• ই-পেপার

\'রোহিঙ্গাদের পর আর শরণার্থী নেওয়ার পরিস্থিতি আমাদের নেই\'

পে-স্কেলের হিসাব নিয়ে হিমশিম সরকার

অনলাইন ডেস্ক
পে-স্কেলের হিসাব নিয়ে হিমশিম সরকার

সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে-স্কেলের মূল বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিসংক্রান্ত হিসাব কষতে হিমশিম খাচ্ছে নির্বাচিত বিএনপি সরকার! এজন্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি বারবার বৈঠক করেও বাস্তবায়ন সংক্রান্ত সুপারিশ চূড়ান্ত করতে পারছে না। গতকালও সচিবালয়ে এ-সংক্রান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুপারিশমালা চূড়ান্ত করতে এ মাসে আরো দুই-তিনটি বৈঠকের প্রয়োজন হবে। মন্ত্রিপরিষদ ও অর্থ বিভাগ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

এদিকে চলমান আর্থিক সংকটের কারণে ড. ইউনূস সরকার ঘোষিত পে-স্কেলের রূপরেখা সরাসরি বাস্তবায়ন করতে পারছে না নির্বাচিত সরকার। অনেকটা বাধ্য হয়েই কিছু কাটছাঁট করবে। এজন্য সুপারিশ করা গ্রেডগুলোতে মূল বেতন ও অন্যান্য সুযোগসুবিধা এবং ভাতাদিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রস্তাবিত পে-স্কেল বাস্তবায়ন তিন ধাপে করা হতে পারে। যদিও এতে প্রযুক্তিগত কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেসব অসুবিধা কাটিয়ে তিন ধাপে বাস্তবায়নের সুপারিশ করবে সচিব কমিটি। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো হবে। পরে অন্যান্য সুবিধা কার্যকর করবে সরকার। তবে ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন দেখিয়ে সে হিসেবে বেতন-ভাতাদি প্রাপ্য হবেন সরকারি চাকুরেরা।

এ বিষয়ে অর্থ বিভাগের সচিব ড. খায়েরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘সচিব কমিটি এখনো সুপারিশমালা জমা দেয়নি। তাদের হয়তো আরো কিছু সময় লাগবে।’

নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা হয়তো এক বা দুই ধাপে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। সচিব কমিটি সে বিষয়টিও দেখছে। এখানে তিন ধাপ পর্যন্তও প্রয়োজন হতে পারে।’

এদিকে এসব কারণে নতুন পে-স্কেলের গেজেট বিজ্ঞপ্তি নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। নতুন অর্থবছর শুরু হলেও গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করা সম্ভব হয়নি। অথচ পে-স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হয়ে গেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে। এ নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিন কাটছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। সবচেয়ে বেশি উদ্বেগে রয়েছেন পেনশনভোগীরা। কেননা তারা বর্তমানে প্রশাসনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নন। তাই সরাসরি কোনো তথ্য পান না। নির্ভর করতে হয় গণমাধ্যমের ওপর। ফলে পে-স্কেলের সর্বশেষ তথ্য জানতে বারবার ফোন করেন গণমাধ্যমকর্মীদের।

একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এরই মধ্যে সরকার নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। তবে বেতন বৃদ্ধির ধরন, কত ধাপে বাস্তবায়ন হবে, কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে এবং কবে গেজেট প্রকাশ হবে এসব বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে নানান প্রশ্ন ও সংশয় দেখা দিয়েছে। এজন্য সচিব কমিটি ধারাবাহিক সভা করে আসছে। সরকারি কর্মচারী সংগঠনগুলোর নেতাদের মতে বর্তমান সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) এবং আইবাস প্লাস সফটওয়্যারের মাধ্যমে মাসিক বেতন, ইনক্রিমেন্ট, পেনশন, গ্রাচুইটি এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। ফলে মূল বেতনকে কয়েক ধাপে ভাগ করে কার্যকর করতে গেলে পুরো সফটওয়্যার কাঠামোতে পরিবর্তন আনতে হবে। সেটাও বেশ জটিল কাজ। গতকালের সভায় এসব বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে এখনো তা চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক আবদুল মালেক বলেন, ‘২০১৫ সালের পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময় বেশির ভাগ কাজ ম্যানুয়ালি করা হতো। তখন সার্ভিস বুক ও সংশ্লিষ্ট নথিতে হাতে বেতন নির্ধারণ করা সম্ভব ছিল। বর্তমানে সবকিছু প্রযুক্তিনির্ভর। যদি প্রথম ধাপে ৫০ বা ৬০ শতাংশ মূল বেতন দেওয়া হয় এবং পরে অবশিষ্ট অংশ কার্যকর হয়, তাহলে দুই দফায় পুরো সিস্টেম পরিবর্তন করতে হবে। দেশের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানে একযোগে এ পরিবর্তন বাস্তবায়ন করা অত্যন্ত জটিল।’

