kalerkantho

বৃহস্পতিবার ।  ১৯ মে ২০২২ । ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯ । ১৭ শাওয়াল ১৪৪৩  

মনের ক্ষত সারবে কবে

এস এম আজাদ   

২৩ জানুয়ারি, ২০২২ ০৮:৫২ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



মনের ক্ষত সারবে কবে

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অভিযান-১০ লঞ্চ দুর্ঘটনায় আহত লোকমান আহসান। গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকায় শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের এইচডিইউ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন জেসমিন আক্তার (৩৫) সারাক্ষণ চুপচাপ থাকেন। হঠাৎ হঠাৎ হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন এই নারী। জেসমিনের স্বামী খলিলুর রহমান বলেন, ‘মোর সব শেষ। ওরে নিয়া এহন চিন্তায় আছি।

বিজ্ঞাপন

তিনটা বাচ্চা চোখের সামনে শেষ! ক্যানে হ্যাডা সহ্য করি কন...। ’

লঞ্চের আগুনে জেসমিনের দুই সন্তান মাহিনুর (৭) ও  তামিম (৮) মারা গেছে। তিনি ছিলেন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। সেই অনাগত সন্তানও মারা গেছে। শরীরের ১২ শতাংশ পুড়লেও মানসিক যন্ত্রণায় কাতর তিনি। স্বামী খলিলও সন্তানদের শোকে দুর্বল হয়ে পড়েছেন। বরগুনার এই দম্পতি গত এক মাস হাসপাতালে।

বরগুনার বেতাগীর মোকামিয়া ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের আরিফুর রহমান ও তাঁর চার বছরের মেয়ে কুলসুমকে এক মাস ধরে খুঁজছে স্বজনরা। আরিফই তাঁর পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর স্ত্রী খাদিজা বেগম বলেন, ‘বাড়িতে বসে তাদের ফিরে পাবার আশায় দিন কাটে আমার। আমার এক মেয়ে মানসিক প্রতিবন্ধী, ছেলেটা ছোট। কিভাবে সামনের দিনগুলো চলবে, সেই চিন্তায় দিশেহারা। ’

ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের মানবিক বিপর্যয় ও ক্ষত নিয়ে এভাবেই এক মাস ধরে ধুঁকছেন ক্ষতিগ্রস্তরা। এখনো ঢাকা ও বরিশালের হাসপাতালে ১০ জন চিকিৎসাধীন।

ডিএনএ পরীক্ষা শেষ হয়নি

বরগুনা জেলা প্রশাসন, ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) তথ্য মতে, নিখোঁজ ৩২ জনের জন্য ৫১ জন ডিএনএ নমুনা দিয়েছেন। এক মাসেও শেষ হয়নি ডিএনএ পরীক্ষা। বরগুনার গণকবরে দাফন করা হয়েছে ২৩ জনের মরদেহ। নদী থেকে উদ্ধারের পর একজনকে সনাতন ধর্মাবলম্বী ধারণা করে পৌর মহাশ্মশানে সমাহিত করা হয়েছে।

জানতে চাইলে সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা নিখোঁজ শনাক্তে নমুনা সংগ্রহ করে কাজ করছি। আরো কিছুদিন সময় লাগবে। ’

এখনো নিখোঁজ ৩২

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বরগুনা, ঝালকাঠি ও ঢাকায় ৫১ স্বজন লাশ শনাক্তের জন্য রক্তের নমুনা দিয়েছেন। ৩৬ জন নিখোঁজের তালিকা করেছে বরগুনা জেলা প্রশাসন। এদের মধ্যে দুজনের নাম ভুলে দুইবার এসেছে। আর তালিকায় থাকা দুজনের লাশ শনাক্ত হয়েছে। এই হিসাবে এখনো ৩২ জন নিখোঁজ। তাদের মধ্যে ১৩ শিশু, ১১ নারী ও আট পুরুষ রয়েছে। বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে ২৪ জনকে। ডিএনএর জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছে সিআইডির ফরেনসিক দল। প্রফাইল তৈরির কাজ শেষ পর্যায়। মেলানো হচ্ছে। এতে আরো এক থেকে দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে বলে জানায় সূত্র।

মা ও বোনকে নিয়ে অভিযান-১০ লঞ্চে উঠেছিলেন ২০ বছরের তরুণ রিশান শিকদার রনি। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জের এই তরুণ নিজের পা পুড়ে যাওয়ার ক্ষত ভুলে খুঁজে ফিরছেন মা রিনা বেগম ও বোন রুসনি আক্তার লিমাকে। বরিশালের হাসপাতাল থেকে বরগুনা গিয়ে ডিএনএ নমুনাও দিয়েছেন। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার মা আমারে ঘুম থেকে ডাইকা তোলে। আমারে আর বোনকে নদীতে ঝাঁপ দিতে বলে। ধাক্কা দেয়। আর তাদের খুঁজে পাইলাম না। মনে হয়, মা আবার এইসা ধাক্কা দিব। ’ তিনি বলেন, ‘এক মাস হইয়া গেল, কিছু জানায়নি। আমরা আর কত অপেক্ষা করমু?’

