বাংলাদেশে বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) খাতে রূপান্তর কেবল পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ হিসেবেই নয়, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং টেকসই শিল্পায়ন এগিয়ে নেওয়ার বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের (এফওয়াই২৭) জাতীয় বাজেট এবং ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট বাজেট রিপোর্ট ২০২৬-২৭’-এ পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার প্রসার এবং দেশীয় ইভি শিল্পভিত্তি গড়ে তুলতে একাধিক কর-সুবিধা ও প্রণোদনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজেট নথি অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ পেট্রোলিয়াম চাহিদা আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। ফলে জ্বালানির আমদানি-নির্ভরতা জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ রূপান্তরের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ ও বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেলে আমদানিকৃত জ্বালানি তেলের ওপর দেশের নির্ভরতা কমবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই বাংলাদেশের শিল্পায়ন হোক উৎপাদনশীল, টেকসই ও পরিবেশবান্ধব।’
ইভির ব্যবহার উৎসাহিত করতে সরকার আমদানিকৃত বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর মোট করভার (টিটিআই) উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে। ২৫ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত মূল্যের ইভির ক্ষেত্রে টিটিআই ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬৪ শতাংশ করা হয়েছে।
২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার মার্কিন ডলার মূল্যের যানবাহনের ক্ষেত্রে টিটিআই ৯৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য প্রয়োজনীয় চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের কর-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ইভি চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর মোট করভার ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে।
একই সঙ্গে বৈদ্যুতিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ওপর উৎসে কর (উইথহোল্ডিং ট্যাক্স) ৫ শতাংশ থেকে শূন্য শতাংশে নামানো হয়েছে।
সবুজ পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি সরকারের অঙ্গীকার তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে বৈদ্যুতিক বাস, বৈদ্যুতিক ট্রাক এবং বৈদ্যুতিক চার্জিং স্টেশন আমদানির ক্ষেত্রে উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।’
বাজেটে বৈদ্যুতিক যানবাহনের নিবন্ধন ও নবায়ন ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। বিদ্যমান দুই লাখ টাকার নির্দিষ্ট অগ্রিম আয়কর (এআইটি) কাঠামোর পরিবর্তে ক্ষমতাভিত্তিক নতুন হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০০ কিলোওয়াট পর্যন্ত ক্ষমতাসম্পন্ন যানবাহনের জন্য ২৫ হাজার টাকা, ২০০ থেকে ৩০০ কিলোওয়াটের জন্য ৫০ হাজার টাকা, ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোওয়াটের জন্য ৭৫ হাজার টাকা এবং ৪০০ কিলোওয়াটের বেশি ক্ষমতার যানবাহনের জন্য এক লাখ টাকা এআইটি নির্ধারণ করা হয়েছে।
চাহিদা বৃদ্ধির পাশাপাশি দেশীয় উৎপাদনও উৎসাহিত করছে সরকার। চার চাকার ও তিন চাকার যানবাহনের বডি নির্মাণ, ওয়েল্ডিং ও রং করাসহ উচ্চ মূল্য সংযোজন কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামাল ও যন্ত্রাংশ আমদানির ক্ষেত্রে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক ছাড়া সব ধরনের শুল্ক ও কর থেকে অব্যাহতি পাবে।
দেশীয়ভাবে বৈদ্যুতিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও আমদানিকৃত যন্ত্রাংশের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট ছাড়া সব ধরনের শুল্ক ও কর থেকে অব্যাহতি পাবে। এর ফলে ইভি খাতে স্থানীয় শিল্প বিকাশে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এই নীতিমালা জলবায়ু কার্যক্রমকে অর্থনৈতিক রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত করার বৃহত্তর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। জলবায়ু বাজেট প্রতিবেদনের ভূমিকায় অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ এমন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে জলবায়ু ঝুঁকি এবং টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের প্রয়াস পরস্পরের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে জলবায়ু অর্থায়ন শুধু সহায়তার উৎস নয়, বরং সহনশীলতা, উদ্ভাবন এবং টেকসই উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা উদীয়মান ও ভবিষ্যৎমুখী অর্থনৈতিক খাতগুলোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি, যেগুলোর সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। এর মধ্যে রয়েছে সবুজ অর্থনীতি। আমাদের লক্ষ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি টেকসই, সবুজ, জলবায়ু-সহিষ্ণু ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা।’
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত এসব প্রণোদনা সম্মিলিতভাবে বৈদ্যুতিক যানবাহন খাতকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, টেকসই শিল্পায়ন এবং পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।