সরকারের অবস্থান কী? : প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনি ইশতেহারে বলা হয়েছিল যথাসময়ে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। সে অনুযায়ী পর্যালোচনা করা হয়েছে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় চূড়ান্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’ তবে গেজেট প্রকাশের নির্দিষ্ট সময় সম্পর্কে তিনি কোনো স্পষ্ট বক্তব্য দেননি। শুধু জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।

একই সঙ্গে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে বেতন ও ভাতা একসঙ্গে কার্যকর করা হবে না। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো হবে। পরে অন্যান্য সুবিধা কার্যকর হবে। তবে কোন গ্রেডে কত বেতন বাড়বে কিংবা বেতন বৃদ্ধির হার কত হবে এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।

বাজেট বক্তৃতায় ছিল ১ জুলাইয়ের ঘোষণা

নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সেই বাজেট ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। তবে পে-স্কেলের গেজেট বিজ্ঞপ্তি করা সম্ভব হয়নি।

গেজেট প্রকাশ কবে?

অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, পে-স্কেলের খসড়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বিভিন্ন আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক পর্যালোচনা শেষে গেজেট প্রকাশে যথেষ্ট সময়ের প্রয়োজন। কেননা বাস্তবায়নসংক্রান্ত সুপারিশমালাই এখনো চূড়ান্ত করা সম্ভব হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, পে-স্কেলের কাঠামো, বাস্তবায়নের ধাপ, আর্থিক প্রভাব এবং সফটওয়্যার ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়গুলো পর্যালোচনা করেই চূড়ান্ত গেজেট জারি করা হবে। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, গেজেট কিছুটা দেরিতে প্রকাশ হলেও কার্যকারিতা ১ জুলাই থেকে গণনা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তারা বকেয়াসহ বেতন বৃদ্ধির সুবিধা পাবেন।

আগের কমিশনের সুপারিশ কী ছিল?

২০২৫ সালে সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় বেতন কমিশন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। সে অনুযায়ী, সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বর্তমান সরকার সেই সুপারিশ হুবহু গ্রহণ করেনি।বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি দেশের রাজস্ব, মূল্যস্ফীতি, বাজেট ঘাটতি, সরকারি ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নতুন খসড়া তৈরি করেছে। বর্তমানে সেই খসড়ার ভিত্তিতেই গেজেট চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।

অন্যদিকে সদ্য শুরু হওয়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পেনশন, গ্রাচুইটিসহ মোট বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, নতুন পে-স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন, এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের সুবিধা এবং পেনশনভোগীদের সমন্বিত সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকার অতিরিক্ত আর্থিক ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান সম্প্রতি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজনীয় হলেও এর সামষ্টিক অর্থনৈতিক প্রভাব সতর্কতার সঙ্গে ব্যবস্থাপনা করতে হবে। প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি তাদের ক্রয়ক্ষমতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে সহায়ক হবে। তবে পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সাধারণ মানুষের ওপর সম্ভাব্য বাজারচাপ মোকাবেলা করাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।’

উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় ১৪ লাখ চাকরিজীবী : সরকারি চাকরিজীবীদের প্রত্যাশা ছিল নতুন অর্থবছরের শুরুতেই গেজেট প্রকাশ এবং বেতন বৃদ্ধির কাঠামো স্পষ্ট হবে। কিন্তু জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহ শেষ হতে চললেও গেজেট প্রকাশ না হওয়ায় তাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে বেতন কত বাড়বে, কোন ধাপে কার্যকর হবে, ভাতা কখন যুক্ত হবে এবং অবসরপ্রাপ্তদের সুবিধা কীভাবে নির্ধারণ করা হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অমীমাংসিত।

হাবিবুর রহমান নামে অবসরপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমার মতো যারা এখন আর সার্ভিসে নাই তারা তো গণমাধ্যম ছাড়া সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত বা তথ্য জানতে পারি না। পে-স্কেলের বিষয়টা যতই দীর্ঘায়িত হচ্ছে আমাদের মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ততই বাড়ছে।’

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

বিদ্যুৎ নিয়ে চরম অস্বস্তি

অনলাইন ডেস্ক
বিদ্যুৎ নিয়ে চরম অস্বস্তি

চরম অস্বস্তিতে আছেন বিদ্যুতের গ্রাহকরা। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের কথা বলে জুনে দাম বৃদ্ধি করা হলেও ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছেন গ্রামাঞ্চলের বাসিন্দারা। লোডশেডিংয়ের কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে। বিদ্যুৎ না থাকায় এইচএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদেরও। এর সঙ্গে নতুন করে অস্বস্তি বাড়িয়েছে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক ভূতুড়ে বিল। এই অস্বাভাবিক বিল নেওয়ার বিষয়টি যাচাই করতে এরই মধ্যে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জন্য ২৮টি টিম গঠন করে দেওয়া হয়েছে। এ টিমের সদস্যরা গ্রাহকদের বিভিন্ন অভিযোগ এখন যাচাই করছেন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্রাহকরা অনেক দিন ধরেই বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বা ভূতুড়ে বিল নিয়ে অভিযোগ করছেন।

ভুক্তভোগী গ্রাহকরা বলছেন, তারা প্রতি মাসে গড়ে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন গত জুনের বিলে তার তুলনায় অনেক বেশি ইউনিট দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বছরের অন্য সময় সাধারণত এমন না হলেও জুন ক্লোজিংয়ের আগে প্রকৃত মিটার রিডিংয়ের পরিবর্তে অনুমানভিত্তিক বা অতিরিক্ত ইউনিট দেখিয়ে বিল করা হয়। যদিও এ অভিযোগ বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো বরাবরই অস্বীকার করেছে। ভুক্তভোগী গ্রাহকদের অভিযোগ, বছরের অন্য সময় থেকে জুনে ব্যবহারের চেয়ে দুই থেকে তিন গুণ বেশি বিল আসে। এজন্য তারা স্থানীয় বিদ্যুৎ অফিসে অভিযোগ করেও কার্যকর সমাধান পাচ্ছেন না। বেশ কিছু এলাকায় নিয়মিত মিটার রিডিংও হয় না। কোথাও একসঙ্গে দুই মাসের বিল নেওয়া হয়। অনুমানভিত্তিক বিল তৈরিরও অভিযোগ আছে। এতে প্রকৃত বিদ্যুৎ ব্যবহারের সঙ্গে বিলের কোনো মিল থাকে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির (পবিস) মনিটরিং ও ব্যবস্থাপনা পরিচালন (কেন্দ্রীয় অঞ্চল) পরিদপ্তরের একজন উপপরিচালক বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চেয়ারম্যানের নির্দেশে এক সপ্তাহ ধরে বিদ্যুতের অস্বাভাবিক বিলের বিষয়ে যাচাই চলছে। এজন্য ২ জুন ২৮টি টিম গঠন করা হয়েছে, যারা ৮০টি পবিসে গিয়ে এ-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা যাচাই করছে। ঈদের সময় ছুটিতে মানুষ বাসায় এসি ও ফ্রিজের মতো ইলেকট্রনিক পণ্য বেশি ব্যবহার করায় মে-জুনে বিল বেশি এসেছে। তবে দুই-একটি জায়গায় ইন্টিগ্রেটেড বিলিং সিস্টেমের কারণে ম্যানুয়ালি পোস্টিং দিতে গিয়ে সংখ্যাগত ভুল হতে পারে। এ ব্যাপারে কেউ অভিযোগ জানালে আমাদের লোক তা যাচাই করে ঠিক করে দেন।’