দগ্ধরা মানসিক যন্ত্রণায়ও কাতর

শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন বরগুনার বামনার ফুলঝুড়ি হাই স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক বানকিম মজুমদারের (৬০) স্ত্রী মনিকা রানী (৪০) গত মঙ্গলবার হাসপাতালে মারা যান। তিনি বলেন, ‘আমি ডায়াবেটিসে অসুস্থ। এক হাতের অপারেশন হয়েছে। আমার স্ত্রীও অসুস্থ ছিল। সে আমাকে ছেড়ে চলে গেল! আমার তো বেঁচে থাকাই কঠিন। ’

বরগুনার শেখ কালু ও তাঁর বোন পুতুল বেগমকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে গত সোমবার শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে স্থানান্তর করা হয়। কালুর স্ত্রী রুমা বেগম, শিশুসন্তান অহনা, মা মনোয়ারা বেগম, পুতুলের স্বামী শেখ রাসেল মারা গেছেন। পুতুল-রাসেলের দুই শিশুসন্তান ইমন ও জীবন নিখোঁজ।   

কালুর বড় ভাই শেখ মুকুল হোসেন গতকাল বলেন, ‘পুতুল গত বুধবার তাঁর স্বামী-সন্তানদের খবর জানতে পারেন। বোনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছি। কালু এখনো নিজেকে সামলে উঠতে পারেননি। স্ত্রী, সন্তান ও মায়ের জন্য কাঁদছেন। ’ গতকাল পর্যন্ত বার্ন ইনস্টিটিউটে সাতজন চিকিৎসাধীন ছিলেন। ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. এস এম আইউব হোসেন বলেন, ‘যাঁরা আছেন তাঁদের অবস্থা এখন শঙ্কামুক্ত বলা যায়। এখানে আসা ১৬ জনের মধ্যে পাঁচজন মারা গেছেন। ’

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অস্থায়ী বার্ন (চক্ষু) ইউনিটে চিকিৎসা নিচ্ছেন তিনজন। তাঁদের একজন রুবেল হোসেন বলেন, হাত-পায়ের তালুসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ শুকাইলেও হাতে দুইটি অপারেশন হইছে। তাই বেশ কয়েক দিন হাসপাতালে থাকতে হবে। ’

হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তারা মানসিকভাবে যে আঘাত পেয়েছে, তা সারতে অনেক সময় লাগবে। এখানে ৬২ জনের মধ্যে ৫৯ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসা নিয়ে যাঁরা বাড়ি ফিরেছেন, তাঁরাও ধুঁকছেন। চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের নিহত মনোয়ারা বেগমের পরিবারে এখনো কাটছে না শোক। তাঁর সঙ্গে দগ্ধ হয়েছিলেন মেয়ে আমেনা বেগম ও স্বামী বিল্লাল হোসেন। চিকিৎসা শেষে গত সপ্তাহে বাড়ি ফিরেছেন তাঁরা।

মনোয়ারা বেগমের ছেলে মোস্তফা গতকাল মোবাইল ফোনে বলেন, ‘মায়ের মৃত্যুতে বোন আমেনা পড়ছে না। প্রতিদিনই মায়ের কবরের পাশে গিয়ে কান্নাকাটি করছে। ’

দুই মামলা ও ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত শেষ হয়নি

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গত ৩ জানুয়ারি নৌ মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দিয়ে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ ও সদরঘাটের বিআইডাব্লিউটিএ কর্তৃপক্ষকে দায়ী করেছে। লঞ্চের ইঞ্জিন রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত। গত ১২ জানুয়ারি ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনেও একই তথ্য মিলেছে। তবে এক মাসে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেনি ফায়ার সার্ভিসের কমিটি।

ফায়ার সার্ভিসের তদন্ত কমিটির প্রধান ও পরিচালক (অপারেশনস) লে. কর্নেল জিল্লুর রহমান বলেন, ‘আমাদের তদন্তের সময় বাড়ানো হয়েছে। শিগগিরই প্রতিবেদন দেওয়া হবে। ’

ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক জোহর আলী বলেন, ‘গত ১২ জানুয়ারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেয়েছি। এই ঘটনায় লঞ্চ কর্তৃপক্ষের অবহেলাই দায়ী। ’

অন্যদিকে ঢাকায় নৌ আদালতের মামলায় অভিযান-১০ লঞ্চের মালিকসহ সাতজন গ্রেপ্তার হয়ে জেলহাজতে আছেন। একই আসামিদের বিরুদ্ধে বরগুনা ও ঝালকাঠি থানায় আরো দুটি মামলা হয়েছে। এসব মামলার তদন্তে আসামিদের শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হলেও তদন্ত এগোয়নি।

(প্রতিবেদন তৈরিতে বরিশালের নিজস্ব প্রতিবেদক, ঝালকাঠি ও বরগুনা প্রতিনিধি তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন)



সাতদিনের সেরা