বর্তমানে উদ্দীপক মাদক হিসেবে মাদকাসক্তরা ইয়াবার বিকল্প এই ব্যথানাশক ট্যাবলেট ব্যবহার করছে।

চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহৃত জি কেটামিন এখন মাদক হিসেবে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচার হচ্ছে। বিদেশে কেটামিন পার্টি ড্রাগ হিসেবে চাহিদা আছে, তবে হ্যালুসিনেশনের বিকল্প ড্রাগ হিসেবে এটা ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত কিছু প্রেসক্রিপশন ড্রাগ যা ক্যান্সার, হার্টের অসুখসহ অন্যান্য দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর তীব্র ব্যথা কমানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। যেমন—পেথিডিন, মরফিন, বুপ্রিনরফিন, অক্সিমরফোন। এগুলো ইউফোরিক ড্রাগ, যা মস্তিষ্কে ব্যাপক আনন্দ অনুভূতির সৃষ্টি করে। সাময়িকভাবে শরীরের দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা ভুলিয়ে দেয়। ব্যথার সিগন্যালকে ব্লক করে মস্তিষ্ক বোধহীন ও অসাড় করে দেয়। এগুলো ব্যাপকভাবে অপব্যবহার হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে দুই ধরনের মাদকের শিডিউলের মধ্যে ব্যথানাশক এই ওষুধগুলো হলো কন্ট্রোল মাদক। কারণ এর চিকিৎসাসেবায় ব্যবহৃত হয়। এটি বিক্রি করতে প্রয়োজন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স। নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ওষুধ বিক্রি করার অনুমোদন দেয়। ওষুধ বিক্রি করতে হলে অবশ্যই প্রেসক্রিপশন প্রয়োজন। বিক্রি করার সময় প্রেসক্রিপশনের গায়ে চিকিৎসক কতগুলো ওষুধ লিখেছেন এবং রোগী কতগুলো কিনেছেন তার সঠিক তথ্য লিপিবদ্ধ থাকার নিয়ম আছে। কিন্তু এটা কতটুকু প্রয়োগ হয় সেটা ভেবে দেখা প্রয়োজন। তবে এ ধরনের প্রেসক্রিপশন ড্রাগ নিয়ন্ত্রণে আছে ঔষধ প্রশাসনের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ আইন, আর মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আছে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮। এর কঠোর প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন। তদুপরি যারা যুবসমাজ ও জাতির ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অপব্যবহার করে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে সেসব অপরাধীকে খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে হবে, প্রয়োজনে এই প্রেসক্রিপশন ড্রাগের যথাযথ প্রয়োগ ও অপব্যবহার রোধে আইনি কাঠামো আরো আধুনিক ও শক্তিশালী করতে হবে। যেন প্রেসক্রিপশন ড্রাগ কোনো মতেই প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি না হয়।

মাদক রূপে ব্যবহৃত এই প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অপব্যবহারের ফলে জাতির সম্ভাবনাময় অংশ যুবক ও তরুণীদের মানসিক ও দৈহিক দিক থেকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তার ওপর এই প্রেসক্রিপশন ড্রাগের অপব্যবহার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সন্ত্রাসী ও সমাজবিরোধী করে তুলছে। প্রেসক্রিপশন ড্রাগের যাতে অপপ্রয়োগ না হতে পারে সে জন্য সরকারের সব এজেন্সিকে আরো নিষ্ঠা, সততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। ১৯৮৬ সাল থেকে প্রেসক্রিপশন ড্রাগ অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক দিবস পালন করা হয়। মানুষ চায় এ দিবস যেন নিছক আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত না হয়; বরং যে যুব তারুণ্যের ঐতিহ্য রয়েছে সংগ্রামের, প্রতিবাদের, যুদ্ধজয়ের তাঁদের প্রেসক্রিপশন ড্রাগ অপপ্রয়োগ দ্বারা নিঃস্ব করার ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ ও সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক ও নৈতিক মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে সন্তানের মনোজগতে এমন বীজ বপন করতে হবে যেন সে বড় হয়ে আত্মবিশ্বাসী, আত্মপ্রত্যয়ী ও আত্মমর্যাদাশীল হয়ে বেড়ে ওঠে এটা খেয়াল রাখার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট সবার। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ যেন শুধু প্রেসক্রিপশনের মাধ্যমে অপব্যবহার দ্বারা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মাদকাসক্ত না হয় সেদিকেও সবাইকে দৃষ্টি দিতে হবে।

লেখক : প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক, সিআইডি, বাংলাদেশ পুলিশ, মহাখালী, ঢাকা



সাতদিনের সেরা