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বিল নিয়ে গ্রাহকের অভিযোগ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বিলও বৃদ্ধি পেয়েছে। এ কারণে প্রিপেইড গ্রাহকদের আগের চেয়ে ঘন ঘন রিচার্জ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া কম বৃষ্টি, অতিরিক্ত তাপ, বিশ্বকাপ ফুটবল, এইচএসসি পরীক্ষার জন্য সারা দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামাঞ্চলেও বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় এর প্রভাব বিলের ওপর পড়েছে। তবে কিছু ভুল পাওয়া গিয়েছে এ ব্যাপারে পরীক্ষানিরীক্ষা করে সমস্যার সমাধান করা হচ্ছে।

ব্রাক্ষণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার মো. মাকসুদ জানান, মে মাসে তার বিদ্যুৎ বিল এসেছে ২ হাজার ৭২১ টাকা, কিন্তু জুনে এসেছ ৫ হাজার ১০১ টাকা। হঠাৎ এই বাড়তি বিল আসার কারণ তিনি বুঝতেই পারছেন না।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহক পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার বাঁশবাড়িয়া গ্রামের জাহাঙ্গীর মৃধা জানান, তার হাতে পাওয়া সর্বশেষ বিলে ৬ জুন পর্যন্ত ৪৯০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব দেখানো হয়েছে। কিন্তু ২১ জুন মিটারে গিয়ে তিনি দেখেন রিডিং রয়েছে মাত্র ৪৩০ ইউনিটের। অর্থাৎ বিলের হিসাবে ব্যবহারের চেয়ে ৬০ ইউনিট বেশি দেখানো হয়েছে। পরে তিনি মিটারের বর্তমান রিডিংয়ের ছবি নিয়ে গলাচিপা জোনাল অফিসে গেলে কর্তৃপক্ষ বিল সংশোধন করে দেন।

বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে সম্প্রতি জানানো হয়েছে, বিল দিতে কোনো কারিগরি ভুল হয়ে থাকলে তা দ্রুত সংশোধন করা হবে। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাদের বিরুদ্ধে আইনি কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সমস্যা সমাধানে গ্রাহকদের হটলাইন বা সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ অফিসে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। গত জুনে ভোক্তাপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম রেকর্ড প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করে সরকার। আর পাইকারি পর্যায়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

দাম বাড়ানোর আগে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে বলা হয়, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু দাম বৃদ্ধির পরও গ্রাহক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না, উল্টো ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢাকার বাইরের মানুষ বিদ্যুৎহীন থাকছেন।

দাম বৃদ্ধির পরও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়ার বিষয়ে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের সুফল তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায় না। জুনের বিল জুলাইয়ে আদায় হবে, ফলে এর আর্থিক প্রভাব আগস্ট থেকে দেখা যাবে। তখন অতিরিক্ত রাজস্ব দিয়ে আরও জ্বালানি সংগ্রহ করা সম্ভব হলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়ানো যাবে।’

ঢাকার বাইরে বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় একদিকে যেমন শিল্পকারখানাসহ উদ্যোক্তাদের পণ্য উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমন তীব্র গরম ও লোডশেডিংয়ে শিশু-বৃদ্ধদের বেশ কষ্ট হচ্ছে। এরই মধ্যে দেশজুড়ে চলা এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। তারা জানান, বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় ঠিকমতো পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পারছেন না।

সিলেট সরকারি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী আবিদুল হাসান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘পরীক্ষায় কী হবে জানি না। লোডশেডিংয়ের কারণে প্রস্তুতি নেওয়া যাচ্ছে না।’

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

ভারত-জাপান উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ

তিন দেশের অর্থনৈতিক করিডরে খুলছে নতুন সম্ভাবনা

অনলাইন ডেস্ক
ভারত-জাপান উন্নয়ন প্রকল্পে যুক্ত হচ্ছে বাংলাদেশ

ভারত ও জাপানের কৌশলগত অংশীদারির নতুন পর্বে উন্নয়ন সহযোগিতার আওতায় বাংলাদেশকে যুক্ত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে।  ২ জুলাই ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ বৈঠকের যৌথ ঘোষণায় উত্তর-পূর্ব ভারতের উন্নয়ন, আঞ্চলিক সংযোগ এবং সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) শক্তিশালী করার পরিকল্পনায় বাংলাদেশসহ বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর সম্পৃক্ততার বিষয়টি তুলে ধরা হয়। নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে অনুষ্ঠিত এ ১৬তম ভারত-জাপান বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের পর প্রকাশিত যৌথ বিবৃতিতে এ বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যের কথা জানানো হয়।

যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ এবং ভারতের ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির আওতায় উত্তর-পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে উভয় দেশ একমত হয়েছে। এ অঞ্চলে শিল্প উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও আঞ্চলিক সংযোগ জোরদারের মাধ্যমে একটি সমন্বিত শিল্প ও বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোকে যুক্ত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিমসটেকের সদস্য দেশগুলো হলো বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, নেপাল ও ভুটান। যদিও যৌথ বিবৃতিতে কোনো নির্দিষ্ট প্রকল্পের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, উত্তর-পূর্ব ভারতের উৎপাদন কেন্দ্রগুলোকে বাংলাদেশ হয়ে সমুদ্রবন্দর এবং আঞ্চলিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনাই মূল লক্ষ্য।

এর আগে ২০২৩ সালে তৎকালীন জাপানের প্রধানমন্ত্রী ফুমিও কিশিদা ভারত সফরে উত্তর-পূর্ব ভারত ও বাংলাদেশকে সংযুক্ত করে শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়নের একটি বৃহৎ পরিকল্পনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের বন্দর, সড়ক ও রেল অবকাঠামো ব্যবহার করে উত্তর-পূর্ব ভারতের রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

সর্বশেষ শীর্ষ বৈঠকের সিদ্ধান্তে সেই ধারণাকে আরো বিস্তৃত করে পুরো বিমসটেক অঞ্চলের সঙ্গে সংযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি শীর্ষ বৈঠক-পরবর্তী ব্রিফিংয়ে বলেন, জাপানের কাছে উত্তর-পূর্ব ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার ক্ষেত্র। এ অঞ্চলের উন্নয়নে দুই দেশের চলমান সহযোগিতা ভবিষ্যতেও আরো সম্প্রসারিত হবে। পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব ভারতকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে একটি শীর্ষ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি। তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান আরো কৌশলগত গুরুত্ব পাবে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, সড়ক ও রেল করিডর এবং সীমান্তভিত্তিক বাণিজ্য নতুন মাত্রা পেতে পারে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে বলে মনে করছেন তারা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আঞ্চলিক পণ্য পরিবহন বাড়বে। বন্দর, লজিস্টিকস ও পরিবহন খাতে নতুন বিনিয়োগ আসতে পারে। উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ আরো গভীর হবে।

বিমসটেকভিত্তিক আঞ্চলিক মূল্য শৃঙ্খল গড়ে ওঠার সুযোগ সৃষ্টি হবে। জাপানের অর্থায়নে নতুন অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের সম্ভাবনাও বাড়বে।

এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান বলেন, জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশ, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং মিয়ানমার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূ-কৌশলগত অঞ্চল। এ কারণে জাপান দীর্ঘদিন ধরেই এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক সংযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ভারত-জাপান শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহযোগিতার কাঠামোয় যুক্ত করার বিষয়টি তাই নতুন কোনো উদ্যোগ নয়; ২০২৩ সালেও এ ধরনের পরিকল্পনার কথা উঠে এসেছিল।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ তখনই সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত হবে, যখন এ উদ্যোগ কেবল উত্তর-পূর্ব ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে মিয়ানমারের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংযোগ আরো জোরদার করবে। কারণ বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজার ও আঞ্চলিক সংযোগের অর্থনৈতিক গুরুত্ব উত্তর-পূর্ব ভারতের তুলনায় অনেক বেশি।

শাহাব এনাম খান আরো বলেন, উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রাকৃতিক সম্পদ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে যদি ভারত, জাপান ও বাংলাদেশ যৌথভাবে শিল্প ও অবকাঠামো উন্নয়ন করতে পারে, তাহলে তা তিন দেশের জন্যই ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করবে। তার মতে, জাপানের দৃষ্টিতে বাংলাদেশ, ভারত ও মায়ানমারের মধ্যে অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক সংযোগ জোরদার হলে পুরো অঞ্চলের স্থিতিশীলতা বাড়বে। তাই ভবিষ্যতে এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিশ্চিত করতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

বিভক্তি নয়, দেশ বাঁচাতে ঐক্য চাই

অনলাইন ডেস্ক
বিভক্তি নয়, দেশ বাঁচাতে ঐক্য চাই

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শনিবার জুলাই-আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের শোক ও বিজয়ের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জুলাই জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেন, ‘প্রতিশোধ নয়, ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে এগিয়ে নিতে হবে।’ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর এটিই প্রথম নয়, গত প্রায় পাঁচ মাসে একাধিকবার সংসদে এবং সংসদের বাইরে তারেক রহমান দেশ পুনর্গঠনে ঐক্যের ডাক দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্য স্রেফ কথার কথা নয়, তিনি এই স্বল্প সময়ের মধ্যে দেশের রাজনীতিতে একটি ঐক্যের আবহ সৃষ্টির চেষ্টা করে চলেছেন। জাতীয় সংসদে সরকারি ও বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধভাবে যেন দেশ পরিচালনা করতে পারে সেজন্য সংসদ নেতা হিসেবে তারেক রহমানের একাধিক পদক্ষেপ সবার কাছে প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী যেভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে ঐক্যের বাংলাদেশ বিনির্মাণের জন্য হাত বাড়িয়েছেন, সেভাবে কি সাড়া দিচ্ছেন সবাই?

একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে বহুলকাঙ্ক্ষিত গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাংলাদেশ এখন ক্ষতবিক্ষত। ধ্বংসের কিনারে দাঁড়িয়ে। বিগত ১৫ বছরের দুর্নীতি, লুটপাট এবং একদলীয় শাসনের ফলে দেশের অবস্থা এমনিতেই বেহাল ছিল।

২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্র্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসন দেশকে আরও গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে। দেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত। বেকারত্ব বেড়েছে উদ্বেগজনকভাবে। ইউনূস সরকারের অর্থনীতিবিনাশী তৎপরতার কারণে বেসরকারি খাত আজ মুখ থুবডে পড়েছে। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ। নতুন বিনিয়োগ নেই বললেই চলে। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির চাপে মানুষ দিশাহারা। সামাজিক জীবনে অস্থিরতা বিরাজ করছে।

ইউনূস আমলে সংক্রামিত মহামারি মব সন্ত্রাস পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এখনো। ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধ এখনো জনজীবনে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইউনূস সরকারের অপশাসনের ক্ষত। এ ধ্বংসস্তূপ থেকে দেশকে উদ্ধার করতে হলে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। সরকারের একার পক্ষে এসব সমস্যার চটজলদি সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন সবার সম্মিলিত উদ্যোগ, পারস্পরিক সহযোগিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। ’২৪-এর গণ অভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল ঐক্যের বাংলাদেশ।

বিভক্তি, হানাহানি, বৈষম্য ও প্রতিহিংসার শিকল ভেঙে বাংলাদেশকে মুক্ত স্বাধীনভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যেই রাজপথে নেমে এসেছিল আপামর জনতা। সবাই আশা করেছিল আওয়ামী লীগের পতনের পর দেশে মন খুলে কথা বলা যাবে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, ভিন্নমতের কারণে কেউ নিগৃহীত হবে না। মানুষের ওপর জুলুম-নির্যাতন বন্ধ হবে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে দেশকে একসুতোয় গাঁথার মহাসুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু ইউনূস সরকার ঐক্যের বদলে বিভাজন বাড়িয়ে দেয়। নতুন করে শুরু হয় দুর্নীতি, লুটপাট। একটি নব্য লুটেরা ফ্যাসিস্ট শক্তির জন্ম দেন ড. ইউনূস।

১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে আবার দেশকে সঠিক পথে নিয়ে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এজন্য দরকার সবার সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল আচরণ। বাংলাদেশের জন্য ঐতিহাসিক বাস্তবতা হলো-দেশ যখনই পথ হারিয়েছে, যখনই জাতি বিভক্তির চোরাগলিতে আটকে গেছে তখনই জিয়া পরিবার জাতির ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। দেশ বাঁচাতে ঐক্যবদ্ধ করেছে মানুষকে।

১৯৭৫-এর পর বাংলাদেশ হয়ে পড়েছিল বিভক্ত। দেশে সৃষ্টি হয়েছিল ভয়াবহ বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি। গৃহযুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ অস্তিত্বের সংকটে পড়েছিল। সে সময় কান্ডারি হয়ে দেশের হাল ধরেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। শহীদ জিয়া দিশাহারা, বিভ্রান্ত জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্রের মাধ্যমে তিনি সব মতকে সম্মান দেখানোর বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সূচনা করেন।

সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির শৃঙ্খল থেকে মুক্তবাজার অর্থনীতি চালু করে দুর্ভিক্ষপীড়িত একটি দেশকে নতুন সম্ভাবনার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সূচনা করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র, বেসরকারি খাতের জন্য পথ তৈরি, দুর্নীতিমুক্ত দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন চিরকাল।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রার তিনিই রূপকার। তিনি প্রথম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অপার সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন। তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত একটি দেশকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল লক্ষ্য ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারও সাথে বৈরিতা নয়’- এর দার্শনিক ভিত্তির জনক শহীদ জিয়া। মাত্র তিন বছরের মধ্যে জিয়াউর রহমান হতাশাগ্রস্ত, দিশাহারা একটি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এগিয়ে চলার পথ দেখিয়েছেন। জিয়াউর রহমান দেখিয়েছেন ঐক্যই বাংলাদেশের সাফল্যের চাবিকাঠি।

শহীদ জিয়ার মৃত্যুর পর বাংলাদেশ আবার পথ হারায়। আবারও শুরু হয় দুর্নীতি, লুটপাটের রাজনীতি। এরশাদ ক্ষমতা দখল করে আবারও দেশের জনগণকে করেন অধিকারহীন। দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ হয়ে যায় বিদেশি ঋণনির্ভর। দাতাদের শর্তের জালে আটকা পড়ে বাংলাদেশের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। এ অবস্থা উত্তরণের জন্য এগিয়ে আসে জিয়া পরিবার। বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে আসেন শুধু দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য।

দেশ বাঁচাতে তিনি চরম ত্যাগ স্বীকার করেন। বেগম জিয়ার নেতৃত্বে দীর্ঘ নয় বছরের আন্দোলনের পর বাংলাদেশ স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয়। নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিপুলভাবে জয়ী হয় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি। শুরু হয় গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা। বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১-এর নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেশ পরিচালনা করেননি। বরং দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেন। যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। বিএনপি দলীয়ভাবে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার পদ্ধতিতে বিশ্বাসী ছিল। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হলে বেগম জিয়া যে বিপুল ভোটে বিজয়ী হতেন তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ ছিল না। কিন্তু তিনি দেশের স্বার্থে, জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে বিরোধী দলের দাবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার বিল সংসদে উত্থাপন করেন। বহুদলীয় গণতন্ত্র ও ভিন্নমত লালনের এটি একটি অনন্য উদাহরণ। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে বেগম খালেদা জিয়া এককভাবে বিএনপির সরকার গঠন করেননি। জোটসঙ্গী জামায়াতকেও মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে গণতন্ত্রের এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।

২০০৭ সালে এক-এগারোর মাধ্যমে গণতন্ত্রবিরোধী অপশক্তি ক্ষমতা দখল করে। জাতির এই চরম সংকটে বেগম জিয়া গণতন্ত্রের ডাক দিয়েছিলেন। তিনি সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকারের প্রলোভনের ফাঁদে পা দেননি। এজন্য জিয়া পরিবারকে চরম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। বেগম জিয়া, তাঁর বড় ছেলে, আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে মিথ্যা অভিযোগে গ্রেপ্তার করে অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। তার পরও আপস করেননি বেগম জিয়া।

২০০৮-এর সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসানো হয়। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করতে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে। এর প্রতিবাদে আবারও রাজপথে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলেন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৪ সালে বেগম জিয়া যে এক দফা আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তারই চূড়ান্ত পরিণতি ২০২৪-এর ৫ আগস্টের গণ অভ্যুত্থান। ১৭ বছর দেশের জন্য, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সীমাহীন ত্যাগ স্বীকার করেছে জিয়া পরিবার। বেগম জিয়াকে বিনা অপরাধে নির্জন কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বছরের পর বছর। তারেক রহমান নির্বাসিত ছিলেন। স্বৈরশাসনের জুলুম-নির্যাতনে মারা যান আরাফাত রহমান কোকো। তবু আপসহীন ছিলেন বেগম জিয়া। আপস করেনি জিয়া পরিবার।

’২৪-এর ৫ আগস্টের পর ইউনূস সরকার যখন জনগণের অধিকার হরণ করে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার ষড়যন্ত্র শুরু করে, তখন তারেক রহমান দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। বস্তুত তারেক রহমানের রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই শেষ পর্যন্ত ইউনূস সরকার নির্বাচন দিতে বাধ্য হয়। আর তাই নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানান দেশবাসী। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয় শুধু বিএনপির নয়, ঐক্যের পক্ষে জনরায়। শান্তি ও সংহতির পক্ষে জনমত।

তাই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমি সবার প্রধানমন্ত্রী।’ যারা ভোট দিয়েছেন, যারা ভোট দেননি সবাইকে নিয়ে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন তারেক রহমান। এটাই জাতীয় ঐক্যের মূলভিত্তি। গণতন্ত্রে দলের প্রধানমন্ত্রী হন না, হন দেশের প্রধানমন্ত্রী। চিরায়ত এই গণতন্ত্রের সংস্কৃতি দেশে নতুন করে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। যে পথ দেখিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়া। ঐক্যের মশাল নিয়ে এখন জাতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। দেশের এই সংকটময় সময়ে বিরোধী দলকেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। রাজনৈতিক দলের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতেই পারে, এটা থাকাটাই স্বাভাবিক। বহুমতই গণতন্ত্রের শক্তি। কিন্তু দেশের মৌলিক প্রশ্নে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, দেশরক্ষা, জনগণের অধিকার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐক্যের বিকল্প নেই। এখন সরকার পতনের হুমকি দেওয়ার সময় নয়। এখন সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথ উত্তপ্ত করার সময় নয়। আন্দোলনের নামে অস্থিরতা দেশের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করবে।

গণতন্ত্রে ক্ষমতা পরিবর্তনের একমাত্র উপায় নির্বাচন। সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরার একমাত্র প্ল্যাটফর্ম জাতীয় সংসদ। জাতীয় সংসদ হোক সব বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মাধ্যমে বিকশিত হোক গণতন্ত্র। আর গণতন্ত্র টেকসই হলেই কেবল অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে। সরকারের জবাবদিহিতার জায়গা জাতীয় সংসদ, রাজপথ নয়; এটা যদি বিরোধী দল বুঝতে পারে তাহলেই গণতন্ত্র রক্ষা পাবে। দেশ বাঁচবে। তাই দেশ বাঁচাতে সরকার ও বিরোধী দল উভয়কেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশ যদি না বাঁচে ক্ষমতা দিয়ে কী হবে? সব পক্ষকে এ সত্য উপলব্ধি করতে হবে।

সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

\'রোহিঙ্গাদের পর আর শরণার্থী নেওয়ার পরিস্থিতি আমাদের নেই\' | কালের কণ্ঠ